সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মক্কা ও মদিনা অভিমুখে ছোড়া দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার দাবি করেছে দেশটির বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ। শনিবার, ২৪ অক্টোবর, কর্তৃপক্ষ জানায়, ক্ষেপণাস্ত্র দুটি প্রতিহত করার পর সেগুলোর ধ্বংসাবশেষ সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় পড়েছে। তবে মক্কা ও মদিনাকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা।
এদিকে সৌদি আরবের বিভিন্ন অঞ্চলে সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করা হয়েছে। অন্যদিকে, দেশটির একাধিক বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা ও সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালানোর দাবি করেছে হুতিরা। দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে সৌদি আরব ও ইয়েমেনকে ঘিরে নতুন করে আঞ্চলিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
মক্কা ও মদিনা অঞ্চলে পড়েছে ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ
সৌদি আরবের বেসামরিক প্রতিরক্ষা অধিদপ্তর শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানায়, দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার পর সেগুলোর ধ্বংসাবশেষ দেশটির বিভিন্ন স্থানে পড়ে। বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, মক্কার বাইরে ওয়াদি মুঘামাস, জেদ্দার আল-নুঝা এলাকা, তাইফের ওয়াদি জালিল এবং রাবিগের একটি জনবসতিহীন স্থানে ধ্বংসাবশেষ পড়েছে। তবে এসব ঘটনায় কেউ হতাহত হয়েছেন কি না কিংবা কোনো স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানায়নি কর্তৃপক্ষ।
সৌদি কর্তৃপক্ষের এই বক্তব্যের পর পবিত্র দুই নগরীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মক্কা ও মদিনা বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমানের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থান হওয়ায় এসব এলাকাকে ঘিরে যেকোনো নিরাপত্তা পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করে। তবে ক্ষেপণাস্ত্র দুটি কোথা থেকে ছোড়া হয়েছিল, সেগুলোর সম্ভাব্য লক্ষ্য কী ছিল এবং প্রতিহত করার প্রক্রিয়াটি কীভাবে সম্পন্ন হয়েছে, সে বিষয়ে বিবৃতিতে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
মক্কা মদিনাকে লক্ষ্য করার অভিযোগ অস্বীকার হুতিদের
সৌদি আরবের পক্ষ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার দাবি সামনে আসার পর তা সরাসরি অস্বীকার করেছে হুতি বিদ্রোহীরা। সংগঠনটির সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বলেছেন, সৌদি আরবের পক্ষ থেকে হুতিদের বিরুদ্ধে মক্কা ও মদিনাকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার যে অভিযোগ করা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা।
ফলে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার ঘটনা নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে স্পষ্ট বিরোধ দেখা দিয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা এবং বিভিন্ন স্থানে ধ্বংসাবশেষ পড়ার কথা জানালেও হুতিরা পবিত্র নগরী দুটিকে লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য ছাড়া ক্ষেপণাস্ত্রের উৎস ও নির্দিষ্ট লক্ষ্য সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন। এ বিষয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যের পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য স্বাধীন তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ।
সৌদির পশ্চিমাঞ্চলের চার প্রদেশে নিরাপত্তা সতর্কতা
ক্ষপণাস্ত্র প্রতিহত করার খবর প্রকাশের আগে সৌদি আরবের বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ দেশটির পশ্চিমাঞ্চলের চারটি প্রদেশে সম্ভাব্য বিপদের বিষয়ে সতর্কতা জারি করেছিল। এসব এলাকার মধ্যে মক্কা অঞ্চলও রয়েছে। সতর্কবার্তায় বাসিন্দাদের নিকটতম নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে সতর্কতা জারির সুনির্দিষ্ট কারণ এবং সম্ভাব্য বিপদের ধরন সম্পর্কে কর্তৃপক্ষ বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি।
সৌদি আরবের বিভিন্ন অঞ্চলে নিরাপত্তা সতর্কতা জারির বিষয়টি সাম্প্রতিক উত্তেজনার গুরুত্ব বাড়িয়েছে। বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার দাবি এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের মধ্যে বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনায় হামলার দাবি হুতিদের
সৌদি আরবের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা চালানোর দাবিও করেছে হুতি বিদ্রোহীরা। সংগঠনটির ভাষ্য অনুযায়ী, শুক্রবার ও শনিবারের মধ্যে দেশটির তিনটি বিমানবন্দর, দুটি তেল স্থাপনা, একটি তেল পরিবহন পাইপলাইন এবং একটি বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি দাবি করেন, সৌদি রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দুই ধাপে হামলা চালানো হয়েছে। এ ছাড়া দাম্মাম ও নাজরান অঞ্চলের বিমানবন্দর এবং দক্ষিণাঞ্চলের খামিস মুশাইত বিমানঘাঁটিও হামলার লক্ষ্য ছিল বলে দাবি করেছে সংগঠনটি।
তবে এসব হামলার বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কী প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে, হামলায় কী ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কিংবা সব লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা সম্ভব হয়েছে কি না, তা সরবরাহ করা প্রতিবেদনে স্পষ্ট নয়। তাই হুতিদের এসব দাবিকে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া তথ্য হিসেবে বিবেচনা করা যাচ্ছে না। সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামো আঞ্চলিক যোগাযোগ এবং অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এসব স্থাপনায় হামলার দাবি সত্য হলে তা দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতির পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহ ও পরিবহনব্যবস্থার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে সংঘাতের পুরোনো প্রেক্ষাপট
সৌদি আরব ও ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যে বিরোধ দীর্ঘদিনের। ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দিয়ে আসছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। অন্যদিকে, হুতিরা রাজধানী সানাসহ দেশটির বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ও হুতিদের মধ্যে সীমান্তপারের হামলা অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে ছিল।
তবে সেই যুদ্ধবিরতি ইয়েমেনের সংঘাতের সব দিকের স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করতে পারেনি। সাম্প্রতিক সময়ে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার দাবি, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার অভিযোগ এবং দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য নতুন করে সংঘাত বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি করেছে। পরিস্থিতি আরও অবনতি হলে সৌদি আরব ও ইয়েমেনের সীমান্তবর্তী অঞ্চল ছাড়াও বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে প্রভাব পড়তে পারে।
জ্বালানি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
সৌদি আরবের তেল স্থাপনা, পাইপলাইন, বিমানবন্দর ও সামরিক ঘাঁটিকে ঘিরে হামলার দাবি সামনে আসায় দেশটির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশ হওয়ায় দেশটির জ্বালানি অবকাঠামোয় বড় ধরনের বিঘ্ন আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রভাব ফেলতে পারে। তবে সম্ভাব্য প্রভাব নির্ভর করবে হামলার দাবির সত্যতা, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এবং জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা কতটা সচল রয়েছে তার ওপর। এখন পর্যন্ত সরবরাহ করা তথ্যের ভিত্তিতে এসব বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না।
সব মিলিয়ে, মক্কা ও মদিনা অভিমুখে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার সৌদি দাবি এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার বিষয়ে হুতিদের বক্তব্য নতুন করে উত্তেজনা বাড়িয়েছে। দুই পক্ষের অবস্থান স্পষ্ট হলেও ঘটনার সব দিক এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত নয়। পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপ্রকৃতি নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নতুন তথ্য, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং সংঘাত নিয়ন্ত্রণে নেওয়া পদক্ষেপের ওপর। সূত্র: এনডিটিভি
কালের আলো/এসএ/আরআইকে
আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]