খুঁজুন
                               
, ,
           

বিদেশে বাংলাদেশের মেধার জয়, অনাগ্রহ দেশে ফেরায়

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৩:১০ অপরাহ্ণ
বিদেশে বাংলাদেশের মেধার জয়, অনাগ্রহ দেশে ফেরায়

বাংলাদেশের মেধাবী তরুণরা বিশ্বজুড়ে নিজেদের সক্ষমতার স্বাক্ষর রাখছেন। কেউ গবেষণাগারে নতুন আবিষ্কারে যুক্ত, কেউ চিকিৎসাসেবায়, কেউ আবার গুগল, অ্যামাজন, মাইক্রোসফট, মেটা কিংবা অ্যাপলের মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্রে তাদের সাফল্য বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে গর্বের। কিন্তু এই সাফল্যের আড়ালে তৈরি হচ্ছে একটি অপ্রিয় ও অস্বস্তিকর প্রশ্ন-দেশের মেধা কি শেষ পর্যন্ত দেশের কোন কাজে আসছে?

উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে পড়াশোনা শেষে বিদেশে থেকে যাওয়ার প্রবণতাও। উন্নত কর্মপরিবেশ, গবেষণার বিস্তৃত সুযোগ, উচ্চ বেতন, পেশাগত মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং স্থায়ী বসবাসের সম্ভাবনা তাদের বড় একটি অংশকে বিদেশেই ক্যারিয়ার গড়তে উৎসাহিত করছে। বিপরীতে দেশে গবেষণার সীমিত সুযোগ, দক্ষ কর্মসংস্থানের ঘাটতি, প্রশাসনিক জটিলতা এবং মেধার যথাযথ মূল্যায়নের অভাব ফেরার সিদ্ধান্তকে কঠিন করে তুলছে।

বিদেশযাত্রা দ্বিগুণ, ব্যয়েও রেকর্ড
ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বিদেশে উচ্চশিক্ষায় অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৫২ হাজারে পৌঁছেছে। শিক্ষার্থীর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বিদেশে শিক্ষার পেছনে দেশের অর্থপ্রবাহও। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদেশে শিক্ষা খাতে বাংলাদেশিদের ব্যয় হয়েছে ৬৬ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৮ হাজার ৭৯ কোটি টাকা-যা এই পর্যন্ত সর্বোচ্চ। অর্থাৎ পরিবার ও রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ বিনিয়োগে বিপুলসংখ্যক তরুণ আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জন করছেন।

কিন্তু এই বিনিয়োগের কতটা শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের অর্থনীতি, গবেষণা কিংবা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ফিরে আসে-তার কোনো নির্ভরযোগ্য জাতীয় হিসাব নেই। বিদেশে উচ্চশিক্ষা শেষে কতজন দেশে ফিরছেন, সে বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারি পরিসংখ্যান না থাকায় ব্রেন ড্রেনের প্রকৃত মাত্রা নিরূপণও কঠিন।

সুযোগ থাকলেই থেকে যান সবাই
সরকারি শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে বিদেশে উচ্চশিক্ষার চিত্র তুলনামূলক ভিন্ন। শিক্ষা ছুটির নির্দিষ্ট শর্ত এবং চাকরিতে ফেরার বাধ্যবাধকতার কারণে তাদের বড় অংশ দেশে ফিরে আসেন। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এ শ্রেণির প্রায় ২০ শতাংশ বিদেশে থেকে যেতে পারেন। সাম্প্রতিক একটি উদাহরণও আলোচনায় এসেছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে। পিএইচডির জন্য বিদেশে যাওয়া ১৩২ শিক্ষকের মধ্যে ২৮ জন দেশে ফেরেননি।

সংখ্যাটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের চিত্র; তবে এটি বৃহত্তর বাস্তবতার একটি ইঙ্গিত বহন করে। অন্যদিকে, নিজ উদ্যোগে স্কলারশিপ, ব্যক্তিগত অর্থায়ন কিংবা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সুযোগ নিয়ে যারা পড়তে যান, তাদের ফেরার ক্ষেত্রে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বাধ্যবাধকতা নেই। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এই শ্রেণির ৬০ শতাংশেরও বেশি পড়াশোনা শেষে দেশে ফেরেন না। বিদেশে পড়াশোনা শেষ করে সেখানকার শ্রমবাজারে প্রবেশের সুযোগ পাওয়ায় স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্তই হয়ে ওঠে তাদের কাছে অধিক যৌক্তিক।

ঘাটতি মেধাকে ধরে রাখার পরিবেশে
বাংলাদেশি তরুণদের আন্তর্জাতিক সাফল্যের তালিকাটি দীর্ঘ। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী আল আমিন হোসেন অ্যামাজনে সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী রিচিতা খন্দকার রিফাত গুগলে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী আনামিকা আহমেদ মাইক্রোসফটে সিনিয়র সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গাজী মোহাইমিন ইকবাল মেটা এবং ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির শিহাব রশিদ অ্যাপলে কাজ করছেন। তাদের সাফল্য দেখিয়ে দেয়, বাংলাদেশের তরুণদের মেধা ও সক্ষমতার ঘাটতি নেই। ঘাটতি রয়েছে সেই মেধাকে দেশে ধরে রাখার মতো পরিবেশে। বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো যে দক্ষতাকে মূল্য দিচ্ছে, দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো একই মেধার জন্য সমপর্যায়ের সুযোগ তৈরি করতে পারছে কি না-সেখানেই মূল প্রশ্ন।

ব্রেন ড্রেনের আসল মূল্য ‘হিউম্যান ক্যাপিটাল লস’
ব্রেন ড্রেনের ক্ষতি তাৎক্ষণিকভাবে অর্থের হিসাবে ধরা পড়ে না। এর প্রভাব পড়ে দীর্ঘমেয়াদে। একজন শিক্ষার্থী যখন দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, অবকাঠামো ও সামাজিক বিনিয়োগের মধ্য দিয়ে তৈরি হয়ে বিদেশে গিয়ে স্থায়ীভাবে অন্য দেশের অর্থনীতিতে যুক্ত হন, তখন তার অর্জিত দক্ষতার বড় অংশের সুফল গন্তব্য দেশ পায়। ফলে গবেষণা, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, স্বাস্থ্যসেবা ও উচ্চশিক্ষায় দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি তৈরি হয়। অর্থনীতির পরিভাষায় এটি ‘হিউম্যান ক্যাপিটাল লস’—মানবসম্পদ তৈরিতে যে বিনিয়োগ করা হয়েছে, তার কাঙ্ক্ষিত রিটার্ন অন্য অর্থনীতি ভোগ করছে।

তরুণদের না ফিরতে চাওয়ার কারণ
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদের মতে, বিদেশে উচ্চশিক্ষা নেওয়া নিজে কোনো সমস্যা নয়; বরং সঠিক পরিবেশ থাকলে এটি জাতীয় সম্পদে পরিণত হতে পারে। এজন্য দেশে আন্তর্জাতিক মানের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি নিয়োগ ও পদোন্নতিতে স্বচ্ছতা, মেধার মূল্যায়ন, গবেষণার স্বাধীনতা এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমানো জরুরি। একই সঙ্গে স্টার্টআপ, উদ্ভাবন ও গবেষণাভিত্তিক উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন, নীতিগত সহায়তা এবং বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়াতে হবে। কারণ একজন মেধাবী তরুণ শুধু ভালো বেতনের জন্য বিদেশে থাকেন না; তিনি দেখেন তার কাজের মূল্য কতটা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা কতটা এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের সুযোগ কোথায় বেশি।

মেধার জন্য বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলো বিশ্বের দক্ষ ও উচ্চশিক্ষিত জনশক্তিকে আকৃষ্ট করতে পরিকল্পিত নীতি গ্রহণ করেছে। তাদের কাছে বিদেশি মেধাবীরা কেবল শিক্ষার্থী নন, ভবিষ্যৎ গবেষক, উদ্ভাবক, উদ্যোক্তা ও করদাতা। বাংলাদেশের তরুণরা যখন এসব দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাগারে প্রবেশ করছেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই তাদের ধরে রাখতে গন্তব্য দেশগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও সুযোগ বড় ভূমিকা রাখছে। ফলে শুধু দেশে ফেরার আহ্বান জানিয়ে এই প্রবণতা ঠেকানো কঠিন।

শুধু প্রয়োজন ‘ব্রেন সার্কুলেশন’
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশে রিভার্স ব্রেন ড্রেন নিয়ে নতুন আশাবাদ তৈরি হয়েছে। বিদেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কিছু বাংলাদেশির দেশে ফেরার আগ্রহ সেই আলোচনাকে আরও জোরালো করেছে। তবে এখন পর্যন্ত এটি কোনো দৃশ্যমান জাতীয় প্রবণতায় রূপ নেয়নি।

সরকার অবশ্য ‘ব্রেন ড্রেন’ বন্ধ করে ‘ব্রেন সার্কুলেশন’-এর দিকে যেতে চায়। শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বিদেশে উচ্চশিক্ষা নেওয়া তরুণদের দেশে ফিরে কাজ করার পরিবেশ তৈরির কথা জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন জানিয়েছেন, প্রবাসী বাংলাদেশি গবেষক ও একাডেমিকদের যৌথ গবেষণা ও স্বল্পমেয়াদি কোর্সের মাধ্যমে দেশের গবেষণাব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এই নীতি বাস্তবায়নের সাফল্য নির্ভর করবে একটি মৌলিক পরিবর্তনের ওপর-বিদেশ থেকে মেধা ফেরানোর চেয়ে দেশে এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে মেধাবীরা নিজেরাই ফিরতে চাইবেন।

কালের আলো/এম/এএই

জনতা ব্যাংকের ইউএই-কাণ্ড

জনতা ব্যাংকের ৩০৪ কোটি: নিষ্পত্তি নাকি হিসাবের গরমিল?

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৩৩ পূর্বাহ্ণ
জনতা ব্যাংকের ৩০৪ কোটি: নিষ্পত্তি নাকি হিসাবের গরমিল?

সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) জনতা ব্যাংকের প্রায় ৩০৪ কোটি টাকার ঋণ নিয়ে ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের বক্তব্যে ভিন্ন চিত্র সামনে এসেছে। জনতা ব্যাংক বলছে, এটি বহু পুরোনো ঋণ এবং দীর্ঘ আইনি ও সালিসি প্রক্রিয়া শেষে ২০০৩ সালেই দুই দেশের সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সম্মতিতে এর চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়েছিল। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদনে ইউএইর চার শাখায় বিপুল অঙ্কের ঋণ অবলোপন, হিসাবের অসঙ্গতি এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতার তথ্য উঠে এসেছে।

ব্যাংকের দাবি, ২০০৩ সালেই দায় নিষ্পন্ন

রোববার (৪ অক্টোবর) জনতা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত জরুরি সংবাদ সম্মেলনে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান মুহ. ফজলুর রহমান বলেন, ইউএই কার্যক্রম নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে কিছু তথ্যগত অসঙ্গতি রয়েছে।

তার দাবি, শেখ খলিফা গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ফাইন্যান্স মরিস ও মেট্রোপলিটন এন্টারপ্রাইজের ঋণটি বহু পুরোনো। পাওনা আদায়ে ব্যাংকের উদ্যোগ, কূটনৈতিক তৎপরতা, আইনগত প্রক্রিয়া এবং সালিসি কার্যক্রমের পর বিধিবিধান মেনেই ঋণটি নিষ্পত্তি করা হয়েছে।

জনতা ব্যাংকের নথি অনুযায়ী, ১৯৮৯ সালের সালিসি আদালতের নির্দেশনা এবং দুই দেশের সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সম্মতির ভিত্তিতে ২০০৩ সালেই ওই ঋণের চূড়ান্ত দায় নিষ্পন্ন হয়।

ব্যাংক আরও জানিয়েছে, গণমাধ্যমে প্রয়াত ইউএই প্রেসিডেন্ট শেখ খলিফা বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের ছবি ব্যবহার করা হলেও প্রকৃত ঋণগ্রহীতা ছিলেন শেখ খলিফা বিন মোহাম্মদ আল নাহিয়ান।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে ৪৩৯ কোটি টাকার ঋণ অবলোপন

অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদনে ইউএইতে জনতা ব্যাংকের চার শাখায় মোট ২০ কোটি ৫১ লাখ দিরহাম বা প্রায় ৪৩৯ কোটি ৭২ লাখ টাকা ঋণ অবলোপনের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব ঋণ ছিল ২৩ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের।

এর মধ্যে শেখ খলিফা-সংশ্লিষ্ট ঋণের পরিমাণ প্রায় ১৪ কোটি ২৮ লাখ ৮০ হাজার দিরহাম, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩০৪ কোটি টাকার সমপরিমাণ।

প্রতিবেদনে আরও প্রায় ৬৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকার একটি ঋণ ‘ভুলক্রমে’ অবলোপনের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—৪৩৯ কোটি ৭২ লাখ টাকা হচ্ছে ইউএইর চার শাখায় ২৩ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মোট অবলোপিত ঋণ। আর ৬৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকার ঋণকে প্রতিবেদনে আলাদাভাবে ‘ভুলক্রমে’ অবলোপনের ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে ৩০৪ কোটি টাকার ঋণের বিষয়টি বৃহত্তর ইউএই কার্যক্রমের হিসাব ও ঋণ ব্যবস্থাপনার প্রশ্নের সঙ্গেও আলোচনায় এসেছে।

হিসাবের গরমিল নিয়েও প্রশ্ন

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে শুধু ঋণ অবলোপন নয়, ইউএই শাখাগুলোর হিসাব ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

শারজাহ শাখার সান্ড্রি ডিপোজিট ও সান্ড্রি অ্যাসেটের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্যের তথ্য প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। পাশাপাশি দুবাই শাখার বিভিন্ন হিসাবেও গরমিলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

ইউএই সিইও কার্যালয়ের ছয়টি ল্যাপটপ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন দল। তবে জনতা ব্যাংকের দাবি, ল্যাপটপগুলোর অস্তিত্ব রয়েছে এবং সেগুলো দাপ্তরিক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।

তিন ভারতীয় নাগরিক নিয়োগ নিয়েও ব্যাখ্যা

ইউএই কার্যক্রমে তিন ভারতীয় নাগরিক নিয়োগের বিষয়েও ব্যাংকের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। জনতা ব্যাংকের বক্তব্য, ইউএইতে স্থানীয় কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে ১৯৮২ সালের স্থানীয় নিয়োগ-সংক্রান্ত বিধিমালা অনুসরণ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমতির বাধ্যবাধকতা নেই বলেও ব্যাংক দাবি করেছে।

অন্যদিকে ইতালির জনতা এক্সচেঞ্জ কোম্পানি (জেইসি) বন্ধ না করার বিষয়ে ব্যাংক জানিয়েছে, প্রবাসী আয় এবং বাংলাদেশের ভাবমূর্তির বিষয় বিবেচনায় আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি চালু রাখা হয়েছে।

এখন মূল প্রশ্ন নথির সামঞ্জস্য নিয়ে

ফলে বিতর্কটি শুধু ৩০৪ কোটি টাকার ঋণ ‘অবলোপন’ হয়েছিল কি না—এমন একক প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকছে না। জনতা ব্যাংকের বক্তব্য অনুযায়ী, এটি দীর্ঘদিনের একটি ঋণ, যা আইনি ও সালিসি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ২০০৩ সালেই নিষ্পত্তি হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে একই ইউএই কার্যক্রমে বড় অঙ্কের ঋণ অবলোপন, হিসাবের অসঙ্গতি এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতার তথ্য উঠে এসেছে।

তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে ৩০৪ কোটি টাকার ঋণকে সরাসরি অবৈধ বা দুর্নীতির অর্থ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে—এমন দাবি করার সুযোগ নেই। একইভাবে শুধু প্রতিবেদনে ঋণ অবলোপনের তথ্য থাকলেই ২০০৩ সালের নিষ্পত্তি প্রশ্নবিদ্ধ প্রমাণিত হয় না।

এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ২০০৩ সালের নিষ্পত্তির নথি, সালিসি সিদ্ধান্ত, দুই দেশের সরকারের সম্মতির প্রমাণ, ঋণ অবলোপনের অনুমোদন এবং পরবর্তী হিসাবরেকর্ড পরস্পরের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—তা যাচাই করা।

এসব নথি ও হিসাবের ধারাবাহিকতা পরিষ্কার হলে বোঝা যাবে, ৩০৪ কোটি টাকার বিষয়টি কেবল একটি পুরোনো ও নিষ্পত্তি হওয়া ঋণের ঘটনা, নাকি এর সঙ্গে ইউএইতে জনতা ব্যাংকের বৃহত্তর ঋণ ব্যবস্থাপনা ও হিসাবের অসঙ্গতির কোনো যোগসূত্র রয়েছে।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি

এলপি গ্যাসে কারচুপি, ১০২ প্রতিষ্ঠানকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:৫২ পূর্বাহ্ণ
এলপি গ্যাসে কারচুপি, ১০২ প্রতিষ্ঠানকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে মূল্য স্থিতিশীল রাখা এবং সরকার নির্ধারিত দামে এলপি গ্যাস বিক্রি নিশ্চিত করতে দেশব্যাপী বিশেষ তদারকি অভিযান চালিয়েছে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। রাজধানীসহ ৩০ জেলায় পরিচালিত এ অভিযানে বিভিন্ন অনিয়মের দায়ে ১০২টি প্রতিষ্ঠানকে মোট ১০ লাখ ৩১ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

রোববার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, অধিদপ্তরের ৪৪টি দল একযোগে পাইকারি ও খুচরা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে অভিযান পরিচালনা করে।

অভিযানে পণ্যের মূল্যতালিকা প্রদর্শন, ক্রয়-বিক্রয়ের ভাউচার সংরক্ষণ ও প্রদান, সঠিক ওজন এবং সরকার নির্ধারিত মূল্যে এলপি গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে কি না—এসব বিষয় যাচাই করা হয়। নিত্যপণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকানো এবং গ্যাস সিলিন্ডারের অতিরিক্ত দাম আদায় বন্ধ করাই ছিল অভিযানের উদ্দেশ্য।

সাভারের আমতলা ও কুটুরিয়া বাজারের দুটি এলপি গ্যাস ডিলার পয়েন্টে অভিযান চালিয়ে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়। এ সময় হাজী আব্দুর রহমান এন্টারপ্রাইজকে ১০ হাজার টাকা এবং ইকবাল এন্টারপ্রাইজকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

অধিদপ্তর জানায়, প্রতিষ্ঠান দুটির বিরুদ্ধে যথাযথভাবে ক্রয়-বিক্রয়ের ভাউচার সংরক্ষণ না করা, প্রদর্শিত মূল্যতালিকার চেয়ে বেশি দামে গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি এবং বিশেষ পাইপের মাধ্যমে গ্যাস স্থানান্তর করে ওজনে কারচুপির অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। অভিযানে কারচুপিতে ব্যবহৃত বিশেষ পাইপ এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সিল-স্টিকারও জব্দ করা হয়।

এর মধ্যে সরবরাহ সংকটের কারণে অক্টোবর মাসে এলপি গ্যাসের দামও বাড়িয়েছে সরকার। রোববার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করে। সেপ্টেম্বরে একই সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ভোক্তাদের পণ্য কেনার আগে মূল্যতালিকা যাচাই, সঠিক ওজন নিশ্চিত করা এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য, উৎপাদনের তারিখ ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ দেখে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। গ্যাস সিলিন্ডার কেনার সময় ওজন, সিল ও দৃশ্যমান ত্রুটি পরীক্ষা এবং ক্রয়ের রশিদ বা ভাউচার সংগ্রহেরও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

কোনো অনিয়ম বা প্রতারণার শিকার হলে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের হটলাইন ১৬১২১ নম্বরে অভিযোগ জানাতে বলা হয়েছে।

বাজারে শৃঙ্খলা, ন্যায্যমূল্য ও পণ্যের স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত করতে এ ধরনের তদারকি অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে অধিদপ্তর।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি 

বাংলা কিউআরের হাত ধরে বদলে যাচ্ছে ব্যাংকিংয়ের হিসাব

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:৩৭ পূর্বাহ্ণ
বাংলা কিউআরের হাত ধরে বদলে যাচ্ছে ব্যাংকিংয়ের হিসাব

দেশে ব্যাংকিং সেবার ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ব্যাংকের শাখা কিংবা ওয়েবসাইটের পরিবর্তে স্মার্টফোনের অ্যাপ ব্যবহার করেই এখন ব্যাংকিংয়ের বড় অংশের কাজ সারছেন গ্রাহকরা। এ পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে আন্তঃব্যাংক ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থা বাংলা কিউআর।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাই শেষে দেশে ব্যাংকিং অ্যাপ ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২ কোটি ৯ লাখ ৭৫ হাজার ছাড়িয়েছে। এক বছর আগে, গত বছরের আগস্টে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ৭১ লাখ ৬৬ হাজার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ব্যবহারকারী বেড়েছে প্রায় ১ কোটি ৩৮ লাখ, যা প্রায় তিন গুণ।

২০২৩ সালে আন্তঃব্যাংক কোডভিত্তিক লেনদেনের জন্য বাংলা কিউআর চালু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে সব প্রতিষ্ঠানের কোডভিত্তিক লেনদেন বাংলা কিউআরের মাধ্যমে করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। এতে বিভিন্ন ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) অ্যাপ ব্যবহার করে একই কিউআর কোড স্ক্যানের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

বাংলা কিউআরের ফলে নির্দিষ্ট কোনো ব্যাংকের গ্রাহককে শুধু সেই ব্যাংকের মাধ্যমেই লেনদেন করতে হচ্ছে না। যেকোনো ব্যাংক বা এমএফএস অ্যাপ ব্যবহার করে অর্থ পরিশোধ করা যাচ্ছে। এতে সাধারণ গ্রাহকের পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের মধ্যেও কিউআরভিত্তিক লেনদেনের আগ্রহ বাড়ছে।

অ্যাপ ব্যবহারকারীর পাশাপাশি লেনদেনের পরিমাণও বেড়েছে। গত জুলাইয়ে ব্যাংকিং অ্যাপের মাধ্যমে ১ লাখ ৭৪ হাজার ১২৯ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। এক বছর আগে, গত আগস্টে এই পরিমাণ ছিল ১ লাখ ১২ হাজার ৩০৪ কোটি টাকা। অবশ্য একক মাস হিসেবে সর্বোচ্চ লেনদেন হয়েছিল গত জুনে—১ লাখ ৮৪ হাজার ৩৪৯ কোটি টাকা।

অন্যদিকে কমছে ব্রাউজারভিত্তিক ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের ব্যবহার। গত জুলাই শেষে ব্যাংকের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সেবা নেওয়া গ্রাহকের সংখ্যা ছিল ২৪ লাখ ৮৯ হাজার। বিপরীতে অ্যাপ ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৯ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি।

অ্যাপ ও ব্রাউজার মিলিয়ে গত জুলাই শেষে মোট ইন্টারনেট ব্যাংকিং ব্যবহারকারী দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৩৪ লাখ ৬৪ হাজারের বেশি। গত বছরের আগস্টে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ১ কোটি ১৯ লাখ ৬৭ হাজার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, একসময় অ্যাপভিত্তিক লেনদেনকে মূলত এমএফএসের সঙ্গে সম্পর্কিত মনে করা হতো। বাংলা কিউআর চালুর পর ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এর গুরুত্ব বুঝতে শুরু করেছে। যেসব ব্যাংকের নিজস্ব অ্যাপ ছিল না, তাদেরও এ ব্যবস্থায় যুক্ত হওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

ফলে বাংলা কিউআর এখন শুধু একটি পেমেন্ট ব্যবস্থা নয়; এটি ব্যাংকের ডিজিটাল সেবা, অ্যাপ ব্যবহার এবং গ্রাহকের দৈনন্দিন আর্থিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে যোগসূত্র তৈরি করছে।

ব্যাংকিং অ্যাপের ব্যবহার বৃদ্ধির এই প্রবণতা ইঙ্গিত দিচ্ছে, গ্রাহকদের ব্যাংকিং অভ্যাসে বড় পরিবর্তন এসেছে। ভবিষ্যতে বাংলা কিউআর ও অ্যাপভিত্তিক সেবা আরও বিস্তৃত হলে স্মার্টফোনই হয়ে উঠতে পারে দৈনন্দিন ব্যাংকিংয়ের প্রধান মাধ্যম।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি