বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র কবি শামসুর রাহমানের ৯৮তম জন্মদিন আজ ২৩ অক্টোবর। ১৯২৯ সালের এই দিনে পুরান ঢাকার মাহুতটুলীর নানাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। প্রেম, দ্রোহ, স্বাধীনতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার কবি হিসেবে বাংলা সাহিত্যে অনন্য অবস্থান তৈরি করেছেন শামসুর রাহমান। তাঁর কবিতা ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বৈরাচারবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে মানুষকে যুগিয়েছে সাহস ও প্রেরণা।
কবির ডাকনাম ছিল ‘বাচ্চু’। তাঁর পৈতৃক বাড়ি নরসিংদী জেলার রায়পুরা উপজেলার পাড়াতলী গ্রামে। দীর্ঘ ছয় দশকের সাহিত্যজীবনে কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ ও শিশুতোষ রচনাসহ নানা মাধ্যমে তিনি বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন।
স্বাধীনতার চেতনায় উজ্জ্বল কবিতা
শামসুর রাহমানের কবিতায় বারবার উঠে এসেছে বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, অধিকার আদায়ের সংগ্রাম এবং মানুষের মুক্তির স্বপ্ন। তাঁর ‘স্বাধীনতা তুমি’, ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য, হে স্বাধীনতা’, ‘আসাদের শার্ট’, ‘বর্ণমালা’ ও ‘আমার দুখিনী বর্ণমালা’ কবিতাগুলো বাংলা সাহিত্যে বিশেষভাবে সমাদৃত।
কবিতা ও সাংবাদিকতা—দুই ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। মৌলবাদ, ধর্মান্ধতা ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আজীবন সোচ্চার ছিলেন এই কবি। পাকিস্তান আমলে রবীন্দ্রসংগীতের ওপর নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদ জানানোর পাশাপাশি তৎকালীন স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধেও লেখনী চালিয়েছেন তিনি।
সাংবাদিকতায় দীর্ঘ পথচলা
১৯৫৭ সালে দৈনিক মর্নিং নিউজ পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন শামসুর রাহমান। একই বছর রেডিও পাকিস্তানে অনুষ্ঠান প্রযোজক হিসেবে যোগ দেন এবং ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত সেখানে দায়িত্ব পালন করেন। পরে মর্নিং নিউজে ফিরে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত সহযোগী সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন।
১৯৬৪ সালের শেষ দিকে দৈনিক পাকিস্তানে সহকারী সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন তিনি। স্বাধীনতার পর পত্রিকাটি দৈনিক বাংলা নামে প্রকাশিত হয়। ১৯৭৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে শামসুর রাহমান দৈনিক বাংলা ও সাপ্তাহিক বিচিত্রার সম্পাদক নিযুক্ত হন। ১৯৮৭ সালে সামরিক শাসনামলে দৈনিক বাংলা থেকে পদত্যাগ করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে সাহিত্য পত্রিকা অধুনার সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
প্রথম কবিতা ও কাব্যগ্রন্থ
১৯৪৯ সালে সোনার বাংলা পত্রিকায় শামসুর রাহমানের প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’ প্রকাশিত হয় ১৯৬০ সালে। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি বিভিন্ন পত্রিকায় সম্পাদকীয় ও উপসম্পাদকীয় লিখেছেন তিনি। এসব লেখায় ‘সিন্দাবাদ’, ‘চক্ষুষ্মান’, ‘লিপিকার’, ‘নেপথ্যে’, ‘জনান্তিকে’ ও ‘মৈনাক’ ছদ্মনাম ব্যবহার করেছেন।
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময়ও তাঁর লেখনী ছিল সক্রিয়। ১৯৮৭ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে ‘শৃঙ্খল মুক্তির কবিতা’, ‘স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে কবিতা’, ‘সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে কবিতা’ ও ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কবিতা’ শিরোনামে কবিতা লিখেছেন তিনি। তাঁর সাহিত্যকর্মে প্রতিবাদ, মানবিকতা ও মুক্তচিন্তার প্রকাশ স্পষ্ট।
পুরস্কার ও সম্মাননা
বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ শামসুর রাহমান পেয়েছেন আদমজী সাহিত্য পুরস্কার, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক, নাসিরউদ্দিন স্বর্ণপদক, জীবনানন্দ পুরস্কার, আবুল মনসুর আহমেদ স্মৃতি পুরস্কার, স্বাধীনতা পদক ও আনন্দ পুরস্কারসহ বিভিন্ন সম্মাননা। সাংবাদিকতার জন্যও পেয়েছেন মিৎসুবিশি পুরস্কার।
এ ছাড়া ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ও রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডিলিট উপাধিতে ভূষিত করে। দুই বাংলার পাঠকের কাছেই তিনি ছিলেন সমান জনপ্রিয়। নাগরিক জীবনের অভিজ্ঞতা, ব্যক্তিমানুষের অনুভূতি এবং সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা তাঁর কবিতাকে দিয়েছে স্বতন্ত্র মাত্রা।
মানুষের সংগ্রামে প্রেরণার নাম
শামসুর রাহমান ছিলেন মৃদুভাষী; কিন্তু মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে ছিলেন দৃঢ় ও সক্রিয়। শুধু কবিতার মাধ্যমে নয়, বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামেও তিনি মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী চেতনায় তাঁর কবিতা বহু মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা, অসাম্প্রদায়িকতা ও মুক্তচিন্তার সঙ্গে কবি শামসুর রাহমানের নাম গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। তাঁর কবিতার পঙ্ক্তি আজও নতুন প্রজন্মকে ভাবায়, সাহস জোগায় এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর প্রেরণা দেয়।
২০০৬ সালের ১৭ আগস্ট চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন বাংলা সাহিত্যের এই শক্তিমান কবি। মৃত্যুর দুই দশক পরও তাঁর সাহিত্যকর্ম ও প্রতিবাদী চেতনা বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছে সমান প্রাসঙ্গিক।
কালের আলো/আরআইকে/জেএন
আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]