খুঁজুন
                               
, ,
           

দেড় শতাধিকের পর প্রথম এসপি

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:৩৬ অপরাহ্ণ
দেড় শতাধিকের পর প্রথম এসপি

ছয় বছরে পুলিশের দেড় শতাধিক সদস্যের ডোপ টেস্টে মাদকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। এত দিন সেই তালিকায় ছিলেন কনস্টেবল থেকে পরিদর্শক পর্যায়ের সদস্যরা। এবার প্রথমবারের মতো তালিকায় যুক্ত হলেন একজন পুলিশ সুপার (এসপি)। পুলিশ সুপার (টিআর) আ ফ ম নিজাম উদ্দিনের মূত্রের নমুনায় বেনজোডায়াজেপিন (বিজেডও) এবং অ্যামফিটামিন/মেথঅ্যামফিটামিন শনাক্ত হওয়ার পর তাঁকে সরকারি চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

গত ১০ সেপ্টেম্বর জননিরাপত্তা বিভাগের পুলিশ-১ শাখা থেকে এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। একজন এসপি পর্যায়ের কর্মকর্তার ডোপ টেস্টে মাদকের উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ার ঘটনা পুলিশের মাদকবিরোধী ব্যবস্থাপনায় নতুন নজির তৈরি করেছে। একই সঙ্গে সামনে এনেছে দীর্ঘদিনের একটি প্রশ্ন-ডোপ টেস্ট কি কেবল মাঠপর্যায়ের সদস্যদের জন্য, নাকি পদমর্যাদা নির্বিশেষে পুরো বাহিনীর জন্য একই নিয়ম কার্যকর হবে?

১২০ থেকে দেড় শতাধিক
পুলিশে ডোপ টেস্টের মাধ্যমে মাদক শনাক্তকরণ কার্যক্রম শুরু হয় ২০২০ সালে। ঢাকা মহানগর পুলিশ সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের জুলাই পর্যন্ত ১২০ সদস্যের শরীরে মাদকের উপস্থিতি পাওয়া যায়। ২০২৪ সাল পর্যন্ত সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৩৪ জনে। তাঁদের মধ্যে ৯৮ জনই ছিলেন কনস্টেবল।

অন্যদের মধ্যে ছিলেন নায়েক, এসএসআই, এসআই, ট্রাফিক সার্জেন্ট ও পরিদর্শক। পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবে, ২০২০ সাল থেকে এ পর্যন্ত ডোপ টেস্টে মাদক শনাক্ত হওয়া সদস্যের সংখ্যা দেড় শতাধিক। কিন্তু এত দিন এএসপি বা তার ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের কোনো কর্মকর্তার নাম সেই তালিকায় ছিল না।

আ ফ ম নিজাম উদ্দিনের ঘটনায় সেই চিত্র বদলেছে। ফলে পুলিশের ডোপ টেস্ট কার্যক্রমে শুধু শনাক্ত সদস্যের সংখ্যা নয়, পরীক্ষার আওতা ও নীতির সমতা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

কোর্সের মধ্যেই শনাক্ত
সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ডিএসসিএসসি-২০২৬ কোর্সে অংশ নিতে গত ৮ জানুয়ারি পুলিশ অধিদপ্তর থেকে মিরপুর সেনানিবাসে যান আ ফ ম নিজাম উদ্দিন। কোর্স চলাকালে গত ৭ জুন অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নেওয়া হয়।

সেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার অংশ হিসেবে তাঁর ডোপ টেস্ট করা হয়। পরীক্ষায় তাঁর মূত্রের নমুনায় বেনজোডায়াজেপিন এবং অ্যামফিটামিন/মেথঅ্যামফিটামিন পজিটিভ পাওয়া যায়।

সরকারি প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, পরীক্ষার ফলাফল সামরিক বাহিনী কমান্ড ও স্টাফ কলেজের চলমান কোর্সের শৃঙ্খলার পরিপন্থী। ঘটনাটিকে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর বিধি ৩(খ) অনুযায়ী ‘অসদাচরণ’ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।

এর পরিপ্রেক্ষিতে একই বিধিমালার ১২(১) অনুযায়ী তাঁকে সরকারি চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। আদেশের কার্যকারিতা ধরা হয়েছে ৩১ আগস্ট ২০২৬ থেকে। সাময়িক বরখাস্তকালীন তিনি বিধি অনুযায়ী খোরপোষ ভাতা পাবেন।

এত দিন কেন নিচের পদগুলোতে?
পুলিশে ডোপ টেস্ট শুরু হওয়ার পর শনাক্তদের বড় অংশই কনস্টেবল। ২০২২ সালের জুলাই পর্যন্ত শনাক্ত ১২০ জনের মধ্যে ৮৪ জন কনস্টেবল ছিলেন। পরবর্তী সময়েও কনস্টেবলদের সংখ্যাই ছিল বেশি। অন্যদের মধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ের অধস্তন কর্মকর্তা ও পরিদর্শক ছিলেন।

এতে প্রশ্ন উঠেছে, ডোপ টেস্টের আওতা কি বাস্তবে বাহিনীর সব স্তরে সমান ছিল? মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের একটি অংশ বলছেন, ডোপ টেস্ট নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ। তবে এএসপি থেকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এত দিন নিয়মিত পরীক্ষার আওতায় না থাকায় বাহিনীর ভেতরে সবার জন্য সমান নিয়মের দাবি ছিল।

তাঁদের যুক্তি, মাদক ব্যবহারের ঝুঁকি পদমর্যাদার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় না। ফলে কনস্টেবলকে পরীক্ষা করে এসপি বা তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে পরীক্ষার বাইরে রাখলে মাদকমুক্ত বাহিনী গড়ার নীতি পুরোপুরি কার্যকর হবে না।

২০২৪-এর পর কমেছে তৎপরতা
ডোপ টেস্টের ধারাবাহিকতা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ২০২৪ সালের পর পুলিশের ডোপ টেস্ট নিয়ে আগের মতো তৎপরতা নেই। ফলে নিয়মিতভাবে সব সদস্যের পরীক্ষা হচ্ছে, নাকি সন্দেহের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট সদস্যদের পরীক্ষা করা হচ্ছে-তা স্পষ্ট নয়।

এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সন্দেহভাজন সদস্যকে পরীক্ষা করলে নির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে শনাক্ত করা সম্ভব হলেও পুরো বাহিনীর মধ্যে মাদক ব্যবহারের প্রকৃত চিত্র পাওয়া কঠিন। নিয়মিত ও আকস্মিক ডোপ টেস্ট চালু থাকলে পদমর্যাদা বা ব্যক্তিগত পরিচয়ের প্রভাব ছাড়াই ঝুঁকিপূর্ণ সদস্য শনাক্ত করা সম্ভব।

২০২২ সালের জুলাইয়ে ১২০ জন শনাক্ত হওয়ার পর ২০২৪ সালে সংখ্যাটি ১৩৪-এ পৌঁছায়। এরপর পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবে তা দেড় শতাধিক হয়েছে। কিন্তু মাঝের সময়ের পরীক্ষার ধরন ও ব্যাপ্তি নিয়ে স্পষ্ট তথ্য না থাকায় ডোপ টেস্ট কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

শুধু শাস্তি নয়, প্রতিরোধও জরুরি
পুলিশে মাদক শনাক্ত হলে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। তবে ডোপ টেস্টকে শুধু শাস্তি দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে দেখলে এর মূল উদ্দেশ্য পূরণ হবে না। মাদক ব্যবহারকারী সদস্যদের শনাক্ত করার পাশাপাশি তাঁদের চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনের সুযোগও থাকা দরকার।

একই সঙ্গে ডোপ টেস্টের ফল নিশ্চিত করার বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া কঠোর হওয়া জরুরি। কোনো সদস্য চিকিৎসকের পরামর্শে নির্দিষ্ট ওষুধ গ্রহণ করেছেন কি না, সেটিও যাচাইয়ের আওতায় থাকা প্রয়োজন। এতে পরীক্ষার ফলের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়বে এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাও হবে আরও নির্ভুল।

পুলিশ বাহিনীর ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পুলিশ সদস্যদের হাতে আইন প্রয়োগের ক্ষমতা রয়েছে। তাঁরা মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করেন, মাদক কারবারিদের গ্রেপ্তার করেন এবং মাদকসংক্রান্ত মামলার তদন্ত করেন। ফলে বাহিনীর ভেতরে মাদক ব্যবহারের ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত শৃঙ্খলার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জনআস্থা ও আইন প্রয়োগের বিশ্বাসযোগ্যতাও জড়িত।

সবার জন্য একই পরীক্ষা?
এসপি পর্যায়ের একজন কর্মকর্তার ডোপ টেস্টে মাদকের উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ার পর সব পর্যায়ের কর্মকর্তাকে পরীক্ষার আওতায় আনার দাবি আরও জোরালো হতে পারে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ভবিষ্যতে এএসপি থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও ডোপ টেস্টের আওতায় আনার বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

এ ধরনের ব্যবস্থা কার্যকর হলে পুলিশের মাদকবিরোধী নীতিতে বড় পরিবর্তন আসবে। তবে শুধু ঘোষণা নয়, নিয়মিত পরীক্ষা, আকস্মিক নমুনা সংগ্রহ, নির্ভরযোগ্য পরীক্ষাগার এবং ফলাফল যাচাইয়ের একটি স্বচ্ছ কাঠামো প্রয়োজন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো-পরীক্ষার ক্ষেত্রে পদমর্যাদা যেন কোনোভাবেই বিবেচ্য না হয়। কনস্টেবল থেকে এসপি, সবার জন্য একই নীতি কার্যকর হলেই ডোপ টেস্টের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে।

প্রথম এসপি, সামনে বড় পরীক্ষা
২০২০ সালে শুরু হওয়া ডোপ টেস্টে দেড় শতাধিক পুলিশ সদস্যের শরীরে মাদকের উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ার পর এবার প্রথম এসপি পর্যায়ের কর্মকর্তা সেই তালিকায় যুক্ত হলেন। ঘটনাটি তাই কেবল একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নেওয়া প্রশাসনিক ব্যবস্থা নয়; এটি পুলিশের মাদকবিরোধী নীতির কার্যকারিতা যাচাইয়েরও একটি বড় মুহূর্ত। এখন দেখার বিষয়, আ ফ ম নিজাম উদ্দিনের ঘটনায় বিষয়টি সাময়িক আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি পুলিশ বাহিনীর ডোপ টেস্ট ব্যবস্থায় স্থায়ী পরিবর্তন আনে।

কালের আলো/এম/এএইচ

সৌদিতে মৃত্যুদণ্ডের খবরে শোক, তবু মেয়ের ফেরার আশায় সুইটির মা

টাংগাইল সংবাদদাতা, কালের আলো
প্রকাশিত: বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬, ৭:৫১ পূর্বাহ্ণ
সৌদিতে মৃত্যুদণ্ডের খবরে শোক, তবু মেয়ের ফেরার আশায় সুইটির মা

সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবরে দিশেহারা হয়ে পড়েছে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার সুইটি আক্তারের পরিবার। মেয়ের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর শুনে শোকে ভেঙে পড়েছেন তাঁর বাবা-মা। তবে নানা তথ্য ও বিভ্রান্তিকর খবরের কারণে এখনো নিশ্চিত হতে পারছেন না, সত্যিই তাঁদের মেয়ের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে কি না। একদিকে মেয়েকে হারানোর শঙ্কা, অন্যদিকে সঠিক তথ্য না পাওয়ার অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে চরম উদ্বেগে দিন কাটছে পরিবারটির।

সুইটির বাবা ফজল মিয়া জানান, গত ১৩ অক্টোবরও সৌদি আরবে কারাবন্দি মেয়ের সঙ্গে তাঁদের কথা হয়েছিল। তখন মেয়ে বিচার বা মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে কিছু জানাননি। ফলে এমন পরিণতির খবর তাঁদের কাছে ছিল সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত।

গত ১৫ অক্টোবর সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাতে দেশটির সংবাদমাধ্যমে আগের দিন দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে তাঁদের নাম উল্লেখ করা হয় নাজেরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিতি আখতার হিসেবে। তবে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) বহির্গমন ছাড়পত্র এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য যাচাই করে তাঁদের পরিচয় সুইটি আক্তার ও নজরুল ইসলাম বলে জানা যায়।

সুইটির বাড়ি টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার মহেড়া ইউনিয়নে। অন্যদিকে নজরুল ইসলামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের বিরামপুর গ্রামে। দুজনই সৌদি আরবে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতে গিয়েছিলেন। পরে গ্রেপ্তার হয়ে দেশটির কারাগারে বন্দি ছিলেন।

সুইটির বাবা ফজল মিয়া বলেন, ‘গত মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সুইটির সঙ্গে কথা হয়। তবে বিচার বা মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে সে কিছু বলেনি। আমাদের জিজ্ঞেস করেছে, আমরা কেমন আছি। এর বাইরে টুকটাক আলাপ হয়েছে। আমরা তার কথা থেকে বুঝতে পারিনি যে এমন কিছু ঘটতে যাচ্ছে। তার মৃত্যুদণ্ড হয়েছে, এ খবরও আমরা জানতাম না।’

এদিকে সুইটি ও নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের পরিচয় ও সৌদি আরবে যাওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে নানা তথ্য ছড়ায়। কেউ কেউ দাবি করেন, তাঁরা ওমরাহ করতে গিয়ে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীও প্রথমে একজন প্রবাসী কর্মী ও অন্যজন ওমরাহ করতে গিয়েছিলেন বলে জানিয়েছিলেন। পরে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, দুজনই প্রবাসী কর্মী ছিলেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ছবিকে সুইটির ছবি বলে প্রচার করা হলেও তাঁর পরিবার জানিয়েছে, ছবিটি তাঁদের মেয়ের নয়। এসব পরস্পরবিরোধী তথ্য তাঁদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।

বাংলাদেশ সরকারও এ বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত তথ্য পায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে বাংলাদেশ সরকার। জেদ্দার বাংলাদেশ কনস্যুলেটও সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি পাঠিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই ব্যক্তির পরিচয়, তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ এবং শাস্তি কার্যকরের আগে বাংলাদেশকে অবহিত না করার বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়েছে।

মেয়ে এখনো বেঁচে থাকতে পারে—এ আশাতেই রয়েছেন সুইটির মা জোহরা বেগম। তিনি বলেন, ‘আজ জানতে পারলাম, আমার মেয়েকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আমরা কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না। আমরা দিশেহারা। সরকারের কাছে আমার মেয়েকে বাঁচানোর আকুল আবেদন জানাই।’

সুইটির বাবা ফজল মিয়া বলেন, যদি তাঁর মেয়ের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়ে থাকে, তাহলে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হোক।

সরকারি নথি অনুযায়ী, সুইটির জন্ম ২০০১ সালের ১১ আগস্ট। ২০২৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ‘এস রানা ট্রেডিং ইন্টারন্যাশনাল’ নামের একটি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে সৌদি আরবে যাওয়ার বহির্গমন ছাড়পত্র পান তিনি। দেশটিতে তাঁর নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ছিল ‘আল মাজাল আল আরাবি গ্রুপ কোম্পানি’।

স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর পরিবারের সহায়তায় শ্রমিক হিসেবে সৌদি আরবে পাড়ি জমান সুইটি। তাঁর মা জানান, স্বামী আরেকটি বিয়ে করায় মেয়েকে বাড়িতে নিয়ে আসেন তাঁরা। পরে সুইটি আর সংসার করতে চাননি। একপর্যায়ে বিদেশে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলে তাঁকে সৌদি আরবে পাঠানো হয়।

জোহরা বেগম বলেন, প্রথম দিকে মেয়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ থাকলেও হঠাৎ তা বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় এক মাস আগে সুইটির এক বান্ধবীর মাধ্যমে জানতে পারেন, তাঁর মেয়ে এক বছর ধরে সৌদি আরবের কারাগারে রয়েছেন।

সুইটির বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য না পাওয়ায় উদ্বিগ্ন তাঁর গ্রামবাসীও। মহেড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিভাষ সরকার নুপুর বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক ও স্পর্শকাতর। সুইটির পরিবার যেন সঠিক তথ্য পায় এবং প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা পায়, সে জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা প্রয়োজন। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে সুইটিকে দেশে ফিরিয়ে আনা কিংবা তাঁর সাজা পুনর্বিবেচনার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মক্কার একটি মসজিদে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে সুইটি ও নজরুলকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও রাজকীয় আদেশের পর ১৪ অক্টোবর মক্কা অঞ্চলে তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তবে কী ধরনের কর্মকাণ্ডের অভিযোগে তাঁদের এ সাজা দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানায়নি সৌদি কর্তৃপক্ষ।

পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, সৌদি আরবে যাওয়ার প্রায় ছয় মাসের মাথায় গ্রেপ্তার হন সুইটি। অন্যদিকে নজরুল ইসলাম ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর সৌদি আরবে যান। তাঁর গ্রেপ্তারের খবরও প্রায় ছয় মাসের মধ্যে পরিবারের কাছে পৌঁছায়।

মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর প্রকাশের পরও পরিচয় ও ঘটনার বিস্তারিত বিষয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি সুইটির পরিবারের। এখন তাঁদের একটাই প্রত্যাশা—সরকার দ্রুত সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করে প্রকৃত ঘটনা নিশ্চিত করবে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি 

ছোট ঘরে মাশরুম চাষ, বদলে গেছে আব্দুল মোমিনের জীবন

বগুড়া সংবাদদাতা, কালের আলো
প্রকাশিত: বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬, ৭:২১ পূর্বাহ্ণ
ছোট ঘরে মাশরুম চাষ, বদলে গেছে আব্দুল মোমিনের জীবন

পড়াশোনা শেষ করে কী করবেন, তা নিয়ে একসময় দুশ্চিন্তায় ছিলেন বগুড়ার সোনাতলা উপজেলার শালিখা গ্রামের আব্দুল মোমিন। পরিবারের আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে অল্প পুঁজিতে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখেন তিনি। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে মাত্র ১২ হাজার টাকা দিয়ে শুরু করেন মাশরুম চাষ। সময়ের সঙ্গে তাঁর সেই ছোট উদ্যোগ এখন বড় খামারে রূপ নিয়েছে। বর্তমানে খামারে রয়েছে ১২ হাজারের বেশি মাশরুমের স্পন প্যাকেট। প্রতিদিন বিক্রি করছেন ৩০ থেকে ৪০ কেজি মাশরুম।

মোমিনের এই সাফল্য স্থানীয় তরুণদের মধ্যেও মাশরুম চাষে আগ্রহ তৈরি করেছে। তাঁর খামার দেখতে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসছেন উৎসাহী মানুষ। এখন তাজা মাশরুম বিক্রির পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাত পণ্য তৈরি করে ব্যবসা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছেন তিনি।

মোমিন স্থানীয় শালিখা উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাসের পর বয়রা টেকনিক্যাল কলেজে ভর্তি হন। সেখান থেকে এইচএসসি পাস করার পর চাকরির অপেক্ষায় না থেকে নিজেই কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন। স্কুলজীবনে পাঠ্যবইয়ে মাশরুমের ছবি দেখে এ বিষয়ে তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সেই আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে উদ্যোক্তা হওয়ার পথে এগিয়ে যান তিনি।

২০২২ সালের নভেম্বরে মাগুরার গ্রিন মাশরুম সেন্টার থেকে প্রশিক্ষণ নেন মোমিন। প্রশিক্ষণ শেষে ঢাকার সাভার থেকে প্রায় ১২ হাজার টাকার মাশরুমের বীজ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কেনেন। বাড়ির একটি ছোট ঘরে সীমিত পরিসরে শুরু করেন চাষ। ধীরে ধীরে অভিজ্ঞতা ও উৎপাদন বাড়তে থাকে। ২০২৪ সালে মামা আতাউর হোসেনকে সঙ্গে নিয়ে খামার সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেন তিনি।

মোমিন জানান, মাশরুম চাষ করে বর্তমানে সব খরচ বাদ দিয়ে ভালো আয় করতে পারছেন। একটি স্পন প্যাকেট থেকে ২৫ থেকে ৩৫ দিনের মধ্যে ফলন পাওয়া যায়। দুই কেজির একটি স্পন প্যাকেট থেকে এক দফায় ৩০০ থেকে ৫০০ গ্রাম মাশরুম উৎপাদিত হয়। বর্তমানে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ কেজি মাশরুম বিক্রি করছেন তিনি। প্রতি কেজি মাশরুম বিক্রি হচ্ছে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায়। অবিক্রীত মাশরুম রোদে শুকিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্রি করেন।

বর্তমানে তাঁর খামারে রয়েছে ১২ হাজারের বেশি স্পন প্যাকেট। এসব প্যাকেট থেকে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় হাজার কেজি মাশরুম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন তিনি।

তবে শুধু তাজা মাশরুম বিক্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে চান না মোমিন। মাশরুম দিয়ে আচার তৈরি এবং শুকিয়ে গুঁড়া উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। এতে পণ্য সংরক্ষণের সময় বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন বাজার তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে আশা করছেন তিনি।

মোমিন বলেন, ‘আচার আমাদের সবার পছন্দ। মাশরুম দিয়ে আচার তৈরি করতে চাই। পাশাপাশি মাশরুম শুকিয়ে গুঁড়া তৈরির কাজও শুরু করার ইচ্ছা আছে। সরকারি সহযোগিতা ও সহজ শর্তে ঋণ পেলে খামারের পরিধি আরও বাড়াতে পারব। আমার লক্ষ্য, এ চাষের মাধ্যমে আরও মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা।’

মাশরুম পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ একটি খাদ্য। এতে প্রোটিন, ভিটামিন, খনিজ উপাদান ও খাদ্যআঁশ রয়েছে। পুষ্টিকর এই খাদ্যের চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।

সোনাতলা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সোহরাব হোসেন বলেন, মাশরুম খামারে ঋতু ও পরিবেশের উপযোগী বিভিন্ন ধরনের মাশরুম চাষ করা যায়। মোমিনের মতো তরুণ উদ্যোক্তাদের উদ্যোগ দেখে স্থানীয় শিক্ষিত বেকার যুবকদের মধ্যেও এ চাষে আগ্রহ তৈরি হচ্ছে। কৃষি অফিস থেকে সরাসরি আর্থিক সহায়তা দেওয়া সম্ভব না হলেও চাষিদের বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, মাশরুমের উৎপাদন, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণের সুযোগ বাড়ানো গেলে এ খাত গ্রামীণ তরুণদের স্বাবলম্বী হওয়ার নতুন পথ তৈরি করতে পারে। মাত্র ১২ হাজার টাকার পুঁজি নিয়ে মোমিনের শুরু করা উদ্যোগ এখন সেই সম্ভাবনারই একটি উদাহরণ।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি 

বাড়ি তৈরির জমিতে তরমুজের বাগান, আব্দুস শহীদের চোখে লাখ টাকার স্বপ্ন

হবিগঞ্জ সংবাদদাতা,কালের আলো
প্রকাশিত: বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬, ১:২২ পূর্বাহ্ণ
বাড়ি তৈরির জমিতে তরমুজের বাগান, আব্দুস শহীদের চোখে লাখ টাকার স্বপ্ন

বাড়ি নির্মাণের জন্য চারদিকে পাকা প্রাচীর দিয়ে ঘেরা ১৫ শতক জমি। সেখানে বাড়ির কাজ শুরুর আগপর্যন্ত জমিটি পতিত পড়ে থাকার কথা ছিল। কিন্তু সেই জমিতেই তরমুজ চাষ করে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছেন হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার কামারগাঁও গ্রামের কৃষক আব্দুস শহীদ। মাত্র ১০ হাজার টাকা খরচ করে মাচা ও মালচিং পদ্ধতিতে তরমুজ চাষ করেছেন তিনি। এখন তাঁর ক্ষেতের চার শতাধিক গাছে ঝুলছে ছোট-বড় এক হাজারের বেশি তরমুজ। সবকিছু অনুকূলে থাকলে ফল বিক্রি করে লাখ টাকার বেশি আয় করার আশা করছেন এই কৃষক।

পাকা প্রাচীরের ভেতর তরমুজের বাগান
কামারগাঁও গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ি নির্মাণের জন্য প্রস্তুত করা প্রায় ১৫ শতক জমির চারপাশে পাকা প্রাচীর। সেই প্রাচীরের ভেতরেই মাচা তৈরি করে সারি সারি তরমুজগাছ লাগানো হয়েছে। গাছের পাতার ফাঁকে ফাঁকে ঝুলছে হলুদ ও কালো রঙের অসংখ্য তরমুজ। কোথাও ছোট ফল, কোথাও আবার বড় আকারের তরমুজে নুয়ে পড়েছে লতাগুলো।

ইউনাইটেড কোম্পানির ‘মধুমালা’ ও ‘ব্ল্যাকবেবি’ জাতের তরমুজ চাষ করা হয়েছে সেখানে। ফ্রিপ প্রকল্পের আওতায় মালচিং পেপার প্রদর্শনীর অংশ হিসেবে এ চাষ করা হয়। সীমিত জায়গায় পরিকল্পিতভাবে মাচা তৈরি করে তরমুজ চাষের এই উদ্যোগ এখন স্থানীয়দের কাছে আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছে।

কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শেই শুরু
কৃষক আব্দুস শহীদ জানান, বাড়ি নির্মাণের উদ্দেশ্যে জমিটির চারপাশে পাকা প্রাচীর তৈরি করেছিলেন তিনি। তবে বাড়ির কাজ শুরু করার আগে জমিটি বেশ কিছুদিন অব্যবহৃত পড়ে থাকার কথা ছিল। এ সময় মাঠ পরিদর্শনে এসে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. শামিমুল হক শামীম তাঁকে জমিটি ফেলে না রেখে তরমুজ চাষের পরামর্শ দেন।

কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শে আগ্রহী হয়ে ওঠেন আব্দুস শহীদ। এরপর উন্নত জাতের তরমুজের চারা রোপণ করে মাচা তৈরি এবং মালচিং পেপার পদ্ধতিতে চাষ শুরু করেন। তাঁর এই উদ্যোগ এখন ভালো ফলনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

আব্দুস শহীদ বলেন, ‘বাড়ি নির্মাণের আগে জমিটা যেন পতিত পড়ে না থাকে, সেই চিন্তা থেকেই তরমুজ চাষ শুরু করি। কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শে অল্প জায়গায় মাচা তৈরি করে তরমুজ লাগিয়েছি। চাষাবাদে আমার প্রায় ১০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এখন গাছে গাছে প্রচুর তরমুজ। ছোট-বড় মিলিয়ে হাজারেরও বেশি তরমুজ রয়েছে। কিছুদিনের মধ্যেই বিক্রি শুরু করতে পারব বলে আশা করছি। ফলন ভালো থাকলে লাখ টাকার বেশি বিক্রি হতে পারে।’

অসময়ে চাষ করেও ভালো ফলনের আশা
আব্দুস শহীদ জানান, অসময়ে তরমুজ চাষ করেও গাছে ভালো ফলন এসেছে। তবে আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ফলন আরও ভালো হতে পারত বলে মনে করেন তিনি। নিজের উদ্যোগে অল্প জায়গায় এত বেশি তরমুজ উৎপাদন করতে পেরে আশাবাদী এই কৃষক।

তাঁর প্রত্যাশা, বাজারে তরমুজের ভালো দাম পেলে এই চাষ থেকে উল্লেখযোগ্য আয় হবে। সেই অর্থ ভবিষ্যতে কৃষিকাজে আরও বিনিয়োগ এবং নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজে লাগাতে পারবেন তিনি। তবে সম্ভাব্য বিক্রির আয় এখনো প্রত্যাশার পর্যায়ে রয়েছে। ফলের চূড়ান্ত উৎপাদন, বাজারদর এবং বিক্রির খরচের ওপর নির্ভর করবে প্রকৃত লাভের পরিমাণ।

আব্দুস শহীদের সাফল্যে উৎসাহিত অন্য কৃষকেরা
স্থানীয় কৃষকদের মধ্যেও আব্দুস শহীদের এই উদ্যোগ সাড়া ফেলেছে। তাঁদের মতে, কৃষিকাজে আগ্রহ, পরিশ্রম ও সঠিক দিকনির্দেশনা থাকলে অল্প জমিতেও ভালো ফলন সম্ভব। প্রচলিত ফসলের বাইরে নতুন জাতের তরমুজ চাষ করে আব্দুস শহীদ সেই সম্ভাবনা দেখিয়েছেন।

স্থানীয় কয়েকজন কৃষক বলেন, ‘চেষ্টা থাকলে কঠিন কাজও সহজ করা যায়, আব্দুস শহীদের ক্ষেত তার প্রমাণ। অল্প জায়গায় তিনি যেভাবে তরমুজ চাষ করেছেন এবং ফলন পেয়েছেন, তা আমাদের উৎসাহিত করেছে। তাঁর কাছ থেকে এ জাতের তরমুজ চাষ সম্পর্কে পরামর্শ নিয়েছি। ভবিষ্যতে আমরাও এভাবে তরমুজ চাষ করার পরিকল্পনা করছি।’ তাঁরা মনে করেন, কৃষি বিভাগের সহযোগিতা ও আধুনিক চাষপদ্ধতি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ পেলে এলাকার আরও কৃষক নতুন ফসল চাষে আগ্রহী হবেন। বাড়ির আশপাশের অব্যবহৃত জমি, পতিত জায়গা কিংবা সীমিত কৃষিজমি পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো গেলে কৃষকের আয়ের নতুন পথ তৈরি হতে পারে।

কৃষি বিভাগের পরামর্শে বাড়ছে আগ্রহ
উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. শামিমুল হক শামীম বলেন, ‘কৃষকদের পাশে থেকে কাজ করতে আমার ভালো লাগে। মাঠে গিয়ে কৃষকদের পরামর্শ দিতে পারলে মনে আনন্দ আসে। মাঠ পরিদর্শনে গিয়ে আব্দুস শহীদকে জমি পতিত না রেখে তরমুজ চাষের পরামর্শ দিয়েছিলাম। তিনি সেই পরামর্শ অনুযায়ী চাষ করে ভালো ফলন পেয়েছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ফলন আরও ভালো হতে পারত। তারপরও অসময়ে তরমুজের ভালো ফলন হয়েছে। তাঁর ক্ষেত দেখে এলাকার অন্যান্য কৃষকও উৎসাহিত হচ্ছেন। অনেকে এ জাতের তরমুজ চাষের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কৃষকদের আগ্রহ বাড়লে ভবিষ্যতে এ ধরনের চাষ আরও সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে।’ বাহুবল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা চিন্ময় কর অপু বলেন, কৃষকদের কল্যাণে কাজ করাই কৃষি বিভাগের দায়িত্ব। কৃষকদের বিভিন্ন ধরনের ফসল চাষে উৎসাহিত করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে অনেক কৃষক নতুন নতুন ফসল চাষ করে সফলতা পাচ্ছেন।

আব্দুস শহীদ তাঁদেরই একজন উল্লেখ করে তিনি বলেন, কৃষকটি উপজেলার পশ্চিম জয়পুর ব্লকের কামারগাঁও গ্রামের বাসিন্দা। অসময়ে তরমুজ চাষ করে তিনি ভালো ফলন পেয়েছেন। সম্প্রতি তাঁর ক্ষেত পরিদর্শন করে ভালো লেগেছে বলেও জানান এই কর্মকর্তা। তিনি আরও বলেন, আধুনিক কৃষিপদ্ধতি অনুসরণ করে কৃষকেরা যেন জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে পারেন, সে বিষয়ে কৃষি বিভাগ কাজ করছে। নতুন ফসল চাষে উৎসাহিত করা এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়ার কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

অল্প জমিতে নতুন সম্ভাবনার দৃষ্টান্ত
আব্দুস শহীদের তরমুজক্ষেত দেখিয়ে দিয়েছে, কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরির জন্য সব সময় বড় জমি কিংবা বিপুল বিনিয়োগের প্রয়োজন হয় না। সঠিক পরিকল্পনা, আধুনিক চাষপদ্ধতি, কৃষি বিভাগের পরামর্শ এবং পরিশ্রমের সমন্বয়ে অব্যবহৃত জমিও আয়ের উৎস হয়ে উঠতে পারে। এখন ফল বিক্রির অপেক্ষায় রয়েছেন আব্দুস শহীদ। গাছে গাছে বেড়ে ওঠা তরমুজগুলো বাজারে ভালো দামে বিক্রি করতে পারলে পূরণ হতে পারে তাঁর আর্থিক প্রত্যাশা। পাশাপাশি তাঁর উদ্যোগ দেখে এলাকার অন্য কৃষকেরাও যদি নতুন ফসল চাষে এগিয়ে আসেন, তাহলে ব্যক্তিগত সাফল্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে এটি হয়ে উঠতে পারে স্থানীয় কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার অনুপ্রেরণা।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি