ইসরায়েলকে ইউরোপীয় ফুটবলের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দিয়ে উয়েফা ‘চোখ বন্ধ করে আছে’ বলে অভিযোগ করেছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। ফিলিস্তিনে চলমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলের ফুটবল অংশগ্রহণের অনুমতি দেওয়ার কঠোর সমালোচনা করেছে মানবাধিকার সংগঠনটি।
২০২৬–২৭ উয়েফা নেশন্স লিগে বৃহস্পতিবার অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচ খেলবে ইসরায়েল। গ্রুপ ‘জি’-তে তাদের অন্য প্রতিপক্ষ রিপাবলিক অব আয়ারল্যান্ড ও কসোভো।
নিরপেক্ষ ভেন্যুতে ইসরায়েলের ম্যাচ
নিরাপত্তাজনিত কারণে ইসরায়েল নিজেদের দেশে ম্যাচ আয়োজন করতে পারছে না। ফলে ২৭ সেপ্টেম্বর আয়ারল্যান্ড এবং ১ অক্টোবর কসোভোর বিপক্ষে তাদের ‘হোম’ ম্যাচ দুটি হাঙ্গেরির ডেব্রেসেনে অনুষ্ঠিত হবে।
অন্যদিকে ৪ অক্টোবর আয়ারল্যান্ডের মাঠে ইসরায়েলের বিপক্ষে ম্যাচটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে সার্বিয়ার বাক্কা টপোলায়। ওই ম্যাচে দর্শক উপস্থিতি থাকবে না।
ইসরায়েলের অংশগ্রহণ নিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে বিতর্কের মধ্যেই ম্যাচগুলোর ভেন্যু পরিবর্তন করা হয়েছে।
উয়েফার বিরুদ্ধে অ্যামনেস্টির অভিযোগ
মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ইউরোপ বিষয়ক পরিচালক স্টিভ ককবার্ন অভিযোগ করেন, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে উয়েফা দেশটিকে আন্তর্জাতিক ফুটবলের মঞ্চ ব্যবহারের সুযোগ দিচ্ছে।
ককবার্ন বলেন, ‘অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের বেআইনি দখলদারিত্ব এবং ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য কোনো মূল্য দিতে হবে—এমন স্পষ্ট বার্তা দেওয়ার পরিবর্তে উয়েফা ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক মঞ্চ দিচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকা কোনো রাষ্ট্রের জন্য খেলাধুলাকে জনসংযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।
অ্যামনেস্টির এই কর্মকর্তা দাবি করেন, অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের অবৈধ বসতিতে থাকা ক্লাবগুলো নিষিদ্ধ করার বিষয়ে পদক্ষেপ না নেওয়ায় উয়েফা ও ফিফার আরও আগেই ইসরায়েল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল।
‘ফুটবল ঐক্যের জন্য’
ককবার্নের ভাষ্য, ইসরায়েল যখন ইউরোপীয় ফুটবলে অংশ নিচ্ছে, একই সময়ে ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোর বাস্তুচ্যুতি, জমি হারানো এবং জলপাই গাছ উপড়ে ফেলার মতো ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘ফুটবল মানুষের মধ্যে ঐক্য তৈরি করার জন্য, কোনো বৈষম্যমূলক ব্যবস্থাকে বৈধতা দেওয়ার জন্য নয়।’
তবে ইসরায়েল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। উয়েফা ও ফিফার কাছেও মন্তব্য চাওয়া হয়েছে।
এশিয়া থেকে ইউরোপে ইসরায়েল
ইসরায়েল একসময় এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের (এএফসি) প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একটি ছিল। তবে ১৯৭৪ সালে কয়েকটি আরব দেশ ইসরায়েলের বিপক্ষে খেলতে অস্বীকৃতি জানানোর পর আন্তর্জাতিক ফুটবলে দেশটি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ১৯৯৪ সালে উয়েফায় যোগ দেওয়ার মাধ্যমে ইউরোপীয় ফুটবলে তাদের অংশগ্রহণের পথ তৈরি হয়।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে কেন্দ্র করে দেশটিকে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা থেকে নিষিদ্ধ করার দাবিও জোরালো হয়েছে।
৭ অক্টোবরের হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ ইসরায়েলি নিহত এবং ২৫০ জনের বেশি মানুষ জিম্মি হন বলে ইসরায়েলি সূত্রে জানানো হয়। অন্যদিকে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের হিসাবে, গাজায় ইসরায়েলি অভিযানে ৭০ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
জাতিসংঘের একটি তদন্ত সংস্থা গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে গণহত্যা হিসেবে উল্লেখ করেছে। তবে ইসরায়েল সরকার এ অভিযোগ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।
আয়ারল্যান্ডেও তীব্র বিতর্ক
ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা থেকে নিষিদ্ধ করার দাবি আয়ারল্যান্ডে বিশেষভাবে জোরালো হয়েছে। দেশটির জাতীয় দলের কোচ হেইমির হালগ্রিমসন সম্প্রতি বলেছেন, আন্তর্জাতিক বিরতিতে তার দল ‘গণহত্যার বিরুদ্ধে খেলছে’।
এর জবাবে ইসরায়েল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন হালগ্রিমসনের মন্তব্যকে ‘অজ্ঞতা, ভণ্ডামি ও বোকামি’ বলে আখ্যা দিয়েছে।
ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন অব আয়ারল্যান্ড (এফএআই) সরাসরি এ মন্তব্যের জবাব দেয়নি। তবে তারা জানিয়েছে, জুলাইয়ে সদস্যদের ভোটের পর ম্যাচ দুটি খেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ম্যাচে অংশ না নিলে উয়েফার নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি ছিল।
এফএআইয়ের ভোটে ম্যাচ খেলার পক্ষে ৭৫-৩২ ব্যবধানে সিদ্ধান্ত হয়। তবে হাঙ্গেরি ও সার্বিয়ায় অনুষ্ঠেয় ম্যাচ দুটিতে কোনো আইরিশ সমর্থক উপস্থিত থাকবেন না। দেশটির সম্প্রচার সংস্থা আরটিইও চুক্তির বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী ম্যাচ সম্প্রচার করবে, তবে বিজ্ঞাপন প্রচার করবে না।
কালের আলো/এসএ
আপনার মতামত লিখুন
Array