চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে সচিব পদে পদোন্নতির স্বপ্নভঙ্গ
সবার আশা থাকে প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদ সচিব হওয়া। গত অন্তর্বর্তী সরকারের পর বর্তমান বিএনপি সরকারের সময়েও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বন্ধ হয়নি। সচিব পর্যায়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ এখন বাড়তে থাকায় অনেকেরই সচিব পদে পদোন্নতি কেবল স্বপ্নই থেকে গেছে।
জানা যায়, বিএনপি দায়িত্ব নেওয়ার পর অন্তবর্তী সরকারের আমলে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া একাধিক সচিবের নিয়োগ বাতিল করে। এমনকি এক দিনে ৯ সচিবের চুক্তি বাতিল করা হয়। চুক্তি বাতিল করা সচিবরা হলেন পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য মোখলেস উর রহমান, এস এম আকমল হোসেন, কাইয়ুম আরা বেগম, বিশ্বব্যাংকের বিকল্প নির্বাহী পরিচালক শরীফা খান, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের মো. সাইদুর রহমান, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের সচিব শীষ হায়দার চৌধুরী, জাতীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমির মহাপরিচালক (সিনিয়র সচিব) সিদ্দিক জোবায়ের, ভূমি আপিল বোর্ডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইউসুফ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মমতাজ আহমেদ।
জনপ্রশাসন কর্মকর্তাদের প্রত্যাশা ছিল সচিবের এ শূন্য পদগুলো পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণ করা হবে। একই সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া অন্যদেরও পর্যায়ক্রমে সরিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু তা না করে চুক্তিতে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তারা মন্ত্রিপরিষদ, জনপ্রশাসন, স্বরাষ্ট্রসহ গুরুত্বপুর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন।
সূত্র জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সচিব ও সচিব পদমর্যাদার গ্রেড-১ পদসহ চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে ছিলেন ৭৯ জন কর্মকর্তা। সম্প্রতি বেশ কয়েকজনের চুক্তি বাতিল হওয়ায় এ সংখ্যা ৬৬-তে নেমে এসেছে। বিএনপি সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব হিসেবে সাবেক কর্মকর্তা এবিএম আব্দুস সাত্তার এবং স্বরাষ্ট্র সচিব পদে মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। গত ৩ মার্চ স্বাস্থ্য, শিক্ষা, স্থানীয় সরকার ও কৃষি মন্ত্রণালয়ে এক বছরের চুক্তিতে চারজনকে সচিব নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। মো. কামরুজ্জামান চৌধুরীকে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, আব্দুল খালেককে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মো. শহীদুল হাসানকে স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং আর রফিকুল আই চৌধুরীকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এছাড়া ১ মার্চ মুনশি আলাউদ্দিন আল আজাদকে এক বছরের চুক্তিতে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব নিয়োগ দেয় সরকার। চুক্তিতে নিয়োগ এই কর্মকর্তারা প্রশাসন থেকে বিদায় নিয়েছেন ১৭ থেকে ২০ বছর আগে এবং তাদের বয়স ৬৫ থেকে ৭৫ বছর।
সূত্র জানায়, বিএনপি সরকার এখনও সচিব পর্যায়ে কোনো নিয়মিত কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেয়নি। কর্মকর্তাদের অনেকেই বলছেন যে, যারা চুক্তিভিত্তিতে নিয়োগ পেয়েছেন তারা মূলধারার জনপ্রশাসন থেকে দীর্ঘ ১০ থেকে ২০ বছর বিচ্ছিন্ন ছিলেন, ফলে তারা প্রশাসনের বর্তমান গতিশীলতার সঙ্গে অপরিচিত। প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা জানান, অন্তবর্তী সরকার আমলের চুক্তি বাতিল করে নতুন করে ফের ঢালাওভাবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ ও পদোন্নতি দেওয়া হলে প্রশাসনে কিছুটা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। পদ ছাড়া ঢালাও পদোন্নতির কারণে জনপ্রশাসনে যেখানে নিয়মিত কর্মকর্তারা পদ পাচ্ছেন না সেখানে কয়েক বছর আগে অবসরে যাওয়া কর্মকর্তাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের কারণে সংকট আরও বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে মনে করছেন পদোন্নতি প্রত্যাশী কর্মকর্তারা। এ ছাড়া নিয়মিত কর্মকর্তা থাকার পরও চুক্তিতে সচিবসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব দেওয়ায় বছরে তাদের বেতন-ভাতা বাবদ সরকারের অতিরিক্ত কোটি কোটি টাকা ব্যয় হবে।
সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, সরকার যদি চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিতে চায়, তা হলে একটা ফর্মুলা তৈরি করে সে অনুযায়ী দিতে পারে। নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে দলীয় বা পছন্দের লোকের পরিবর্তে ওই পদের জন্য কতটা যোগ্য সেটিই বিবেচনা করা জরুরি। ভালো কর্মকর্তা এবং বর্তমান সরকারের প্রতি সমর্থন, সততা-দক্ষতা, সিদ্ধান্ত দেওয়ার সক্ষমতা আছে এমন ব্যক্তিদের নিয়ে আসা উচিত। যোগ্য কর্মকর্তা নয় অথচ বিভিন্নজনের পরিচয়ে কাউকে নিয়ে আসা কোনোভাবেই ঠিক হবে না।
কালের আলো/এম/এএইচ


আপনার মতামত লিখুন
Array