খুঁজুন
                               
, ,
           

জুলাইয়ের ঐক্যে ছয় মাসেই ফাটল

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:৪৯ অপরাহ্ণ
জুলাইয়ের ঐক্যে ছয় মাসেই ফাটল

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজনৈতিক মতপার্থক্য ভুলে একটি অভিন্ন লক্ষ্যে এক হয়েছিল বিভিন্ন দল। রাজপথের সেই ঐক্যই শেষ পর্যন্ত স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনকে শক্তি দিয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতার পালাবদলের মাত্র ছয় মাসের মাথায় সেই রাজনৈতিক সমীকরণে এসেছে বড় পরিবর্তন। একসময়ের আন্দোলনের সহযোদ্ধারা এখন ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থানে। ত্রয়োদশ ভোটে দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপি এখন সরকারে।

  • একসময় একই আন্দোলনের সহযোদ্ধা এখন একজন সরকারে অন্যজন বিরোধী শিবিরে
  • ছয় মাসেই রাজপথের কর্মসূচি—এই বিভাজন কি জুলাইয়ের শক্তিকেই দুর্বল করছে?

একসময় তাদের রাজনৈতিক মিত্র জামায়াতে ইসলামী এখন সংসদের প্রধান বিরোধী দল। আর বিরোধী দলের নেতৃত্বে থাকা ১১ দলীয় জোট ইতোমধ্যে সংসদের বাইরে ধারাবাহিক কর্মসূচিতে নেমেছে। শনিবার ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে লংমার্চও হয়েছে। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট, দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে তাদের দাবি। এখন প্রশ্ন উঠছে, নতুন সরকারের ছয় মাসের মধ্যেই রাজপথের বড় কর্মসূচিতে যাওয়া কতটা যৌক্তিক?

জনস্বার্থে চাপ তৈরির গুরুত্বপূর্ণ জায়গা সংসদ
বিরোধী দলের আন্দোলনের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন নেই। গণতন্ত্রে সরকারকে প্রশ্ন করা, সমালোচনা করা এবং জনস্বার্থে চাপ তৈরি করা বিরোধী দলের অন্যতম দায়িত্ব। কিন্তু সেই চাপের প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা সংসদ। বর্তমান সংসদে বিরোধী দলের প্রশ্ন তোলা, প্রস্তাব দেওয়া, বিতর্ক করা এবং সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ছয় মাসের মাথায় দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা বা প্রশাসনিক নানা সমস্যার সমাধানে সরকারকে কিছুটা সময় দেওয়া যেত—এমন মতও রয়েছে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে। তবে এর অর্থ এই নয় যে বিরোধী দলকে নীরব থাকতে হবে। বরং সংসদের ভেতরে ধারাবাহিক চাপ তৈরি করে, নির্দিষ্ট সময়সীমা দিয়ে এবং সরকারের অগ্রগতি মূল্যায়ন করে প্রয়োজনে রাজপথে যাওয়ার পথ খোলা রাখা যেত। এতে একদিকে বিরোধী দলের সাংবিধানিক ভূমিকা আরও দৃশ্যমান হতো, অন্যদিকে সরকারেরও কাজ করার সুযোগ বাড়ত।

সব সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান বাস্তবসম্মত নয়
বিরোধী দলের ছয় দফার মধ্যে জুলাই গণহত্যার বিচার কিংবা গণভোটের রায় বাস্তবায়ন অন্যতম। অন্যদিকে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট, আইনশৃঙ্খলা বা দুর্নীতি—এসব দীর্ঘদিনের সমস্যা। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই এসব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি প্রত্যাশিত হলেও সব সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান বাস্তবসম্মত নয়। তাই রাজনৈতিকভাবে সব দাবিকে একই মাত্রার চাপের মধ্যে নিয়ে আসার বদলে কোন বিষয়ে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ প্রয়োজন আর কোন বিষয়ে সময় দেওয়া যায়—এই পার্থক্যটিও গুরুত্বপূর্ণ। অবশ্যই এসব বিষয় ভেবে দেখা উচিত।

বিএনপি-জামায়াতের সম্পর্কের নতুন বাস্তবতা
বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করেছে বিএনপি ও জামায়াতের সম্পর্কের পরিবর্তন। একসময় দুই দল ছিল রাজনৈতিক মিত্র। এখন বিএনপি সরকারে, জামায়াত বিরোধী শিবিরের নেতৃত্বে। ফলে পুরোনো মিত্রতার জায়গায় এসেছে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা। যদিও বিএনপি একটি বড় রাজনৈতিক শক্তি। জনগণের ম্যান্ডেট পেয়ে জনকল্যাণেই নিজেকে নিবেদিত রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি সমস্যাসমূহ সমাধানে চেষ্টা করছেন। এদিকে, লংমার্চে বিরোধী দলের নেতাদের কঠোর বক্তব্যের পাল্টা জবাবও এসেছে সরকারি দলের নেতাদের কাছ থেকে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও সতর্ক করে বলেছেন, চলমান সংকটকে পুঁজি করে কেউ বিভ্রান্তি ছড়িয়ে অরাজকতা সৃষ্টি করতে চাইলে তা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা আইনে রয়েছে। অন্যদিকে, জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানও সরকারের সমালোচনায় কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। এমন বাস্তবতায় দু’পক্ষের মধ্যে সংলাপের প্রয়োজনীয়তা দেখছেন বিশ্লেষকরা।

জুলাইয়ের ঐক্য ফাটলে লাভ ক্ষতি
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল বহুমতের ঐক্য। ভিন্ন রাজনৈতিক আদর্শের দলগুলো একটি অভিন্ন লক্ষ্য সামনে রেখে একসঙ্গে দাঁড়িয়েছিল। সেই ঐক্যের কারণেই আন্দোলন একটি ব্যাপক গণআন্দোলনে পরিণত হয়েছিল। এখন সেই শক্তিগুলোই যদি ক্ষমতার পালাবদলের পর দ্রুত পরস্পরের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হয়, তাহলে জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষাগুলো বাস্তবায়নের পথ কঠিন হতে পারে। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারের মতে, সরকার ও বিরোধী দল একসময় একই রাজনৈতিক সংগ্রামের অংশীদার ছিল। তাই তাঁদের কাছ থেকে মানুষের প্রত্যাশা ছিল জাতীয় সমস্যাগুলো সমাধানে সহযোগিতার। বিরোধী দলের দায়িত্ব সরকারের ত্রুটি তুলে ধরা, তবে একই সঙ্গে গঠনমূলক প্রস্তাবও দিতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান মনে করেন, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্র হওয়া উচিত জনস্বার্থ। তাঁর মতে, ক্ষমতার পরিবর্তন বা রাজনৈতিক বিরোধ—সবকিছুর সমাধান গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যেই হওয়া প্রয়োজন। দুই বিশ্লেষকের বক্তব্যের মধ্যে একটি অভিন্ন বার্তা আছে—সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে রাখা যেমন জরুরি, বিরোধী দলের আন্দোলনকেও দায়িত্বশীল ও জনস্বার্থকেন্দ্রিক রাখা তেমনই জরুরি।

পারস্পরিক অবিশ্বাসে ক্ষতি হবে রাষ্ট্রের
সরকার ও বিরোধী দল যে আলাদা অবস্থানে থাকবে, সেটিই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক নিয়ম। মতপার্থক্য থাকবে, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাও থাকবে। কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা যদি এমন পর্যায়ে যায়, যেখানে পারস্পরিক অবিশ্বাসই রাজনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে, তাহলে ক্ষতি হবে রাষ্ট্রের। বিশেষ করে জুলাইয়ের আন্দোলনের শক্তিগুলোর মধ্যে অনৈক্য যত বাড়বে, ততই সেই আন্দোলনের অভিন্ন লক্ষ্যগুলো আড়ালে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে। সরকার বিরোধী দলের প্রশ্ন ও সমালোচনাকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে নিয়েছে। এখন বিরোধী দলের জন্যও জরুরি হবে সংসদকে কার্যকর রাজনৈতিক মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করা এবং প্রয়োজন হলে ধাপে ধাপে রাজপথে যাওয়া। কারণ সরকার ও বিরোধী দল দুটিই গণতন্ত্রের অংশ। একজনের দুর্বলতায় অন্যজন শক্তিশালী হয় না; বরং দুর্বল হয় পুরো ব্যবস্থাই। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান যে রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে এক করেছিল, ছয় মাস পর তাদের সামনে এখন নতুন পরীক্ষা—তারা কি ক্ষমতার প্রতিযোগিতার মধ্যেও জুলাইয়ের অভিন্ন আকাঙ্ক্ষাকে অক্ষুণ্ন রাখতে পারবে? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু বিএনপি বা জামায়াতের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নির্ধারণ করবে না; নির্ধারণ করবে গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতির চরিত্রও।

কালের আলো/এম/এএইচ

অবরোধের জেরে সাজেক বন্ধ, পর্যটকদের জন্য সময় বেঁধে দিল প্রশাসন

রাঙামাটি সংবাদদাতা,কালের আলো
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬, ২:০৩ পূর্বাহ্ণ
অবরোধের জেরে সাজেক বন্ধ, পর্যটকদের জন্য সময় বেঁধে দিল প্রশাসন

রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র সাজেক ভ্যালি সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে প্রশাসন। বুধবার (২১ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৭টা থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত পর্যটনকেন্দ্রটি বন্ধ থাকবে। একই সঙ্গে সাজেকে অবস্থানরত পর্যটকদের বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) বিকেল ৪টার মধ্যে এলাকা ছেড়ে নিরাপদে নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বুধবার সন্ধ্যায় রাঙামাটির  জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী স্বাক্ষরিত এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।

পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ সাজেক
জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বুধবার সন্ধ্যা ৭টা থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার অন্তর্গত সাজেক ভ্যালি পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ থাকবে। বর্তমানে পর্যটন এলাকায় অবস্থানরত সবাইকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সাজেক ত্যাগ করে নিরাপদে গন্তব্যে ফিরে যেতে বলা হয়েছে। প্রশাসনের এই নির্দেশের ফলে সাজেকে ভ্রমণের পরিকল্পনা করা পর্যটকদের আপাতত সেখানে যাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। পর্যটনকেন্দ্রটি পুনরায় চালুর বিষয়ে পরবর্তী নির্দেশনার অপেক্ষায় থাকতে হবে।

সাজেক সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ঘোষণা
এদিকে বুধবার বিকেলে সাজেক সড়কে আবারও অনির্দিষ্টকালের অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করে সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন ও সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি। সংগঠন দুটি বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) থেকে এই কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেয়। সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নতুন জয় চাকমা এবং সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক বাবুধন চাকমা স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ কর্মসূচির কথা জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বুধবারের মধ্যেই পর্যটকদের সাজেক ছেড়ে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছিল।

জরুরি যানবাহন অবরোধের আওতামুক্ত
সংগঠন দুটির বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত অবরোধ চলবে। তবে অবরোধের সময় জরুরি ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুলেন্স, লাশবাহী গাড়ি, জরুরি ওষুধ সরবরাহকারী যানবাহন এবং সংবাদপত্র বহনকারী যান চলাচলের ক্ষেত্রে ছাড় থাকবে। সংবাদ সংগ্রহের কাজে ব্যবহৃত সাংবাদিকদের গাড়িও অবরোধের আওতামুক্ত থাকবে। সাজেক সড়কে নতুন করে অবরোধের ঘোষণার পরই পর্যটনকেন্দ্রটি বন্ধের সিদ্ধান্ত জানাল প্রশাসন। ফলে সাজেকে অবস্থানরত পর্যটকদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এলাকা ছাড়তে বলা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত পর্যটনকেন্দ্রটি বন্ধ থাকবে।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

ভোটার তালিকায় মৃত ঘোষণা, অথচ প্রতিবছর ভোট দিচ্ছেন তিনি!

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৫২ পূর্বাহ্ণ
ভোটার তালিকায় মৃত ঘোষণা, অথচ প্রতিবছর ভোট দিচ্ছেন তিনি!

ভারতের ভোটার তালিকায় মৃত হিসেবে নাম উঠেছে ৫৩ বছর বয়সী কামতা প্রসাদের। অথচ তিনি বেঁচে আছেন, নিয়মিত কাজ করছেন এবং বছরের পর বছর ভোটও দিয়েছেন। জীবিত থাকা সত্ত্বেও সরকারি নথিতে মৃত হিসেবে চিহ্নিত হওয়ায় এবার নিজের অস্তিত্ব ও ভোটাধিকার প্রমাণ করতে সরকারি দপ্তরে দপ্তরে ঘুরতে হচ্ছে দিল্লির এই দর্জিকে।

ভারতের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর কার্যক্রম ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কের মধ্যে কামতা প্রসাদের ঘটনাটি নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে ভোটার তালিকা হালনাগাদের প্রক্রিয়া নিয়ে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে তার এই ভোগান্তির কথা উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের ভোটার তালিকা সংশোধনের উদ্যোগে প্রায় ১৩ কোটি মানুষের নাম বাদ পড়েছে। এর মধ্যে দিল্লিতেই বাদ পড়েছেন প্রায় ৪২ লাখ ভোটার।

নাম ও পরিচয়ে ভুল, তালিকায় মৃত কামতা
কামতা প্রসাদের নাম ভোটার তালিকায় ‘কান্তা প্রসাদ’ হিসেবে লেখা হয়েছে। নতুন তালিকায় তাকে মৃত দেখানো হয়েছে। ফলে দীর্ঘদিনের ভোটার হওয়া সত্ত্বেও নিজের পরিচয় সংশোধন এবং ভোট দেওয়ার অধিকার ফিরে পেতে তাকে প্রশাসনিক জটিলতার মুখে পড়তে হচ্ছে। একজন জীবিত নাগরিককে সরকারি নথিতে মৃত হিসেবে চিহ্নিত করার ঘটনা ভোটার তালিকা সংশোধনের নির্ভুলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। নামের ভুল, তথ্য যাচাইয়ের সীমাবদ্ধতা কিংবা প্রশাসনিক ত্রুটির কারণে কোনো ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়লে তাকে নিজের পরিচয় প্রমাণের জন্য দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হতে পারে।

১৩ কোটি মানুষের নাম বাদ পড়া নিয়ে বিতর্ক
ভারতে নির্বাচন কমিশনের বিশেষ নিবিড় সংশোধন কার্যক্রম ঘিরে দেশজুড়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এই প্রক্রিয়ায় প্রায় ১৩ কোটি মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। দিল্লিতেও বাদ পড়েছেন প্রায় ৪২ লাখ ভোটার। বিরোধী দল ও আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম বাদ পড়ায় প্রকৃত ভোটারদের ভোটাধিকার ঝুঁকির মুখে পড়েছে। তাদের দাবি, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ক্ষমতাসীন বিজেপি নির্বাচনে সুবিধা পেতে পারে। তবে নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে নিম্ন আয়ের মানুষ
ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ায় নিম্ন আয়ের মানুষের দুর্ভোগ বিশেষভাবে সামনে এসেছে। প্রয়োজনীয় নথিপত্রের অভাব, ঠিকানা যাচাই এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে অনেকের পক্ষে নিজেদের ভোটার পরিচয় পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ভোটাধিকার হারানোর আশঙ্কার পাশাপাশি সরকারি রেশন ও অন্যান্য জনকল্যাণমূলক সুবিধা পাওয়া নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যাদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহের সামর্থ্য সীমিত, তাদের জন্য সরকারি দপ্তরে বারবার যাতায়াত করা বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

নাম ফেরানোর সুযোগ থাকলেও দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ভোগান্তি
বিতর্কের মধ্যে বাদ পড়া ভোটারদের তথ্য পুনরায় যাচাইয়ের উদ্যোগ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। যাদের নাম তালিকা থেকে বাদ গেছে, তারা আবেদন করে নাম পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ পাচ্ছেন। তবে আবেদন, নথিপত্র সংগ্রহ এবং পরিচয় যাচাইয়ের দীর্ঘ প্রক্রিয়া অনেকের জন্য ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কামতা প্রসাদের ঘটনাও সেই বাস্তবতাকে সামনে এনেছে। জীবিত একজন নাগরিককে নিজের অস্তিত্বের প্রমাণ দিতে হচ্ছে, অথচ তার ভোট দেওয়ার অধিকার নিশ্চিত হওয়ার কথা ছিল নির্ভুল সরকারি নথির মাধ্যমেই।

ভোটার তালিকার নির্ভুলতা নিয়ে বড় প্রশ্ন
কামতা প্রসাদের ঘটনা কেবল একজন ব্যক্তির নাম ভুলভাবে নথিভুক্ত হওয়ার বিষয় নয়। এটি ভোটার তালিকা সংশোধনের স্বচ্ছতা, নির্ভুলতা এবং সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার সুরক্ষার প্রশ্ন সামনে এনেছে।নির্বাচন পরিচালনার জন্য ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেই প্রক্রিয়ায় প্রকৃত ভোটারদের নাম ভুলবশত বাদ পড়লে তার দায় ও ভোগান্তি শেষ পর্যন্ত সাধারণ নাগরিককেই বহন করতে হয়। তাই তালিকা সংশোধনের পাশাপাশি বাদ পড়া ভোটারদের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি এবং তাদের অধিকার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কামতা প্রসাদের মতো কেউ যেন জীবিত থেকেও সরকারি নথিতে মৃত হয়ে না থাকেন, তা নিশ্চিত করতে ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় নির্ভুলতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা আবারও সামনে এসেছে।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স ও দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

লাল সিঁদুরে রাঙা মুখ, বিদায়ের অশ্রু

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশিত: বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬, ৯:২৭ অপরাহ্ণ
লাল সিঁদুরে রাঙা মুখ, বিদায়ের অশ্রু

ঢাকের বোল, শঙ্খের ধ্বনি আর উলুধ্বনিতে চারপাশ মুখর। কারও মুখ সিঁদুরে রাঙা, কারও চোখে বিদায়ের অশ্রু। আনন্দ আর বিষাদের এমন মায়াবী মেলবন্ধনের মধ্য দিয়েই বিদায় নিলেন দেবী দুর্গা। পাঁচ দিনের পূজা-অর্চনা, উৎসব আর মিলনমেলার পর প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হলো সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসব।

দেবীকে শেষবারের মতো প্রণাম জানাতে রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরসহ বিভিন্ন পূজামণ্ডপে ভিড় করেন ভক্তরা। দশমীর আনুষ্ঠানিকতা, দেবীবরণ ও সিঁদুর খেলা ঘিরে মণ্ডপগুলোতে ছিল উৎসবের আমেজ। তবে বিদায়ের মুহূর্ত ঘনিয়ে আসতেই আনন্দের আড়ালে অনুভূত হয় বিচ্ছেদের বেদনা।

  • ঢাকেশ্বরী মন্দির থেকে বুড়িগঙ্গার ঘাট—দেবীবরণ
  • সিঁদুর খেলা ও প্রতিমা বিসর্জনে শেষ শারদীয় দুর্গোৎসব
  • দেবী দুর্গাকে বিদায় জানিয়ে আগামী বছরের অপেক্ষায় ভক্তরা

বুধবার (২১ অক্টোবর) সকালে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে বিশেষ পূজা ও অঞ্জলি নিবেদনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় বিজয়া দশমীর আনুষ্ঠানিকতা। ভক্তরা ধূপ, দীপ, বেলপাতা ও নানা পূজাসামগ্রী দিয়ে দেবীর চরণে শেষ অর্ঘ্য নিবেদন করেন। প্রার্থনায় উঠে আসে পরিবার-পরিজনের মঙ্গল, সুস্বাস্থ্য, দেশ ও জাতির শান্তি এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রত্যাশা।

সিঁদুরে রাঙা উৎসব, চোখে বিদায়ের জল
পূজার আনুষ্ঠানিকতা শেষে শাস্ত্রীয় রীতি অনুযায়ী সম্পন্ন হয় দর্পণ বিসর্জন ও ঘট বিসর্জন। এরপর শুরু হয় দেবীবরণ ও ঐতিহ্যবাহী সিঁদুর খেলা। বিবাহিত নারীরা দেবী দুর্গার কপাল ও চরণে সিঁদুর ছুঁইয়ে প্রণাম করেন। পান ও মিষ্টি নিবেদনের মধ্য দিয়ে জানান বিদায়ী শ্রদ্ধা।

পরে একে অপরের কপাল ও মুখে সিঁদুর মাখিয়ে আনন্দ ভাগ করে নেন তাঁরা। কারও মুখে হাসি, কারও চোখে জল—লাল সিঁদুরে রাঙা মন্দির প্রাঙ্গণ হয়ে ওঠে আবেগের এক অনন্য দৃশ্যপট। উৎসবের শেষ দিনের এই আচার ঘিরে নারীদের মধ্যে দেখা যায় আন্তরিকতা, শুভকামনা ও পারস্পরিক সম্প্রীতির প্রকাশ। ঢাকা মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি তাপস কুমার পাল জানান, দশমীর পূজা ও অঞ্জলি শেষে নিয়ম অনুযায়ী দর্পণ বিসর্জনের মাধ্যমে শাস্ত্রীয় পূজার সমাপ্তি হয়। এরপর ঢাকেশ্বরী মন্দিরের পুকুরে ঘট বিসর্জন দেওয়া হয় এবং সবশেষে অনুষ্ঠিত হয় সিঁদুর খেলা।

তিনি বলেন, ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, সপ্তমীতে চক্ষুদানের মধ্য দিয়ে প্রতিমায় দেবীর উপস্থিতি আহ্বান করা হয়। আর দশমীতে দর্পণ বিসর্জনের মাধ্যমে পূজার আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি ঘটে। সিঁদুর খেলা বিজয়া দশমীর একটি ঐতিহ্যবাহী আচার, যার সঙ্গে স্বামীর দীর্ঘায়ু ও পরিবারের কল্যাণ কামনার বিশ্বাস জড়িয়ে আছে।

ঢাকের তালে শোভাযাত্রা, গন্তব্য ওয়াইজঘাট
মন্দিরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে রাজধানীর বিভিন্ন পূজামণ্ডপ থেকে প্রতিমা নিয়ে শুরু হয় বিজয়া শোভাযাত্রা। ঢাকের বাদ্য আর ভক্তদের জয়ধ্বনিতে মুখর শোভাযাত্রা বুড়িগঙ্গার ওয়াইজঘাটের দিকে এগিয়ে যায়।

মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির নেতৃত্বে শোভাযাত্রায় অংশ নেন অসংখ্য ভক্ত। নদীঘাটে পৌঁছে ধর্মীয় আচার মেনে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। জলে প্রতিমা বিলীন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয় এবারের দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিক আয়োজন। বিসর্জনের সময় অনেক ভক্তকে দেবীর উদ্দেশে প্রণাম জানাতে এবং আগামী বছর আবার ফিরে আসার প্রার্থনা করতে দেখা যায়। তাঁদের বিশ্বাস, দেবী দুর্গা কৈলাসে ফিরে গেলেও তাঁর আশীর্বাদ ও কল্যাণের প্রত্যাশা থেকে যায় মানুষের মনে।

রাজধানীতে ২৫৮ মণ্ডপে দুর্গোৎসব
সনাতন পঞ্জিকা ও উদযাপন পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, এ বছর রাজধানীতে ২৫৮টি মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়। প্রতিমা বিসর্জন নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে ঢাকার নির্ধারিত ১১টি ঘাটে ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। পাঁচ দিনের এই উৎসবকে ঘিরে রাজধানীর বিভিন্ন মণ্ডপে পূজা, অঞ্জলি, সাংস্কৃতিক আয়োজন ও দর্শনার্থীদের উপস্থিতিতে তৈরি হয়েছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে সেই ব্যস্ততা ও আনন্দের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটল।

বিদায়ের সুরে আগামী বছরের প্রতীক্ষা
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাসে, দুর্গাপূজা অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শুভ শক্তির বিজয়ের প্রতীক। দেবী দুর্গার আগমন মানুষের মনে জাগায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, কল্যাণ ও ন্যায়ের প্রত্যাশা। প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে মণ্ডপের আলো নিভলেও ভক্তদের মনে রয়ে যায় উৎসবের স্মৃতি। সিঁদুরের রং মুছে যাবে, ঢাকের আওয়াজ থেমে যাবে, কিন্তু দেবীকে ঘিরে প্রার্থনা ও বিশ্বাস থেকে যাবে অটুট। তাই বিজয়া দশমী শুধু বিদায়ের দিন নয়, এটি আবার ফিরে পাওয়ার আশারও দিন। বিষাদমাখা কণ্ঠে ভক্তদের প্রার্থনা—আগামী বছর আবার এসো মা, শান্তি, সম্প্রীতি ও কল্যাণের বার্তা নিয়ে।

কালের আলো/জেএন/এমকে