মিয়ানমারের খনিজ সম্পদ যেভাবে জ্বালানি দিচ্ছে গৃহযুদ্ধে
মিয়ানমারের জেড, সোনা, টিন ও ভারী বিরল মৃত্তিকার মতো মূল্যবান খনিজ এখন শুধু দেশটির অর্থনীতির অংশ নয়; এগুলো হয়ে উঠেছে দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধের অর্থের অন্যতম উৎস। যেসব এলাকায় এসব খনি রয়েছে, সেগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সামরিক বাহিনী ও বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে লড়াই চলছে। খনি ও বাণিজ্যপথের নিয়ন্ত্রণ যার হাতে, তারই বাড়ছে অর্থ, অস্ত্র কেনার সক্ষমতা ও রাজনৈতিক প্রভাব।বিশ্বের উন্নত মানের জেড, বিশেষ করে উজ্জ্বল সবুজ ‘ইম্পেরিয়াল জেড’, মিয়ানমারের কাচিন রাজ্যের হপাকান্ত থেকে আসে। চীনে বহু শতাব্দী ধরে জেডকে ‘স্বর্গের পাথর’ বলা হয়। এই পাথরের বিশাল বাজার ঘিরে খনি মালিক, ব্যবসায়ী, সামরিক বাহিনী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে অর্থের প্রবাহ তৈরি হয়েছে।বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাত নিয়ে কাজ করা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের (আইসিজি) এক অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, মিয়ানমারের সংঘাতের মূল কারণ খনিজ সম্পদ নয়। মূল দ্বন্দ্ব ক্ষমতা, রাজনৈতিক পরিচয় ও জাতিগত স্বায়ত্তশাসন নিয়ে। তবে খনিজ সম্পদের নিয়ন্ত্রণ সংঘাতকে টিকিয়ে রাখার অর্থ জোগাচ্ছে।
টিনের বাজারে মিয়ানমারের প্রভাব
চীন সীমান্তবর্তী উত্তর-পূর্ব মিয়ানমারের মান মাও বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ টিনের খনিগুলোর একটি। এলাকাটি ইউনাইটেড ওয়া স্টেট আর্মির (ইউডব্লিউএসএ) নিয়ন্ত্রণে। একসময় চীনের আমদানি করা টিন আকরিকের ৯০ শতাংশের বেশি মিয়ানমার থেকে আসত।২০২৩ সালে সম্পদ নিরীক্ষার কথা বলে মান মাওয়ের খনন বন্ধ করে দেয় ওয়া কর্তৃপক্ষ। উৎপাদন বন্ধ হওয়ার পরপরই লন্ডন মেটাল এক্সচেঞ্জে টিনের দাম ১০ শতাংশের বেশি বেড়ে যায়। চীনের ধাতু গলানোর কারখানাগুলো বিকল্প উৎস খুঁজতে বাধ্য হয়।পরবর্তীতে আবার খনন শুরু হয়। চলতি বছরের জুনে চীনের আমদানি করা টিন আকরিকের ৩৭ শতাংশ এসেছে মিয়ানমার থেকে। অর্থাৎ উৎপাদন পুরোপুরি আগের অবস্থায় না ফিরলেও বিশ্ববাজারে দেশটির প্রভাব এখনো বড়।এদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ডেটা সেন্টারসহ আধুনিক ইলেকট্রনিক যন্ত্রে ব্যবহৃত সোল্ডারে টিন প্রয়োজন। ফলে মিয়ানমারের একটি প্রত্যন্ত খনির পরিস্থিতিও বিশ্ব প্রযুক্তি শিল্প ও বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে।
সোনা: অস্ত্র কেনার অর্থ
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারের মধ্য ও উত্তরাঞ্চলে সোনা উত্তোলন বেড়েছে। আইসিজির উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণে সাগাইং অঞ্চলের কিছু এলাকায় অভ্যুত্থানের পর সোনা উত্তোলনের পরিসর ১৬০ শতাংশের বেশি বাড়ার তথ্য পাওয়া গেছে।সরকারি হিসাবে দেশটিতে বছরে প্রায় ৫০০ কেজি সোনা উৎপাদিত হয়। তবে অনানুষ্ঠানিক উৎপাদন এর অন্তত ১০ গুণ হতে পারে। এই খাতের আনুমানিক বার্ষিক মূল্য প্রায় ১০০ কোটি ডলার।সামরিক সরকারবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সোনা উত্তোলনের ওপর কর আরোপ করে অস্ত্র ও গোলাবারুদ কেনার অর্থ সংগ্রহ করছে। অন্যদিকে সামরিক সরকারের স্থানীয় কর্মকর্তারাও খনি ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের কাছ থেকে ঘুষ ও অনানুষ্ঠানিক কর আদায় করছেন।ফলে একই খাত একদিকে প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোকে অর্থ জোগাচ্ছে, অন্যদিকে সামরিক সরকারের স্থানীয় কর্মকর্তাদেরও আয় দিচ্ছে। এর পাশাপাশি নির্বিচারে খনন কৃষিজমি নষ্ট, নদী ও পানি দূষণ এবং স্থানীয় মানুষের বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
‘স্বর্গের পাথর’ ঘিরে যুদ্ধ
হপাকান্তের জেড খনি মিয়ানমারের সবচেয়ে লাভজনক খনিজ সম্পদের একটি। চীনের বাজারে ব্যাপক চাহিদার কারণে প্রতিবছর শত শত কোটি ডলারের জেড সেখানে যায়।১৯৯৪ সালে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও কাচিন ইনডিপেনডেন্স অর্গানাইজেশনের (কেআইও) মধ্যে যুদ্ধবিরতির পর হপাকান্তে শিল্পভিত্তিক খনন ব্যাপকভাবে বাড়ে। এতে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক সেখানে ভিড় করেন। খনির বর্জ্যধসে বহু শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে এবং বিস্তীর্ণ পাহাড়ি এলাকা পরিবেশগতভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে।২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর কাচিন রাজ্যে আবার সংঘাত তীব্র হয়। ২০২৪ সালে কেআইও বড় অভিযান চালিয়ে চীনের সীমান্তবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথের নিয়ন্ত্রণ নেয়। এতে জেডসহ বিভিন্ন খনিজ সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ নিয়েও নতুন করে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হয়।
বিরল মৃত্তিয়া: বৈদ্যুতিক গাড়ি থেকে ক্ষেপণাস্ত্র
মিয়ানমার ভারী বিরল মৃত্তিয়া—বিশেষ করে ডিসপ্রোসিয়াম ও টার্বিয়ামের—একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। এসব উপাদান বৈদ্যুতিক গাড়ি, বায়ুবিদ্যুতের টারবাইন এবং আধুনিক অস্ত্রে ব্যবহৃত শক্তিশালী চুম্বক তৈরিতে প্রয়োজন।২০১৪ সালে মিয়ানমার থেকে চীনে বিরল মৃত্তিয়া রপ্তানির মূল্য ছিল প্রায় ১৫ লাখ ডলার। ২০২১ সালে তা বেড়ে প্রায় ৭৮ কোটি ডলারে পৌঁছায়। ওই বছর মিয়ানমার চীনের ভারী বিরল মৃত্তিয়ার কাঁচামালের সবচেয়ে বড় একক উৎসে পরিণত হয়।চীন নিজ দেশে পরিবেশগত কারণে এই খনিজ উত্তোলন কমিয়ে দেওয়ার পর উৎপাদনের বড় অংশ মিয়ানমারে সরে যায়। কিন্তু এসব খনি থেকে খনিজ তুলতে পাহাড়ের ভেতর বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। রাসায়নিক বর্জ্য নদী ও জলাধারে ছড়িয়ে পড়ছে।২০২৪ সালের শেষ দিকে কেআইও গুরুত্বপূর্ণ বিরল মৃত্তিয়া খনি এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয়। এতে চীনের সঙ্গে তাদের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়ে। তবে একই কারণে বেইজিংয়ের চাপের মুখেও পড়তে হয় তাদের, কারণ চীনের শিল্পের জন্য এই খনিজের সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দূষণ মিয়ানমারে, লাভের বড় অংশ বাইরে
আইসিজির অনুসন্ধানে উঠে এসেছে একটি বড় বৈপরীত্য। চীন নিজের ভূখণ্ডে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর অনেক খনি বন্ধ করলেও একই ধরনের খনিজ উত্তোলনের কাজ সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারে বেড়েছে। ফলে পরিবেশগত ক্ষতির বড় অংশ মিয়ানমার ও প্রতিবেশী দেশগুলোকে বহন করতে হচ্ছে, আর খনিজ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও চূড়ান্ত পণ্য উৎপাদনের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে চীনের হাতে।মিয়ানমারের খনিজ সম্পদ তাই এখন স্থানীয় গৃহযুদ্ধের সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও প্রযুক্তি সরবরাহব্যবস্থাকে যুক্ত করেছে। বৈদ্যুতিক গাড়ি, বায়ুবিদ্যুৎ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামো থেকে শুরু করে আধুনিক অস্ত্র—বিভিন্ন বৈশ্বিক শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামালের একটি অংশ আসছে সংঘাতপূর্ণ মিয়ানমার থেকে।অর্থাৎ বিশ্ববাজারে এসব খনিজের চাহিদা যত বাড়ছে, মিয়ানমারের সংঘাতপূর্ণ এলাকাগুলোর খনিও তত বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। আর খনি ও বাণিজ্যপথ থেকে পাওয়া অর্থ সামরিক বাহিনী ও সশস্ত্র বিরোধী গোষ্ঠী—উভয়েরই যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা বাড়াচ্ছে।
কালের আলো/এসএ

আপনার মতামত লিখুন
Array