খুঁজুন
                               
, ,
           

ছয় মাসেই ঝাঁকুনি, মন্ত্রীদের সামনে আরও বড় পরীক্ষা

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬, ১০:৪৯ পূর্বাহ্ণ
ছয় মাসেই ঝাঁকুনি, মন্ত্রীদের সামনে আরও বড় পরীক্ষা

৬ মাস হয়েছে সরকারের বয়স। কিন্তু মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের কাছে এই ছয় মাস যেন অন্য অনেক সরকারের কয়েক বছরের সমান। দায়িত্ব নেওয়ার শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে বার্তা দিয়েছিলেন, তার কেন্দ্রে ছিল একটি বিষয়—সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই। প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের থাকতে হবে নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা, আর নির্ধারিত সময় শেষে দিতে হবে তার বাস্তবায়নের হিসাব।

ছয় মাসের সেই প্রথম সময়সীমা শেষ হওয়ার পর মন্ত্রিসভায় যে পরিবর্তন এসেছে, সেটিকে তাই নিছক সম্প্রসারণ বা প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস হিসেবে দেখছেন না রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা। বরং এর মধ্য দিয়ে সরকারের ভেতরে একটি স্পষ্ট বার্তা গেছে—পদ পাওয়া শেষ কথা নয়, কাজের ফলাফলই শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

২১ আগস্ট মন্ত্রিসভায় চারজন নতুন মন্ত্রী ও দুজন প্রতিমন্ত্রী যুক্ত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে আগে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা রশিদুজ্জামান মিল্লাত পূর্ণ মন্ত্রী হয়েছেন। অন্যদিকে নতুন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে এসেছেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরসহ দুজন। একই সঙ্গে দপ্তর পুনর্বিন্যাস হয়েছে এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা জহির উদ্দিন স্বপনকে মন্ত্রীর মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা করা হয়েছে।

এই পরিবর্তনের তাৎপর্য এখানেই যে, এটি সরকার গঠনের ছয় মাসের মাথায় প্রথম বড় রদবদল। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি কেবল প্রথম ধাপ, নাকি সামনে আরও বিস্তৃত মূল্যায়ন ও পুনর্বিন্যাসের পথ খুলে গেল?

১৮০ দিনই ছিল প্রথম পরীক্ষা
মন্ত্রিসভার এই পরিবর্তনের তাৎপর্য বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে সরকারের প্রথম কয়েক সপ্তাহের দিকে। ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠনের পর প্রথম মন্ত্রিসভা বৈঠকেই নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, বিদ্যুৎ-জ্বালানি পরিস্থিতি এবং নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের মতো বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল। সরকারের পক্ষ থেকে তখনই ১৮০ দিনের কর্মসূচির কথা বলা হয়।

পরবর্তী সময়ে সংসদেও প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে জানান, নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয়গুলো প্রথম ১৮০ দিন, ২০২৬-২৭ অর্থবছর এবং পুরো পাঁচ বছরের জন্য আলাদা কর্মপরিকল্পনা করছে। অর্থাৎ ছয় মাসের মূল্যায়নের ধারণাটি হঠাৎ করে তৈরি হয়নি; সরকার গঠনের শুরুতেই এর কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল। এ কারণেই মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের কাছে ১৮০ দিন কার্যত একটি ‘পারফরম্যান্স ডেডলাইন’ হয়ে উঠেছিল।

রাজনীতিতে মন্ত্রী হওয়ার পর সাধারণত একটি অলিখিত নিরাপত্তাবলয় তৈরি হয়। নতুন সরকার হলে সেই নিরাপত্তা আরও বেশি থাকে। প্রথম দিকে কাজের চেয়ে রাজনৈতিক ভারসাম্য, অভিজ্ঞতা ও দলীয় সমীকরণ অনেক সময় বড় হয়ে ওঠে। কিন্তু তারেক রহমানের সরকারের ক্ষেত্রে অন্তত এখন পর্যন্ত যে চিত্রটি দেখা যাচ্ছে, সেখানে সেই প্রচলিত ধারণায় কিছুটা পরিবর্তনের ইঙ্গিত আছে। মন্ত্রণালয়ের কাজ কতটা এগোল, অগ্রাধিকার কর্মসূচির কতটা বাস্তবায়িত হলো এবং কোথায় গতি কম—এসব প্রশ্ন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

রদবদল কি সতর্কবার্তা?
ছয় মাসের মাথায় মন্ত্রিসভায় পরিবর্তনকে দুইভাবে দেখা যায়। প্রথমত, এটি সরকারের স্বাভাবিক সম্প্রসারণ ও প্রশাসনিক প্রয়োজনের অংশ। নতুন মন্ত্রীদের অনেকেই শূন্য হওয়া বা পুনর্বিন্যাস হওয়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি হওয়ায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে পরিবর্তন এসেছে; দীর্ঘদিন খালি থাকা পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়েও নতুন মন্ত্রী দেওয়া হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, এর মধ্যে রাজনৈতিক বার্তাও আছে। বিশেষ করে একজন পূর্ণ মন্ত্রীকে মন্ত্রিসভা থেকে সরিয়ে উপদেষ্টা করা এবং একাধিক মন্ত্রণালয়ে নতুন নেতৃত্ব আনার বিষয়টি দেখিয়ে দেয়—প্রধানমন্ত্রীর হাতে পদ ও দায়িত্ব পুনর্বিন্যাসের জায়গাটি সক্রিয় রয়েছে। এখানেই মন্ত্রীদের মধ্যে তৈরি হতে পারে এক ধরনের নতুন চাপ। কারণ ছয় মাস পার হওয়ার পর এখন আর শুধু ‘কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে’ সেটি যথেষ্ট নয়; বরং প্রশ্ন হতে পারে—কী ফল পাওয়া গেছে? এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। উদ্যোগ নেওয়া প্রশাসনের কাজ। কিন্তু উদ্যোগের ফল তৈরি করা রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্ব।

সামনে আরও পরিবর্তনের সম্ভাবনা?
এখন পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে এমন কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা নেই যে ১৮০ দিনের মূল্যায়নের ভিত্তিতে আরও মন্ত্রী বাদ পড়বেন বা দপ্তর বদল হবে। তাই ভবিষ্যৎ রদবদলকে নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে সরকারের ঘোষিত কর্মপরিকল্পনা এবং ইতোমধ্যে হওয়া রদবদল মিলিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট—মন্ত্রীদের কাজের মূল্যায়নের প্রশ্নটি সরকার পরিচালনার কাঠামোর ভেতরেই জায়গা করে নিয়েছে।

ফলে আগামী কয়েক মাসে কয়েকটি মন্ত্রণালয় বিশেষ নজরে থাকতে পারে। যেসব ক্ষেত্রে জনগণের দৈনন্দিন জীবনে দ্রুত ফলাফল দেখানোর প্রত্যাশা তৈরি করা হয়েছিল—বিশেষ করে দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা, বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির দৃশ্যমান বাস্তবায়ন—সেসব ক্ষেত্রে অগ্রগতির হিসাব রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এটি শেষ পর্যন্ত মন্ত্রিসভায় আরও রদবদল ঘটাবে কি না, তা সময়ই বলবে। তবে বর্তমান প্রবণতা বলছে, মন্ত্রীরা এখন শুধু পাঁচ বছরের মেয়াদ মাথায় রেখে কাজ করছেন না; তাঁদের সামনে ছোট ছোট সময়সীমাও তৈরি হচ্ছে। অর্থাৎ পাঁচ বছরের সরকার, কিন্তু হিসাব হতে পারে ছয় মাস পরপর।

মন্ত্রিসভার বাইরে একই বার্তা
তারেক রহমানের নেতৃত্বের ধরন বোঝার ক্ষেত্রে আরও একটি সাম্প্রতিক ঘটনাও গুরুত্বপূর্ণ—ক্ষমতাসীন দলের সাংগঠনিক কাঠামোয় পরিবর্তন। গত ২০ আগস্ট রুহুল কবির রিজভীকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করা হয়েছে। এর আগে তিনি দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হন। রিজভীর এই উত্থানকে দলের নেতারা তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক ভূমিকা, আনুগত্য, সাংগঠনিক দক্ষতা ও ধারাবাহিক দায়িত্ব পালনের স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন। কিন্তু এর রাজনৈতিক তাৎপর্য আরও বিস্তৃত।

কারণ দলের গুরুত্বপূর্ণ পদ বণ্টনেও প্রচলিত প্রত্যাশা বা অভ্যন্তরীণ সমীকরণের বাইরে নেতৃত্বের নিজস্ব মূল্যায়ন যে গুরুত্বপূর্ণ, রিজভীর নিয়োগে তার একটি দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছে। এখানে সরকার ও দলের মধ্যে একটি মিল দেখা যায়। মন্ত্রিসভায়—কাজের ফলাফল। দলে—দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ভূমিকা, আনুগত্য ও সাংগঠনিক সক্ষমতা। দুই ক্ষেত্রেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ক্ষমতা নেতৃত্বের হাতে কেন্দ্রীভূত।

‘পদ’ নয়, ‘পারফরম্যান্স’ কি নতুন মাপকাঠি?
এই জায়গাটিই সম্ভবত বর্তমান পরিবর্তনগুলোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পাঠ। একজন মন্ত্রী একবার দায়িত্ব পেলেই পাঁচ বছর সেই দায়িত্বে থাকবেন—এমন ধারণা দুর্বল হচ্ছে। একইভাবে দলের গুরুত্বপূর্ণ পদও একবার পাওয়া মানেই দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা নয়। বরং নেতৃত্বের সিদ্ধান্তে এখন চারটি বিষয় একসঙ্গে কাজ করছে বলে মনে হচ্ছে—পারফরম্যান্স, আনুগত্য, রাজনৈতিক প্রয়োজন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। এটি কার্যকর হলে বাংলাদেশের প্রচলিত মন্ত্রিসভা রাজনীতিতে একটি পরিবর্তন আসতে পারে। কারণ তখন মন্ত্রী হওয়ার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হবে না—‘কতদিন পদে থাকবেন?’ বরং প্রশ্ন হবে—‘কত দ্রুত ফল দেখাতে পারবেন?’

এই দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচক দিকও আছে। মন্ত্রণালয়ের কাজের গতি বাড়তে পারে, আমলাতন্ত্রের ওপর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের চাপ বাড়তে পারে এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সময়ের হিসাব আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে এর ঝুঁকিও আছে। অতিরিক্ত স্বল্পমেয়াদি ফলাফলের চাপ তৈরি হলে দীর্ঘমেয়াদি নীতি, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও জটিল প্রশাসনিক কাজের জন্য প্রয়োজনীয় সময় কমে যেতে পারে। আবার মন্ত্রীদের মধ্যে সব সময় পদ হারানোর আশঙ্কা থাকলে তাঁরা ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার বদলে দ্রুত দৃশ্যমান ফল দেখানোর দিকে বেশি ঝুঁকতে পারেন। সুতরাং ‘পারফরম্যান্স কালচার’ সফল হবে কি না, তা শুধু রদবদলের সংখ্যায় নয়; মূল্যায়নের মাপকাঠি কতটা স্বচ্ছ, বাস্তবসম্মত এবং ফলাফলভিত্তিক—তার ওপরও নির্ভর করবে।

ছয় মাসে বার্তা, সামনে বড় পরীক্ষা
মন্ত্রিসভার প্রথম রদবদল তাই শুধু কয়েকজন নতুন মুখের আগমন নয়। এর ভেতরে সরকারের পরিচালন পদ্ধতি সম্পর্কে একটি সম্ভাব্য ইঙ্গিতও রয়েছে। প্রথম ১৮০ দিন ছিল সরকারের জন্য পরীক্ষার প্রথম পর্ব। সামনে ২০২৬-২৭ অর্থবছর এবং তারপর পাঁচ বছরের বৃহত্তর কর্মপরিকল্পনা। অর্থাৎ এখন মন্ত্রীদের সামনে আরও বড় পরীক্ষা।

প্রধানমন্ত্রীর বার্তাটি যদি সত্যিই হয়—‘কাজ করুন, ফল দেখান’—তাহলে আগামী কয়েক মাসে মন্ত্রণালয়গুলোর পারফরম্যান্সই নির্ধারণ করতে পারে কার দায়িত্ব আরও শক্ত হবে, কার দপ্তর বদলাবে আর কার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নতুনভাবে নির্ধারিত হবে। একই সঙ্গে দলের ভেতরেও যদি দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে নেতৃত্বের মূল্যায়নই প্রধান হয়ে ওঠে, তাহলে তারেক রহমানের নেতৃত্বের একটি বৈশিষ্ট্য ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে পারে—পদকে স্থায়ী অধিকার নয়, বরং নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অর্পিত দায়িত্ব হিসেবে দেখা।

সেক্ষেত্রে মন্ত্রীরা শুধু গতির চাপে তটস্থ নন; তাঁরা এমন এক রাজনৈতিক ব্যবস্থার মুখোমুখি হচ্ছেন, যেখানে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের কাজের হিসাবও দিতে হবে। আর ছয় মাসের প্রথম রদবদল যদি সেই ব্যবস্থার সূচনা হয়ে থাকে, তাহলে সামনে আরও বড় ‘পারফরম্যান্স রিভিউ’ যে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে আসবে—সেটি উড়িয়ে দেওয়া কঠিন।

কালের আলো/এম/এএইচ

ভোরে প্রশ্ন, সোয়া ৬টায় উত্তর, এরপর লাখ টাকায় বিক্রি

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:৩৮ অপরাহ্ণ
ভোরে প্রশ্ন, সোয়া ৬টায় উত্তর, এরপর লাখ টাকায় বিক্রি

একটি নিয়োগ পরীক্ষা, লাখো চাকরিপ্রার্থীর স্বপ্ন আর কয়েক ঘণ্টা আগেই প্রশ্নপত্র হাতে পাওয়ার গোপন ব্যবস্থা। ভোর ৪টা ৪৩ মিনিটে পাওয়া প্রশ্নপত্রের অস্পষ্ট ছবি সকাল সোয়া ৬টার দিকে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এরপর তৈরি হয় উত্তরপত্র, আর তা ছড়িয়ে পড়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্যদের মাধ্যমে সম্ভাব্য পরীক্ষার্থীদের কাছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই পুরো প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন একাধিক সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী।

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে নিয়োগের বাছাই পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) তদন্তে এমন তথ্য উঠে এসেছে। গত ১৪ থেকে ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে সংস্থাটি। তাঁদের মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), পরিবেশ অধিদপ্তর ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে কর্মরত ব্যক্তিরা রয়েছেন। তবে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে ঘটনার সব প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। প্রশ্নপত্রের মূল উৎস কে, কীভাবে তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হাতে পৌঁছাল এবং এই প্রক্রিয়ায় নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের ভেতরের কেউ জড়িত ছিলেন কি না—এসব বিষয়ে তদন্ত এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি।

  • যুব উন্নয়নের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসে সরকারি তিন প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের নাম
  • ৮–১০ লাখ টাকায় প্রশ্ন-উত্তর বিক্রির তথ্য; সাতজন গ্রেপ্তার
  • প্রশ্নপত্রের মূল উৎস এখনো অজানা

কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে প্রশ্ন থেকে উত্তরপত্র
এসআরবির সংবাদ সম্মেলনে জানানো তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ অক্টোবর ভোর ৪টা ৪৩ মিনিটের দিকে এনবিআরের অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদ তাঁর মুঠোফোনে প্রশ্নপত্রের একটি অস্পষ্ট ছবি পান। পরে সকাল সোয়া ৬টার দিকে একই প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার অপারেটর জাহাঙ্গীর তাঁকে প্রশ্নপত্রের তুলনামূলক স্পষ্ট ছবি পাঠান। এরপর নূর মোহাম্মদ প্রশ্নগুলোর উত্তর তৈরি করে জাহাঙ্গীর ও তাঁর সহকর্মী এস এম ইমদাদুল ইসলামের কাছে পাঠান বলে তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দাবি করেছে এসআরবি। পরবর্তী সময়ে চক্রের অন্য সদস্যদের মাধ্যমে উত্তরপত্র পৌঁছে দেওয়া হয় তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকা পরীক্ষার্থী এবং প্রশ্নপত্রের সম্ভাব্য ক্রেতাদের কাছে।

অর্থাৎ, তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এখানে শুধু প্রশ্নপত্র সংগ্রহের ঘটনা নয়; এর সঙ্গে যুক্ত ছিল ছবি আদান-প্রদান, উত্তর প্রস্তুত, একাধিক ব্যক্তির মধ্যে তথ্য সরবরাহ এবং অর্থের বিনিময়ে তা বিক্রির একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। তদন্তের এই বর্ণনা সত্য হলে, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাটি কোনো একক ব্যক্তির তাৎক্ষণিক উদ্যোগে সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং প্রশ্ন সংগ্রহ থেকে শুরু করে উত্তর তৈরি ও গ্রাহকের কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত আলাদা আলাদা ভূমিকা পালনকারী একটি নেটওয়ার্ক কাজ করছিল।

প্রশ্নের দাম ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা
এসআরবির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চক্রের সদস্যরা পরিচিত প্রার্থীদের কাছে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র ও উত্তরপত্র ৮ থেকে ১০ লাখ টাকায় বিক্রি করতেন। দ্বিতীয় শ্রেণির নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের ক্ষেত্রে এই অঙ্ক বেড়ে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত হতো বলে জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। এই অর্থের অঙ্ক প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাকে শুধু অনিয়ম নয়, একটি লাভজনক অবৈধ ব্যবসা হিসেবে গড়ে ওঠার সম্ভাবনাও সামনে আনে। সরকারি চাকরির সীমিত সুযোগ এবং বিপুলসংখ্যক প্রার্থীর প্রতিযোগিতাকে কাজে লাগিয়ে একটি চক্র কীভাবে অর্থ আদায়ের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে, তদন্তের তথ্য সেই প্রশ্নও সামনে এনেছে। তবে চক্রটি মোট কতজনের কাছে প্রশ্নপত্র বিক্রি করেছে, কত টাকা লেনদেন হয়েছে এবং অর্থের ভাগ কীভাবে বণ্টন করা হতো—এসব বিষয়ে এখনো পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ফলে প্রশ্নপত্র বিক্রির প্রকৃত পরিসর নির্ধারণের জন্য আর্থিক লেনদেনের অনুসন্ধান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

প্রতারিত চাকরিপ্রার্থী থেকে চক্রের সদস্য
মতিঝিল এলাকা থেকে পরিবেশ অধিদপ্তরের ডেটা এন্ট্রি অপারেটর মো. রুবেল ইসলামের সঙ্গে আরও দুজনকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে তদন্তে নতুন সূত্র পাওয়া যায় বলে জানিয়েছে এসআরবি। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের একজন মফিজুল ইসলাম নিজেও চাকরিপ্রার্থী। সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, একটি চক্রের সদস্যকে ১৭ লাখ টাকা দিয়ে প্রতারিত হওয়ার পর তিনি আরও বেশি অর্থ উপার্জনের আশায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে যুক্ত আরেকটি চক্রে যোগ দেন।

এই তথ্য তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আনে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের বাজারে চাকরিপ্রার্থীরা যেমন সম্ভাব্য ক্রেতা, তেমনি প্রতারণার শিকার হওয়ার পর তাঁদের কেউ কেউ অবৈধ কার্যক্রমের অংশ হয়ে উঠতে পারেন—এমন আশঙ্কাও তৈরি হয়। তবে মফিজুলের বক্তব্য ও ভূমিকা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য তদন্তের ফল এবং বিচারিক প্রক্রিয়া বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। রুবেল ও মফিজুলের সূত্র ধরে তদন্তকারীরা এনবিআরের কম্পিউটার

অপারেটর এস এম ইমদাদুল ইসলাম এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক আসাদুল ইসলামের সন্ধান পান। পরে মুঠোফোনের কথোপকথন ও চ্যাটের তথ্য বিশ্লেষণ করে সাভার থেকে নূর মোহাম্মদ এবং মোহাম্মদপুর থেকে জাহাঙ্গীরকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার অন্য ব্যক্তি হলেন মো. হাসিনুর রহমান ওরফে সুজন। এসআরবি জানিয়েছে, চক্রের সদস্যরা হোয়াটসঅ্যাপে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে যোগাযোগ ও লেনদেনের মতো কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। এতে প্রকৃত পরিচয় আড়াল করে প্রশ্নপত্রের তথ্য আদান-প্রদান এবং সম্ভাব্য ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরা কীভাবে যুক্ত হলেন?
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের পরিচয় তদন্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। তাঁদের কয়েকজন বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন। তবে শুধু সরকারি চাকরিতে থাকা থেকে প্রশ্নপত্রের মূল উৎস বা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয় না। তদন্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, প্রশ্নপত্রটি প্রথম কোথা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল। এনবিআরের দুই কর্মচারী নূর মোহাম্মদ ও জাহাঙ্গীরের কাছে প্রশ্নপত্র পৌঁছানোর আগের ধাপটি এখনো স্পষ্ট নয়। সংবাদ সম্মেলনে তাঁদের কাছে প্রশ্নপত্রের উৎস জানতে চাওয়া হলে তাঁরা সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি বলে জানিয়েছে এসআরবি।

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন বলেন, তদন্ত শেষ হলে বিষয়টি নিশ্চিত করা যাবে।

অতএব, তদন্তের পরবর্তী ধাপে প্রশ্নপত্রের মূল কপি বা ডিজিটাল উৎস শনাক্ত করা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যোগাযোগের ধারাবাহিকতা যাচাই করা এবং অর্থ লেনদেনের তথ্য মিলিয়ে দেখা জরুরি। এসব তথ্য ছাড়া চক্রের প্রকৃত বিস্তার কিংবা দায়িত্বের স্তর নির্ধারণ করা কঠিন।

 জব্দ করা সামগ্রী কী ইঙ্গিত দিচ্ছে?
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এসআরবি ১০০ টাকার ১১৬টি স্ট্যাম্প, ৫০ টাকার চারটি স্ট্যাম্প, এক সেট প্রশ্নপত্র, বিভিন্ন পরীক্ষার প্রবেশপত্রের ১৯ পাতা, বিভিন্ন ক্যাটাগরির ১০টি সনদ, বিভিন্ন শ্রেণির আরও ১৫টি সনদ, বিভিন্ন ব্যাংকের চেকের ৪৮ পাতা, একটি ব্যাংকের চেকবই, ছয়টি জাতীয় পরিচয়পত্র এবং চার হাজার টাকা জব্দ করেছে।

জব্দ করা এসব সামগ্রীর মধ্যে প্রবেশপত্র, সনদ, চেক ও পরিচয়পত্রের উপস্থিতি তদন্তের পরিধি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে। এগুলোর সঙ্গে প্রশ্নপত্র ফাঁস, চাকরির নামে প্রতারণা কিংবা আর্থিক লেনদেনের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা আলাদাভাবে যাচাই করতে হবে।

বিশেষ করে বিভিন্ন পরীক্ষার প্রবেশপত্র ও সনদ উদ্ধারের বিষয়টি সামনে আসায় তদন্ত শুধু একটি নিয়োগ পরীক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি অন্য পরীক্ষাকেও অন্তর্ভুক্ত করবে—তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে জব্দ করা কোনো সামগ্রীকে অপরাধের প্রমাণ হিসেবে চূড়ান্তভাবে বিবেচনার আগে তার উৎস, ব্যবহার ও সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

পরীক্ষা স্থগিত, বিক্ষোভ, তারপর পুনরায় আয়োজন
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে ২৪২টি শূন্য পদের বিপরীতে আবেদন করেছিলেন ৩ লাখ ১৯ হাজার চাকরিপ্রার্থী। গত ১০ অক্টোবর সকাল ১১টায় বাছাই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সকাল ১০টা ৩ মিনিটে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর পরীক্ষা স্থগিত করে কর্তৃপক্ষ।

পরীক্ষা স্থগিতের পর গত শনিবার পরীক্ষার্থীরা ঢাকার বিভিন্ন সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। অভিযোগ তদন্তে সেদিনই যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। কমিটির প্রধান করা হয় মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবকে। তবে এখনো তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়েনি।

এর মধ্যেই শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) নতুন করে পরীক্ষাটি অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই ঘটনাপ্রবাহের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে সাধারণ চাকরিপ্রার্থীদের ওপর। দীর্ঘ প্রস্তুতি, সময় ও অর্থ ব্যয়ের পর পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ তাঁদের নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে অনিশ্চয়তায় ফেলেছে। আবার পরীক্ষা স্থগিত ও পুনরায় আয়োজনের কারণে প্রার্থীদের বাড়তি সময়, যাতায়াত ও প্রস্তুতির চাপও তৈরি হয়েছে।

কালের আলো/আরআই/এমকে

প্রশ্নপত্র ফাঁসে ৮–১০ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ, গ্রেপ্তার সরকারি ৫ কর্মচারী

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:২৪ অপরাহ্ণ
প্রশ্নপত্র ফাঁসে ৮–১০ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ, গ্রেপ্তার সরকারি ৫ কর্মচারী

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে পাঁচ সরকারি কর্মচারীসহ সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি-৩)। চক্রটির বিরুদ্ধে চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে প্রশ্নপত্র, প্রবেশপত্র, স্ট্যাম্প, ব্যাংক চেক, সনদপত্র, জাতীয় পরিচয়পত্র ও মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন আলামত জব্দ করা হয়েছে। তবে প্রশ্নপত্রের মূল উৎস এখনো শনাক্ত করা যায়নি। কার কাছ থেকে প্রশ্নপত্র প্রথমে চক্রটির হাতে এসেছে এবং এর সঙ্গে আর কারা জড়িত, তা জানতে তদন্ত চলছে।

শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এসআরবির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন।

৩ লাখ ১৯ হাজার প্রার্থীর পরীক্ষা, প্রশ্নফাঁসে স্থগিত

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে ২৪২টি শূন্যপদে নিয়োগের জন্য গত ১০ অক্টোবর বাছাই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। এ পরীক্ষায় আবেদন করেছিলেন মোট ৩ লাখ ১৯ হাজার চাকরিপ্রার্থী। পরীক্ষা সকাল ১১টায় শুরু হওয়ার কথা থাকলেও ওই দিন সকাল ১০টা ৩ মিনিটে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর পরীক্ষা স্থগিত করে কর্তৃপক্ষ। এতে বিপুলসংখ্যক চাকরিপ্রার্থীর নিয়োগপ্রক্রিয়া অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর এসআরবি ছায়া তদন্ত শুরু করে। এর ধারাবাহিকতায় ১৪, ১৫ ও ১৬ অক্টোবর রাজধানী ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনায় গত ১১ অক্টোবর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে মতিঝিল থানায় মামলা করা হয়েছিল।

গ্রেপ্তার পাঁচ সরকারি কর্মচারী

এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন জানান, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তর, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পাঁচ কর্মচারী রয়েছেন। গ্রেপ্তার অন্য দুজনের মধ্যে একজন চাকরিপ্রার্থী।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—

  • পরিবেশ অধিদপ্তরের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মো. রুবেল ইসলাম (৩৩)।
  • চাকরিপ্রার্থী মো. মফিজুল ইসলাম (২৩)।
  • মো. হাসিনুর রহমান সুজন (৩২)।
  • এনবিআরে কর্মরত কম্পিউটার অপারেটর এস এম ইমদাদুল ইসলাম (৩৫)।
  • প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক আসাদুল ইসলাম (৩৩)।
  • এনবিআরের অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদ (৩০)।
  • এনবিআরে কর্মরত কম্পিউটার অপারেটর জাহাঙ্গীর (৩৮)।

যেভাবে গ্রেপ্তার করা হয়

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গত ১৪ অক্টোবর মতিঝিল এলাকা থেকে রুবেল ইসলাম, মফিজুল ইসলাম ও হাসিনুর রহমান সুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে উত্তরখান এলাকা থেকে এস এম ইমদাদুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। এসআরবি-৪-এর সহায়তায় মিরপুর-১০ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় আসাদুল ইসলামকে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মোবাইল ফোনের কথোপকথন ও চ্যাট পর্যালোচনা করে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ১৫ অক্টোবর সাভার এলাকা থেকে নূর মোহাম্মদকে গ্রেপ্তার করে এসআরবি-৪। পরে তাঁর কাছ থেকে পাওয়া তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে ১৬ অক্টোবর মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে জাহাঙ্গীরকে গ্রেপ্তার করা হয়।

ভোরে প্রশ্নপত্রের ছবি, পরে তৈরি হয় উত্তর

তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মোবাইল ফোনের চ্যাট পর্যালোচনায় প্রশ্নপত্র ছড়িয়ে দেওয়ার একটি ধারাবাহিকতা পাওয়া গেছে। লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন জানান, ১০ অক্টোবর ভোর ৪টা ৪৩ মিনিটে নূর মোহাম্মদ একটি সূত্রের মাধ্যমে প্রশ্নপত্রের অস্পষ্ট ছবি পান। পরে সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে জাহাঙ্গীর তাঁকে প্রশ্নপত্রের একটি স্পষ্ট ছবি পাঠান। এরপর নূর মোহাম্মদ প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রস্তুত করে জাহাঙ্গীর ও ইমদাদুলকে পাঠান। পরে চক্রের সদস্য এবং তাঁদের সঙ্গে যুক্ত পরীক্ষার্থীদের কাছে প্রশ্নপত্র ও উত্তর পৌঁছে দেওয়া হয় বলে তদন্তে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে জানান তিনি।  কাজে আসাদুল, রুবেল, মফিজুল ও সুজন যুক্ত ছিলেন বলেও সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়। তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, চক্রটি হোয়াটসঅ্যাপে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করত। তবে প্রশ্নপত্র প্রথম কোথা থেকে এসেছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

প্রশ্নপত্রের মূল উৎস নিয়ে ধোঁয়াশা

প্রশ্নপত্রের মূল উৎস সম্পর্কে জানতে চাইলে এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক বলেন, নূর মোহাম্মদকে সকালে যে প্রশ্নপত্র দেওয়া হয়েছিল, সেটি কে দিয়েছিল, তা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও তিনি সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি বলে জানান তিনি। লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন বলেন, নূর মোহাম্মদ ও জাহাঙ্গীর দাবি করেছেন, তাঁরা ফেসবুকের মাধ্যমে প্রশ্নপত্র পেয়েছেন। তবে তাঁদের দেওয়া তথ্য এখনো নির্ভরযোগ্য বলে মনে করছে না তদন্ত দল। তাঁরা যেসব ফেসবুক গ্রুপ ও আইডির কথা বলেছেন, সেগুলো যাচাই করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের মূল উৎস শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। এ ঘটনায় অন্য কেউ জড়িত থাকলে তাঁদেরও শনাক্ত করার জন্য অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কেউ জড়িত কি না

প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক বলেন, এখন পর্যন্ত ওই অধিদপ্তরের কারও সম্পৃক্ততার সরাসরি তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে অন্যান্য সরকারি দপ্তরের কর্মচারীদের এ ঘটনায় জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি। তদন্ত এগোলে এ বিষয়ে আরও তথ্য সামনে আসতে পারে বলেও উল্লেখ করেন।

উদ্ধার হয়েছে স্ট্যাম্প, চেক ও বিভিন্ন সনদপত্র

গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে বিপুলসংখ্যক নথি ও অন্যান্য আলামত জব্দ করেছে এসআরবি। উদ্ধার করা সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে—

  • ১০০ টাকার ১১৬টি স্ট্যাম্প এবং ৫০ টাকার চারটি স্ট্যাম্প।
  • প্রশ্নপত্রের এক সেট।
  • বিভিন্ন পরীক্ষার প্রবেশপত্রের ১৯ পাতা।
  • ১০টি সনদপত্র এবং বিভিন্ন ক্যাটাগরির আরও ১৫টি সনদপত্র।
  • বিভিন্ন ব্যাংকের চেকের ৪৮ পাতা এবং একটি ব্যাংক চেক।
  • আটটি মোবাইল ফোন।
  • ছয়টি জাতীয় পরিচয়পত্র।
  • নগদ চার হাজার টাকা।

এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক জানান, উদ্ধার হওয়া এসব আলামত তদন্তে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের পাশাপাশি অর্থ লেনদেন ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্মকাণ্ডের বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে ,সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, মফিজুল ইসলাম চক্রের একজন সদস্যের কাছে প্রতারিত হওয়ার পর বেশি অর্থ উপার্জনের আশায় ওই চক্রের সঙ্গে যুক্ত হন বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ভর্তি-বাণিজ্যসংক্রান্ত অর্থ লেনদেনের তথ্যও তদন্তে উঠে এসেছে। চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগের বিষয়টিও তদন্তের আওতায় রয়েছে। তবে অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ সত্যতা এবং চক্রের কার্যক্রমের ব্যাপ্তি তদন্ত শেষে স্পষ্ট হবে।

 

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

‘হাসিনার দেখানো পথেই হাঁটছে বর্তমান সরকার’—শফিকুর রহমান

গাজীপুর সংবাদদাতা
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:১৫ অপরাহ্ণ
‘হাসিনার দেখানো পথেই হাঁটছে বর্তমান সরকার’—শফিকুর রহমান

দেশে মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি এবং দুর্নীতি, অনিয়ম ও অন্যায় বেড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি দাবি করেছেন, বর্তমান সরকার সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের দেখানো পথেই হাঁটছে। এভাবে চলতে থাকলে বর্তমান সরকারের পরিণতিও হাসিনার সরকারের মতো হবে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।

শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) সকালে গাজীপুর মহানগরী জামায়াতের উদ্যোগে টঙ্গীর শহীদ আব্দুল মালেক মিলনায়তনে আয়োজিত রুকন সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে এসব কথা বলেন শফিকুর রহমান। বক্তব্যে শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার গণভোটকে অস্বীকার করছে এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করছে না। তাঁর ভাষ্য, এভাবে চলতে থাকলে সরকারের গন্তব্যও শেখ হাসিনার সরকারের মতো হবে।

তিনি বলেন, দেশের মানুষের মৌলিক অধিকার এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সমাজে দুর্নীতি, অনিয়ম ও অন্যায় বেড়েছে। গত নির্বাচনের আগে একটি দল নির্বাচনের মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধান হবে বলে প্রচার করেছিল। কিন্তু তাঁর দাবি, বর্তমানে সমস্যাগুলো সমাধান হওয়ার পরিবর্তে দ্বিগুণ বেড়েছে। জামায়াত আমিরের অভিযোগ, বর্তমান সরকার আগের সরকারের পথ অনুসরণ করছে। গণতান্ত্রিক প্রত্যাশা পূরণ এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রসঙ্গ তুলে শফিকুর রহমান বলেন, সে সময় জামায়াতে ইসলামী ও তরুণ সমাজের প্রত্যাশা ছিল শোষণমুক্ত ও ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা। এমন একটি দেশ গড়ে তোলার প্রত্যাশা ছিল, যেখানে কোনো বৈষম্য থাকবে না। তবে তাঁর অভিযোগ, বর্তমান সরকারের সময়ে বৈষম্যের নতুন মাত্রা যুক্ত হচ্ছে। শিক্ষাঙ্গনে আগের সরকারের মতো দলীয়করণ, লুটতরাজ এবং উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে ভাগ বসানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি। শফিকুর রহমানের বক্তব্য, রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে মানুষের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা পূরণ করতে হলে বৈষম্য দূর করা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখা জরুরি।

দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সমালোচনা করতে গিয়ে জামায়াত আমির বলেন, তাঁর কাছে মনে হচ্ছে, এক লুটেরার হাত থেকে আরেক লুটেরার হাতে ক্ষমতা ন্যস্ত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, মুসলিম বিশ্বেও ঐক্যের অভাব রয়েছে। তাঁর মতে, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন মুসলিম দেশে রাসুল (সা.)-এর আদর্শ উপেক্ষা করার কারণে মুসলিম বিশ্ব ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শফিকুর রহমান দাবি করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে জনগণের একটি অংশ জামায়াতে ইসলামীকে নিরাপত্তার স্থল হিসেবে মনে করে। তবে এ বিষয়ে তিনি কোনো জরিপ বা পরিসংখ্যান উল্লেখ করেননি।

গাজীপুর মহানগর জামায়াতের আমির অধ্যাপক জামাল উদ্দিনের সভাপতিত্বে সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য আব্দুর রউফ, নির্বাহী সদস্য মাওলানা শাহজাহান, মাওলানা দেলোয়ার হোসেন, উত্তরাঞ্চলের দায়িত্বশীল খলিলুর রহমান মাদানি, সাবেক জেলা আমির আবুল হাশেম খান এবং জেলা আমির জাহাঙ্গীর আলম। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন গাজীপুর মহানগর মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি আমেনা বেগম, নায়েবে আমির খায়রুল হাসান, মহানগর সেক্রেটারি আ স ম ফারুক, সহকারী সেক্রেটারি আফজাল হোসেনসহ বিভাগীয় নেতারা। মহানগর কর্মপরিষদ, বিভিন্ন থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতারাও সম্মেলনে অংশ নেন।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি