অবৈধ পথে ইউরোপযাত্রার চেষ্টা থামছে না
অবৈধ পথে ঝুঁকি নিয়ে পাহাড়, সমুদ্র, জঙ্গল পাড়ি দিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রবেশ করছেন হাজার হাজার বাংলাদেশী। এ কাজে জড়িত মানব পাচার চক্রটি পশ্চিম বলকান অঞ্চল ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করছে। যেখানে যুক্ত আছে বাংলাদেশসহ আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারীরা।
অনেকে গন্তব্যে পৌঁছতে পারলেও বেশির ভাগ অভিবাসনপ্রত্যাশীর ভাগ্যে নেমে আসে নির্মম পরিণতি। পরিসংখ্যান বলছে, গত পাঁচ বছরে বৈধ পথে যে পরিমাণ বাংলাদেশী ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাড়ি দিয়েছেন প্রায় সমপরিমাণ বাংলাদেশী অবৈধ পথে দালালের মাধ্যমে ইউরোপে গেছেন। সর্বশেষ গত শুক্রবার গ্রিস উপকূলে নৌকা ডুবে প্রাণ গেছে ১৮ থেকে ২০ বাংলাদেশির। বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক বলেছে, প্রতিবছর লিবিয়া থেকে সাগরপথে ইউরোপ যাওয়ার এই রুটে অন্তত ৫০০ বাংলাদেশি মারা যান। গত ১০ বছরে ভূমধ্যসাগরে ৩০ হাজার অভিবাসনপ্রত্যাশী মারা গেছেন, যাঁদের বেশির ভাগ বাংলাদেশি।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উন্নত জীবন ও আর্থিক সচ্ছলতার জন্য ইউরোপে যাওয়া বাংলাদেশীদের প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি। বর্তমানে একটি ট্রেন্ড চলছে ইউরোপে পাড়ি জমানোর। এছাড়া অপরাধী চক্রকে আইনের আওতায় আনার ব্যর্থতাও একটি বড় কারণ হিসেবে মনে করেন তারা। বিএমইটির তথ্যমতে, বৈধ পথে ২০২৪ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশে গেছেন ২০ হাজার ৮৩৯ বাংলাদেশী, যা আগের বছরের তুলনায় অর্ধেকেরও কম। গত পাঁচ বছরের মধ্যে ২০২৩ সালেই সর্বোচ্চসংখ্যক ৪৬ হাজার ২৪২ বাংলাদেশী ইউরোপে যান। ২০২২ সালে গেছেন ২৩ হাজার ৮০৬ জন, ২০২১ সালে ৬ হাজার ২৩৯ ও ২০২০ সালে ১ হাজার ৭৪০ জন কর্মসংস্থানের জন্য পাড়ি জমান ইউরোপে।
আইওএম ‘বাংলাদেশ মাইগ্রেশন স্ন্যাপসর্ট রিপোর্ট’-এর তথ্যমতে, ২০২৪ সালে স্থল ও সমুদ্রপথে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গেছেন ১৫ হাজার ৩০৪ বাংলাদেশী। ২০২৩ সালে গেছেন ১৩ হাজার ৭৭৩ জন, ২০২২ সালে ১৬ হাজার ৪৮৭ এবং ২০২১ ও ২০২০ সালে যথাক্রমে ৭ হাজার ৯৫৫ ও ৪ হাজার ৫১০ জন। পশ্চিম বলকান ও পূর্ব ইউরোপকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে এসব দেশে ২০২৪ সালে গেছেন ৩ হাজার ৪২৭ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী। ২০২৩ সালে ৯ হাজার ৮৬৩ জন, ২০২২ সালে ১০ হাজার ৪০, ২০২১ সালে ৭ হাজার ৬২৯ ও ২০২০ সালে গেছেন ৮ হাজার ৮৪৪ বাংলাদেশী।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৫ জানুয়ারি ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবির পর ২৩ জনের অর্ধগলিত মরদেহ ২৮ থেকে ৩১ জানুয়ারি লিবিয়ার পূর্ব উপকূলের সৈকতে ভেসে এসেছিল। পরিচয় শনাক্ত না করতে পারায় তাঁদের লিবিয়ায় দাফন করা হয়। মৃতদের অবয়ব ও পোশাকের ধরনে তাঁদের সবাইকে বাংলাদেশি মনে হয়েছে। ২০২৪ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ভূমধ্যসাগরের তিউনিসিয়া উপকূলে নৌকাডুবিতে ৮ বাংলাদেশি নিহত হন। ২০২৩ সালের ১৩ মার্চে নৌকাডুবিতে নিখোঁজ হওয়া ৩০ জনের ভাগ্য এখনো অজানা। একই বছরের ৯ আগস্ট রাতে লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে নিখোঁজ হন নরসিংদীর বেলাব উপজেলার ৯ তরুণ। এর আগে ২৪ জুন ইতালি যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে স্পিডবোট ডুবে নরসিংদীর এক তরুণ নিহত এবং নিখোঁজ হন ১৩ তরুণ।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ বছরে বাংলাদেশ দূতাবাস এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতায় ইউরোপযাত্রার চেষ্টায় বিপদে পড়া ৪৮ হাজার ৫৪৮ জন বাংলাদেশিকে দেশে ফেরত আনা হয়েছে। লিবিয়ার বিভিন্ন ডিটেনশন ক্যাম্পে আটক ২৩৯ জন বাংলাদেশিকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, গত পাঁচ বছরে অবৈধভাবে ইউরোপে যাওয়ার পথে প্রাণ হারানো ১৮৭ জন বাংলাদেশির মরদেহ সরকারি খরচে দেশে আনা হয়েছে।
কালের আলো/এম/এএইচ


আপনার মতামত লিখুন
Array