ইউরোপে রাশিয়ার ‘বেপরোয়া’ তৎপরতা নিয়ে ন্যাটো-ইইউর সতর্কবার্তা
ইউরোপের মাটিতে রাশিয়ার কথিত নাশকতামূলক তৎপরতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। জার্মানির লেইপজিগ বিমানবন্দরে ড্রোন হামলার ঘটনায় রাশিয়াকে দায়ী করার পর ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটে এবং ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লায়েন মস্কোর বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
ফন ডার লায়েন বলেন, লেইপজিগের ঘটনা ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভূখণ্ডে রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট একটি নতুন মাত্রার উত্তেজনা তৈরি করেছে। তিনি বলেন, রাশিয়ার এই ধরনের ‘বেপরোয়া’ কর্মকাণ্ড মেনে নেওয়া হবে না এবং ইউরোপকে আরও দ্রুত ও কার্যকরভাবে জবাব দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে হবে।
ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটে বলেন, জার্মানির পাশে ন্যাটো ‘পূর্ণ সংহতি’ নিয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁর মতে, ইউরোপের পূর্বাঞ্চলে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের ঝুঁকি বাড়ার পাশাপাশি ন্যাটো দেশগুলোর ভূখণ্ডে আগুন লাগানো, নাশকতা এবং অন্যান্য ‘হাইব্রিড’ কর্মকাণ্ডও বৃদ্ধি পেয়েছে।
গত ৪ আগস্ট লেইপজিগ/হালে বিমানবন্দরে একটি বিস্ফোরকবোঝাই ড্রোন দিয়ে ইউক্রেনীয় একটি কার্গো বিমানকে লক্ষ্যবস্তু করার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে জার্মানি অভিযোগ করেছে। বিমানবন্দরে একটি ড্রোন রোবটের মাধ্যমে নিষ্ক্রিয় করা হয়। আরেকটি ড্রোন অন্য একটি কার্গো বিমানের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ঘটনার প্রায় ১০ দিন পর বিমানবন্দরে তৃতীয় একটি ড্রোনও পাওয়া যায়। বিমানবন্দরটি ন্যাটোর গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিবহনকেন্দ্র এবং নিয়মিত ইউক্রেনীয় আন্তোনভ পরিবহন বিমান এখানে চলাচল করে।
জার্মান সরকার মঙ্গলবার জানায়, পুলিশি তদন্ত ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তারা নিশ্চিত হয়েছে যে হামলার পেছনে রাশিয়া রয়েছে। জার্মান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দাবি, ড্রোনটির নকশা, যন্ত্রাংশ, বিস্ফোরক ও ডেটোনেটর—সবকিছুর সঙ্গে রাশিয়ার আগের কয়েকটি ‘হাইব্রিড অপারেশনের’ মিল পাওয়া গেছে।
এ ঘটনায় দুই সন্দেহভাজনকে শনাক্ত করা হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। তাদের একজন বেলারুশের নাগরিক, যার রুশ পাসপোর্ট রয়েছে এবং পর্যটক ভিসায় জার্মানিতে প্রবেশ করেছিলেন। অন্যজনের লাটভিয়া ও রাশিয়ার পাসপোর্ট রয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে রাশিয়া জার্মানির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে এবং বলেছে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ দেওয়া হয়নি।
লেইপজিগের ঘটনার জেরে জার্মানি রাশিয়ার বন শহরের কনস্যুলেট এবং বার্লিনের ‘রুশ হাউস’ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে। জার্মানিতে রুশ হাউসকে দীর্ঘদিন ধরে ক্রেমলিনের প্রচারকেন্দ্র হিসেবে সন্দেহ করা হয়।
এর পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ মস্কো, সেন্ট পিটার্সবার্গ ও ইয়েকাতেরিনবার্গে অবস্থিত জার্মানির গ্যেটে ইনস্টিটিউটের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলো বন্ধের ঘোষণা দিয়েছেন।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন জার্মানির পদক্ষেপকে ‘গুরুতর ভুল’ বলে মন্তব্য করেছেন। রুশ উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলেক্সান্ডার গ্রুশকো কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি। তবে তিনি বলেন, আপাতত মস্কো কূটনীতিকে সুযোগ দিতে চায়।
লেইপজিগের ঘটনার পাশাপাশি জার্মানিতে গত ২৪ ঘণ্টায় বিদ্যুৎ অবকাঠামোতে সন্দেহজনক নাশকতার একাধিক ঘটনা ঘটেছে। পশ্চিমাঞ্চলের বার্গহাইম ও পূর্বাঞ্চলে দুটি বিদ্যুৎ সাবস্টেশনে হামলার তদন্ত করছে পুলিশ।
বার্গহাইমে হামলার ঘটনায় উত্তর রাইন-ভেস্টফালিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হারবার্ট রেউল বলেছেন, এটি ইচ্ছাকৃত নাশকতা ছিল। তদন্তকারীরা বিদেশি রাষ্ট্রের নির্দেশিত নাশকতা এবং বামপন্থী চরমপন্থা—দুটি সম্ভাবনাই খতিয়ে দেখছেন।
পাশের দেশ পোল্যান্ডেও সামরিক ড্রোন উৎপাদনকারী একটি কারখানায় আগুনকে ইচ্ছাকৃত অগ্নিসংযোগ ও নাশকতা বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক।
ইইউর পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কাজা কালাস জানিয়েছেন, বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোরভাবে কার্যকর করার উপায় নিয়ে আলোচনা চলছে। রাশিয়ার পর্যটক ও সাবেক যোদ্ধাদের ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও কঠোর বিধিনিষেধের পক্ষেও কয়েকটি দেশ সমর্থন দিচ্ছে।
ফ্রান্সসহ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ রাশিয়ার তথাকথিত ‘শ্যাডো ফ্লিট’-এর বিরুদ্ধেও নতুন ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে রুশ তেল ও অন্যান্য পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত এসব জাহাজ ইউরোপের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।
এদিকে সুইডেন, নেদারল্যান্ডস, পোল্যান্ড ও স্পেনসহ কয়েকটি দেশ ইউক্রেনকে সহায়তার জন্য ১৯৩ বিলিয়ন ইউরোর বেশি জব্দ করা রুশ সম্পদ ব্যবহারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তবে এসব সম্পদ যে দেশে রাখা হয়েছে, সেই বেলজিয়াম এখনো আইনি দায়বদ্ধতার আশঙ্কায় এতে সম্মতি দেয়নি।
ইইউ ইতোমধ্যে ইউক্রেনকে ৯০ বিলিয়ন ইউরোর ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফন ডার লায়েন জানান, ইউক্রেন প্যাট্রিয়ট PAC-3 আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র কেনার জন্য অতিরিক্ত অর্থ সহায়তা চেয়েছে।
তিনি বলেন, ইউরোপ ও ইউক্রেন যৌথভাবে ‘ফ্রেইয়া’ নামে একটি অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা প্রকল্প নিয়েও কাজ করছে।
ফন ডার লায়েনের ভাষায়, ইউরোপ রাশিয়ার ওপর চাপ শুধু বজায় রাখবে না, বরং আরও বাড়াবে-যতক্ষণ না মস্কো ইউক্রেনে বোমাবর্ষণ ও বেসামরিক মানুষ হত্যা বন্ধ করে।
সূত্র:বিবিসি
কালের আলো/এসএ

আপনার মতামত লিখুন
Array