মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক উত্তেজনা এবার নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট যোগাযোগের নিরাপত্তা নিয়ে। হরমুজ প্রণালির তলদেশ দিয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ সাবমেরিন ইন্টারনেট কেবলকে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু করার ইঙ্গিত দিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত নতুন করে বাড়লে এসব কেবলসহ গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অবকাঠামোয় হামলা হতে পারে—ইরানি কর্মকর্তাদের এমন বক্তব্যের পর আন্তর্জাতিক যোগাযোগব্যবস্থার ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
২০ অক্টোবর তেহরানের স্যাক্রেড ডিফেন্স মিউজিয়ামে এক অনুষ্ঠানে আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি হরমুজ প্রণালির নিচ দিয়ে যাওয়া সাতটি গুরুত্বপূর্ণ ডেটা যোগাযোগ কেবলের কথা উল্লেখ করেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবির বরাতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানায়, তিনি নতুন লক্ষ্যবস্তু ও অস্ত্র উন্মোচনের হুঁশিয়ারি দেন। তবে ওই বক্তব্যে কেবলগুলোতে হামলার নির্দিষ্ট সময় বা পরিকল্পনা প্রকাশ করা হয়নি।
নতুন করে স্পষ্ট হুঁশিয়ারি আইআরজিসির
মোহেব্বির বক্তব্যের এক দিন পর, ২১ অক্টোবর আইআরজিসির রাজনৈতিক উপপ্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াদোল্লাহ জাভানি আরও স্পষ্টভাবে বলেন, ইরানের নিজস্ব অবকাঠামোয় হামলা হলে হরমুজ প্রণালির তলদেশের ইন্টারনেট কেবলও নিরাপদ থাকবে না। ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম প্রেস টিভির বরাতে এ তথ্য প্রকাশিত হয়। তাঁর বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের ওই অঞ্চলে থাকা বিনিয়োগ ও অবকাঠামোকে পাল্টা পদক্ষেপের সম্ভাব্য ক্ষেত্র হিসেবে তুলে ধরা হয়।
এর আগে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজায়িও সতর্ক করেছিলেন, নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ডেটা সেন্টার, সমুদ্রতলের যোগাযোগ কেবল এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। ফলে সামরিক স্থাপনার বাইরেও বাণিজ্যিক ও ডিজিটাল অবকাঠামো সংঘাতের ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সমুদ্রের নিচে কীভাবে চলে বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট?
অনেকে মনে করেন, ইন্টারনেটের তথ্য আদান-প্রদান মূলত স্যাটেলাইটের মাধ্যমে হয়। বাস্তবে আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট যোগাযোগের বড় অংশই সমুদ্রের তলদেশে স্থাপন করা ফাইবার-অপটিক কেবলের ওপর নির্ভরশীল। এসব কেবলের মধ্য দিয়ে বিপুল পরিমাণ তথ্য দ্রুত এক দেশ থেকে অন্য দেশে যায়।
আন্তর্জাতিক ওয়েবসাইট ব্যবহার, ভিডিও স্ট্রিমিং, ক্লাউডভিত্তিক সেবা, ব্যবসায়িক যোগাযোগ এবং আর্থিক লেনদেনের তথ্য পরিবহনে এসব কেবল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একাধিক কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হলে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে ইন্টারনেটের গতি কমে যেতে পারে, যোগাযোগে বিলম্ব তৈরি হতে পারে কিংবা কিছু সেবা সাময়িকভাবে ব্যাহত হতে পারে।
তবে একটি বা কয়েকটি কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হলেই পুরো বিশ্বের ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যাবে—এমন নয়। আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কে বিকল্প পথ ও একাধিক কেবল ব্যবহারের ব্যবস্থা রয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নির্ভর করবে কোন কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, বিকল্প পথে কতটা তথ্য পাঠানো সম্ভব এবং সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের নেটওয়ার্ক কতটা নির্ভরশীল তার ওপর।
হরমুজের ঝুঁকি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
হরমুজ প্রণালি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথের আশপাশে সমুদ্রতলের যোগাযোগ অবকাঠামোও রয়েছে। ফলে সেখানে সামরিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে জ্বালানি পরিবহনের পাশাপাশি ডিজিটাল যোগাযোগের নিরাপত্তাও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
ইরানের হুমকির তাৎপর্য এখানেই—সমুদ্রপথের কৌশলগত অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে শুধু জাহাজ চলাচল নয়, আন্তর্জাতিক তথ্যপ্রবাহের ওপরও চাপ তৈরির আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। তবে হরমুজের তলদেশ দিয়ে যাওয়া সাতটি কেবলের বিষয়ে আইআরজিসির বক্তব্য থাকলেও, সেগুলোর সবকটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে ঠিক কতটা বৈশ্বিক ট্রাফিক ব্যাহত হবে, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা জরুরি।
লোহিত সাগরেও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ
হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিও আন্তর্জাতিক ডেটা যোগাযোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী একাধিক সাবমেরিন কেবল এ অঞ্চলের মধ্য দিয়ে গেছে। তাই মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বিস্তৃত হলে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ একই সময়ে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
আল জাজিরার ১৩ অক্টোবরের বিশ্লেষণে লোহিত সাগর অঞ্চলের কেবল ও ডেটা সেন্টারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তুলে ধরা হয়। সেখানে বাব আল-মান্দেব প্রণালির কৌশলগত গুরুত্ব এবং আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে সমুদ্রতলের অবকাঠামোর ঝুঁকির বিষয়টি আলোচিত হয়েছে।
তবে হরমুজ ও লোহিত সাগরের কেবল একই পথে অবস্থিত নয়। কোনো একটি অঞ্চলে হামলা হলে অন্য অঞ্চলের সব কেবলও স্বয়ংক্রিয়ভাবে অচল হয়ে যাবে, এমন ধারণা সঠিক নয়। ঝুঁকি নির্ভর করবে ক্ষতিগ্রস্ত কেবলের অবস্থান, নেটওয়ার্কের বিকল্প ব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক যোগাযোগের ওপর।
ডেটা সেন্টার ও এআই অবকাঠামোও উদ্বেগের কেন্দ্রে
মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলো ক্লাউড কম্পিউটিং, ডেটা সেন্টার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সেবা সম্প্রসারণে বিনিয়োগ করছে। এসব স্থাপনা ইন্টারনেট কেবল ও বিদ্যুৎ সরবরাহের মতো অবকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত। ফলে সামরিক সংঘাতে কেবল, ডেটা সেন্টার বা বিদ্যুৎব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসা ও অনলাইন সেবায় প্রভাব পড়তে পারে।
চলতি বছরের মার্চে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনে অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেসের (এডব্লিউএস) অবকাঠামোতে ড্রোন হামলার পর কিছু স্থাপনায় শারীরিক ক্ষতি ও সেবা বিঘ্নের খবর পাওয়া যায়। ওই ঘটনা দেখিয়েছে, আঞ্চলিক সংঘাতের প্রভাব ডিজিটাল সেবাতেও পৌঁছাতে পারে। তবে ডেটা সেন্টারে হামলা এবং সমুদ্রতলের কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা আলাদা; দুটির প্রভাবও পরিস্থিতি অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে।
কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হলে মেরামত কতটা কঠিন?
সমুদ্রের গভীরে স্থাপিত ফাইবার-অপটিক কেবল মেরামত করা সময়সাপেক্ষ ও প্রযুক্তিনির্ভর কাজ। ক্ষতিগ্রস্ত অংশ শনাক্ত করার পর বিশেষায়িত জাহাজের মাধ্যমে কেবল তুলে এনে মেরামত করতে হয়। সমুদ্রের গভীরতা, আবহাওয়া, ক্ষতির ধরন এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর কাজের সময় নির্ভর করে।
সংঘাতপূর্ণ জলসীমায় জাহাজ চলাচলে বাধা থাকলে মেরামতের কাজ আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। এতে বিকল্প কেবলের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে এবং কিছু অঞ্চলে ইন্টারনেটের গতি, ক্লাউড সেবা কিংবা আন্তর্জাতিক যোগাযোগে দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা দেখা দিতে পারে।
এখনই কি বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট বিপর্যয়ের আশঙ্কা?
ইরানি কর্মকর্তাদের সাম্প্রতিক বক্তব্য ডিজিটাল অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। কিন্তু হুমকি দেওয়া আর বাস্তবে কেবল কেটে দেওয়া এক বিষয় নয়। এখন পর্যন্ত প্রকাশিত বক্তব্যের ভিত্তিতে হরমুজের সব কেবলে হামলা হয়েছে বা বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট বিপর্যয় আসন্ন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
তবে সংঘাত বাড়লে সমুদ্রতলের কেবল, ডেটা সেন্টার এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সামরিক চাপের অংশ হয়ে উঠতে পারে। এতে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, আন্তর্জাতিক ব্যবসা, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ ব্যবহারকারীর যোগাযোগব্যবস্থাও পরোক্ষভাবে প্রভাবিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বিশ্বের ডিজিটাল অর্থনীতি যে অদৃশ্য নেটওয়ার্কের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, হরমুজকে ঘিরে এই হুমকি আবারও তা সামনে এনেছে। সমুদ্রের গভীরে থাকা কয়েকটি কেবল এখন তাই শুধু প্রযুক্তিগত অবকাঠামো নয়, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
কালের আলো/এমএসআইপি/জেএন
আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]