আলোচনায় ‘মাল্টি-রোল’ যুদ্ধবিমান, বাংলাদেশকে সরবরাহে আগ্রহ পাকিস্তানের
কালের আলো রিপোর্ট:
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে নতুন গতি পেয়েছে ঢাকা-ইসলামাবাদ সম্পর্ক। দ্রুতই গলে যাচ্ছে দেশ দু’টির মাঝখানে জমে থাকা দীর্ঘদিনের বরফ। পাকিস্তান সরকারের হাইপ্রোফাইলরা বাংলাদেশ সফর করেছেন। দুই দেশের সম্পর্কের পুনরুজ্জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বাংলাদেশের বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন’র সাম্প্রতিক ইসলামাবাদ সফর। মঙ্গলবার (০৬ জানুয়ারি) পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, বাংলাদেশ বিমান বাহিনী প্রধান এই সফরকালে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল জহির আহমেদ বাবর সিধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এই সফরে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী প্রধান একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিরক্ষা প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাদের মধ্যকার আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে চীন ও পাকিস্তান যৌথভাবে তৈরি ‘মাল্টি-রোল’ যুদ্ধবিমান। যেটি জেএফ-১৭ থান্ডার নামে পরিচিত।
পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর বরাতে সংবাদ সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, বাংলাদেশের কাছে জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান বিক্রির বিষয়ে সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের বিমান বাহিনীর প্রধানদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। প্রতিনিধিদলটি পাকিস্তান বিমানবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোও পরিদর্শন করেছে। একই সঙ্গে জানানো হয়েছে, অস্ত্র রপ্তানির পরিসর বাড়ানো এবং বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের অংশ হিসেবেই এই আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে পাকিস্তান গত বছরের ভারতের সঙ্গে সংঘাতের সময়ে বিমান বাহিনীর সাফল্যকে কাজে লাগিয়ে সামরিক সম্পর্ক জোরদার করতে চায়। ওই সংঘাত পারমাণবিক সক্ষম দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে তিন দশকের মধ্যে সবচেয়ে তীব্র আঘাতের ঘটনা হিসেবে আলোড়ন তৈরি করে।
জেএফ-১৭ বিমানটির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে-এটি শুধু আকাশে যুদ্ধ করার জন্য নয় ভূমিতেও শত্রুর কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ এবং হামলাও চালাতে সক্ষম। বিমানটি আকাশ থেকে ভূমি এবং আকাশ থেকে আকাশে হামলাযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রসহ বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র বহন করতে পারে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা বলছেন, জেএফ-১৭ ওজনে হালকা এবং যেকোনো আবহাওয়ায় ভূমি ও আকাশে আক্রমণ চালাতে সক্ষম। ক্ষেপণাস্ত্রসমৃদ্ধ এই বিমান দূর থেকে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতেও সক্ষম। এই যুদ্ধবিমানের অনেক বৈশিষ্ট্য রাফায়েল যুদ্ধবিমানের সঙ্গে তুলনীয়। এর রেঞ্জ প্রায় ১৫০ কিলোমিটার, এবং এতে থাকা ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যবস্তুতে সঠিকভাবে আঘাত করতে পারে।
প্রশিক্ষণ, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং মহাকাশ গবেষণার অগ্রগতিতে সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ
পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বৈঠকে প্রশিক্ষণ, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং মহাকাশ গবেষণার (অ্যারোস্পেস) অগ্রগতিতে সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপসহ উভয় পক্ষের মধ্যে সরাসরি সহযোগিতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় জোরদার করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশ বিমানবাহিনী প্রধানকে নিজেদের সাম্প্রতিক অগ্রগতি সম্পর্কে অবহিত করেছেন পাকিস্তান বিমানবাহিনী প্রধান। পাকিস্তান বিমানবাহিনীর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রাথমিক থেকে উন্নততর উড্ডয়ন প্রশিক্ষণ ও বিশেষায়িত কোর্সের মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রশিক্ষণ কাঠামোর মাধ্যমে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীকে সহযোগিতার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন তিনি। পাকিস্তানের আইএসপিআরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, পাকিস্তান বিমানবাহিনী প্রধান ‘সুপার মুশাক’ প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান দ্রুত সরবরাহ করার পাশাপাশি একটি পরিপূর্ণ প্রশিক্ষণ ও দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করারও আশ্বাস দিয়েছেন।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘বাংলাদেশের বিমানবাহিনী প্রধান পাকিস্তান বিমানবাহিনীর যুদ্ধের সাফল্যের প্রশংসা করেন এবং তাদের আভিযানিক দক্ষতা থেকে উপকৃত হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। এছাড়া বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর পুরোনো বিমানবহরের রক্ষণাবেক্ষণ সহায়তা এবং আকাশপথে নজরদারি বাড়াতে আকাশ প্রতিরক্ষা রাডার ব্যবস্থা সংযোজনে সহযোগিতা চেয়েছেন তিনি। তবে এই বৈঠকের বিষয়ে বাংলাদেশের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) এখনও কোন প্রেস নোট ইস্যু করেনি।
সূত্র জানায়, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের বিমানবাহিনী প্রধানদের এই আলোচনা দক্ষিণ এশিয়ার দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কোন্নয়নের আভাস দিচ্ছে। পাকিস্তানের আইএসপিআর বলেছে, ‘এই সফর পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যকার শক্তিশালী ঐতিহাসিক সম্পর্কের গুরুত্ব তুলে ধরেছে। এটি দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও গভীর করা এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে তোলার অভিন্ন সংকল্পেরই প্রতিফলন।’
সামরিক সক্ষমতার নতুন দিক খুলে দিতে পারে দক্ষিণ এশিয়ায়
একই সূত্র জানায়, জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান চীন ও পাকিস্তানের যৌথ উদ্যোগে তৈরি হয়েছে। এই যুদ্ধবিমান পাকিস্তানের জন্য একটি বড় অস্ত্র রপ্তানি প্রকল্পের অংশ। এটি বর্তমানে আর্জেন্টিনা, আজারবাইজানসহ অন্যান্য দেশেও রপ্তানির অংশ। লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মির সঙ্গে ৪০০ কোটি ডলারের অস্ত্র চুক্তিতেও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এই যুদ্ধবিমান। বাংলাদেশ এই যুদ্ধবিমান সংগ্রহ করলে, এটি দক্ষিণ এশিয়ায় সামরিক সক্ষমতার নতুন দিক খুলে দিতে পারে। জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান সম্পর্কিত পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল ১৯৯৫ সালে। এর প্রথম পরীক্ষামূলক মডেল তৈরি করা হয় ২০০৩ সালে, আর ২০১০ সালে পাকিস্তান বিমান বাহিনী প্রথমবার জেএফ-১৭ তাদের বিমান বহরে অন্তর্ভুক্ত করে। এরপর রাশিয়ার মিকোয়ান কোম্পানিও এই প্রকল্পে যুক্ত হয়, যারা এমআইজি যুদ্ধবিমান তৈরি করে। পুরনো মিরাজ, এফ-৭ ও এ-৫ যুদ্ধবিমানের জায়গায় নতুন বিমান আনার উদ্যোগের অংশ হিসেবে পাকিস্তান বিমান বাহিনী জেএফ-১৭ থান্ডার নকশা করে।
পাকিস্তান বিমান বাহিনীর মুখপাত্র এয়ার কমোডর আহমার রাজা বিবিসিকে জানিয়েছিলেন, জেএফ-১৭ ব্লক থ্রি হলো চতুর্থ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান। ব্লক থ্রি হলো জেএফ-১৭-এর পরবর্তী সংস্করণ, যেখানে নতুন রাডার সংযোজন করা হয়েছে। এই ভার্সনে আধুনিক অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহৃত হবে, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে, এবং প্রতিটি দিক থেকে এটি আরও উন্নত। পাকিস্তান এখন পর্যন্ত এই বিমান আজারবাইজান, মিয়ানমার ও নাইজেরিয়ার কাছে বিক্রি করেছে। গত বছর প্রায় ৪.৬ বিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় পাকিস্তান আজারবাইজানের কাছে ৪০টি জেএফ-১৭ বিক্রির চুক্তি স্বাক্ষর করে। বিমান বাহিনীর মুখপাত্র নির্দিষ্ট সংখ্যা জানাননি, তবে ধারণা করা হচ্ছে ইরাক ও লিবিয়াসহ আরও কয়েকটি দেশের সঙ্গে বিক্রয় নিয়ে সমঝোতা হয়েছে। তবে ইরানসহ কিছু দেশও এই যুদ্ধবিমান কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলে সংবাদমাধ্যমে খবর এসেছে।
কালের আলো/আরআই/এমকে


আপনার মতামত লিখুন
Array