প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে এক দিনেই বড় ধরনের রদবদল। একের পর এক ১০টি প্রজ্ঞাপনে বদলে গেছে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মন্ত্রণালয় ও সংস্থার নেতৃত্বের বিন্যাস। কেউ পেয়েছেন নতুন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব, কেউ পদোন্নতি পেয়ে হয়েছেন সচিব, আবার কাউকে দেওয়া হয়েছে ভারপ্রাপ্ত সচিবের দায়িত্ব। একজন সচিবকে সংযুক্ত করা হয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে। এই পুনর্বিন্যাসে শুধু পদ বদলের হিসাব নয়, প্রশাসনের প্রতি সরকারের প্রত্যাশা ও অসন্তোষের বার্তাও খুঁজে পাচ্ছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বার্তাটি স্পষ্ট—গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা মানেই সেখানে বহাল থাকার নিশ্চয়তা নয়; কাজের গতি, দক্ষতা ও দায়িত্ব পালনের সক্ষমতাই শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই প্রশাসনে গতি ফেরানোর কথা বলে আসছে। কিন্তু নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অসন্তোষ রয়েছে, প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না সরকারি কার্যক্রম। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা, কাজে অনীহা এবং ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধা আদায়ে কর্মকর্তাদের বেশি মনোযোগ দেওয়ার অভিযোগও আলোচনায় রয়েছে। বিদেশ সফর ও প্রশিক্ষণের সুযোগ নিয়ে কর্মকর্তাদের আগ্রহের বিষয়টিও এ আলোচনার বাইরে নয়।
- এক দিনে ১০ প্রজ্ঞাপনে সচিব পর্যায়ে বড় পরিবর্তন
- পদোন্নতি, বদলি ও ভারপ্রাপ্ত নিয়োগে নতুন নেতৃত্ব
- প্রশাসনিক গতি, জবাবদিহি ও সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বাড়তি প্রত্যাশা
গত রবিবারের (১৮ অক্টোবর) রদবদলকে এই প্রেক্ষাপটেই তাৎপর্যপূর্ণ মনে করা হচ্ছে। সরকারের প্রত্যাশা, কর্মকর্তারা ব্যক্তিগত সুবিধার ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রের দায়িত্বকে অগ্রাধিকার দেবেন এবং সরকারি কর্মসূচি বাস্তবায়নে আন্তরিকতা দেখাবেন। দায়িত্বে থেকে প্রত্যাশিত ফল দিতে না পারলে পদ আঁকড়ে থাকার সুযোগ সীমিত হতে পারে—এমন বার্তাও রয়েছে প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের এই পুনর্বিন্যাসে।
রাজনৈতিক নেতৃত্বেও বদলের নজির
দায়িত্ব পালনে ঘাটতি থাকলে পরিবর্তনের মুখে পড়তে পারেন—এমন বার্তা শুধু প্রশাসনের জন্যই নয়, রাজনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা আলোচনায় এনেছে। তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে পরিবর্তন, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের পদত্যাগ এবং সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগের ঘটনা সেই আলোচনার অংশ। সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের সাড়ে তিন মাসের মাথায় পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়কমন্ত্রী দীপেন দেওয়ানও পদত্যাগ করেন। সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে তাঁর পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার পর তা গৃহীত হয়।
এসব ঘটনা সামনে রেখে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা, প্রশাসনের ক্ষেত্রেও দায়িত্ব পালনের সক্ষমতাকে গুরুত্ব দেওয়ার বার্তা দেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘদিন একটি পদে থাকলেই সেই পদে অবস্থান স্থায়ী হয়ে যায় না; সরকারের অগ্রাধিকার অনুযায়ী কাজ করতে না পারলে কিংবা প্রত্যাশিত দক্ষতা দেখাতে ব্যর্থ হলে অন্য কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে।
তবে সব বদলিই যে শাস্তিমূলক, তা নয়। জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ আকরাম হোসেনের মতে, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের উদ্দেশ্য হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ পদে নতুন নেতৃত্ব আনা, দায়িত্বের ভারসাম্য তৈরি করা এবং কাজের গতি বাড়ানো। কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ না করা হলে শুধু বদলি বা সংযুক্তির ভিত্তিতে তাঁর কর্মদক্ষতা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও ঠিক নয়।
যাঁদের দায়িত্বে রদবদল
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের গত ১৮ অক্টোবরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরীকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব করা হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আয়েশা আক্তার পদোন্নতি পেয়ে হয়েছেন বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব আতাউর রহমান খানকে পাঠানো হয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব জাকারিয়াকে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আশরাফুল ইসলামকে সচিব মর্যাদায় জাতীয় প্রশাসন একাডেমির রেক্টর পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং অতিরিক্ত সচিব মো. আবুল হাছানাত হুমায়ূন কবীরকে দেওয়া হয়েছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিবের দায়িত্ব।
জাতীয় উন্নয়ন প্রশাসন একাডেমির রেক্টর ড. কামরুজ্জামান হয়েছেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব। এ বিভাগের সচিব বিলকিস জাহান রিমিকে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য পদে বদলি করা হয়েছে; এ পদে তিনি সচিব মর্যাদা পাবেন। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মাহবুব-উল-আলমকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। তাঁর মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মাহফুজুল আলম খান পেয়েছেন ভারপ্রাপ্ত সচিবের দায়িত্ব।
এই পরিবর্তনে বাণিজ্য, নৌপরিবহন, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রের নেতৃত্বে নতুন বিন্যাস তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন, জাতীয় প্রশাসন একাডেমি ও পরিকল্পনা কমিশনেও দায়িত্ব পুনর্বণ্টন হয়েছে। নতুন দায়িত্বে কর্মকর্তারা কতটা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, সরকারি কর্মসূচি বাস্তবায়নে কী অগ্রগতি আনেন এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে কতটা গতি ফেরাতে পারেন, এখন সেদিকেই নজর থাকবে।
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে কি নতুন সংকেত?
প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের এই পরিবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ। আগের সরকার ও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের চুক্তিতে সচিবসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে নতুন চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের পরিবর্তে নিয়মিত কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে দায়িত্ব দেওয়া এবং ভারপ্রাপ্ত সচিব নিয়োগের প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে।
গত ১৮ অক্টোবরের প্রজ্ঞাপনেও দুজন অতিরিক্ত সচিবকে ভারপ্রাপ্ত সচিব করা হয়েছে। এর আগে ভূমি মন্ত্রণালয়ে এমদাদুল হক চৌধুরীকে ভারপ্রাপ্ত সচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়। অন্যদিকে, ভূমি মন্ত্রণালয়ের সাবেক জ্যেষ্ঠ সচিব এএসএম সালেহ আহমেদের চুক্তির মেয়াদ আর না বাড়ানোর সিদ্ধান্তও এ আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।
গত আগস্টে সচিব ও সমমর্যাদার ৭৯ কর্মকর্তার মধ্যে ২৩ জন চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে কর্মরত ছিলেন। অর্থাৎ ওই সময় শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রায় ২৯ শতাংশই ছিলেন চুক্তিভিত্তিক। এই পরিসংখ্যান প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ব্যাপকতা তুলে ধরে।
পদ নয়, এবার কাজের পরীক্ষা?
ভারপ্রাপ্ত সচিব নিয়োগের মধ্য দিয়ে কর্মকর্তাদের বাস্তব দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে সক্ষমতা যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এ ধরনের নিয়োগকে পদোন্নতির নিশ্চয়তা কিংবা যোগ্যতার চূড়ান্ত স্বীকৃতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কার্যকর মূল্যায়নের জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য, সময়মতো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন, নিয়মিত অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং জনসেবার মান যাচাই।
পদোন্নতি ও পদায়নে পেশাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও নিরপেক্ষতার গুরুত্বও নিশ্চিত করতে হবে। শুধু বদলি করে প্রশাসনের গতি ফেরানো সম্ভব নয়; কর্মকর্তাদের কাজের ফলাফল পরিমাপের ব্যবস্থা না থাকলে রদবদলের উদ্দেশ্যও শেষ পর্যন্ত অস্পষ্ট থেকে যেতে পারে।
এক দিনে ১০টি প্রজ্ঞাপনে প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে যে পরিবর্তন এসেছে, তা সরকারের প্রত্যাশা ও কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনের মধ্যে নতুন করে হিসাব মেলানোর পরিস্থিতি তৈরি করেছে। এখন দেখার বিষয়, নতুন দায়িত্ব পাওয়া কর্মকর্তারা কতটা দ্রুত কাজ এগিয়ে নিতে পারেন, সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কতটা কার্যকর হন এবং জনসেবায় কী ধরনের পরিবর্তন আনেন।
প্রশাসনের সামনে তাই মূল চ্যালেঞ্জ শুধু নতুন পদে দায়িত্ব নেওয়া নয়, বরং সেই দায়িত্বের বাস্তব ফল দেখানো। রদবদলের পর কাজের গতি বাড়লে এবং মূল্যায়ন যদি হয় পরিমাপযোগ্য ফলাফলের ভিত্তিতে, তবেই দক্ষতা ও জবাবদিহির বার্তা বাস্তবে রূপ পাবে। শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের এই ঝাঁকুনির সাফল্য নির্ধারিত হবে প্রজ্ঞাপনের সংখ্যায় নয়, সরকারি কাজে দৃশ্যমান পরিবর্তনে।
কালের আলো/জেএন/এএএন
আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]