বাজেটের অঙ্ক বড়, চিকিৎসার বোঝাও বড়
হাসপাতাল হয়েছে। নতুন ভবন উঠেছে। চিকিৎসা অবকাঠামো বেড়েছে। স্বাস্থ্য খাতের বাজেটও প্রতি বছর বড় হয়েছে। কিন্তু চিকিৎসার বিল মেটাতে গিয়ে সাধারণ মানুষের পকেট কি একটু হালকা হয়েছে, নাকি আরও দ্রুত খালি হচ্ছে? পরিসংখ্যান বলছে, দ্বিতীয় ঘটনাটিই ঘটছে। বিশ্বব্যাংক ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গ্লোবাল হেলথ এক্সপেনডিচার ডাটাবেজের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের বর্তমান স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৭৯ দশমিক ৩১ শতাংশই আসে রোগীর নিজস্ব পকেট থেকে।
- রোগ সারাতে গিয়ে নিঃস্ব হওয়ার ঝুঁকি
- স্বাস্থ্য বাজেট পৌঁছেছে ৪৯ হাজার কোটি টাকায়
- রোগীর নিজের ব্যয় প্রায় ৮০ শতাংশ
- ওষুধ, পরীক্ষা ও বেসরকারি চিকিৎসায় বাড়ছে পরিবারের চাপ
অর্থাৎ চিকিৎসায় খরচ হওয়া প্রতি ১০০ টাকার প্রায় ৮০ টাকাই পরিবারকে সরাসরি বহন করতে হচ্ছে। এক দশক আগেও পরিস্থিতি এতটা খারাপ ছিল না। ২০১২ সালে ব্যক্তিগত ব্যয়ের অংশ ছিল ৬৪ শতাংশ, ২০১৬ সালে ৬৭ শতাংশ এবং ২০১৮ সালে ৬৯ শতাংশ। অর্থাৎ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়লেও মানুষের চিকিৎসা ব্যয়ের দায় কমেনি উল্টো বেড়েছে।
বরাদ্দ বাড়ছে, রোগীর দায়ও বাড়ছে
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে ৪৯ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় বেড়েছে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা। এর আগে ২০২২-২৩ অর্থবছরেও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ছিল ৩৬ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা। বাজেটের অঙ্ক তাই বাড়ছে। কিন্তু সেই বাড়তি অর্থের কতটা সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় কমাতে যাচ্ছে—এই প্রশ্নের উত্তর মিলছে না।
স্বাস্থ্য অর্থনীতির হিসাবে, একটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার শক্তি শুধু মোট কত টাকা বরাদ্দ হলো, তা দিয়ে বোঝা যায় না। নাগরিককে চিকিৎসার সময় নিজের পকেট থেকে কতটা দিতে হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ সূচক। সেই সূচকেই বাংলাদেশের চিত্র উদ্বেগজনক।
দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে বড় চাপ
প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে ব্যবধান আরও স্পষ্ট। বিশ্বব্যাংক-ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের ‘আউট অব পকেট’ ব্যয় প্রায় ৭৯ শতাংশ। ভারতে এটি প্রায় ৪৯ শতাংশ, নেপালে ৫১ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ৪৬ শতাংশ, ভুটানে ৪২ শতাংশ এবং মালদ্বীপে ১৮ শতাংশ।
অর্থাৎ একই অঞ্চলের অন্য দেশগুলো যেখানে রোগীর সরাসরি ব্যয়ের বোঝা কমিয়ে আনতে পেরেছে, বাংলাদেশ সেখানে উল্টো পথে হাঁটছে।
স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদদের মতে, সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার লক্ষ্য অর্জন করতে ব্যক্তিগত ব্যয়ের অংশ ১৫ থেকে ২০ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনা প্রয়োজন। বাংলাদেশের বর্তমান হার সেই কাঙ্ক্ষিত সীমার প্রায় চার গুণ।
চিকিৎসার বিল মানেই পরিবারের আর্থিক ঝুঁকি
৭৯ শতাংশের এই সংখ্যা শুধু একটি অর্থনৈতিক সূচক নয়। এর পেছনে আছে অসংখ্য পরিবারের ভিন্ন ভিন্ন সংকট। কেউ চিকিৎসার খরচ মেটাতে সঞ্চয় ভাঙছেন, কেউ ঋণ করছেন, কেউ সম্পদ বিক্রি করছেন। আবার অর্থের অভাবে অনেকে চিকিৎসা পিছিয়ে দিচ্ছেন কিংবা প্রয়োজনীয় সেবা নিচ্ছেনই না। ফলে রোগ সারানোর খরচই অনেক সময় পরিবারের জন্য নতুন আর্থিক সংকট তৈরি করছে। জনস্বাস্থ্যবিদদের ভাষায়, এ ধরনের উচ্চ ব্যক্তিগত ব্যয় স্বাস্থ্যসেবাকে অধিকার থেকে সামর্থ্যের বিষয়ে পরিণত করে।
ওষুধ-পরীক্ষার খরচে চাপে পরিবার
রোগীর পকেট থেকে এত টাকা যাওয়ার পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে ওষুধ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা। সরকারি হাসপাতালে সব ধরনের প্রয়োজনীয় ওষুধ, পরীক্ষা ও সেবা পর্যাপ্তভাবে পাওয়া না গেলে রোগীকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হতে হয়। সেখানেই বাড়ে সরাসরি ব্যয়। চিকিৎসার বাণিজ্যিকীকরণ, ওষুধের মূল্য, ডায়াগনস্টিক পরীক্ষার খরচ এবং কার্যকর স্বাস্থ্যবিমার অনুপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করছে।
ফলে একটি হাসপাতাল নির্মাণ বা শয্যা বাড়ানোর পরিসংখ্যান দিয়ে স্বাস্থ্যসেবার উন্নতি মাপা হলেও রোগীর চিকিৎসা ব্যয় কমছে কি না, সেই হিসাব আড়ালেই থেকে যাচ্ছে।
বাজেটের সাফল্য কোথায়?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. রুমানা হক বলেন, স্বাস্থ্য বাজেটকে শুধু টাকার অঙ্ক হিসেবে দেখলে হবে না। জনগণের জন্য সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য চিকিৎসা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত বাজেটের মূল লক্ষ্য। সরকারি হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানো, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ, প্রয়োজনীয় ওষুধ নিশ্চিত করা এবং ধীরে ধীরে স্বাস্থ্যবিমা ব্যবস্থা চালুর ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
অন্যদিকে, একই ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, স্বাস্থ্য খাতে বড় বাজেট পাওয়া গেছে, এখন সেই অর্থ সঠিকভাবে ব্যয় করতে হবে। স্বাস্থ্য সমস্যার অগ্রাধিকার চিহ্নিত করে ব্যয় এবং প্রতি তিন মাসে বাজেট বাস্তবায়নের অগ্রগতি প্রকাশের ওপর জোর দেন তিনি।
এম/এএইচ

আপনার মতামত লিখুন
Array