সংকটে বহুমুখী চ্যালেঞ্জের বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
কালের আলো রিপোর্ট:
দু:সময়ে বহুমুখী চ্যালেঞ্জের এক বাজেট ঘোষণা করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ। আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি, বিপর্যস্ত আর্থিক খাত সংস্কার ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। সোমবার (২ জুন) দুপুরে রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ টেলিভিশনে তিনি প্রস্তাবিত এই বাজেট ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটও উপস্থাপন করেন তিনি। এছাড়া প্রস্তাবিত ‘অর্থ অধ্যাদেশ ২০২৫’ প্রকাশ করা হয়েছে।
এবারের বাজেট বক্তৃতার শিরোনাম হচ্ছে-‘বৈষম্যহীন ও টেকসই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ার প্রত্যয়’। সংকটের এই সময়ে তিনি গতানুগতিক বাজেটের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে পারেননি। সংকট কাটানোর পথও নেই। প্রস্তাবিত বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। সর্বশেষ গত এপ্রিলে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ১৭ শতাংশ। অর্থবছর শেষে মূল্যস্ফীতির হার ৮ শতাংশে নেমে আসবে বলে অর্থ উপদেষ্টা তার বাজেট বক্তৃতায় আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে প্রস্তাবিত বাজেটে নানা ধরনের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির পাশাপাশি বাড়ানো হয়েছে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা। তবে বাজেটের বাস্তবায়ন ও বিভিন্ন দিক নিয়ে উদ্বেগ ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে, বাজেটে অর্থ উপদেষ্টা রাজস্ব আয়ের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রস্তাবিত বাজেটে করভিত্তি সম্প্রসারণ, করহার বাড়ানো, কর হার পুনর্বিন্যাস,ভ্যাটের আওতা বৃদ্ধি এবং সরকারি সেবা ব্যয় ও মাশুল বাড়ানোর প্রস্তাব করেছেন। এছাড়া বাজেটে কৃষি, খাদ্য উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্পায়ন, বিনিয়োগ আকর্ষণ ও এলডিসি-উত্তর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলাকে অধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
বাজেটের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, প্রস্তাবিত বাজেটে আগের সরকারের ধারাবাহিকতা থেকে খুব একটা বের হতে পারেনি। বাজেটের সাইজ ছোট হওয়া উচিত ছিল। গুণগত দিক দিয়ে এবারের বাজেটে পরিবর্তন নেই, সংখ্যার সামান্য পরিবর্তন রয়েছে। তাই সরকারের জন্য এই বাজেট বাস্তবায়ন করা খুব একটা সহজ হবে না। তবে আগামীকাল মঙ্গলবার বিএনপির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হবে।
- ব্রিফকেসহীন বাজেট
- বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট
- অর্থবছর শেষে মূল্যস্ফীতির হার ৮ শতাংশে নেমে আসবে
- প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ব্যয়ের পরিমাণ ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা
- বাজেটের বাস্তবায়ন ও বিভিন্ন দিক নিয়ে উদ্বেগ ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া
একই রকম কথা বলেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী প্রথম বাজেটে নতুন বাংলাদেশ পুনর্গঠনের প্রত্যয় আশানুরূপভাবে প্রতিফলিত হয়নি বলে জানিয়েছে দলটি। বাজেট ঘোষণার পর দলটির পক্ষ থেকে জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মাছুম এমন প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থ বছরের জন্য ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার এক বাজেটে নতুন বাংলাদেশ পুনর্গঠনের প্রত্যয় আশানুরূপভাবে প্রতিফলিত হয়নি। পূর্বের বাজেটের মতো এটি একটি গতানুগতিক বাজেট। প্রস্তাবিত বাজেটের সঙ্গে ২০২৪-২৫ অর্থ বছরের মূল বাজেটের মোটা দাগে খুব একটা তফাৎ পরিলক্ষিত হয়নি। বাজেটে ব্যয় না বাড়লেও তেমন কোনো ব্যয় কমেওনি, এতে কোনো নতুনত্ব নেই।
বাজেট বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়া হলে গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো ও অর্থনীতিবিদ এম হেলাল আহমেদ জনি বলেছেন, ‘নিঃসন্দেহে এবারের বাজেটটা বেশ চ্যালেঞ্জিং। তারপরেও অন্তবর্তী সরকার বেশ সাহসী কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে বাজেটে ঘাটতির যে পরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছে প্রকৃত ঘাটতি এর চেয়ে আরও বেশি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। কেননা অন্যান্য অর্থবছরের তুলনায় এবছর রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বেশ চ্যালেঞ্জিং হবে। এছাড়া অভ্যন্তরীণ ঋণ তথা ব্যাংক খাত থেকে খুব বেশি ঋণ সহায়তা আশা করা যাচ্ছে না। উপরন্তু কয়েকটি ব্যাংকে সরকারকেই মূলধন সহায়তা দিতে হবে। তাই বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়তে পারে। সার্বিকভাবে এ অর্থবছরের ঘোষিত বাজেট বাস্তবায়ন করা বেশ কঠিন হবে বলে মনে হচ্ছে।’
বাজেট প্রতিক্রিয়ায় খুব একটা খুশি নন ব্যবসায়ীরাও। বাজেট বিষয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, ‘প্রস্তাবিত বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ন্যূনতম করের সমন্বয়, বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনুমোদন যোগ্য বিয়োজনের আওতা বৃদ্ধি, করজাল সম্প্রসারণ এবং অটোমেটেড রিটার্ন ব্যবস্থা চালুর মতো ইতিবাচক পদক্ষেপ থাকা সত্ত্বেও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, সহজে ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ উন্নয়ন, সিএমএসএমই এবং ব্যাংকিং খাত সংস্কার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা না থাকায় সার্বিক ব্যবসা ও বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে ততটা সহায়ক নয়। প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা বেশ বড়, যা অর্জন বেশ চ্যালেঞ্জিং হবে। ব্যক্তি পর্যায়ের করের সীমা অপরিবর্তিত রাখা এবং স্ল্যাব উঠিয়ে নেওয়ায় মধ্যবিত্ত ও বিশেষকরে চাকরিজীবীদের করের বোঝা আগামী অর্থবছর হতে আরও বেশি বহন করতে হবে।’
কালো ব্রিফকেসহীন এক বাজেট
প্রতিবছর বাজেটকে কেন্দ্র করে থাকতো নানান আয়োজন। প্রধানমন্ত্রী বা সরকার প্রধানের সঙ্গে ব্রিফকেস হাতে অর্থমন্ত্রী জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপন করতে আসতেন। তবে এবার ভিন্ন আঙ্গিকে উপস্থাপন করা হয়েছে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট। সংসদ না থাকায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট অধ্যাদেশ আকারে জারি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এবারের বাজেট প্রস্তাবনা উপস্থাপন করা হয়েছে বিটিভির ধারণ করা বাজেট বক্তব্যে। আসন্ন ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ধরা হচ্ছে ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। বিশাল অংকের এ বাজেটের ঘাটতি ধরা হচ্ছে ২ লাখ ৫১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। আর অনুদান ছাড়া ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াবে ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা, যা মোট জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ।
যে কারণে কমেছে বাজেটের আকার
বাজেট ঘোষণার আগে এবারের বাজেট ‘বাস্তবসম্মত ও বাস্তবায়নযোগ্য’ হবে বলে অর্থ উপদেষ্টা বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমকর্মীদের জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আগামী বাজেটটা আমরা মোটামুটি বাস্তবায়ন করবো, বিরাট একটা গ্যাপ নিয়ে করবো না। ব্যাংক থেকে ধার করে কিংবা টাকা ছাপিয়ে বাজেট বাস্তবায়ন করবো না। তবে কিছুটা তো ডেফিসিট (ঘাটতি) থাকবে। নতুন বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকারও অত্যন্ত বাস্তবভিত্তিক হবে।’ এ কারণে প্রথমবারের মত আগামী বাজেটের আকার চলতি বাজেটের তুলনায় কমছে।
প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ব্যয়ের পরিমাণ ধরা হয়েছে ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। এটি জিডিপি’র ১২ দশমিক ৭ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের তুলনায় টাকার অঙ্কে বাজেটের আকার কমছে ৭ হাজার কোটি টাকা। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মূল বাজেটের আকার ছিল ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা।
প্রস্তাবিত বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ রাজস্ব আদায়
প্রস্তাবিত বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে রাজস্ব আদায়। বর্তমানে বাংলাদেশের কর-জিডিপি’র অনুপাত ৮ শতাংশের নিচে রয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে মোট প্রাপ্তি প্রাক্কলন করা হয়েছে ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা। এটি জিডিপি’র ৯ শতাংশ। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) নিয়ন্ত্রিত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা। এটি চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১৯ হাজার কোটি টাকা বেশি। এছাড়া এনবিআর-বহির্ভূত কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে ১৯ হাজার কোটি টাকা এবং কর ব্যতীত প্রাপ্তির (এনটিআর) লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪৬ হাজার কোটি টাকা। এর বাইরে বৈদেশিক অনুদানের প্রত্যাশা করা হয়েছে ৫ হাজার কোটি টাকা।
বিদায়ী অর্থবছরের মূল বাজেটে মোট রাজস্ব প্রাপ্তির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) নিয়ন্ত্রিত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে এটি কমিয়ে ৪ লাখ ৬৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা প্রাক্কলন করা হয়েছে। এছাড়া এনবিআর-বহির্ভূত কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৫ হাজার কোটি টাকা এবং কর ব্যতীত প্রাপ্তির (এনটিআর) লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৬ হাজার কোটি টাকা। এর বাইরে বৈদেশিক অনুদানের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।
বাজেট ঘাটতি ও অর্থায়ন
প্রস্তাবিত বাজেটে অনুদান ব্যতীত সার্বিক ঘাটতি প্রাক্কলন করা হয়েছে ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা। এটি জিডিপি’র ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে ঘাটতির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা। এটি ছিল জিডিপি’র ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। বাজেট ঘাটতি পূরণে আগামী বাজেটে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে মোট ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে নীট ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা এবং ব্যাংক-বহির্ভূত খাতের মধ্যে সঞ্চয়পত্র খাত থেকে ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ও অন্যান্য খাত থেকে ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হবে।
- সম্পদের সুষম বণ্টন ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়া এবারের বাজেটের অন্যতম লক্ষ্য
ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ
অর্থ উপদেষ্টা, অন্তর্বর্তী সরকার
অন্যদিকে বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আর ৩৯ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করা হবে। সেক্ষেত্রে নীট বৈদেশিক ঋণ দাঁড়াবে ৯৬ হাজার কোটি টাকা। পাঁচ হাজার কোটি টাকা অনুদানসহ মোট ১ লাখ ১ হাজার কোটি টাকা। বাজেট ঘাটতি পূরণে বিদায়ী অর্থবছরের মূল বাজেটে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার ৯০০ কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার ২০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল। বিদায়ী অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে নীট ১ লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা (এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী ঋণ ৭২,৬৮২ কোটি টাকা ও স্বল্পমেয়াদী ঋণ ৬৪,৮১৮ কোটি টাকা) এবং ব্যাংক-বহির্ভূত খাতের মধ্যে সঞ্চয়পত্র খাত থেকে ১৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকা ও অন্যান্য খাত থেকে ৮ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
ঋণ ও সুদ পরিশোধ
আগামী অর্থবছরের দেশি-বিদেশি ঋণ ও ঋণের সুদ বাবদ মোট ১ লাখ ৮৭ হাজার কোটি টাকা পরিশোধের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণ ও ঋণের সুদ বাবদ যথাক্রমে ১৬ হাজার কোটি টাকা এবং ১ লাখ কোটি টাকা পরিশোধ করা হবে। অন্যদিকে প্রস্তাবিত বাজেটে আগামী অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৯ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণের সুদ বাবদ ২২ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করা হবে।
চলতি অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ ঋণ বাবদ ১৫ হাজার ১৬৩ কোটি টাকা এবং ঋণের সুদ বাবদ ৯৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পরিশোধ দেখানো হয়েছে। অন্যদিকে বিদায়ী অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে ৩৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পরিশোধ দেখানো হয়েছে।
পরিচালন ও অনুন্নয়ন ব্যয়
প্রতিবারের মত এবারও বাজেটে পরিচালনা ও অন্যান্য খাতে (অনুন্নয়ন) ব্যয় বাড়ছে। প্রস্তাবিত বাজেটে এসব খাতে মোট ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৩৫ হাজার ৩১৭ কোটি টাকা। চলতি বাজেটে এ খাতে ৫ লাখ ৬ হাজার ৯৭১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। প্রস্তাবিত বাজেটে অনুন্নয়ন ব্যয়ের মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ পরিশোধে ১ লাখ কোটি টাকা (চলতি অর্থবছরে এ লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯৩ হাজার কোটি টাকা) এবংবৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধে ২২ হাজার টাকা (চলতি অর্থবছরে এ লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা); মূলধনী খাতে ৩৬ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা (চলতি অর্থবছরে এ লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৭ হাজার ৯৮৯ কোটি টাকা); খাদ্য হিসাবে ৬৮৩ কোটি টাকা (চলতি অর্থবছরে এ লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১৯ কোটি টাকা) এবং ঋণ ও অগ্রীম খাতে ৮ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা (চলতি অর্থবছরে এ লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা) ব্যয় করা হবে। এছাড়া প্রস্তাবিত বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচী (এডিপি)-এর আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। বিদায়ী অর্থবছরের বাজেটে মূল এডিপি’র আকার ছিল ২ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা।
সম্পদের সুষম বণ্টন ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়া এবারের বাজেটের অন্যতম লক্ষ্য
বৈষম্যহীন ও টেকসই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ার প্রত্যয় নিয়ে জাতির সামনে ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেট দিয়েছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। সোমবার (২ জুন) বিকেল ৩টায় জাতির সামনে এই বাজেট তুলে ধরে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, সম্পদের সুষম বণ্টন ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়া এবারের বাজেটের অন্যতম লক্ষ্য। তিনি বলেন, রাজস্ব আয় ও সরকারি ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে একটা যৌক্তিক ও বাস্তবায়নযোগ্য বাজেট প্রণয়নও হবে এই বাজেটের অন্যতম উদ্দেশ্য।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধির লক্ষ্যে কর অব্যাহতি যৌক্তিকীকরণসহ মধ্যমেয়াদে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে বলে উল্লেখ করেন সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করতে জনবল বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া, কর অব্যাহতি সুবিধা ক্রমান্বয়ে কমিয়ে আনা, করজাল সম্প্রসারণ, বিভিন্ন পণ্য ও পরিষেবায় যথাসম্ভব একই হারে ভ্যাট নির্ধারণের বিষয়টি সক্রিয় বিবেচনাধীন রয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের প্রস্তাব করেছেন অর্থ উপদেষ্টা, যা জিডিপির ৯ শতাংশ। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য উৎস থেকে ৬৫ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুন অর্থবছরের জন্য মোট ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করেছেন অর্থ উপদেষ্টা, যা জিডিপির ১২ দশমিক ৭ শতাংশ। এর মধ্যে পরিচালনসহ অন্যান্য খাতে মোট ৫ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।
অর্থ উপদেষ্টা বলেন, ২০১৫ সালের পর এখন পর্যন্ত কোনো বেতন কাঠামো প্রণীত না হওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এবারের বাজেটে সরকারি কর্মচারীদের জন্য বিশেষ সুবিধার পরিমাণ বৃদ্ধির প্রস্তাব করছি। আগামী অর্থবছরে সামগ্রিক বাজেট ঘাটতি ও ঋণ সহনীয় পর্যায়ে থাকবে উল্লেখ করে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা ধরার কথা জানিয়েছেন অর্থ উপদেষ্টা। যা জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ঘাটতির মধ্যে এক লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এবং এক লাখ এক হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক উৎস থেকে নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। সুদ পরিশোধ বাবদ ব্যয় ধরা হয়েছে এক লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেট
চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা মূল বাজেট থেকে ২৩ হাজার কোটি টাকা হ্রাস করে ৫ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকারি ব্যয় ৫৩ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে ৭ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকার ২ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা থেকে ৪৯ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের বাজেটে ঘাটতি প্রাক্কলন করা হয়েছিল ২ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে ঘাটতি প্রস্তাব করা হয়েছে ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৪ দশমিক ১ শতাংশ।
কালের আলো/আরআই/এমএসএএকে


আপনার মতামত লিখুন
Array