মাত্র ৮০০ টাকা পুঁজি নিয়ে বিদেশি ফল প্যাশন ফ্রুট বা আনারকলি চাষ শুরু করেছিলেন টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরের তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা সোহেল আকন্দ। বাড়ির পরিত্যক্ত আঙিনায় পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করা সেই চাষে এখন গাছে গাছে ফল ধরেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ফল বিক্রি করেও পাচ্ছেন ভালো সাড়া। আর এ সাফল্যকে পুঁজি করে ভবিষ্যতে বড় পরিসরে চাষাবাদ ও চারা উৎপাদনের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন তিনি।
বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন ভেঙে কৃষিতে উদ্যোগ
সোহেল আকন্দ ভূঞাপুর পৌর শহরের বামনহাটা গ্রামের বাসিন্দা। তিনি মৃত আবুল কালাম আকন্দের ছেলে। বিদেশে যাওয়ার আশায় এবং চাকরির পেছনে ছুটতে গিয়ে একপর্যায়ে দালালের খপ্পরে পড়ে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন তিনি। পরে অন্যের ওপর নির্ভর না করে নিজের উদ্যোগে কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন।
সেই ভাবনা থেকেই কৃষিকাজে আগ্রহী হয়ে ওঠেন সোহেল। প্রায় ছয় মাস আগে কক্সবাজারের চকরিয়ার এক চাষির কাছ থেকে মাত্র ৮০০ টাকায় কয়েকটি প্যাশন ফ্রুটের চারা সংগ্রহ করেন। বাড়ির পরিত্যক্ত আঙিনায় শুরু করেন পরীক্ষামূলক চাষ। শুরুর দিকে অবশ্য পথটা সহজ ছিল না। গাছে ফুল এলেও তা ঝরে পড়ত। ফলে ফল উৎপাদন নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েন তিনি। পরে বিভিন্ন মানুষের পরায়ে গামর্শ নিছের নিয়মিত পরিচর্যা শুরু করেন। ধীরে ধীরে গাছগুলোতে ফল ধরতে থাকে। বর্তমানে নিজের উদ্যোগের ফল দেখতে পাচ্ছেন সোহেল।
প্রতি কেজি ফল বিক্রি হচ্ছে ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকায়
সোহেলের বাগানে উৎপাদিত আনারকলি ফল আকারভেদে প্রতিটি ৩০ থেকে ৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। আর প্রতি কেজি ফলের দাম ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকা। এক কেজিতে সাধারণত ১০ থেকে ১২টি ফল পাওয়া যায়। ফেসবুকে ফলের ছবি ও তথ্য ছড়িয়ে পড়ার পর ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়তে শুরু করে। পরিচিতজন, বন্ধুবান্ধবসহ বিভিন্ন এলাকার মানুষ তার সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। কেউ ফল কিনতে চাইছেন, আবার কেউ আগ্রহ দেখাচ্ছেন চারা সংগ্রহে। স্থানীয় মানুষের পাশাপাশি বাইরের এলাকা থেকেও অনেকে তার বাগান দেখতে আসছেন।
বাড়ির উঠানে শুধু প্যাশন ফ্রুট চাষই নয়, ছোট কটি এনার্সারিও গড়ে তুলেছেন সোহেল। সেখানে বিভিন্ন জাতের ফলজ ও বনজ গাছের চারা রয়েছে। ফলে ফল বিক্রির পাশাপাশি চারা উৎপাদন ও বিক্রির মাধ্যমেও আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে তার সামনে।
স্বাদ থেকেই চাষের আগ্রহ
সোহেল জানান, প্রথমে কক্সবাজারে গিয়ে প্যাশন ফ্রুটের স্বাদ নিয়েছিলেন তিনি। ফলটি ভালো লাগায় নিজের এলাকায় এর চাষ করার ইচ্ছা তৈরি হয়। তবে ভালো জাতের চারা সংগ্রহ করতে তাকে বেশ ঘুরতে হয়েছে। পরে একটি বিশ্বস্ত নার্সারি থেকে চারা সংগ্রহ করে রোপণ করেন। তিনি বলেন, শুরুতে প্যাশন ফ্রুটের চাষাবাদ সম্পর্কে তার তেমন ধারণা ছিল না। ফুল ঝরে পড়াসহ নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে। পরে বিভিন্নজনের পরামর্শ নিয়ে গাছের যত্ন নেওয়া শুরু করেন।
সোহেল আরও বলেন, তার উৎপাদিত ফল কিনতে ফেসবুকে অনেকেই যোগাযোগ করছেন। পরিচিত বন্ধুবান্ধবেরাও ফল চাইছেন। বিভিন্ন এলাকার মানুষ বাগান দেখতে আসছেন এবং অনেকে চারা নিতে আগ্রহ প্রকাশ করছেন। এলাকায় ফলটি নতুন হলেও এর চাহিদা রয়েছে বলে মনে করছেন তিনি। বর্তমানে অল্প পরিসরে চাষ করলেও ভবিষ্যতে বড় পরিসরে প্যাশন ফ্রুট উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে সোহেলের। পাশাপাশি চারা উৎপাদনের কাজও সম্প্রসারণ করতে চান তিনি।
তরুণদের জন্য নতুন সম্ভাবনা দেখছেন স্থানীয়রা
সোহেলের এই উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ভূঞাপুরের সাবেক কাউন্সিলর খন্দকার আমিন বলেন, তাদের এলাকায় আগে এই ফল তেমন দেখা যেত না। সোহেলের উদ্যোগ প্রশংসনীয়। তিনি শুধু ফল বিক্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে চারা উৎপাদনেও উদ্যোগ নিয়েছেন। এতে এলাকার অন্য তরুণেরাও এ ধরনের চাষে আগ্রহী হতে পারেন। খন্দকার আমিনের মতে, কৃষিতে নতুন ধরনের উদ্যোগ বেকার তরুণদের স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে এ জন্য প্রয়োজনীয় পরামর্শ, প্রশিক্ষণ ও সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ।
কৃষি বিভাগের সহযোগিতার আশ্বাস
ভূঞাপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মোখলেছুর রহমান জানান, কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা সরেজমিনে সোহেলের আনারকলির বাগান পরিদর্শন করেছেন। উপজেলা কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে তাকে সহযোগিতার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে এই ফলের বাগান সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় কারিগরি ও অন্যান্য সহযোগিতা দেওয়া হবে। মাত্র ৮০০ টাকা দিয়ে শুরু হওয়া সোহেলের এই উদ্যোগ এখন সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলেছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এ চাষকে লাভজনক করতে উৎপাদন বাড়ানো, গাছের পরিচর্যা সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন, বাজার সম্প্রসারণ এবং নিয়মিত ক্রেতা তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ হবে। সোহেলের আশা, পরিকল্পনা অনুযায়ী চাষের পরিধি বাড়াতে পারলে কৃষিই হয়ে উঠবে তার স্বাবলম্বী হওয়ার পথ।
কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি
আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]