পে-স্কেলে বাড়ি ভাতার হিসাবেই যত গরমিল
নতুন জাতীয় বেতন স্কেলে বাড়ি ভাড়া ভাতার হার নিয়ে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। গ্রেডভেদে বাড়ি ভাতার শতাংশে বড় ধরনের পার্থক্যের কারণে মূল বেতন বাড়লেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে মোট মাসিক প্রাপ্য বেতন কমে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এমনকি উচ্চতর গ্রেডে থাকা কর্মচারীর চেয়ে নিচের গ্রেডের কর্মচারীর মোট বেতন বেশি হওয়ারও সুযোগ তৈরি হয়েছে। নতুন বেতন কাঠামোর গেজেটের তথ্য বিশ্লেষণে এমন অসংগতি সামনে এসেছে। বিশেষ করে ১৫, ১৬ ও ১৭ গ্রেডের বেতন ও বাড়ি ভাতা তুলনা করলে বিষয়টি স্পষ্ট হয়।
বাড়ি ভাতার হারেই বদলে যাচ্ছে বেতনের হিসাব
নতুন স্কেলে ১৫ গ্রেডের মূল বেতন ২২ হাজার ৮০০ টাকা। এ গ্রেডে বাড়ি ভাড়া ভাতার হার ৩৫ শতাংশ, অর্থাৎ ৭ হাজার ৯৮০ টাকা। অন্যদিকে ১৬ গ্রেডে মূল বেতন ২১ হাজার ৯০০ টাকা—১৫ গ্রেডের চেয়ে ৯০০ টাকা কম। কিন্তু এ গ্রেডে বাড়ি ভাড়ার হার ৪৫ শতাংশ হওয়ায় ভাতা দাঁড়াচ্ছে ৯ হাজার ৮৫৫ টাকা। ফলে মূল বেতন কম হলেও বাড়ি ভাতার কারণে ১৬ গ্রেডের মোট প্রাপ্য ১৫ গ্রেডের তুলনায় ৯৭৫ টাকা বেশি।
একই চিত্র দেখা যাচ্ছে ১৫ ও ১৭ গ্রেডের ক্ষেত্রেও। ১৭ গ্রেডের মূল বেতন ২১ হাজার ৪০০ টাকা, যা ১৫ গ্রেডের চেয়ে ১ হাজার ৪০০ টাকা কম। কিন্তু ৪৫ শতাংশ বাড়ি ভাড়া পাওয়ায় মোট প্রাপ্য ১৫ গ্রেডের চেয়ে ২৫০ টাকা বেশি হচ্ছে। আবার ১৪ গ্রেডের মূল বেতন ২৩ হাজার ৭০০ টাকা হলেও ১৬ গ্রেডের মোট প্রাপ্যের সঙ্গে ব্যবধান থাকছে মাত্র ১৭০ টাকা।
- উচ্চতর গ্রেডে গিয়েও কমতে পারে মোট বেতন
- অসন্তোষ সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে
পদোন্নতির সুফল নিয়ে প্রশ্ন
এমন পরিস্থিতিতে পদোন্নতির পর সরকারি কর্মচারীদের প্রকৃত আর্থিক সুবিধা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, উচ্চতর গ্রেডে মূল বেতন বাড়লেও বাড়ি ভাড়ার শতাংশ কমে গেলে সেই বৃদ্ধির একটি বড় অংশ কার্যত সমন্বয় হয়ে যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বাড়ি ভাড়া ভাতার শতকরা হারে পার্থক্য এবং ন্যূনতম বাড়ি ভাড়া নির্ধারণ না থাকাই এই অসংগতির অন্যতম কারণ। ফলে নতুন পে-স্কেলে পদোন্নতি পাওয়ার পর একজন কর্মচারীর মোট মাসিক প্রাপ্য কতটা বাড়বে, সেটি শুধু মূল বেতন দিয়ে বোঝার সুযোগ থাকছে না।
পুরোনো ব্যবস্থায় ছিল ন্যূনতম বাড়ি ভাড়ার সুবিধা
বর্তমান ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করলে নতুন কাঠামোর পার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়। ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় বর্তমানে মূল বেতন ৯ হাজার ৭০০ টাকা পর্যন্ত হলে ৬৫ শতাংশ হারে বাড়ি ভাড়া দেওয়া হয়। তবে ন্যূনতম বাড়ি ভাড়া ৫ হাজার ৬০০ টাকা। ৯ হাজার ৭০১ থেকে ১৬ হাজার টাকা পর্যন্ত মূল বেতনে বাড়ি ভাড়া ৬০ শতাংশ, ন্যূনতম ৬ হাজার ৪০০ টাকা। ১৬ হাজার ১ টাকা থেকে ৩৫ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত মূল বেতনে ৫৫ শতাংশ, ন্যূনতম ৯ হাজার ৬০০ টাকা। আর ৩৫ হাজার ৫০১ টাকার বেশি মূল বেতনে ৫০ শতাংশ হারে বাড়ি ভাড়া দেওয়া হয়, যার ন্যূনতম পরিমাণ ১৯ হাজার ৫০০ টাকা। নতুন কাঠামোয় গ্রেডভেদে বাড়ি ভাতার হার পরিবর্তনের কারণে সেই ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সরকারি কর্মচারীরা।
অর্থ বিভাগের সঙ্গে বৈঠক, সংশোধনের দাবি
গেজেট প্রকাশের পর বাড়ি ভাতাসহ নতুন বেতন কাঠামোর বিভিন্ন অসংগতি নিয়ে বিভিন্ন কর্মচারী সংগঠনের নেতারা অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সংগঠনগুলোর নেতাদের দাবি, অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা তাদের জানিয়েছেন, সচিব কমিটির সুপারিশ অনুযায়ীই নতুন কাঠামো প্রণয়ন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী দাবি আদায় ঐক্য পরিষদের মুখ্য সমন্বয়ক ওয়ারেছ আলী বলেন, নতুন বেতন কাঠামোর অসংগতিগুলো সংশোধনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ও অর্থ সচিবের কাছে লিখিত আবেদন করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
জুলাই থেকে কার্যকর, বকেয়া মিলবে পরে
নতুন পে-স্কেল ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হলেও সেপ্টেম্বরের বেতন-ভাতা আপাতত জাতীয় বেতন স্কেল-২০১৫ অনুযায়ী পরিশোধ করা হবে। নতুন স্কেলে বেতন নির্ধারণের প্রক্রিয়া শেষ হলে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর—এই তিন মাসের বকেয়া আর্থিক সুবিধা হিসাব করে সমন্বয় করা হবে। এ জন্য সরকারি চাকরিজীবীদের প্রথমে অনলাইনে পে ফিক্সেশন সম্পন্ন করতে হবে। আইবাস এ তথ্য দেওয়ার পর নতুন নির্ধারণযোগ্য মূল বেতন সিস্টেমে দেখা যাবে। পরে ডিডিও এবং হিসাবরক্ষণ অফিসের যাচাই ও অনুমোদন শেষে ভেরিফিকেশন নম্বর তৈরি হবে। এরপর নতুন কাঠামো অনুযায়ী বেতন ও বকেয়া সুবিধার হিসাব চূড়ান্ত করা হবে। সরকারি কর্মচারীদের দাবি, পদোন্নতিতে মূল বেতন বাড়ার সুফল যেন বাড়ি ভাতার হার কমে যাওয়ায় নষ্ট না হয়, সে বিষয়টি দ্রুত পর্যালোচনা করা জরুরি। একই সঙ্গে গ্রেড বাড়ার সঙ্গে মোট আর্থিক সুবিধাও যেন যৌক্তিকভাবে বাড়ে, তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
কালের আলো/আরডি/এমডিএইচ



আপনার মতামত লিখুন
Array