খুঁজুন
                               
, ,
           

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ৭ বছরে ঝরেছে ১৫ হাজারের বেশি প্রাণ

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২৬, ২:৩১ অপরাহ্ণ
মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ৭ বছরে ঝরেছে ১৫ হাজারের বেশি প্রাণ

দেশে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা দিন দিন ভয়াবহ হয়ে উঠছে। ২০২০ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত সাড়ে সাত বছরে ১৬ হাজার ৬৫টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৫ হাজার ৭১২ জন নিহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ১৪ হাজার ১৪৩ জন। নিহতদের বড় একটি অংশ কিশোর ও তরুণ।

শনিবার (৮ আগস্ট) রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমানের পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত সময়ে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে ২০২১ সালে। ওই বছর ২ হাজার ৭৮টি দুর্ঘটনায় নিহত হন ২ হাজার ২১৪ জন। এরপর ২০২৫ সালে ৩ হাজার ২৯টি দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৬৭১ জন এবং ২০২৪ সালে ২ হাজার ৭৬১টি দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৬০৯ জন নিহত হয়েছেন।

প্রতিবেদনের তথ্যে দেখা যায়, ২০২০ সালে ১ হাজার ৩৮১টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৪৬৩ জন নিহত হন। ২০২২ সালে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির তথ্যের মধ্যে প্রতিবেদনে অসামঞ্জস্য রয়েছে। সেখানে ২৯৭টি দুর্ঘটনায় ৩ হাজার ৯১ জন নিহতের কথা বলা হয়েছে। ২০২৩ সালে ২ হাজার ৫৩২টি দুর্ঘটনায় নিহত হন ২ হাজার ৪৮৭ জন। ২০২৪ সালে ২ হাজার ৭৬১টি দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৬০৯ জন এবং ২০২৫ সালে ৩ হাজার ২৯টি দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৬৭১ জন নিহত হন। ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ১ হাজার ৩১১টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১ হাজার ১৭৭ জন।

দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণ করে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন বলেছে, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার সবচেয়ে বড় অংশ ঘটেছে ভারী যানবাহনের ধাক্কায়। ১৬ হাজার ৬৫টি দুর্ঘটনার মধ্যে ৬ হাজার ৩১৪টি, অর্থাৎ ৩৯ দশমিক ৩০ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে মোটরসাইকেলে ভারী যানবাহনের ধাক্কায়।

এ ছাড়া মোটরসাইকেল চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ৫ হাজার ৪৯৭টি দুর্ঘটনা ঘটেছে, যা মোট দুর্ঘটনার ৩৪ দশমিক ২১ শতাংশ। মুখোমুখি সংঘর্ষে ঘটেছে ৩ হাজার ৫৪৮টি বা ২২ দশমিক ৮ শতাংশ দুর্ঘটনা। অন্যান্য কারণে ঘটেছে ৭০৬টি বা ৪ দশমিক ৩৯ শতাংশ দুর্ঘটনা।

দুর্ঘটনার জন্য দায়ী যানবাহনের হিসাবেও পণ্যবাহী যানবাহন এগিয়ে রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, পিকআপ, ট্রাক্টর, ট্রলি ও লরিসহ পণ্যবাহী যানবাহন ৬ হাজার ৪৮১টি দুর্ঘটনার জন্য দায়ী, যা মোট দুর্ঘটনার ৪০ দশমিক ৩৪ শতাংশ।

মোটরসাইকেল চালক এককভাবে দায়ী ছিলেন ৫ হাজার ৮৩১টি দুর্ঘটনার জন্য, যা ৩৬ দশমিক ২৯ শতাংশ। বাসের চালক ২ হাজার ১৬৪টি বা ১৩ দশমিক ৪৭ শতাংশ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী। এ ছাড়া তিন চাকার যান ৭৩২টি, ব্যক্তিগত গাড়ি, মাইক্রোবাস, অ্যাম্বুলেন্স ও জিপ ৪৩৮টি এবং বাইসাইকেল ও রিকশা ১২৩টি দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ছিল। পথচারীর কারণে ঘটেছে ২৯৬টি দুর্ঘটনা।

সড়কের ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, আঞ্চলিক সড়কে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা সবচেয়ে বেশি হয়েছে। এ ধরনের সড়কে ৬ হাজার ৬৮৯টি দুর্ঘটনা ঘটেছে, যা মোট দুর্ঘটনার ৪১ দশমিক ৬৩ শতাংশ। জাতীয় মহাসড়কে ৪ হাজার ৭৭৩টি বা ২৯ দশমিক ৭১ শতাংশ, শহরের সড়কে ২ হাজার ৬৪৬টি বা ১৬ দশমিক ৪৭ শতাংশ এবং গ্রামীণ সড়কে ১ হাজার ৯৫৭টি বা ১২ দশমিক ১৮ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত মোট মোটরযানের প্রায় ৭১ শতাংশই মোটরসাইকেল। এর একটি বড় অংশ কিশোর ও তরুণেরা ব্যবহার করেন। বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল চালানোর প্রবণতা, ট্রাফিক আইন না মানা এবং সড়কে প্রতিযোগিতামূলকভাবে মোটরসাইকেল চালানো দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোটরসাইকেল উৎপাদন ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিজ্ঞাপনের ভাষা ও উপস্থাপনাও তরুণদের মধ্যে অতিরিক্ত গতিতে মোটরসাইকেল চালানোর প্রবণতা তৈরি করছে। গতির মধ্যে রোমাঞ্চ খুঁজতে গিয়ে অনেক চালক নিজের পাশাপাশি পথচারী ও অন্য সড়ক ব্যবহারকারীদেরও ঝুঁকিতে ফেলছেন।

অন্যদিকে বাস ও পণ্যবাহী যানবাহনের চালকদের একটি অংশ শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ অবস্থায় যানবাহন চালান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের বেপরোয়া চালনার কারণেও মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বাড়ছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আক্রান্তদের ৫৮ শতাংশের বয়স ১৩ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। চার চাকার যানবাহনের তুলনায় মোটরসাইকেল প্রায় ৩০ গুণ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। তারপরও সহজ ও সাশ্রয়ী গণপরিবহনের ঘাটতি, যানজট এবং দ্রুত চলাচলের সুবিধার কারণে মানুষ মোটরসাইকেলের দিকে বেশি ঝুঁকছেন।

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণহানি কমাতে মানসম্পন্ন হেলমেট ব্যবহারের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে সংগঠনটি। তাদের মতে, মানসম্পন্ন হেলমেট দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় ৪৮ শতাংশ কমাতে পারে।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা কমাতে চালকদের বেপরোয়া গতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা ও নজরদারি প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং মানসম্পন্ন হেলমেট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করতে হবে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিরাপদ মোটরসাইকেল চালানো নিয়ে প্রচারণা চালাতে হবে। মোটরসাইকেলের বিজ্ঞাপনের ভাষা ও উপস্থাপনাতেও পরিবর্তন আনতে হবে। একই সঙ্গে নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো নির্মাণ এবং সহজ, সাশ্রয়ী ও যাত্রীবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থা চালু করা জরুরি।

তিনি বলেন, শুধু মোটরসাইকেল চালকদের সচেতন করলেই দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব নয়। সড়কের অবকাঠামো, গণপরিবহন ব্যবস্থা, ট্রাফিক আইন প্রয়োগ এবং ভারী যানবাহনের চালকদের প্রশিক্ষণ ও নজরদারি একসঙ্গে জোরদার করতে হবে। তা না হলে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণহানির এই প্রবণতা থামানো কঠিন হবে।

কালের আলো/আরডি/এমডিএইচ

‘হাসিনার দেখানো পথেই হাঁটছে বর্তমান সরকার’—শফিকুর রহমান

গাজীপুর সংবাদদাতা
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:১৫ অপরাহ্ণ
‘হাসিনার দেখানো পথেই হাঁটছে বর্তমান সরকার’—শফিকুর রহমান

দেশে মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি এবং দুর্নীতি, অনিয়ম ও অন্যায় বেড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি দাবি করেছেন, বর্তমান সরকার সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের দেখানো পথেই হাঁটছে। এভাবে চলতে থাকলে বর্তমান সরকারের পরিণতিও হাসিনার সরকারের মতো হবে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।

শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) সকালে গাজীপুর মহানগরী জামায়াতের উদ্যোগে টঙ্গীর শহীদ আব্দুল মালেক মিলনায়তনে আয়োজিত রুকন সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে এসব কথা বলেন শফিকুর রহমান। বক্তব্যে শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার গণভোটকে অস্বীকার করছে এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করছে না। তাঁর ভাষ্য, এভাবে চলতে থাকলে সরকারের গন্তব্যও শেখ হাসিনার সরকারের মতো হবে।

তিনি বলেন, দেশের মানুষের মৌলিক অধিকার এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সমাজে দুর্নীতি, অনিয়ম ও অন্যায় বেড়েছে। গত নির্বাচনের আগে একটি দল নির্বাচনের মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধান হবে বলে প্রচার করেছিল। কিন্তু তাঁর দাবি, বর্তমানে সমস্যাগুলো সমাধান হওয়ার পরিবর্তে দ্বিগুণ বেড়েছে। জামায়াত আমিরের অভিযোগ, বর্তমান সরকার আগের সরকারের পথ অনুসরণ করছে। গণতান্ত্রিক প্রত্যাশা পূরণ এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রসঙ্গ তুলে শফিকুর রহমান বলেন, সে সময় জামায়াতে ইসলামী ও তরুণ সমাজের প্রত্যাশা ছিল শোষণমুক্ত ও ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা। এমন একটি দেশ গড়ে তোলার প্রত্যাশা ছিল, যেখানে কোনো বৈষম্য থাকবে না। তবে তাঁর অভিযোগ, বর্তমান সরকারের সময়ে বৈষম্যের নতুন মাত্রা যুক্ত হচ্ছে। শিক্ষাঙ্গনে আগের সরকারের মতো দলীয়করণ, লুটতরাজ এবং উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে ভাগ বসানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি। শফিকুর রহমানের বক্তব্য, রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে মানুষের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা পূরণ করতে হলে বৈষম্য দূর করা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখা জরুরি।

দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সমালোচনা করতে গিয়ে জামায়াত আমির বলেন, তাঁর কাছে মনে হচ্ছে, এক লুটেরার হাত থেকে আরেক লুটেরার হাতে ক্ষমতা ন্যস্ত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, মুসলিম বিশ্বেও ঐক্যের অভাব রয়েছে। তাঁর মতে, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন মুসলিম দেশে রাসুল (সা.)-এর আদর্শ উপেক্ষা করার কারণে মুসলিম বিশ্ব ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শফিকুর রহমান দাবি করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে জনগণের একটি অংশ জামায়াতে ইসলামীকে নিরাপত্তার স্থল হিসেবে মনে করে। তবে এ বিষয়ে তিনি কোনো জরিপ বা পরিসংখ্যান উল্লেখ করেননি।

গাজীপুর মহানগর জামায়াতের আমির অধ্যাপক জামাল উদ্দিনের সভাপতিত্বে সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য আব্দুর রউফ, নির্বাহী সদস্য মাওলানা শাহজাহান, মাওলানা দেলোয়ার হোসেন, উত্তরাঞ্চলের দায়িত্বশীল খলিলুর রহমান মাদানি, সাবেক জেলা আমির আবুল হাশেম খান এবং জেলা আমির জাহাঙ্গীর আলম। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন গাজীপুর মহানগর মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি আমেনা বেগম, নায়েবে আমির খায়রুল হাসান, মহানগর সেক্রেটারি আ স ম ফারুক, সহকারী সেক্রেটারি আফজাল হোসেনসহ বিভাগীয় নেতারা। মহানগর কর্মপরিষদ, বিভিন্ন থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতারাও সম্মেলনে অংশ নেন।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

সংঘর্ষের জেরে কুমিল্লা মহানগর জামায়াতের কমিটি বিলুপ্ত

কুমিল্লা সংবাদদাতা
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:০৬ অপরাহ্ণ
সংঘর্ষের জেরে কুমিল্লা মহানগর জামায়াতের কমিটি বিলুপ্ত

কুমিল্লা মহানগরী জামায়াতে ইসলামীর সংগঠন ও ইমারাত ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ। গত ১৪ অক্টোবর মহানগর জামায়াতের কার্যালয়ে সংঘটিত ঘটনা এবং এর পরবর্তী পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সঙ্গে ওই ঘটনা তদন্তে দুই সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে দলটি। কমিটিকে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

জরুরি বৈঠকে কমিটি ভাঙার সিদ্ধান্ত

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ১৪ অক্টোবর কুমিল্লা মহানগরী জামায়াত কার্যালয়ে সংঘটিত ঘটনা ও উদ্ভূত পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সন্ধ্যায় রাজধানীর মগবাজারে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। এতে কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্যরাও অংশ নেন। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, বৈঠকে কুমিল্লা মহানগরী জামায়াত কার্যালয়ের ঘটনার বিস্তারিত আলোচনা ও পর্যালোচনা শেষে দলটির গঠনতন্ত্রের ১৬ নম্বর ধারার ৩ নম্বর উপধারার ‘চ’ অনুচ্ছেদ অনুসরণ করে ৬৩ নম্বর ধারার ক্ষমতাবলে মহানগরীর সংগঠন ও ইমারাত ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

কেন্দ্রের তত্ত্বাবধানে চলবে কার্যক্রম

কমিটি ভেঙে দেওয়ার পর থেকে কুমিল্লা মহানগরী জামায়াতের সাংগঠনিক কার্যক্রম কেন্দ্রের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে। এ সংগঠনের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিমকে। দলীয় বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর এ বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ। অর্থাৎ, ১৪ অক্টোবরের ঘটনার তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে সংগঠনটির বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হবে।

তদন্তে দুই সদস্যের কমিটি

কুমিল্লা মহানগর জামায়াত কার্যালয়ে সংঘটিত ঘটনার কারণ ও সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ। কমিটির সদস্যরা হলেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির এ টি এম আজহারুল ইসলাম এমপি এবং সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা মুহাম্মদ শাহজাহান। কমিটিকে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমানের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।

মহানগর কার্যালয়ের সামনে সংঘর্ষ, গাড়ি ভাঙচুর ও ককটেল বিস্ফোরণ

এর আগে গত ১৪ অক্টোবর সন্ধ্যায় কুমিল্লা নগরীর গাংচর ফারুকী হাউসের সামনে জামায়াতের দলীয় কার্যালয়ে মহানগর জামায়াতের দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ওই সময় দলীয় কার্যালয়ের সামনে মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারির একটি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। পাশাপাশি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটে। এসব ঘটনার পর মহানগর জামায়াতের অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও সাংগঠনিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। তবে সংঘর্ষের ঘটনায় কারা কীভাবে জড়িত ছিলেন, তা তদন্ত কমিটির অনুসন্ধানের বিষয়।

পদ-পদবি ও সিটি নির্বাচন নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, কুমিল্লা মহানগর জামায়াতের নেতাদের মধ্যে বেশ কিছুদিন ধরেই দ্বন্দ্ব চলছিল। মহানগর কমিটির ভবিষ্যৎ পদ-পদবি এবং কুমিল্লা সিটি করপোরেশন (কুসিক) নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নকে কেন্দ্র করে এ বিরোধের সূত্রপাত বলে জানা গেছে। দীর্ঘদিনের এই বিরোধের মধ্যে ১৪ অক্টোবর দলীয় কার্যালয়ে সংঘর্ষ, গাড়ি ভাঙচুর ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এরপর পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ মহানগরীর সংগঠন ও ইমারাত ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

 

প্রাচীন গ্রিক পুরাণ থেকে আধুনিক প্রেম, অ্যান কারসনের অনন্য সাহিত্যভুবন

সাহিত্য ডেস্ক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:০১ অপরাহ্ণ
প্রাচীন গ্রিক পুরাণ থেকে আধুনিক প্রেম, অ্যান কারসনের অনন্য সাহিত্যভুবন

প্রাচীন গ্রিক পুরাণের চরিত্র, আধুনিক মানুষের প্রেম, নিঃসঙ্গতা ও আত্মপরিচয়ের সংকট—এই ভিন্ন জগতের মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরি করেছেন কানাডীয় কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক অ্যান কারসন। ধ্রুপদি সাহিত্যের গভীর পাঠ এবং প্রচলিত সাহিত্যরীতির বাইরে গিয়ে লেখার স্বতন্ত্র ভঙ্গির জন্য পরিচিত এই সাহিত্যিক ২০২৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। তাঁর সাহিত্যকর্মে প্রাচীন পুরাণের চরিত্রগুলো কেবল অতীতের গল্পের অংশ হয়ে থাকে না; বরং সমকালীন মানুষের আবেগ, আকাঙ্ক্ষা ও অস্তিত্বের সংকটের প্রতীকে পরিণত হয়।

কারসনের সাহিত্যজগতের অন্যতম উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি অটোবায়োগ্রাফি অব রেড। গ্রিক পুরাণের লাল ডানাওয়ালা দানব গেরিয়নের কাহিনিকে আধুনিক প্রেম, বিচ্ছিন্নতা ও আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধানে রূপ দিয়েছেন তিনি। প্রচলিত পুরাণে যে চরিত্রকে দানব হিসেবে দেখা হয়, কারসনের লেখায় সেই চরিত্রই হয়ে ওঠে গভীর অনুভূতিসম্পন্ন এক মানুষ, যে নিজের ভিন্নতা নিয়ে সমাজের সঙ্গে লড়াই করে এবং ভালোবাসার মধ্য দিয়ে নিজেকে বুঝতে চায়।

প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য থেকে আধুনিক মানুষের মনোজগৎ

অ্যান কারসনের সাহিত্যচর্চার কেন্দ্রে রয়েছে প্রাচীন গ্রিক ভাষা, পুরাণ, কবিতা ও নাটক। দীর্ঘদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে ধ্রুপদি সাহিত্য পড়িয়েছেন তিনি। প্রাচীন সাহিত্য অনুবাদের পাশাপাশি নিজের কবিতা, প্রবন্ধ ও নিরীক্ষাধর্মী গদ্যে অতীতের উপাদানকে নতুন অর্থে ব্যবহার করেছেন।

কৈশোরে গ্রিক কবি সাফোর কবিতার সঙ্গে পরিচয় তাঁর সাহিত্যজীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মাত্র ১৬ বছর বয়সে একটি বইয়ের দোকানে সাফোর কবিতার গ্রিক-ইংরেজি সংস্করণ খুঁজে পেয়েছিলেন তিনি। গ্রিক ভাষার প্রতি আকর্ষণ এবং কবিতার খণ্ডিত অংশের মধ্যে লুকিয়ে থাকা প্রেম ও আকাঙ্ক্ষার অনুভূতি তাঁকে ভাষাটি গভীরভাবে শেখার অনুপ্রেরণা দেয়।

পরবর্তী সময়ে সাফোর টিকে থাকা কবিতার খণ্ডাংশ অনুবাদ করে ২০০০ সালে প্রকাশ করেন ইফ নট, উইন্টার: ফ্র্যাগমেন্টস অব সাফো। বইটিতে প্রাচীন কবিতার অসম্পূর্ণ অংশগুলোর মধ্য দিয়ে প্রেম, আকাঙ্ক্ষা ও মানবিক অনুভূতির যে জগৎ ফুটে ওঠে, তা কারসনের অনুবাদদৃষ্টির পরিচয় বহন করে।

গ্রিক নাট্যকার ইউরিপিদিস, সফোক্লিস ও এসকাইলাসের রচনাও তাঁর সাহিত্যচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ। এসব নাটক অনুবাদের পাশাপাশি তিনি প্রাচীন সাহিত্যকে নতুন কাঠামো ও ভাষাভঙ্গিতে উপস্থাপন করেছেন। ফলে তাঁর কাজ কেবল অনুবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং প্রাচীন সাহিত্যকে সমকালীন পাঠকের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করার একটি সৃজনশীল প্রয়াসে পরিণত হয়েছে।

‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড’: এক দানবের ভেতরে মানুষের গল্প

কারসনের বহুল আলোচিত বই অটোবায়োগ্রাফি অব রেড একটি কাব্যোপন্যাস। এর কেন্দ্রীয় চরিত্র গেরিয়ন গ্রিক পুরাণের সেই লাল ডানাওয়ালা দানব, যাকে বীর হারকিউলিস হত্যা করে। প্রাচীন কাহিনিতে গেরিয়ন মূলত হারকিউলিসের অভিযানের একটি প্রতিপক্ষ। কিন্তু কারসন চরিত্রটির দিকে তাকিয়েছেন ভিন্ন দৃষ্টিতে।

তিনি যেন প্রশ্ন তুলেছেন—যাকে পৃথিবী দানব বলে চিহ্নিত করে, তার নিজের অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার গল্পটি কেমন?

এই প্রশ্ন থেকেই গেরিয়ন কারসনের উপন্যাসে নতুন জীবন পায়। সে হয়ে ওঠে এমন এক কিশোর, যে অন্যদের থেকে নিজেকে আলাদা মনে করে। তার পিঠে রয়েছে লাল ডানা, যা সে পোশাকের নিচে লুকিয়ে রাখে। ডানাগুলো কেবল পুরাণের অলৌকিক উপাদান নয়; এগুলো তার স্বাতন্ত্র্য, আত্মপরিচয় এবং সমাজের কাছে নিজের প্রকৃত সত্তা প্রকাশ করতে না পারার প্রতীক।

গেরিয়নের পরিবারেও রয়েছে নিঃসঙ্গতা ও ভয়ের অভিজ্ঞতা। বড় ভাইয়ের নির্যাতন এবং নিজের ভিন্নতা আড়াল করে রাখার চাপ তাকে ক্রমে অন্তর্মুখী করে তোলে। চারপাশের মানুষের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে মিশতে না পারার অভিজ্ঞতা তার মধ্যে বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি বাড়ায়।

নিজের ভেতরের জগৎকে বোঝার জন্য গেরিয়ন ফটোগ্রাফির প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে। ক্যামেরার মাধ্যমে সে চারপাশের পৃথিবীকে নিজের মতো করে দেখতে এবং অভিজ্ঞতাগুলো ধরে রাখতে চায়। অন্যদের চোখে যা সাধারণ দৃশ্য, তার কাছে তা হয়ে ওঠে অনুভূতি ও অর্থের নতুন ক্ষেত্র।

হারকিউলিসের প্রেম ও প্রত্যাখ্যানের ক্ষত

গেরিয়নের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে হারকিউলিসের সঙ্গে পরিচয়ের পর। কৈশোরে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এই সম্পর্কের মধ্য দিয়ে গেরিয়ন নিজের আকাঙ্ক্ষা ও পরিচয়কে নতুনভাবে আবিষ্কার করে। কিন্তু সম্পর্কটি স্থায়ী হয় না। হারকিউলিস অন্য একজনের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে গেরিয়নকে ছেড়ে চলে যায়।

এই প্রত্যাখ্যান গেরিয়নের কাছে কেবল প্রেম হারানোর অভিজ্ঞতা নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় নিজের অস্তিত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা, ভালোবাসা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং অন্যের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার প্রশ্ন। সে যেন নিজের ভিন্নতাকে ভালোবাসার অযোগ্য হওয়ার কারণ হিসেবে দেখতে শুরু করে।

কারসনের উপন্যাসে লাল ডানার প্রতীকটি এখানেই বিশেষ তাৎপর্য পায়। গেরিয়নের ডানা যেমন তার স্বাতন্ত্র্যকে প্রকাশ করে, তেমনি তা আড়াল করার চেষ্টা তার নিজের পরিচয়কে গোপন রাখার মানসিক চাপেরও প্রতিফলন। ডানাকে লুকিয়ে রাখা মানে নিজের এমন একটি অংশকে আড়াল করা, যেটিকে সে একদিকে ভালোবাসে, অন্যদিকে সামাজিক প্রত্যাখ্যানের ভয়ে প্রকাশ করতে সাহস পায় না।

এইভাবে প্রাচীন পুরাণের একটি চরিত্রের মধ্য দিয়ে কারসন আধুনিক মানুষের প্রেম, যৌনপরিচয়, আত্মসম্মান ও বিচ্ছিন্নতার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। গেরিয়নের গল্পে ব্যক্তিগত কষ্টের পাশাপাশি রয়েছে সেই সামাজিক বাস্তবতার ইঙ্গিত, যেখানে প্রচলিত ধারণার বাইরে থাকা মানুষকে প্রায়ই নিজের পরিচয় আড়াল করে চলতে হয়।

লাল ডানা কি শেষ পর্যন্ত মুক্তির প্রতীক?

গেরিয়নের জীবনে হারকিউলিসের প্রত্যাখ্যান দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করলেও তার গল্প শেষ পর্যন্ত কেবল বেদনার মধ্যে আটকে থাকে না। সময়ের ব্যবধানে পুরোনো সম্পর্কের মুখোমুখি হওয়ার পাশাপাশি সে নিজের পরিচয় ও আকাঙ্ক্ষাকে নতুন করে বোঝার সুযোগ পায়।

কাহিনির শেষভাগে গেরিয়নের জীবনে গ্রহণযোগ্যতার একটি ভিন্ন অভিজ্ঞতা আসে। হারকিউলিসের নতুন সঙ্গী আনকাশ তার লাল ডানা দেখে তাকে প্রত্যাখ্যান না করে গ্রহণ করে। এই অভিজ্ঞতা গেরিয়নের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, কারণ এত দিন যে বৈশিষ্ট্যকে সে লজ্জা ও ভয়ের সঙ্গে লুকিয়ে রেখেছিল, অন্য একজনের কাছে সেটিই ঘৃণার কারণ হয় না।

উপন্যাসের শেষ দিকে আগ্নেয়গিরির ওপর দিয়ে গেরিয়নের ডানা মেলে উড়ে যাওয়ার চিত্রটি আত্মমুক্তির প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়। আগুন, ডানা ও উড্ডয়নের এই চিত্রকল্পের মধ্য দিয়ে সে যেন নিজের পরিচয়কে আর অপরাধ হিসেবে দেখতে চায় না। অন্যের স্বীকৃতির জন্য নিজের অস্তিত্ব অস্বীকার করার পরিবর্তে সে নিজের স্বাতন্ত্র্যকে গ্রহণ করতে শেখে।

এই মুক্তি অবশ্য কেবল একটি প্রেমের সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার বিষয় নয়। এটি নিজের সম্পর্কে দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হওয়া ভয়, লজ্জা ও অপরাধবোধের সঙ্গে বোঝাপড়ারও গল্প। কারসনের সাহিত্যিক কৃতিত্ব হলো, তিনি পুরাণের পরিচিত চরিত্রকে ব্যবহার করে এমন একটি অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন, যা সমকালীন পাঠকের কাছেও প্রাসঙ্গিক।

ভাষা ও আঙ্গিকে স্বতন্ত্র অ্যান কারসন

অ্যান কারসনের সাহিত্যকর্মের বিশেষত্ব শুধু বিষয়বস্তুতে নয়, লেখার আঙ্গিকেও। কবিতা, গদ্য, অনুবাদ, নাট্যরূপ ও দৃশ্যভিত্তিক উপস্থাপনার মধ্যে তিনি প্রায়ই প্রচলিত সীমারেখা অতিক্রম করেন। তাঁর লেখায় প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য যেমন উপস্থিত থাকে, তেমনি থাকে আধুনিক মানুষের ব্যক্তিগত সংকট ও অনুভূতির জটিলতা।

তাঁর রচনায় পাঠককে সব প্রশ্নের সহজ উত্তর দেওয়া হয় না। বরং খণ্ডিত স্মৃতি, সংক্ষিপ্ত বাক্য, পৌরাণিক অনুষঙ্গ এবং ভিন্ন ভিন্ন সাহিত্যরীতির সংমিশ্রণে তৈরি হয় বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা। ফলে তাঁর লেখা একই সঙ্গে বুদ্ধিবৃত্তিক অনুসন্ধান ও আবেগের জগৎ হয়ে ওঠে।

সাফোর কবিতা অনুবাদ থেকে শুরু করে গ্রিক ট্র্যাজেডির পুনর্নির্মাণ কিংবা অটোবায়োগ্রাফি অব রেড—সব ক্ষেত্রেই কারসন প্রাচীন সাহিত্যকে কেবল ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে দেখেননি। বরং সেসব রচনার মধ্যে এমন অনুভূতি ও প্রশ্ন খুঁজেছেন, যা সময়ের পরিবর্তনেও মানুষের জীবনে ফিরে আসে।

ব্যক্তিগত জীবন, অসুস্থতা ও সৃজনশীলতার ধারাবাহিকতা

কানাডায় জন্ম নেওয়া অ্যান কারসন তাঁর কর্মজীবনের বড় অংশ কাটিয়েছেন শিক্ষকতা, গবেষণা, অনুবাদ ও লেখালেখিতে। প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি, মিশিগান ইউনিভার্সিটি ও বার্ড কলেজের মতো প্রতিষ্ঠানে ধ্রুপদি সাহিত্য পড়িয়েছেন তিনি। তাঁর সাহিত্যজীবন প্রমাণ করে, প্রাচীন ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে গভীর গবেষণাও আধুনিক সৃজনশীলতার নতুন পথ তৈরি করতে পারে।

জীবনের পরবর্তী সময়ে পারকিনসনস রোগের সঙ্গে তাঁর লড়াইয়ের কথাও সামনে এসেছে। এই স্নায়বিক রোগ চলাফেরা ও হাতের সূক্ষ্ম কাজকে কঠিন করে তুলতে পারে। তবু তাঁর সাহিত্যিক পরিচয়ের কেন্দ্রে রয়েছে দীর্ঘদিনের পাঠ, অনুসন্ধান এবং প্রচলিত রীতিকে নতুনভাবে দেখার প্রবণতা।

২০২৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার তাঁর সাহিত্যকর্মের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পুরস্কারটির অর্থমূল্য ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই অর্থের একাংশ চিকিৎসাসেবামূলক সংস্থা ডক্টরস উইদাউট বর্ডারসকে দেওয়ার এবং বাকি অর্থের একটি অংশ দিয়ে এক বন্ধুকে বাড়ি কিনতে সহায়তা করার কথা ভেবেছেন তিনি।

পুরাণের গণ্ডি পেরিয়ে মানুষের গল্প

অ্যান কারসনের সাহিত্যভুবনে প্রাচীন গ্রিক পুরাণের চরিত্রগুলো নতুন অর্থে ফিরে আসে। গেরিয়নের লাল ডানা হয়ে ওঠে ভিন্নতার প্রতীক; হারকিউলিসের প্রত্যাখ্যান প্রকাশ করে প্রেম ও আত্মসম্মানের জটিলতা; আর শেষের উড্ডয়ন ইঙ্গিত দেয় নিজের পরিচয়কে গ্রহণ করার সম্ভাবনার দিকে।

এই কারণেই অটোবায়োগ্রাফি অব রেড কেবল পুরাণের আধুনিক পুনর্কথন নয়। এটি এমন এক সাহিত্যিক অনুসন্ধান, যেখানে প্রশ্ন করা হয়—মানুষকে কে বা কারা দানব হিসেবে চিহ্নিত করে, ভালোবাসার জন্য কেন কাউকে নিজের পরিচয় লুকাতে হয়, আর অন্যের স্বীকৃতি ছাড়াও কি নিজের অস্তিত্বকে গ্রহণ করা সম্ভব?

অ্যান কারসনের সাহিত্য সেই প্রশ্নগুলোর সহজ উত্তর দেয় না। বরং পাঠককে নিজের অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গির দিকে ফিরে তাকাতে আহ্বান জানায়। প্রাচীন গ্রিসের একটি দানবের লাল ডানার মধ্য দিয়ে তিনি তাই আধুনিক মানুষের হৃদয়ের গল্প বলেন—যেখানে প্রেম আছে, প্রত্যাখ্যান আছে, নিঃসঙ্গতা আছে, আবার নিজের মতো করে বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষাও রয়েছে।

কালের আলো/জেএন/এসএ