সরকারি ক্ষমতার শীর্ষ করিডরে যার ছিল অবাধ যাতায়াত, ফ্যাসিবাদী সরকার বদলের পর এক সময়কার ক্ষমতাধর আমলা এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরীর ঠিকানা এখন দেশের অন্যতম বড় শিল্পগোষ্ঠী ইউনাইটেড। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিবের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই তার এই নতুন কর্মস্থল নিয়ে প্রশ্ন উঠে।
কারণ, নুরীর নাম শুধু গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদায়নের সঙ্গে নয়—রাজউকের প্লট, বিধিমালা, ডিএসসিসির বিপুল অর্থ স্থানান্তরসহ নানা অভিযোগের সঙ্গেও আলোচিত। প্রশ্নটি তাই শুধু নতুন চাকরি নয়। সরকারি ক্ষমতার বলয়ে দীর্ঘদিন থাকা এবং বিতর্কিত অভিযোগে ঘেরা একজন কর্মকর্তাকে সরকার পরিবর্তনের পর এত দ্রুত একটি প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীতে জায়গা করে দেওয়ার নেপথ্যে কী ছিল?
- কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ক্ষমতার কেন্দ্রে দাপট
- রাজউক-ডিএসসিসিতে নানা অভিযোগ
- সচিবের পদ হারানোর পরই বড় শিল্পগোষ্ঠীতে নির্বাহী পরিচালক—পুরোনো সম্পর্কের নতুন হিসাব
সচিবের চেয়ার থেকে ইউনাইটেডের বোর্ডরুম
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ৫ জুন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিবের দায়িত্ব নেন নুরী। ২০২৪ সালের ২৬ জুন তার চুক্তির মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানো হয়। সরকারি নথিতে তার দায়িত্বের অবসান দেখানো হয়েছে ১৪ আগস্ট ২০২৪। এরপরই ইউনাইটেড গ্রুপে নির্বাহী পরিচালক হিসেবে তার যোগদানের বিষয়টি সামনে আসে। এই সময়ের ব্যবধানই তৈরি করেছে ‘পুনর্বাসন’-এর প্রশ্ন। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ আমলা হিসেবে পরিচিত একজন কর্মকর্তা সরকার পরিবর্তনের পর প্রশাসনে জায়গা না পেলেও বেসরকারি খাতের একটি শক্তিশালী শিল্পগোষ্ঠীতে কীভাবে নির্বাহী পর্যায়ের পদ পেলেন—এটির উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
একের পর এক ক্ষমতাবান পদ
নুরীর প্রশাসনিক ক্যারিয়ার ছিল গুরুত্বপূর্ণ পদে ধারাবাহিক উত্থানের। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, শিল্প ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন পদ, ধর্মবিষয়ক ও গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেরিয়ে তিনি ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হন। পরে ২০২১ সালে দায়িত্ব পান রাজউকের চেয়ারম্যান হিসেবে। ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হওয়ার সময় মেয়র ছিলেন শেখ ফজলে নূর তাপস। সে সময় নুরীর নিয়োগসহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসনিক পরিবর্তন নিয়ে সংবাদমাধ্যমে আলোচনা হয়েছিল। তাপসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণেই নুরী পরবর্তী সময়ে রাজউকের চেয়ারম্যানের পদ পেয়েছিলেন—এমন অভিযোগ রয়েছে।
রাজউকে প্লটের খেলা, বিধিমালা নিয়েও প্রশ্ন
রাজউকের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব ছিল নুরীর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে প্রভাবশালী অধ্যায়গুলোর একটি। রাজধানীর জমি, ভবন ও নগর উন্নয়নসংক্রান্ত অনুমোদন ও নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা তখন তার প্রতিষ্ঠানের হাতে। এই সময় প্লট বরাদ্দ নিয়ে নুরীর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ওঠে। প্রভাবশালী ব্যক্তি ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠদের প্লট পাওয়ার প্রক্রিয়ায় তিনি ভূমিকা রেখেছিলেন—এমন অভিযোগও রয়েছে। প্লট বরাদ্দের বিধিমালা পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল।
রাজউকের চেয়ারেই ইউনাইটেডের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ
নুরীর বর্তমান কর্মস্থল ইউনাইটেড গ্রুপ হওয়ায় তার রাজউক-পর্বের একটি ঘটনা নতুন করে তাৎপর্য পাচ্ছে।।২০২১ সালে রাজউকের চেয়ারম্যান থাকাকালে নুরী ইউনাইটেড ডেলকটের সঙ্গে পূর্বাচল পানি সরবরাহ প্রকল্পের একটি চুক্তিতে রাজউকের পক্ষে স্বাক্ষর করেন। প্রকল্পটি ছিল সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায়। একই অনুষ্ঠানে ইউনাইটেড ডেলকটের ব্যবস্থাপনা পরিচালকও চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। পরে সেই ইউনাইটেড গ্রুপেই নুরীর নির্বাহী পদে যোগদান করায় পুরোনো সরকারি দায়িত্বকালের যোগাযোগ এখন অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। রাজউকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় যে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ ছিল, পরবর্তী সময়ে সেই শিল্পগোষ্ঠীরই নির্বাহী পদে তার যোগদান—এই দুই ঘটনার মধ্যে কোনো স্বার্থগত সম্পর্ক ছিল কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
ডিএসসিসির ৯৬৬ কোটি টাকার অভিযোগ
নুরীর বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা থাকার সময়ের। অভিযোগকারীদের দাবি, সিটি করপোরেশনের ৫৪৩ কোটি টাকা এবং বিভিন্ন প্রকল্পের আরও ৪২৩ কোটি টাকা—মোট ৯৬৬ কোটি টাকা—মধুমতি ব্যাংকে স্থানান্তরের ঘটনায় নুরীর ভূমিকা ছিল। অভিযোগের সঙ্গে তৎকালীন মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসের নামও এসেছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, অর্থ স্থানান্তরের ক্ষেত্রে তৎকালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে নুরী সহযোগিতা করেছিলেন। তবু অভিযোগের অঙ্কটি এত বড় যে, তার নতুন করপোরেট নিয়োগের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
কালের আলো/এসআর/এএএন
আপনার মতামত লিখুন
Array