খুঁজুন
                               
, ,
           

অর্থবছরের সময় বদলের যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত

মোস্তফা কামাল:
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬, ৮:৫৯ অপরাহ্ণ
অর্থবছরের সময় বদলের যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত

দেশের প্রথাগত অর্থবছরের সময়কাল বদলে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। জুলাই টু জুনের বদলে অর্থবছরের নতুন সময়কাল হবে এপ্রিল টু মার্চ । আগামী ২০২৭-২৮ অর্থবছরকে ট্রানজিশনাল অর্থবছর হিসেবে বিবেচনা করে ৯ মাসে অর্থবছর (জুলাই-মার্চ) শেষ করা হবে। এরপর ২০২৮-২৯ নতুন অর্থবছর (এপ্রিল-মার্চ) অনুযায়ী সরকারের সব কার্যক্রম শুরু করা হবে। পাকা সিদ্ধান্ত হয়েছে মন্ত্রি পরিষদে। তা কার্যকরের আগে, অর্থবছর পরিবর্তনের সঙ্গে সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় যুক্ত বিভিন্ন সিস্টেমে প্রযুক্তিগত পরিবর্তন আনতে হবে। চেঞ্জমেকিং বা নতুন বন্দোবস্তের চিন্তা-মেধা সবার হয় না। সেই উদ্যোগ নেয়ার সাহসও সবার হয় না। অর্থবছর বদলানো কেবল ক্যালেন্ডারের কয়েকটি পাতা উল্টে দেওয়া নয়। জুলাইর জায়গায় এপ্রিল, জুনের জায়গায় মার্চ নিয়ে আসা নয়। রাষ্ট্রের অর্থবছর কোনো সাধারণ ক্যালেন্ডার নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাজেট, উন্নয়ন প্রকল্প, রাজস্ব আদায়, সরকারি ব্যয়, কৃষি, ব্যবসা বাণিজ্য, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, করব্যবস্থা, সরকারি হিসাবরক্ষণ এবং শেষ পর্যন্ত নাগরিকের জীবন।

আমাদের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বড় অংশ বাস্তবায়নের তৎপরতা দেখা যায় অর্থবছরের শেষ দিকে। ফলে জুনের শেষ মুহূর্তে প্রকল্প বাস্তবায়নের যে তাড়াহুড়া, তার সঙ্গে যখন বর্ষার পানি যুক্ত হয়, তখন তৈরি হয় এক অদ্ভুত বাস্তবতা। যে রাস্তা শুকনো মৌসুমে করার কথা, সেটি করা হচ্ছে বৃষ্টির মধ্যে। যে বাঁধের কাজ আগে শেষ হওয়ার কথা, সেটি চলছে নদীর পানি বাড়ার সময়। যে অবকাঠামো নির্মাণের জন্য বছরের শুরুতেই অর্থ বরাদ্দ ছিল, সেটির বড় অংশের কাজ শুরু হচ্ছে অর্থবছরের শেষ কয়েক মাসে। তখন প্রশ্ন ঘোরে এ উন্নয়ন কতো দিনের? এ কথাও সত্য বাংলাদেশের সমস্যা শুধু অর্থবছরের সময়সূচিতে নয়। সমস্যা আরো অনেক জায়গায়। প্রকল্প পরিকল্পনা, ক্রয়প্রক্রিয়া, অনুমোদনব্যবস্থা, জমি অধিগ্রহণ, দরপত্র, ঠিকাদারি ব্যবস্থাপনা, প্রকল্প পরিচালনা, তদারকি এবং জবাবদিহিতায় অনেক ঘাটতি।

প্রকৃতিতভাবে জুলাই-আগস্টে অর্থাৎ বর্ষাকালে অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রম চলে। এতে একদিকে কাজ দীর্ঘায়িত হয়, কাজের গুণগত মানও নষ্ট হয়। সেইসাথে হয় জনদুর্ভোগ। এপ্রিল–মার্চ সময়কে অর্থবছর হিসেবে ব্যবহার করা হলে বর্ষার আগেই অবকাঠামোগত উন্নয়ন কার্যক্রম শেষ করা যাবে। অর্থ বছরের এমন সময় বদল একটা বহুল-প্রতিক্ষীত পরিবর্তন। বাংলা ক্যালেন্ডার ধরে পহেলা বৈশাখ থেকে ৩০ চৈত্র অর্থবছর ধরার একটা দাবিও ঘুরছিল অনেক দিন ধরে। যা করা হয়েছে তাও বাংলা ক্যালেন্ডারের কাছাকাছিই। বেসরকারিভাবে গ্রাম-বাংলার দোকান-পাট অর্থাৎ হালখাতা ও জমির খাজনা পরিশোধ করা হচ্ছে বৈশাখ-চৈত্র মাসে অর্থাৎ এপ্রিল- মার্চ মাসে। এ প্রথাটি মোঘল সম্রাট আকবরের চিন্তার জের। মোগল সম্রাট আকবরের আমলে বাংলা নববর্ষ চালু হয়। রাজস্ব আহরণের দৃষ্টিকোণ থেকে তখন অর্থবর্ষ গণনা শুরু হয় এপ্রিল মাসে। পরে উপনিবেশ আমলে ১৮৬০ সালের ৭ এপ্রিল ভারতের প্রথম বাজেট দেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির স্কটিশ অর্থনীতিবিদ জেমস উইলসন। তখন থেকে এপ্রিল মাসে অর্থবছরের শুরু হয়। এই ব্যবস্থা চলে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ পর্যন্ত। পরে ভারত এপ্রিল–মার্চ সময়কালকে নিজেদের অর্থবছর হিসেবে বজায় রাখে। অন্যদিকে পঞ্চাশের দশকে পাকিস্তান অর্থবছরের সময়কাল পরিবর্তন করে জুলাই–জুন ধরে অর্থবছর গণনা শুরু করে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে একই ধারা বজায় রেখে জুলাই–জুন সময় ধরেই অর্থবছর গণণা অব্যাহত রাখা হয়।

সময়ের বিবর্তনে খোদ ব্রিটেন তাদের অর্থবছর তিন মাস এগিয়ে এনে এপ্রিলে স্থিত করেছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, শ্রীলংকা এবং নেপাল তাদের অর্থ বছর পাল্টিয়ে ৬ মাস এগিয়ে এনেছে। বিশ্বের বেশির ভাগ দেশেই জানুয়ারি–ডিসেম্বর সময়কাল ধরেই অর্থবছর হিসাব করা হয়। বিশেষ করে উন্নত দেশে এটি বেশি। জানুয়ারি–ডিসেম্বর সময়কাল ধরে অর্থবছর গণনা করা দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, জার্মানি, ফ্রান্স, ব্রাজিল, রাশিয়া, কোরিয়া। পার্শ্ববর্তী শ্রীলঙ্কাও জানুয়ারি–ডিসেম্বর ধরেই অর্থবছরের সব হিসাব–নিকাশ করে। অন্যদিকে জুলাই–জুন ধরে যেসব দেশ অর্থবছর হিসাব করে, সেসব দেশের মধ্যে আছে অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, নেপাল, পাকিস্তান। আর এপ্রিল–মার্চ অর্থবছরের দেশগুলো মধ্যে আছে ভারত, যুক্তরাজ্য। তবে অনেক দেশে কর দেওয়ার সময় এবং অর্থবছরের সময়ের মধ্যে ভিন্নতা আছে।

অর্থবছর হলো সরকারের আর্থিক হিসাবের এক বছর। এই অর্থবছর ধরেই সরকার কত আয় করবে, কত খরচ করবে, তা নিয়ে বাজেট করে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জন্য বরাদ্দও অর্থবছর হিসাবেই দেওয়া হয়। সে অনুযায়ী বাজেট বাস্তবায়ন করে। অর্থবছরের নতুন সময়কাল বাস্তবায়ন শুরু হলে কেবল সরকারি পরিকল্পনায়ই পরিবর্তন আসবে না। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনায়ও আসবে নতুন সময়সূচি। এ ছাড়া মানুষের জীবনে প্রতিবছরের আয়–ব্যয়ের হিসাব, কর ব্যবস্থাপনাসহ বেশ কিছু পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতেই হবে। প্রভাব পড়বে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হিসাব–নিকাশেও। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার ও প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি), শুল্ক–কর, বিনিয়োগ, দেশি–বিদেশি ঋণ ও দায়দেনা, সরকারি প্রতিষ্ঠানের লাভ–লোকসানের হিসাব অর্থবছর ধরেই করা হয়। এসব বিবেচনায় নিয়েই মন্ত্রিসভার বৈঠকে অর্থবছরের সময়কাল পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ সংক্রান্ত তেমন আগাম তথ্য ছিল না গণমাধ্যমে। সরকার চায় উন্নয়ন প্রকল্পের কর্মকাণ্ডে গতি বাড়াতে। নতুন সময়কালে, অর্থাৎ এপ্রিল–মার্চ অর্থবছরে বাজেট কার্যকর করা হলে অর্থবছর শুরু হবে গ্রীষ্মের শুরুতে। ফলে এপ্রিল–জুনের শুকনো মৌসুমেই নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।

এ ছাড়া প্রতিবছরই দেখা যায়, অর্থবছরের শেষ সময়ে উন্নয়ন প্রকল্পের টাকা খরচ বেড়ে যায়। বিশেষ করে জুন মাসে তড়িঘড়ি করে কাজ শেষ করেন অনেক ঠিকাদার। এভাবে কাজ করে বিল তুলে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে প্রতিবছরই। জুনে বৃষ্টির কারণে অনেক সময় কাজের মানও ঠিক থাকে না। অর্থবছরের শুরুতেই এপ্রিল মাস থেকে অবকাঠামো প্রকল্পের কাজ শুরু করা গেলে অর্থবছরের শেষ চার–পাঁচ মাসে (নভেম্বর–মার্চ) শুষ্ক মৌসুমে উন্নয়ন প্রকল্পের কাজে গতি বাড়ানো সম্ভব হবে। সড়ক, সেতু, ভবনসহ বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পে বর্ষার বাধা কিছুটা কমবে বলেও আশা করা যায়। এ ছাড়া অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের প্রায় পুরোটাই শুষ্ক মৌসুম হওয়ায় শেষ মুহূর্তে তড়িঘড়ি করে নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে দেখিয়ে টাকা তুলে নেওয়ার প্রবণতাও কমতে পারে। প্রশ্ন থাকা স্বাভাবিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কী হবে? অবশ্যই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হিসাব–নিকাশও পরিবর্তন করতে হবে। করব্যবস্থা ও কোম্পানির হিসাবের সঙ্গে নতুন অর্থবছরের সামঞ্জস্য করতে হবে। বড় বড় প্রতিষ্ঠান তাদের হিসাব–নিকাশের সফটওয়্যারে আপডেট আনতে হবে। এতে নতুন করে কিছু খরচ বাড়বে, প্রাপ্তিও ঘটবে। সাধারণ মানুষও পরিবর্তনের তাগিদ পাবে। এতে তাদের দৈনন্দিন জীবনে সরাসরি বড় কোনো পরিবর্তন হবে না। করবর্ষ ও অর্থবছর এক হওয়ায় ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের আয়কর গণনার সময় বদলে যাবে। এখন জুলাই–জুন সময়ের আয়ের ওপর কর দিতে হয়। আয়কর রিটার্ন দাখিলের সময়সূচিতে কিছুটা পরিবর্তন আসবে। নতুন ব্যবস্থায় এপ্রিল–মার্চ সময়ের ওপর ভিত্তি করে রিটার্ন জমা ও কর দিতে হবে।

সামগ্রিক বিবেচনায় ১ এপ্রিল–৩১ মার্চ করার সিদ্ধান্তটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগ। বর্ষাকালের সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সূচির অসামঞ্জস্য কমিয়ে প্রকল্পের গতি ও মান বাড়ানোর ক্ষেত্রে এটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। শুধু অর্থবছরের সময়সূচি বদলালেই উন্নয়ন প্রকল্পের ধীরগতি, অর্থছাড়ে বিলম্ব বা দুর্বল বাস্তবায়ন সক্ষমতার মতো দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো দূর হবে না। বরং নতুন কাঠামো কার্যকর করতে বাজেট প্রণয়ন, রাজস্ব আদায়, সরকারি হিসাব ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বড় ধরনের সমন্বয় প্রয়োজন হবে। তাই এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক সংস্কার হিসেবে দেখার পাশাপাশি এর বাস্তবায়ন কতটা পরিকল্পিত ও দক্ষ হচ্ছে, সেদিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি, জবাবদিহি ও তদারকি নিশ্চিত করা গেলে অর্থবছর পরিবর্তন দেশের উন্নয়ন ও আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হয়ে উঠতে পারে। এমন আশাবাদ ও উচ্চ্বাশার সমান্তরালে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে সত্য। একটি দেশে ৫৫ বছর পর অর্থবছরের সময়সীমায় পরিবর্তনের একটি উদ্যোগ খাপ খাওয়াতে একটু সময় লাগবে সত্য। সময় পরিবর্তনের পাশাপাশি রাজস্ব আদায়, সরকারি হিসাব পরিচালনা, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, সরকারি ক্রয় ও অর্থছাড় ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কার দিনে দিনে চলে আসবে, তা ভাবা যায় না। প্রত্যাশিত সুফল পেতে সময় লাগবে। অর্থবছর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাজেট প্রণয়ন, রাজস্ব আদায়, করব্যবস্থা, সরকারি হিসাবরক্ষণ, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন ও অর্থছাড়ের পদ্ধতিতে কী ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন হবে, সেই হোম ওয়ার্ক সরকার করেছে। প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভায় আনার আগে বিভিন্ন পর্যায়ে মতামত নেওয়া হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের অনেকে প্রকল্প অনুমোদন, দরপত্র প্রক্রিয়া, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ, অর্থছাড়, সরকারি ক্রয় এবং বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণের পুরো কাঠামোয় সংস্কারের তাগিদ দিয়েছেন। প্রকল্পের শুরুতেই সঠিক পরিকল্পনা এবং সময়মতো অর্থছাড় নিশ্চিত করতে বলেছেন। বারবার মেয়াদ বাড়ানোর প্রবণতা রুখতে বলেছেন।

রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক নানা দুর্বলতার কারণে প্রকল্পে দীর্ঘসূত্রতা যেন না হয় সে ব্যাপারে সরকারকে কঠোর হতে হবে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতার সামঞ্জস্য আনতে হবে। বলাই বাহুল্য শিল্প, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মতো কিছু মন্ত্রণালয় ঐতিহাসিকভাবেই বাজেট বাস্তবায়নে দুর্বল। আবার স্থানীয় সরকার ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মতো কিছু মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন সক্ষমতা তুলনামূলক ভালো। এসব ফের কমাতে হবে। বাজেট বাস্তবায়নের বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আগে ব্যয় কাঠামোয় সংস্কার আনা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। সেইসথে প্রতিটি প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। মনে করার দরকার রয়েছে, ২০১০ সালেও জুলাই-জুনের পরিবর্তে অন্য সময়সীমায় অর্থবছর নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন হয়নি। এবারের প্রেক্ষিত ভিন্ন। নতুন বাংলাদেশ, রূপান্তরিত বাংলাদেশের কথা মুখে মুখে সবাই বলছেন। এবার বাস্তব দেখার অপেক্ষা।

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন।

পুলিশকে ‘নিষ্ক্রিয়’ করার চেষ্টা রুখতে জনসম্পৃক্ততার ডাক তথ্য প্রতিমন্ত্রীর

বিশেষ সংবাদদাতা ও ময়মনসিংহ প্রতিবেদক:
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮:৪৯ অপরাহ্ণ
পুলিশকে ‘নিষ্ক্রিয়’ করার চেষ্টা  রুখতে জনসম্পৃক্ততার ডাক তথ্য প্রতিমন্ত্রীর

পুলিশকে নিষ্ক্রিয় করতে একটি চক্র নানা ধরনের বিতর্ক ও বিভ্রান্তি তৈরির চেষ্টা করছে বলে মন্তব্য করেছেন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী এমপি। এমন পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশকে এককভাবে নির্ভর না করে জনগণকে সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে অপরাধীদের শনাক্ত করে তাদের বিষয়ে গোপনে পুলিশকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করার জন্য সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।

  • জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সমন্বয় কমিটি গঠনের তাগিদ
  • অপরাধীদের গোপন তথ্য দিতে আহ্বান
  • মাদকবিরোধী অভিযানে বাড়ি বাড়ি যাওয়ার নির্দেশ

মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) বিকেলে ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলা পরিষদ সভাকক্ষে উপজেলা প্রশাসন আয়োজিত আইনশৃঙ্খলা কমিটির বিশেষ সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

সীমিত পুলিশ, বাড়াতে হবে জনসম্পৃক্ততা
ইয়াসের খান চৌধুরী বলেন, একটি থানায় কর্মরত সীমিতসংখ্যক পুলিশ সদস্য দিয়ে এককভাবে পুরো এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। অপরাধের ধরন ও পরিধি বিবেচনায় নিয়ে পুলিশ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন। এ জন্য স্থানীয় পর্যায়ে পুলিশ-জনগণের সমন্বয় কমিটি গঠনের ওপর জোর দেন তিনি।

প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব শুধু পুলিশের ওপর রেখে দিলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। স্থানীয় জনগণের কাছ থেকে অপরাধসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ এবং দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তা জানানোর ব্যবস্থা কার্যকর হলে অপরাধ প্রতিরোধে পুলিশের সক্ষমতাও বাড়তে পারে—এমন একটি সমন্বিত কাঠামোর প্রয়োজনীয়তার কথাই তুলে ধরেন তিনি।

‘বিতর্ক সৃষ্টি করে পুলিশকে দুর্বল করার চেষ্টা’
পুলিশকে নিষ্ক্রিয় করতে একটি চক্র নানা ধরনের বিতর্ক সৃষ্টির চেষ্টা করছে উল্লেখ করে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তথ্য প্রতিমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য, অপরাধীদের শনাক্ত করতে জনগণকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য গোপনে পুলিশকে দিতে হবে।

একই সঙ্গে একটি নিষিদ্ধ দলের রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ ও তৎপর থাকার আহ্বান জানান তিনি। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের নামে যেন নিরীহ মানুষ হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়েও পুলিশকে কঠোরভাবে সতর্ক করেন প্রতিমন্ত্রী।

মিথ্যা মামলা নয়, আইনের প্রয়োগে সতর্কতা
পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে ইয়াসের খান চৌধুরী বলেন, কোনো অবস্থাতেই মিথ্যা মামলা নেওয়া যাবে না। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে নিরীহ মানুষ যাতে হয়রানির শিকার না হন, তা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে, সংবাদকর্মীদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি। তাঁর মতে, মিথ্যা অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের মাধ্যমে এলাকায় যাতে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়, সেদিকে সাংবাদিকদের অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে। অর্থাৎ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে একদিকে পুলিশের সক্রিয়তা, অন্যদিকে গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল তথ্য পরিবেশন—দুই দিকের ভারসাম্যকেই গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

মাদকবিরোধী অভিযানে তালিকা ধরে অভিযান
মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা উল্লেখ করে মাদক কারবারিদের তালিকা অনুযায়ী বাড়ি বাড়ি অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেন প্রতিমন্ত্রী। ইয়াবাসহ মাদক উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ জনগণকেও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

তাঁর বক্তব্যে মাদক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে শুধু অভিযান পরিচালনার পরিবর্তে স্থানীয় পর্যায়ে তথ্য, জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা এবং নাগরিক সহযোগিতাকে সমান গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি উঠে আসে। মাদক কারবারিদের শনাক্তকরণ ও তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দেন তিনি।

নান্দাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাতেমা জান্নাতের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দেবাশীষ কর্মকার, সহকারী কমিশনার (ভূমি) সালাহ উদ্দিন মাহমুদ এবং নান্দাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আজহারুল ইসলাম। এ ছাড়া উপজেলা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারাও সভায় উপস্থিত ছিলেন।

সভা শেষে ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে লিফলেট বিতরণ করেন তথ্য প্রতিমন্ত্রী। এ সময় নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে ডেঙ্গুর প্রজননস্থল ধ্বংসের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। লিফলেট বিতরণ কর্মসূচিতে নান্দাইল উপজেলা বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা অংশ নেন। এর আগে পাঁচ দিনের সফরে মঙ্গলবার দুপুরে ময়মনসিংহের নান্দাইলে পৌঁছান ইয়াসের খান চৌধুরী। সফরের অংশ হিসেবে কিশোরগঞ্জ ও জামালপুরের একাধিক কর্মসূচিতে তাঁর অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।

কালের আলো/এএইচ/এমএএএমকে

সংবাদমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞার পর ‘ট্রাম্প টিভি’ চালু হোয়াইট হাউসের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮:৪৬ অপরাহ্ণ
সংবাদমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞার পর ‘ট্রাম্প টিভি’ চালু হোয়াইট হাউসের

দ্য এসেনশিয়ালস স্টেশন’ নামে একটি নতুন ২৪ ঘণ্টার অনলাইন সম্প্রচার চ্যানেল চালু করেছে। ২১ সেপ্টেম্বর থেকে চ্যানেলটির সম্প্রচার শুরু হয়। হোয়াইট হাউসের নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেলের মাধ্যমে এটি পরিচালিত হচ্ছে এবং প্রশাসনের ঘোষণা, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য ও বিভিন্ন পুরোনো ভিডিও প্রচার করা হচ্ছে।

চ্যানেলটি চালুর সময়টি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে, কারণ এর কয়েক দিন আগে CNN, পলিটিকো ও MS NOW-এর সাংবাদিকদের হোয়াইট হাউসে প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছিল ট্রাম্প প্রশাসন। ট্রাম্প ওই সংবাদমাধ্যমগুলোর কাভারেজ নিয়ে আপত্তি প্রকাশ করে তাদের বিরুদ্ধে ‘ভুয়া খবর’ প্রচারের অভিযোগ করেন।

সরাসরি প্রশাসনের ভিডিও

হোয়াইট হাউসের তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প টিভিতে প্রশাসনের ভিডিও, প্রেসিডেন্টের বক্তব্য ও বিভিন্ন ঘোষণা সম্প্রচার করা হচ্ছে। প্রেসিডেন্টের অতীতের নির্বাচিত ভিডিও এবং প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ফুটেজও এতে দেখানো হচ্ছে।

সরকার ও প্রেসিডেন্টের নিজস্ব ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে সরাসরি বক্তব্য প্রচারের নজির অবশ্য নতুন নয়। তবে স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে হোয়াইট হাউসের চলমান বিরোধের মধ্যে নতুন চ্যানেলটি চালু হওয়ায় বিষয়টি আলাদা গুরুত্ব পেয়েছে।

তিন সংবাদমাধ্যমের মামলা

হোয়াইট হাউসে প্রবেশাধিকার ফিরে পেতে CNN, পলিটিকো ও MS NOW ২১ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটনের ফেডারেল আদালতে মামলা করেছে। প্রতিষ্ঠান তিনটি অভিযোগ করেছে, তাদের সংবাদ কাভারেজের কারণে প্রবেশাধিকার বাতিল করা মার্কিন সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সুরক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

মামলায় তারা দ্রুত নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করে সাংবাদিকদের হোয়াইট হাউসে প্রবেশাধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার আবেদন করেছে।

অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্য, হোয়াইট হাউসে প্রবেশাধিকার একটি বিশেষ সুবিধা এবং প্রেসিডেন্টের কাভারেজ নিয়ে প্রশাসনের নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রয়েছে।

টেলিভিশন পুলে সংকট

হোয়াইট হাউসে সব টেলিভিশন চ্যানেলের ক্যামেরা একসঙ্গে প্রবেশ করতে না পারায় দীর্ঘদিন ধরে প্রধান সম্প্রচারমাধ্যমগুলো একটি টিভি পুলের মাধ্যমে প্রেসিডেন্টের অনুষ্ঠান কাভার করে আসছে। CNN, ABC, CBS, NBC ও Fox News এই ব্যবস্থার অংশ।

CNN-কে পুল থেকে বাদ দেওয়ার পর অন্য বড় সম্প্রচারমাধ্যমগুলোও প্রেসিডেন্টের নির্ধারিত পুল কাভারেজ স্থগিত করে। ফলে ট্রাম্পের কয়েকটি অনুষ্ঠানের ভিডিও কাভারেজে ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি তৈরি হয়।

স্বাধীন সাংবাদিকতার বিকল্প কি?

ট্রাম্প টিভিতে প্রচারিত ভিডিও ও তথ্য প্রশাসন নিজেই তৈরি, বাছাই ও প্রচার করবে। ফলে এটি স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের মতো বাইরের সাংবাদিকদের অনুসন্ধান, প্রশ্ন, যাচাই বা সম্পাদনার মাধ্যমে তৈরি সংবাদপ্ল্যাটফর্ম নয়।

সমর্থকেরা বলছেন, এর মাধ্যমে সংবাদমাধ্যমের মধ্যস্থতা ছাড়াই প্রেসিডেন্টের বক্তব্য সরাসরি জনগণের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে। অন্যদিকে সংবাদমাধ্যম ও প্রেস-স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো বলছে, সরকারি যোগাযোগমাধ্যম ও স্বাধীন সাংবাদিকতার ভূমিকা আলাদা।

এদিকে CNN, পলিটিকো ও MS NOW-এর করা মামলার মাধ্যমে বিষয়টি এখন আদালতের বিচারাধীন।

কালের আলো/এসএ

ফায়ার সার্ভিসের নতুন মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮:৪৪ অপরাহ্ণ
ফায়ার সার্ভিসের নতুন মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পদে পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ।

মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের বর্তমান মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ জাহেদ কামালকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে প্রত্যাবর্তন করা হয়েছে।

এর ফলে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ। নতুন মহাপরিচালক হিসেবে তিনি ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের দায়িত্ব পালন করবেন।

কালের আলো/এমএসআইপি