চোখে সমস্যা, অথচ জানেনই না! এমন দৃষ্টিত্রুটি নিয়েই সড়কে গাড়ি চালাচ্ছেন হাজারো পেশাদার চালক। ঢাকাসহ দেশের ১৯ জেলায় ৩১ হাজার ৫৩৫ জন চালকের চোখ পরীক্ষা করে ২৪ হাজার ১০ জনের চশমার প্রয়োজন শনাক্ত হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১৪ হাজার ৬৪৬ জন জীবনে প্রথমবারের মতো চশমা ব্যবহার করছেন। অর্থাৎ চশমা প্রয়োজন হওয়া চালকদের প্রায় ৬০ শতাংশই প্রথমবার চশমা নিচ্ছেন। সব মিলিয়ে চোখ পরীক্ষা করা চালকদের প্রায় ৭৬ শতাংশের দৃষ্টিশক্তি সংশোধনে চশমা প্রয়োজন হয়েছে।
বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান কিংবা সিএনজিচালিত অটোরিকশা—পেশাদার চালকদের একটি বড় অংশের চোখে সমস্যা থাকার এই চিত্র সড়ক নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক সামনে এনেছে। কারণ গাড়ি চালানোর সময় দূরের যানবাহন, পথচারী, সড়কের সংকেত ও আশপাশের পরিস্থিতি স্পষ্টভাবে দেখতে পারা অত্যন্ত জরুরি। দৃষ্টিশক্তির ত্রুটি শনাক্ত না হলে এবং প্রয়োজনীয় চশমা বা চিকিৎসা না পেলে চালনার সময় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তবে পরীক্ষার এই তথ্য থেকে দৃষ্টিত্রুটির কারণে সংঘটিত দুর্ঘটনার সংখ্যা নির্ধারণ করা যায় না।
- ১৯ জেলায় ৩১ হাজার ৫৩৫ জনের চোখ পরীক্ষা
- ২৪ হাজার ১০ জনকে চশমা দেওয়া হয়েছে
- প্রথমবার চশমা নিচ্ছেন ১৪ হাজার ৬৪৬ জন
আন্তর্জাতিক দৃষ্টি সেবা সংস্থা ভিশনস্প্রিং বাংলাদেশের বিশেষ স্বাস্থ্য শিবিরে চালকদের চোখ পরীক্ষার মাধ্যমে উঠে এসেছে এসব তথ্য। গত বছরের অক্টোবরে শুরু হওয়া এই কার্যক্রম চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পরীক্ষায় চালকদের ৪৯ শতাংশের নিকটদৃষ্টি এবং ৫১ শতাংশের দূরদৃষ্টির সমস্যা পাওয়া গেছে। প্রয়োজন অনুযায়ী চশমা বিতরণের পাশাপাশি চোখের অন্যান্য সমস্যার চিকিৎসার ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।
চোখের সমস্যাই জানেন না
চোখের সমস্যা থাকলেও তা সব সময় নিজে থেকে বুঝতে পারেন না অনেকে। বিশেষ করে দৃষ্টিশক্তির ত্রুটি ধীরে ধীরে তৈরি হলে বা দৈনন্দিন কাজে তার প্রভাব স্পষ্ট না হলে সমস্যা শনাক্ত হতে দেরি হতে পারে। পেশাদার চালকদের ক্ষেত্রে নিয়মিত চোখ পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা এখানেই। কারণ তাঁদের প্রতিদিন দীর্ঘ সময় ধরে সড়কের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে হয়।
ভিশনস্প্রিং বাংলাদেশের ভিশন অ্যাকসেস প্রোগ্রামের সহযোগী পরিচালক উম্মে সাউদা বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে চালকের দক্ষতা, প্রশিক্ষণ ও সচেতনতার পাশাপাশি দৃষ্টিশক্তিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চালকের স্পষ্ট দৃষ্টিশক্তি তাঁর নিজের, যাত্রীদের এবং সড়কে চলাচলকারী অন্যদের নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
তাঁর মতে, সড়ক নিরাপত্তাকে শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন কিংবা ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। চালকের শারীরিক সক্ষমতা, সচেতনতা এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
উম্মে সাউদা বলেন, পরিবহন খাতের কর্মীদের নিয়মিত চোখ পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় দৃষ্টিসেবা সহজলভ্য করতে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সম্মিলিত সহযোগিতা প্রয়োজন। পাশাপাশি চালকদের নিয়মিত চোখ পরীক্ষা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চশমা ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
১৯ জেলায় পরীক্ষা, লক্ষ্য ৫০ হাজার চালক
ভিশনস্প্রিং বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, বগুড়া, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, দিনাজপুর, ঢাকা, গাইবান্ধা, গাজীপুর, খুলনা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নরসিংদী, নীলফামারী, নোয়াখালী, পাবনা, রাজবাড়ী, রংপুর, সিলেট ও রাজশাহীতে চোখ পরীক্ষার কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। এ ছাড়া সৈয়দপুরেও চালকদের চোখ পরীক্ষা করা হয়েছে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সহযোগিতায় দেশজুড়ে মোট ৫০ হাজার চালকের চোখ পরীক্ষা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে এ কার্যক্রম শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। যাঁদের চশমা প্রয়োজন হবে, তাঁদের বিনা মূল্যে চশমা দেওয়া হবে। পাশাপাশি ছানিতে আক্রান্ত চালকদের চিকিৎসার ব্যবস্থাও করা হবে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলম বলেন, চালকদের চোখের ত্রুটি দূর করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দৃষ্টিশক্তির সমস্যা নিয়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ছাড়া গাড়ি চালানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। পরিবহন শ্রমিকদের সার্বিক সুরক্ষায় শুধু চোখের সমস্যায় সীমাবদ্ধ না থেকে পর্যায়ক্রমে আরও বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, চোখের সমস্যা দ্রুত শনাক্ত করা, প্রয়োজনীয় চশমা দেওয়া এবং ছানি বা অন্য রোগে আক্রান্ত চালকদের নিয়মিত পরীক্ষা ও সচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যমে দৃষ্টিশক্তিজনিত ঝুঁকি কমানো সম্ভব। এ বিষয়ে মালিক সমিতির পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।
একবার চোখ পরীক্ষা যথেষ্ট নয়
চালকদের চোখ পরীক্ষায় বিপুলসংখ্যক মানুষের দৃষ্টিত্রুটি শনাক্ত হওয়া পরিবহন খাতে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। তবে একবার চোখ পরীক্ষা করে চশমা দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। চালকেরা নিয়মিত চশমা ব্যবহার করছেন কি না, দৃষ্টিশক্তির সমস্যা যথাযথভাবে সংশোধন হয়েছে কি না এবং চোখের অন্য রোগের চিকিৎসা পাচ্ছেন কি না, তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
প্রথমবার চশমা ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেশি হওয়া থেকে বোঝা যায়, এই উদ্যোগের মাধ্যমে অনেক চালকের দৃষ্টিশক্তির সমস্যা প্রথমবার শনাক্ত হয়েছে। তবে সমস্যাগুলো আগে ধরা না পড়ার পেছনে সচেতনতার অভাব, চিকিৎসাসেবায় প্রবেশের সীমাবদ্ধতা কিংবা ব্যয়ের মতো কোন কারণ কতটা দায়ী, তা নির্ধারণের জন্য আরও তথ্য প্রয়োজন।
সড়ক নিরাপত্তায় চালকের দক্ষতা, প্রশিক্ষণ, যানবাহনের উপযুক্ত অবস্থা, সড়ক ব্যবস্থাপনা ও ট্রাফিক আইন মানার পাশাপাশি শারীরিক সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ। তাই পেশাদার চালকদের নিয়মিত চোখ পরীক্ষা, প্রয়োজনীয় চশমা ব্যবহার এবং চোখের রোগের চিকিৎসাকে পরিবহন খাতের স্থায়ী স্বাস্থ্য সুরক্ষাব্যবস্থার অংশ করা প্রয়োজন।
৩১ হাজারের বেশি চালকের চোখ পরীক্ষা যে বাস্তবতা সামনে এনেছে, তা হলো—চালকের দৃষ্টিশক্তির সমস্যা শনাক্ত করার সুযোগ বাড়ানো জরুরি। এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো, বিশেষ স্বাস্থ্য শিবিরের এই উদ্যোগকে নিয়মিত ও টেকসই ব্যবস্থায় রূপান্তর করা। এতে অজানা দৃষ্টিত্রুটি শনাক্ত হওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে, যা চালক, যাত্রী ও অন্য সড়ক ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা সুরক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে।
কালের আলো/টিইকে/এমকে
আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]