ঋণ শোধে রেকর্ড, অর্থনীতিতে আস্থার নতুন বার্তা
বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধে রেকর্ড গড়েছে নতুন সরকার। দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম পাঁচ মাসেই ২০৪ কোটি ৭৬ লাখ ডলার পরিশোধ শুধু বড় অঙ্কের অর্থ পরিশোধ নয়, বরং বৈদেশিক দায় ব্যবস্থাপনায় সরকারের সক্ষমতা ও অগ্রাধিকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ২৫ হাজার ১৬৩ কোটি টাকা। পাঁচ মাসের হিসাবে এটিই এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ঋণ পরিশোধ।
চাপের মধ্যেও দায় পরিশোধের ধারাবাহিকতা
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের একই সময়ে বিদেশি ঋণ পরিশোধ হয়েছিল ১৮৯ কোটি ৭১ লাখ ডলার। এবার পরিশোধ বেড়েছে ১৫ কোটি ৪ লাখ ডলার। অর্থাৎ বাড়তি বৈদেশিক দায়ের চাপের মধ্যেও সরকার নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করছে। মার্চ-জুলাই সময়ে পরিশোধ করা অর্থের মধ্যে আসল ১৩৫ কোটি ২৪ লাখ এবং সুদ ৬৯ কোটি ৫২ লাখ ডলার। গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ৪১ কোটি ডলার পরিশোধ করতে হয়েছে। এ হিসাবই বোঝাচ্ছে, বিদেশি ঋণের দায় এখন সরকারের অর্থ ব্যবস্থাপনার একটি বড় বাস্তবতা।
পুরোনো ঋণই এখন বড় বাস্তবতা
ঋণ পরিশোধের এই বাড়তি চাপকে নতুন সরকারের নেওয়া ঋণের ফল হিসেবে দেখার সুযোগ কম। মূলত আগের বছরগুলোতে বড় অবকাঠামো ও মেগা প্রকল্পের জন্য নেওয়া ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ায় এখন আসল ও সুদ পরিশোধের সময় এসেছে। গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যানেও সেই চাপের ধারাবাহিকতা স্পষ্ট। ২০২২-২৩ অর্থবছরে বিদেশি ঋণ পরিশোধ ছিল ২৬৭ কোটি ডলার। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা বেড়ে ৩৩৭ কোটি, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪০৯ কোটি এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪৪৯ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ এখন এমন একটি পর্যায়ে প্রবেশ করেছে, যেখানে অতীতে নেওয়া ঋণের প্রকৃত আর্থিক দায় দৃশ্যমান হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করতে পারাটাই সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সক্ষমতার বিষয় হয়ে উঠেছে।
তিতুমীরের ‘ভ্যালু ফর মানি’ প্রশ্নটি কেন গুরুত্বপূর্ণ
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের বক্তব্যে এই বাস্তবতার পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত রয়েছে। তার বক্তব্যের কেন্দ্রবিন্দু হলো—ঋণ নেওয়ার আগে দেখতে হবে, সেই ঋণের বিপরীতে প্রকল্পটি আসলে কতটা অর্থনৈতিক সুফল তৈরি করবে। তিনি মনে করেন, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বড় অবকাঠামো ও মেগা প্রকল্পে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে ‘ভ্যালু ফর মানি’ এবং ঋণের সুদের হার যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয়নি। তার এই বক্তব্য মূলত প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সক্ষমতা মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তাকে সামনে নিয়ে আসে।
ঋণ থাকবে, তবে ফিরবে রিটার্নও
তিতুমীরের বক্তব্যের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো, সরকার ঋণকে উন্নয়নের বিরোধী হিসেবে দেখছে না। বরং উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে ঋণ ব্যবহারের কথা বলা হচ্ছে। বিশেষ করে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে উৎপাদন, রপ্তানি ও কর্মসংস্থান বাড়ানো গেলে সেই বিনিয়োগ ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাও তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ নতুন ঋণের ক্ষেত্রে লক্ষ্য হচ্ছে শুধু প্রকল্প বাস্তবায়ন নয়, প্রকল্প থেকে অর্থনৈতিক রিটার্ন নিশ্চিত করা।
ঋণ পরিশোধে আস্থাই বড় সম্পদ
পুরোনো ঋণের কিস্তি সময়মতো পরিশোধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সুফল হলো আন্তর্জাতিক আর্থিক আস্থা ধরে রাখা। ঋণদাতা ও উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে নিয়মিত দায় পরিশোধ বাংলাদেশের আর্থিক সক্ষমতার ইতিবাচক সংকেত দেয়। এতে ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় উন্নয়ন অর্থায়ন পাওয়ার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অবস্থান শক্ত হতে পারে। একই সঙ্গে নতুন ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান নিলে ঋণের অর্থ আরও কার্যকর খাতে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে।
রেকর্ড পরিশোধ তাই শুধু চাপের গল্প নয়
পাঁচ মাসে ২০৪ কোটি ৭৬ লাখ ডলার ঋণ পরিশোধ নিঃসন্দেহে সরকারের ওপর বড় আর্থিক চাপের প্রতিফলন। তবে এর ইতিবাচক দিকও স্পষ্ট—সরকার পুরোনো দায় এড়িয়ে যাচ্ছে না; বরং নিয়মিত পরিশোধের মাধ্যমে আর্থিক বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখছে। এর পাশাপাশি ভবিষ্যতের ঋণকে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানমুখী করার যে নীতির কথা বলা হচ্ছে, সেটি বাস্তবায়িত হলে বর্তমান ঋণ পরিশোধের চাপই ভবিষ্যতের জন্য আরও দায়িত্বশীল ঋণ ব্যবস্থাপনার ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
কালের আলো/এম/এএইচ

আপনার মতামত লিখুন
Array