শিল্পে একসঙ্গে পাঁচ সংকট
একটি কারখানা বন্ধ হওয়ার গল্প সাধারণত শুরু হয় উৎপাদন কমে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের শিল্প খাতে এখন সেই গল্প একসঙ্গে অনেক প্রতিষ্ঠানে লেখা হচ্ছে। কারখানা আছে, শ্রমিক আছে, বিদেশি ক্রেতাও আছে—কিন্তু উৎপাদন চালানোর মতো গ্যাস-বিদ্যুৎ নেই। ফলে মেশিন থেমে যাচ্ছে, অর্ডার পিছিয়ে যাচ্ছে, শ্রমিক ছাঁটাই হচ্ছে এবং ধীরে ধীরে বাজার হারাচ্ছে দেশীয় শিল্প।
শিল্পোদ্যোক্তাদের মতে, পরিস্থিতি এতটাই নাজুক যে অনেক কারখানা দিনে ২ থেকে ৩ ঘণ্টার বেশি চালানো যাচ্ছে না। কোথাও পুরো কারখানা বন্ধ, কোথাও উৎপাদন ইউনিটের অর্ধেকের বেশি অচল। শিল্পে গ্যাস সরবরাহ ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। এর সঙ্গে দিনে গড়ে ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা লোডশেডিং যুক্ত হওয়ায় উৎপাদন ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়ছে।
গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে উৎপাদন অর্ধেক
গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় গার্মেন্টসের পাশাপাশি সিরামিক, স্টিল, সিমেন্ট ও কাচ শিল্পেও উৎপাদন ৪৫-৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। কিছু প্রতিষ্ঠান ডিজেল জেনারেটর দিয়ে উৎপাদন সচল রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু এতে জ্বালানি ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যাচ্ছে। ফলে একদিকে উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে প্রতিটি পণ্যের খরচ বাড়ছে। সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে রপ্তানিমুখী শিল্পে।
সময়মতো পণ্য পাঠাতে না পারায় বিদেশি ক্রেতাদের নির্ধারিত ‘লিড টাইম’ পূরণ করা যাচ্ছে না। এর সুযোগ নিচ্ছে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো। ক্রেতারা অর্ডার কমানোর পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে অর্ডার সরিয়ে ভিয়েতনাম, ভারত, কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় নিচ্ছেন। কেউ কেউ পুরোনো অর্ডারও বাতিল করছেন। বিশ্ববাজারের দুর্বল চাহিদা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করেছে। যুদ্ধ ও মূল্যস্ফীতির প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মানুষ পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্যে ব্যয় কমিয়েছে। ইইউ বাজারে পোশাকের চাহিদা ১৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ কমেছে। অর্থাৎ যখন বৈশ্বিক বাজারই সংকুচিত, তখন উৎপাদন ও সরবরাহ সক্ষমতা হারানো বাংলাদেশের জন্য দ্বিগুণ বিপদ।
বন্ধ কারখানা ও ছাঁটাই শ্রমিক
সংকটের সবচেয়ে দৃশ্যমান আঘাত পড়েছে কর্মসংস্থানে। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত দেশে প্রায় ৪৩৬টি তৈরি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে। কাজ হারিয়েছেন প্রায় আড়াই লাখ শ্রমিক। অবশ্য একই সময়ে ৩৩৬টি নতুন কারখানা উৎপাদনে এসে প্রায় দুই লাখ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করেছে। কিন্তু নতুন বিনিয়োগের প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি অংশও গ্যাস-বিদ্যুতের অভাবে পূর্ণ সক্ষমতায় যেতে পারছে না। নিট খাতেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক।
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমের হিসাবে, গত দুই বছরে ১৭৬টি নিট কারখানা বন্ধ হয়েছে এবং কর্মহীন হয়েছেন ৭৮ হাজার ৯৮৩ শ্রমিক।বিপরীতে ১৬০টি নতুন কারখানায় প্রায় ১ লাখ ৮৯০ জনের কর্মসংস্থান হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঋণের উচ্চ সুদ। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতির কারণে ব্যাংক ঋণের সুদ ১৪-১৬ শতাংশে উঠেছে। ফলে নতুন শিল্প স্থাপনে উদ্যোক্তাদের আগ্রহ কমেছে। পুরোনো ঋণের কিস্তি পরিশোধেও অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যর্থ হচ্ছে। উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি ঋণের বোঝা বাড়ায় খেলাপি হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে।
জ্বালানি নির্ভরতা বাড়ছে, ঝুঁকিও বাড়ছে
শিল্পের এই সংকটকে আরও গভীর করছে দেশের বাড়তে থাকা জ্বালানি আমদানি নির্ভরতা। উদ্যোক্তাদের তথ্য অনুযায়ী, চার বছরে এ নির্ভরতা ৪৭ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬২ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বা সরবরাহে সামান্য অস্থিরতাও দেশের শিল্প উৎপাদনে বড় ধাক্কা দিচ্ছে। নরসিংদীতে ৩০০টির বেশি কারখানা বন্ধ থাকার কথা জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা। অথচ সেখানে প্রায় তিন হাজার টেক্সটাইল ও ডাইং মিল রয়েছে, যা দেশের স্থানীয় কাপড়ের বড় অংশের জোগান দেয়। কোথাও বয়লার চালাতে কাঠ ব্যবহার করতে হচ্ছে। গাজীপুরেও গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ নেমে এসেছে মাত্র ৪৫ শতাংশে।
বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের ভাষায়, সামষ্টিক অর্থনীতি, শিল্প উৎপাদন ও রপ্তানি—সব ক্ষেত্রেই দুর্বলতা তৈরি হয়েছে। তাঁর মতে, শিল্প উৎপাদন যে হারে কমছে, সেটিই এখন সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়।
কালের আলো/এম/এএইচ

আপনার মতামত লিখুন
Array