খুঁজুন
                               
, ,
           

এনবিআর সংস্কার: অর্থনীতি পুনর্গঠন ও উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ

আহসান হাবিব বরুন:
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬, ৯:০৯ অপরাহ্ণ
এনবিআর সংস্কার: অর্থনীতি পুনর্গঠন ও উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ

দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা, দীর্ঘস্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং নীতিগত স্থবিরতার বৃত্ত ভেঙে বাংলাদেশ আজ এক নতুন ভোরের মুখোমুখি। ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণের দীর্ঘ দেড় দশকের অভিশাপ কাটিয়ে একটি মুক্ত ও স্বনির্ভর সার্বভৌম বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। যেকোনো দেশের স্বনির্ভরতা ও টেকসই অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের মূল চাবিকাঠি হলো একটি দক্ষ, আধুনিক ও জনবান্ধব রাজস্ব ব্যবস্থা। সেই নিরিখে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ‘রাজস্ব সম্মেলন-২০২৬’-এ রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকদের কৌশলগত দিকনির্দেশনা এবং গৃহীত যুগান্তকারী সিদ্ধান্তসমূহ কেবল রাজস্ব আদায় বাড়ানোর প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি জাতীয় অর্থনীতি পুনর্গঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ কার্যকার উদ্যোগ। ১ এপ্রিল থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত নতুন অর্থবছর চক্র নির্ধারণ এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) দুটি স্বতন্ত্র ও স্বচ্ছ সংস্থায় বিভক্ত করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত অর্থনৈতিক সংস্কারের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা করবে বলে মনে হচ্ছে।

একটি দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির টেকসই যাত্রা কখনোই বৈদেশিক ঋণ বা কৃত্রিম আর্থিক পরিসংখ্যানের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। বিগত বছরগুলোতে দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর যে চরম আঘাত এসেছে, তা থেকে মুক্ত হয়ে আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে ওঠার মূল শর্তই হলো অভ্যন্তরীণ সম্পদের সর্বোচ্চ ও দক্ষ ব্যবহার। জাতীয় রাজস্ব সম্মেলনের উদ্বোধনকালে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে সুস্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ: ‘ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে এবার আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর পালা, বাংলাদেশের ঘুরে দাঁড়ানোর পালা।’

সরকার পরিচালনার দ্বায়িত্ব নেওয়ার পর বর্তমান বাস্তবতায় ভঙ্গুর অর্থনৈতিক কাঠামোকে স্থিতিশীল করা এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আনা পুরোপুরি নির্ভর করছে রাজস্ব আহরণের সক্ষমতার ওপর। কিন্তু অতীতের নীতিহীন পৃষ্ঠপোষকতা, রাজনৈতিক স্বার্থে প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার এবং রাজস্ব আহরণে স্বেচ্ছাচারিতা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মতো সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের আস্থা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনেছিল। করদাতাদের কাছে এনবিআর একসময় আতঙ্কের নাম ছিল, যা কোনো স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কাম্য হতে পারে না। আজ করদাতারা এনবিআরকে নিজেদের আস্থার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখতে চায়। করদাতাদের এই প্রত্যাশা পূরণ করা এবং একটি জনবান্ধব রাজস্ব কাঠামো তৈরি করা বর্তমান সময় ও দেশগঠনের প্রধান দাবি।

বাংলাদেশের রাজস্ব খাতের দীর্ঘদিনের স্থবিরতা এবং পেশাদারিত্বের অভাব দূর করতে আন্তর্জাতিক মানের প্রশাসনিক সংস্কার অত্যন্ত জরুরি ছিল। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ঘোষণা অনুযায়ী এনবিআর ভেঙে দুটি সম্পূর্ণ পৃথক ও বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান গঠনের সিদ্ধান্ত দেশের প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসে সবচেয়ে সময়োপযোগী পদক্ষেপ।

১.এই বিভাগটি কাজ করবে সরকারের উচ্চমানের ‘থিংক ট্যাংক’ বা চিন্তাশীল সংস্কারক সংস্থা হিসেবে। অর্থনীতিবিদ, গবেষক, বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি ও শিল্প-বাণিজ্য সংগঠনের বিশেষজ্ঞদের মতামত ও গবেষণার ভিত্তিতে এটি একটি ভারসাম্যপূর্ণ, প্রতিযোগিতামূলক এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নবান্ধব কর নীতি ও আইন কাঠামো প্রণয়ন করবে।
২.এটি কাজ করবে একটি দক্ষ ‘অ্যাকশন টিম’ হিসেবে। যাদের মূল দায়িত্ব হবে কেবল রাজস্ব নীতি বাস্তবায়ন, কর সংগ্রহ এবং আইনের পরিপালন নিশ্চিত করা।

অতীতের কাঠামোয় একই কর্মকর্তার হাতে নীতি প্রণয়ন এবং কর সংগ্রহের দায়িত্ব থাকায় সেখানে স্বার্থের সংঘাত (Conflict of Interest), স্বৈরাচারী সিদ্ধান্ত এবং দুর্নীতি লালনের সুযোগ থেকে যেত। রাজস্ব প্রশাসন থেকে নীতি নির্ধারণী অংশকে বিচ্ছিন্ন করার এই নতুন মডেল কর ব্যবস্থার সামগ্রিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও পেশাদারিত্ব শতভাগ নিশ্চিত করবে।

অর্থনীতির আকার ও বিস্তৃতি ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেলেও বাংলাদেশে ট্যাক্স-টু-জিডিপি (Tax-to-GDP Ratio) অনুপাত বিশ্ব ও আঞ্চলিক সূচকে অত্যন্ত হতাশাজনক। ২০২৩ সালে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে গড় কর-জিডিপি অনুপাত ছিল ১৯.৫ শতাংশ, যেখানে বাংলাদেশের এই হার ৭.২ শতাংশে অবস্থান করছিল। দুখজনকভাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এটি আরও কমে ৬.৭ শতাংশে নেমে আসে, যা বিশ্বপর্যায়ে সর্বনিম্নগুলোর অন্যতম।

এর মূল কারণ অর্থনীতির সম্প্রসারণের সাথে সাথে রাষ্ট্র তার রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা বাড়াতে পারেনি। বিদ্যমান নিয়মিত করদাতাদের ওপর বারবার করের বোঝা বাড়ানোর নীতি কোনো অবস্থাতেই টেকসই নয়। এ ব্যবধান কমাতে আমাদের কর কাঠামোতে প্রধানত চারটি কৌশল অবলম্বন করা প্রয়োজন:

১.যারা কর দেয়ার সক্ষমতা রাখেন অথচ কর ব্যবস্থার বাইরে রয়েছেন, তাদের সঠিকভাবে শনাক্ত করে করের আওতায় আনতে হবে।
২.অযৌক্তিক, অপ্রয়োজনীয় এবং রাজনৈতিক সুবিধাভিত্তিক কর ছাড় বা ট্যাক্স হলিডে সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে।
৩.আন্তর্জাতিক সীমানা পেরিয়ে ট্রান্সফার প্রাইসিং বা মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে সম্পদ পাচার কঠোরভাবে রদ করতে হবে।
৪.ভয়ভীতি প্রদর্শনের পরিবর্তে করদাতাদের সম্মানিত করা এবং ট্যাক্স প্রসেস সহজ করতে হবে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরে নির্ধারিত ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা আপাতদৃষ্টিতে উচ্চাভিলাষী হলেও, একটি ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে নিজস্ব সামর্থ্যভিত্তিক উন্নয়ন বাজেটে উত্তরণের জন্য এই অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের কোনো বিকল্প নেই।

বৈশ্বিক অর্থনীতি এখন ট্রেডিশনাল ম্যানুয়াল ফরম্যাট থেকে দ্রুত গতিতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের দিকে মোড় নিয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ই-কমার্স, ট্রান্সফার প্রাইসিং, বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত ইন্টারন্যাশনাল ট্যাক্সেশন এবং ডিজিটাল ক্রাইমের জটিল সমীকরণে আমাদের রাজস্ব কর্মকর্তাদের মানসিকভাবে ও সামর্থ্যের দিক দিয়ে বহুমাত্রিক দক্ষতা অর্জন করতে হবে।

সরকার রাজস্ব খাতের আমূল পরিবর্তনে ‘কন্টাক্ট-ফ্রি’ এবং ‘ফেসলেস’ রাজস্ব প্রশাসন গড়ে তোলার ওপর জোর দিচ্ছে। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া করদাতাকে কর কর্মকর্তার মুখোমুখি না হওয়ার সংস্কৃতি চালু করা গেলে দুর্নীতির বড় একটি পথ বন্ধ হয়ে যাবে। ইতোমধ্যে চালু হওয়া ই-ট্যাক্স ম্যানেজমেন্ট, আসিকুডা ওয়ার্ল্ড (ASYCUDA World), ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো (NSW) এবং পোর্টগুলোতে আধুনিক স্ক্যানিং ব্যবস্থার মতো তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক কার্যক্রমকে ‘এন্ড-টু-এন্ড অটোমেশন’ (End-to-End Automation)-এর অধীনে আনতে হবে। আধুনিক ডাটাভিত্তিক কর প্রশাসনই কেবল পারে অহেতুক হয়রানি বন্ধ করে প্রকৃত কর ফাঁকিদাতা ও সৎ করদাতাকে নির্ভুলভাবে চিহ্নিত করতে।

বাংলাদেশের অর্থপ্রশাসনের ইতিহাসে সবচেয়ে যুগান্তকারী ও বৈপ্লবিক সিদ্ধান্তটি এসেছে দেশের অর্থবছর পরিবর্তনের মাধ্যমে। দীর্ঘকালের ‘১ জুলাই – ৩০ জুন’ অর্থবছর চক্রকে বদলে ‘১ এপ্রিল – ৩১ মার্চ’ নতুন অর্থবছর নির্ধারণ করার সিদ্ধান্ত প্রশাসনিক বাস্তবতার আলোকেই গৃহীত হয়েছে।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও জলবায়ুগত বাস্তবতায় জুন-জুলাই-আগস্ট—এই তিন মাস থাকে প্রচণ্ড বর্ষাকাল। কিন্তু আমাদের প্রচলিত অর্থবছর জুন মাসে শেষ হওয়ায় অর্থছাড়, দরপত্র আহ্বান এবং উন্নয়ন বাজেটের সিংহভাগ বরাদ্দ খরচের মহোৎসব শুরু হতো মে ও জুন মাসেই। ফলে বর্ষার তীব্র বৃষ্টিপাতের মধ্যেই তড়িঘড়ি করে রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্টসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের কাজ সম্পন্ন করতে হতো। এর ফলে প্রতিবছর: কোটি কোটি টাকার জনগণের আমানত নর্দমায় যেত এবং কাজের মান চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতো। বর্ষার কারণে কাজ দীর্ঘায়িত হয়ে জনদুর্ভোগ চরম মাত্রায় পৌঁছাত। অর্থছাড়ের নির্ধারিত সময়সীমা বা জুন ডেডলাইনের কারণে ঠিকাদার ও দুর্নীতিবাজদের পকেট ভারী হতো কিন্তু টেকসই অবকাঠামো তৈরি হতো না।

অর্থবছরের মতো বিশাল জটিল একটি সরকারি অর্থনৈতিক পরিকাঠামো রাতারাতি পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। তাই সরকার অত্যন্ত দূরদর্শীভাবে প্রশাসনিক ও আর্থিক ট্রানজিশনের সময়রেখা নির্ধারণ করেছে:
২০২৬ – ২০২৭ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের দ্বিখণ্ডীকরণ, ডিজিটাইজেশন প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন এবং নতুন অর্থবছর সংক্রান্ত অর্থ আইন ও প্রশাসনিক বিধিমালা প্রস্তুত করা।

২০২৭ – ২০২৮ অর্থবছরটিকে বিশেষ ৯ মাসের (১ জুলাই ২০২৭ থেকে ৩১ মার্চ ২০২৮) রূপান্তরকালীন অর্থবছর হিসেবে পরিচালনা করা হবে এবং পরীক্ষামূলকভাবে বাজেট সমন্বয় করা হবে। ১ এপ্রিল ২০২৮ থেকে ৩১ মার্চ ২০২৯ তারিখ পর্যন্ত নতুন সময়সূচী অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ‘এপ্রিল-মার্চ’ অর্থবছর চক্র চালুকরণ।

একটি দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক মুক্তি ও সার্বভৌমত্ব নির্ভর করে তার নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত উন্নয়ন কাঠামোর ওপর। জাতীয় রাজস্ব সম্মেলন ২০২৬ কেবল একটি বার্ষিক আলোচনা সভা ছিল না, বরং এটি ছিল অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জনের জন্য একটি জাতীয় ঐকমত্যের প্ল্যাটফর্ম। কর আদায় কেবল আইন বা জোরজবরদস্তির বিষয় নয়; এটি আস্থা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও দেশপ্রেমের সংমিশ্রণ।

পরিশেষে বলা যায়,রাজস্ব কর্মকর্তাদের মানসিকতায় আমূল পরিবর্তন এনে সেবাধর্মী মনোভাব গড়ে তুলতে হবে। দেশপ্রেম ও সততার সাথে প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তি স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দিতে হবে। যে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের সম্মান দিতে জানে এবং সেবার প্রক্রিয়াকে হয়রানিমুক্ত রাখে, নাগরিকরাও সেই রাষ্ট্রের উন্নয়নে অংশীদার হতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসে।

অর্থবছরের যুগান্তকারী পরিবর্তন, এনবিআরের সংস্কার, ডিজিটাইজেশন এবং আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সমন্বয়ে যে ব্যাপক সংস্কারমূলক কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে—তা যদি সততা, সাহসিকতা ও নিরপেক্ষতার সাথে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে বাংলাদেশ অতি দ্রুত একটি শক্তিশালী, দক্ষ ও বিশ্বস্ত রাজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সক্ষম হবে। সুতরাং এই অর্থনৈতিক সংস্কারই হবে ফ্যাসিবাদমুক্ত, স্বনির্ভর এবং অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ ‘নতুন বাংলাদেশ’ গঠনের মূল হাতিয়ার ইনশাল্লাহ।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com

৪৫০ গাড়ির লংমার্চ নিয়ে প্রশ্ন তুললেন রিজভী

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:৩৪ অপরাহ্ণ
৪৫০ গাড়ির লংমার্চ নিয়ে প্রশ্ন তুললেন রিজভী

দেশে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করছে দাবি করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, বিরোধী দল গণতান্ত্রিক কর্মসূচি পালন করতে পারে। তবে কর্মসূচির নামে দেশকে অস্থিতিশীল করা ও জনগণের দুর্ভোগ সৃষ্টি করার দায়ও তাদের নিতে হবে।

সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপি আয়োজিত মিছিল-পূর্ব সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ‘পরিকল্পিত সন্ত্রাসের মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করার বিরুদ্ধে’ এ সমাবেশের আয়োজন করা হয়।

রিজভী বলেন, গণতন্ত্রে সংসদের ভেতরে-বাইরে কথা বলার অধিকার রয়েছে। বিরোধী দল কর্মসূচি করুক, এতে আপত্তি নেই। তবে হুমকি-ধমকি, মিথ্যাচার, অপপ্রচার এবং প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ গ্রহণযোগ্য নয়।

৪৫০ গাড়ির লংমার্চ নিয়ে প্রশ্ন

জ্বালানি সংকটের মধ্যে ৪৫০টি গাড়ি নিয়ে রংপুরে লংমার্চের সমালোচনা করেন রিজভী। তাঁর দাবি, যমুনা সেতুর টোল আদায়ের হিসাব অনুযায়ী ওই বহরে প্রায় ৪৫০টি গাড়ি ছিল।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, এতগুলো গাড়িতে কত জ্বালানি ব্যয় হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, দেশে যখন ডিজেল সরবরাহে সংকট এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানির ঘাটতি রয়েছে, তখন এত গাড়ি নিয়ে লংমার্চের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বিরোধী দলের বিকল্প প্রস্তাব কী—এ প্রশ্নও তোলেন বিএনপির এই নেতা। তাঁর বক্তব্য, বিরোধী দল ভবিষ্যতে সরকারে যেতে পারে, তাই বর্তমান সংকট মোকাবিলায় তাদেরও পরিকল্পনা জানানো উচিত।

জ্বালানি সংকট নিয়ে বক্তব্য

রিজভী বলেন, বর্তমান জ্বালানি সংকটকে শুধু সরকারের একক সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তাঁর দাবি, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালীর পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহে প্রভাব পড়েছে।

তিনি জানান, সরকার বাজেটের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে মিয়ানমার, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে গ্যাস ও এলএনজি আনার উদ্যোগ নিয়েছে। একটি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটি ঠিক হওয়ায় গ্যাসের চাপ ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নতি করছে বলেও দাবি করেন তিনি।

বাসে আগুন, বোমাবাজি নিয়েও প্রশ্ন

দেশ অস্থিতিশীল করার বিভিন্ন ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে রিজভী বলেন, মধ্যবাড্ডা, কাফরুল ও মিরপুরে বাসে আগুন এবং হাইকোর্টের সামনে বোমাবাজির ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় কারা জড়িত, তা তদন্ত করে বের করার আহ্বান জানান তিনি।

একটি ট্রেনে আগুন দেওয়ার ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জামায়াতের লোক বলে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে—এমন দাবি করে জামায়াতের আমিরের প্রতিও প্রশ্ন তোলেন রিজভী। রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে ভাঙচুরের ঘটনার প্রতিবাদে জামায়াতের আমিরকে লংমার্চ করার আহ্বান জানান তিনি।

বিএনপির আন্দোলন প্রসঙ্গে রিজভী

এক দফার আন্দোলনের প্রসঙ্গে রিজভী বলেন, এক দফার কথা শুনে বিএনপি গলি দিয়ে পালিয়ে যাবে না কিংবা প্রাচীর টপকে পালাবে না।

তিনি বলেন, বিএনপির রাজপথের আন্দোলনের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ১৭ বছর ধরে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে দলটি আন্দোলন করেছে বলেও দাবি করেন তিনি। জুলাইয়ের আন্দোলন ও আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনও দীর্ঘদিনের সেই আন্দোলনের বহিঃপ্রকাশ বলে মন্তব্য করেন রিজভী।

বিএনপি ক্ষমতায় আছে ক্ষমতার জোরে নয়, জনগণের শক্তির জোরে—এমন দাবি করে তিনি বলেন, জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকার এগিয়ে যাচ্ছে।

সমাবেশে তিনি পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন, ২৫ হাজার কোটি গাছ লাগানো, হৃদরোগীদের রিংয়ের দাম কমানো এবং ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড চালুর উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন।

সমাবেশে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক রফিকুল আলম মজনু, সদস্যসচিব তানভীর আহমেদ রবিনসহ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতারা বক্তব্য দেন। পরে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি বিজয়নগর নাইটিঙ্গেল মোড় ঘুরে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে এসে শেষ হয়।

কালের আলো/এমএসআইপি 

চার ক্যাটাগরিতে পুলিশ পদক পাচ্ছেন ৯২ সদস্য

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:১৯ অপরাহ্ণ
চার ক্যাটাগরিতে পুলিশ পদক পাচ্ছেন ৯২ সদস্য

সাহস ও বীরত্ব প্রদর্শন, সেবায় অনন্য নজির স্থাপন, গুরুত্বপূর্ণ ও চাঞ্চল্যকর মামলার তদন্ত এবং উদ্ভাবনীমূলক কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতি হিসেবে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরসহ ৯২ জন পুলিশ সদস্যকে পুলিশ পদক দেওয়া হচ্ছে।

সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পুলিশ-২ শাখা থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়। এতে সই করেছেন উপসচিব নাসরিন সুলতানা।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ১ মার্চ থেকে ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এসব পদক দেওয়া হচ্ছে।

চারটি ক্যাটাগরিতে মোট ৯২ জন পুলিশ সদস্যকে পদক দেওয়া হবে। এর মধ্যে রয়েছে ‘বাংলাদেশ পুলিশ পদক (বিপিএম)’, ‘বাংলাদেশ পুলিশ পদক (বিপিএম)-সেবা’, ‘রাষ্ট্রপতির পুলিশ পদক (পিপিএম)’ এবং ‘রাষ্ট্রপতির পুলিশ পদক (পিপিএম)-সেবা’।

সাহস ও বীরত্ব, দায়িত্ব পালনে বিশেষ অবদান, গুরুত্বপূর্ণ ও চাঞ্চল্যকর মামলার তদন্ত এবং অন্যান্য উদ্ভাবনীমূলক কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতি হিসেবে এসব পদক প্রদান করা হচ্ছে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।

কালের আলো/এমএসআইপি 

মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীরা বাংলাদেশকে পাকিস্তান বানাতে চায়: ইশরাক

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:৫১ অপরাহ্ণ
মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীরা বাংলাদেশকে পাকিস্তান বানাতে চায়: ইশরাক

মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীরা ভিন্ন ন্যারেটিভ নিয়ে হাজির হয়ে বাংলাদেশকে পাকিস্তান বানাতে চায় বলে মন্তব্য করেছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন।

তিনি বলেন, একটি পক্ষ বাংলাদেশকে ভারত বানাতে চায়, আরেকটি পক্ষ বাংলাদেশকে পাকিস্তান বানাতে চায়। এসব ষড়যন্ত্র থেকে মুক্ত থাকতে হলে মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ করতে হবে।

সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) বিকেলে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্মের ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা ও আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।

ইশরাক হোসেন বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা থেকেই আমরা দীর্ঘ সাড়ে ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রাম করেছিলাম। সেটিরই একটি চূড়ান্ত ফলাফল ছিল জুলাই গণঅভ্যুত্থান। চব্বিশের পর মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীরা ভিন্ন ন্যারেটিভ নিয়ে হাজির হয়েছিল। তারা মুক্তিযুদ্ধকে মুছে ফেলতে চেয়েছিল। এক দল বাংলাদেশকে ভারত বানাতে চেয়েছিল, আরেক দল বাংলাদেশকে পাকিস্তান বানাতে চায়। এই দেশকে ষড়যন্ত্র থেকে মুক্ত থাকতে হলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ করতে হবে।’

তিনি বলেন, জামায়াতের লং মার্চের মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করা হচ্ছে। বিদেশে থাকা শেখ হাসিনার সন্ত্রাসী কার্যক্রমের সঙ্গে এর মিল রয়েছে। তারা মনে করে একমাত্র জাতীয়তাবাদী শক্তিকে নষ্ট করতে পারলেই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে ফেলা যাবে। বাংলাদেশবিরোধী শক্তি দেশকে পরাধীন রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য জাতীয়তাবাদী শক্তিতে আঘাত হানতে চায়। এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে কাজ করতে হবে।

মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্ব তুলে ধরে ইশরাক হোসেন বলেন, মুক্তিযোদ্ধারা চিরকাল থাকবেন না, কোনো মানুষই চিরকাল বেঁচে থাকেন না। কিন্তু বাংলাদেশের মূল ভিত্তি হচ্ছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। এই মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র পেয়েছি, স্বাধীন পতাকা পেয়েছি, স্বাধীন ভূখণ্ড পেয়েছি এবং স্বাধীন পরিচয় পেয়েছি। তাই আমাদের এই পরিচয়কে ধরে রাখতে হলে এবং বাংলাদেশকে যদি ভবিষ্যতে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত রাখতে চাই, বহির্বিশ্বের যেকোনো ষড়যন্ত্রের হাত থেকে দেশকে মুক্ত রাখতে চাই, তাহলে মুক্তিযুদ্ধকে মনে-প্রাণে জীবনের প্রত্যেকটি স্তরে ধারণ করতে হবে। এর অন্য কোনো বিকল্প নেই।

তিনি বলেন, বিএনপি কোনো রাষ্ট্রীয় বাহিনীনির্ভর দল নয়। পুলিশের ওপর নির্ভরশীল থাকা যাবে না। তাদের কাজ করতে বাধ্য করতে হবে।

গ্যাস ও তেল সংকট প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এই সংকট সমাধানে কিছু সময় প্রয়োজন। তবে রাজনীতির মাধ্যমে জনগণের সঙ্গে যে সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, তা রক্ষা করতে হবে।

কালের আলো/আরডি/এমডিএইচ