জ্বালানির আগুনে পুড়বে কি জনজীবন?
দেশে ডিজেল, কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রোলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়িয়েছে সরকার। নতুন দামে ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা এবং পেট্রোল ১৬০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে জ্বালানি ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি পরিবহন, শিল্প, উৎপাদন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কারণ জ্বালানির সাথে সব রকমের উৎপাদন ও পরিবহন জড়িত। রাজধানীতে যত নিত্যপন্য বিভিন্ন জেলা উপজেলা থেকে আসে তার পথের খরচ বেড়ে যাবে বিশ শতাংশ। উৎপাদিত প্রতিটি পণ্যের উৎপাদন খরচ বাড়বে। যা সাধারণ মানুষের দুর্গোতির কারণ হবে। অনেকে বলছেন, সরকারি চাকুরেদের বেতন বেড়েছে। কিন্তু তাদের সংখ্যাতো মাত্র কয়েক লাখ। কিন্তু কোটি কোটি মানুষেরতো আয় বাড়েনি।
টেলিভিশনের খবরে দেখলাম তাদের প্রতিনিধি উত্তরবঙের কৃষকদের সাথে কথা বলছেন। কৃষকরা সব হিসেব দিয়ে জানালা, কৃষি উৎপাদন খরচ বাড়বে পঞ্চাশ ভাগ। সেই পণ্য ক্রেতার হাতে পৌঁছাতে মোট খরচ পড়বে কত। জ্বালানি তেল অত্যন্ত প্রয়োজনীয় পণ্য। এর দাম বাড়লে শুধু পরিবহন খাত নয়, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, উৎপাদন, পণ্য পরিবহন ও মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয়ও বেড়ে যায়। ফলে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব প্রায় সব খাতেই পড়বে।
সাধারণ মানুষ এমনিতেই উচ্চমূল্যের যাতাকলে রয়েছে তার ওপর জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সইবে কেমনে। সব শেষে একথাই কি সত্য যে সাধারণ মানুষের কথা কেউ ভাবেনা। কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক দায়িত্বশীল সরকারকে আগে গণমানুষের কথা ভাবতে হবে। এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে— আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয়, বিপিসির লোকসান কমানো এবং জ্বালানি তেল পাচার ঠেকাতেই এ মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম দ্বিগুণের বেশি বাড়লেও জনস্বার্থে গত পাঁচ মাস দেশে জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত রাখায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে বলে জানিয়েছে সরকার।
এখন নতুন মূল্য অনুযায়ী, ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ টাকা থেকে ১৬৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ টাকা থেকে ১৬০ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ টাকা থেকে ১৫৫ টাকা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিটি জ্বালানি পণ্যের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বেড়েছে।
জ্বালানি বিভাগ আরও জানায়, বর্তমানে পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের তুলনায় জ্বালানি তেলের দাম অনেক বেশি। ভারতে (কলকাতা) প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১৩৪ টাকা ৭৬ পয়সা, মিয়ানমারে ১৬৪ টাকা ৮৩ পয়সা, নেপালে ১৬১ টাকা ২৪ পয়সা, শ্রীলঙ্কায় ১৭৯ টাকা ৪২ পয়সা, থাইল্যান্ডে ১৫১ টাকা ২২ পয়সা এবং ভিয়েতনামে ১৩৭ টাকা।
এ ছাড়া মালদ্বীপে ১৪০ টাকা ৭১ পয়সা, ফিলিপাইনে ১৬৮ টাকা ৫৩ পয়সা, পাকিস্তানে ১৮৫ টাকা ৪৮ পয়সা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১৪৪ টাকা ৭৯ পয়সা দরে ডিজেল বিক্রি হচ্ছে বলে জানিয়েছে সরকার।
বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য অনুযায়ী ডিজেলে বিপিসির লিটারপ্রতি লোকসান প্রায় ৮৯ টাকা। এ হিসাবে শুধু ডিজেলেই দৈনিক লোকসান প্রায় ১০৯ কোটি টাকা। একই হারে লোকসান অব্যাহত থাকলে বছরে ডিজেলে বিপিসির প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা লোকসান হতে পারে।
সরকার বলছে, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানো হলে বছরে বিপিসির লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমানো সম্ভব হবে।
জ্বালানি তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয়ের দাবি করছে সরকার। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে দেশে সে অনুযায়ী জ্বালানি তেলের দাম কমানোর নজির নেই। বরং দাম বাড়ার সময় দ্রুত সমন্বয় করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার প্রভাব দেশে আসতে কিছুটা সময় লাগে। ফলে হঠাৎ করে রাতারাতি জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করার পেছনে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের শর্তও একটি কারণ হতে পারে। আইএমএফের ঋণ পেতে সরকারকে যেসব শর্ত পূরণ করতে হচ্ছে, তার মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে এভাবে শর্ত পূরণ করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব কতটা পড়বে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
সাধারণ মানুষ এমনিতেই উচ্চমূল্যের যাতাকলে রয়েছে তার ওপর জ্বালানির আরো মূল্যবৃদ্ধি সইবে কেমনে। সব শেষে একথাই কি সত্য যে সাধারণ মানুষের কথা কেউ ভাবেনা। কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক দায়িত্বশীল সরকারকে আগে গণমানুষের কথা ভাবতে হবে। এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
লেখক : সাংবাদিক।

আপনার মতামত লিখুন
Array