গিজার পিরামিডে লুকিয়ে আছে মহাজাগতিক সংকেত? নতুন গবেষকের দাবি
মিসরের গিজার গ্রেট পিরামিডের মাপ ও নকশার মধ্যে চাঁদ, নক্ষত্র ও গ্রহের গতিপথের সঙ্গে সম্পর্কিত বিশেষ সংখ্যাগত সংকেত রয়েছে—এমন দাবি করেছেন স্বাধীন গবেষক সেফি লেভি। তবে তাঁর গবেষণাটি এখনো স্বাধীন পিয়ার রিভিউয়ের মধ্য দিয়ে যায়নি। ফলে তত্ত্বটি নিয়ে বৈজ্ঞানিক মহলে বিতর্ক রয়েছে।
প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর ধরে মিসরের গিজার গ্রেট পিরামিড গবেষকদের কাছে এক বিস্ময়ের নাম। বিশাল পাথরের এই স্থাপনার নির্মাণকৌশল, উদ্দেশ্য ও নকশা নিয়ে নানা গবেষণা হয়েছে। এবার পিরামিডের উচ্চতা, ভিত্তি ও ঢালু দেয়ালের মাপ বিশ্লেষণ করে নতুন এক তত্ত্ব সামনে এনেছেন স্বাধীন গবেষক সেফি লেভি।
লেভির দাবি, পিরামিডের বিভিন্ন মাত্রাগত অনুপাতের সঙ্গে চাঁদের আবর্তন, নক্ষত্রের গতিপথ এবং প্রাচীন মিসরের ক্যালেন্ডার ব্যবস্থার মিল রয়েছে। তাঁর মতে, প্রাচীন মিসরীয়রা গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের জ্ঞান পাথরের এই স্থাপনার নকশার মধ্যেই সংরক্ষণ করে যেতে চেয়েছিলেন।
পিরামিডের মাপে জ্যোতির্বিজ্ঞানের ছাপ?
গবেষণায় পিরামিডের বিভিন্ন মাপ ও অনুপাত নিয়ে হিসাব করেছেন লেভি। তাঁর দেওয়া হিসাবের একটি ফলাফল ২৭ দশমিক ৫-এর কাছাকাছি, যা চাঁদের কক্ষপথের নির্দিষ্ট একটি চক্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে তিনি দাবি করেছেন।
আরেকটি হিসাবে পাওয়া ৭০ সংখ্যাটির সঙ্গে সিরিয়াস নক্ষত্রের অদৃশ্য থাকা ও পুনরায় উদিত হওয়ার সময়ের মিল রয়েছে বলে তাঁর দাবি। প্রাচীন মিসরে মমি তৈরির প্রক্রিয়ার সঙ্গেও ৭০ দিনের একটি সময়কাল যুক্ত ছিল।
এ ছাড়া পিরামিডের নকশায় পাই (π) ও গোল্ডেন রেশিওর উপস্থিতির কথাও তুলে ধরেছেন তিনি। শনি ও বৃহস্পতির আবর্তনচক্রের সঙ্গেও পিরামিডের কিছু অনুপাতের মিল রয়েছে বলে গবেষণায় দাবি করা হয়েছে।
লেভি তাঁর তত্ত্ব যাচাই করতে বিপুলসংখ্যক কাল্পনিক পিরামিডের মডেল তৈরি করে তুলনামূলক পরীক্ষা চালিয়েছেন বলেও জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, মাত্র প্রায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ মডেলে একই ধরনের অস্বাভাবিক মিল পাওয়া গেছে।
তবে এসব মিল প্রাচীন মিসরীয় স্থপতিদের ইচ্ছাকৃত নকশা, নাকি পরবর্তী সময়ে মাপের ওপর আধুনিক সংখ্যাতত্ত্ব প্রয়োগ করে পাওয়া কাকতালীয় সম্পর্ক—এ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
পিরামিড কি ফারাও খুফুর সমাধি?
প্রধানধারার মিসরবিদ্যার মতে, গিজার গ্রেট পিরামিড নির্মাণ করা হয়েছিল ফারাও খুফুর জন্য। প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর আগে নির্মিত এই বিশাল স্থাপনাটি প্রাচীন মিসরের রাজকীয় সমাধি-ব্যবস্থার অংশ ছিল বলে মনে করা হয়।
পিরামিডের ভেতরে গ্রানাইটের একটি খালি কফিন বা সারকোফেগাস পাওয়া গেছে। তবে ফারাও খুফুর দেহ সেখানে সমাহিত করা হয়েছিল কি না, তার সরাসরি নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
একইভাবে পিরামিডের মাপের মধ্যে জ্যোতির্বিজ্ঞানের নির্দিষ্ট সংকেত লুকিয়ে রাখার দাবির পক্ষেও কোনো প্রাচীন মিসরীয় লিখিত প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
‘বেনবেন পাহাড়ের’ সঙ্গে কি সম্পর্ক আছে?
লেভির তত্ত্বের আরেকটি অংশ আরও চমকপ্রদ। প্রাচীন মিসরীয় সৃষ্টিতত্ত্বে আদিম জলরাশি থেকে প্রথম যে ভূমিখণ্ড বা পাহাড় উঠে এসেছিল, সেটিকে ‘বেনবেন’ বলা হয়।
লেভির ধারণা, এই পৌরাণিক কাহিনির পেছনে কোনো বাস্তব ভৌগোলিক স্মৃতি থাকতে পারে। এ ক্ষেত্রে তিনি সাহারা মরুভূমির মৌরিতানিয়ায় অবস্থিত ‘আই অব দ্য সাহারা’ নামে পরিচিত বিশাল বৃত্তাকার ভূ-গঠনের কথা উল্লেখ করেছেন।
তাঁর অনুমান, হাজার হাজার বছর আগে সাহারা অঞ্চল যখন তুলনামূলকভাবে সবুজ ও উর্বর ছিল, তখন সেখানে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর একটি অংশ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পূর্বদিকে নীল নদের উপত্যকার দিকে চলে যেতে পারে। পরবর্তী সময়ে সেই পুরোনো ভূদৃশ্যের স্মৃতি মিসরীয় সংস্কৃতিতে ‘বেনবেন পাহাড়’-এর পৌরাণিক ধারণায় প্রতিফলিত হয়ে থাকতে পারে।
তবে আই অব দ্য সাহারার সঙ্গে গিজার পিরামিডের সরাসরি ঐতিহাসিক যোগাযোগের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। মানুষের এমন অভিবাসনের দাবির পক্ষেও নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক দলিল নেই।
তত্ত্বটি নিয়ে বিতর্ক
গিজার পিরামিডের মাপের সঙ্গে মহাজাগতিক বিভিন্ন সংখ্যার মিল থাকার দাবি নতুন নয়। তবে কোনো স্থাপনার মাপের সঙ্গে আধুনিক গণিত বা জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিভিন্ন সংখ্যার মিল পাওয়া গেলেই সেটি যে নির্মাতাদের পরিকল্পিত ছিল, তা প্রমাণিত হয় না।
সেফি লেভির গবেষণাপত্রও এখন পর্যন্ত স্বাধীনভাবে পিয়ার রিভিউ হয়নি। ফলে তাঁর দাবি প্রমাণিত বৈজ্ঞানিক সত্য হিসেবে গ্রহণ করার সুযোগ নেই। তবে পিরামিডের নকশা, প্রাচীন মিসরীয়দের গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং তাঁদের সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে এই গবেষণা।
কালের আলো/এসএ

আপনার মতামত লিখুন
Array