খুঁজুন
                               
, ,
           

দেশের উন্নয়নে চীনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে হবে: শিক্ষামন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:৪৩ অপরাহ্ণ
দেশের উন্নয়নে চীনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে হবে: শিক্ষামন্ত্রী

কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), শিল্পের সঙ্গে শিক্ষার সংযোগ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সুনীল অর্থনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উন্নয়নে চীনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।

তিনি বলেছেন, তরুণদের দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে চীনের অভিজ্ঞতাও বাংলাদেশের কাজে লাগতে পারে।

বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ঢাকা চায়না ডে ২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। শিক্ষা ও উন্নয়নে দুই দেশের বন্ধুত্ব, আস্থা ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে এ সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী হবে।

তিনি আরও বলেন, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা (টিভেট), কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, শিল্প-শিক্ষা সংযোগ এবং ব্লু ইকোনমিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশের উন্নয়নে ‘চীনা মডেল’ গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে চীনের উন্নয়ন অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে হবে।

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে ড. এহছানুল হক মিলন বলেন, জাতি শিক্ষার্থীদের দিকে তাকিয়ে আছে, তারাই আমাদের ভবিষ্যৎ। তাই ‘আগামীর বাংলাদেশ’ গড়তে তাদের যোগ্য ও দক্ষ করে গড়ে তুলতে কাজ করছি।

বাংলাদেশের জনমিতিক সুবিধা বা ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, এটি দেশের জন্য একটি বড় সুযোগ। এই সুযোগ কাজে লাগাতে তরুণদের দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এক্ষেত্রেও চীনের সহযোগিতা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে।

শিল্প ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সংযোগ তৈরিতে চীনের অভিজ্ঞতা অনুসরণীয় উল্লেখ করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটকে একটি মডেল হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। একইভাবে চাঁদপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের উন্নয়নেও কাজ চলছে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও প্রযুক্তির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার সৌরবিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। পাশাপাশি ইলেকট্রিক ভেহিকল (ইভি), সবুজ প্রযুক্তি ও আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ চলছে। রোবটিক্স ও ব্লু ইকোনমির মতো সম্ভাবনাময় খাতেও চীনের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশ কাজে লাগাতে পারে।

বাংলাদেশকে ‘এডুকেশন হাব’ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, দেশে ‘ক্রস-বর্ডার এডুকেশন’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আন্তর্জাতিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে উচ্চশিক্ষাকে আরও যুগোপযোগী ও মানসম্মত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

অনুষ্ঠানে ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেন, তরুণরাই ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশের শিক্ষা ও উন্নয়ন কার্যক্রমে চীনের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. ফরাসউদ্দিন। স্বাগত বক্তব্য দেন বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য অধ্যাপক শামস রহমান।

কালের আলো/আরডি/এমডিএইচ

গাছে পেঁপে, কৃষকের চোখে লোকসানের পানি

ঝালকাঠি সংবাদদাতা, কালের আলো
প্রকাশিত: বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:০৫ পূর্বাহ্ণ
গাছে পেঁপে, কৃষকের চোখে লোকসানের পানি

ঝালকাঠিতে পেঁপের বাম্পার ফলন হলেও ন্যায্যমূল্য না পেয়ে লোকসানের মুখে পড়েছেন চাষিরা। বাজারে প্রতি কেজি পেঁপে ২০ থেকে ২৫ টাকায় বিক্রি হলেও ক্ষেত থেকে পাইকাররা কিনতে চাইছেন মাত্র ১০ থেকে ১২ টাকা দরে। উৎপাদন খরচও তুলতে পারছেন না অনেক কৃষক। ফলে গাছের পরিচর্যা কমিয়ে দিয়েছেন কেউ কেউ। গাছে পেকে ও মাটিতে পড়ে নষ্ট হচ্ছে পেঁপে। লোকসান সামলাতে না পেরে কোনো কোনো চাষি গাছ কেটেও ফেলছেন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে ঝালকাঠিতে প্রায় ১১৮ হেক্টর জমিতে পেঁপে চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। শাহী জাতসহ বিভিন্ন উচ্চ ফলনশীল জাতের পেঁপে চাষ করেছেন কৃষকেরা। অনুকূল আবহাওয়ায় ফলন ভালো হওয়ায় এবং একই সময়ে বিপুল পরিমাণ পেঁপে বাজারে আসায় সরবরাহ বেড়েছে। এ মৌসুমে জেলায় পেঁপে উৎপাদিত হয়েছে ১ হাজার ৬৫০ মেট্রিক টন। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, অতিরিক্ত সরবরাহের কারণেই বাজারে দাম কমেছে।

সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পেঁপের দাম কমে যাওয়ায় অনেক কৃষক গাছের পরিচর্যা কমিয়ে দিয়েছেন। এতে গাছের পাতা হলুদ হয়ে ঝরে পড়ছে। গাছে পাকা পেঁপে ঝুলে থাকার পাশাপাশি মাটিতে পড়ে পচে নষ্ট হচ্ছে। বাধ্য হয়ে স্থানীয় বাজার, আড়ত ও পাইকারদের কাছে কম দামে পেঁপে বিক্রি করছেন তাঁরা।

সদর উপজেলার নবগ্রাম গ্রামের কৃষক দেলোয়ার হোসেন বলেন, দুই বিঘা জমিতে পেঁপে চাষ করতে তাঁর প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। অথচ ক্ষেত থেকে পাইকাররা প্রতি কেজি পেঁপে ১০ থেকে ১২ টাকা দরে কিনতে চাইছেন। এ দামে বিক্রি করলে শ্রমিকের মজুরি ও ভ্যানভাড়াও উঠবে না। তাই চোখের সামনে পেঁপে নষ্ট হতে দেখলেও তাঁর কিছু করার নেই।

উত্তর বাউকাঠি গ্রামের কৃষক সাদ্দাম হোসেন ছয় বিঘা জমিতে পেঁপে চাষ করে এখন বিপাকে পড়েছেন। তিনি বলেন, দাম এতটাই কম যে ক্ষেতের পরিচর্যা করতেও আর আগ্রহ পান না। এ অবস্থা চলতে থাকলে পেঁপেগাছ কেটে ফেলতে বাধ্য হবেন।

কৃষক তাজুল ইসলাম জানান, প্রতি কেজি পেঁপে ১০ থেকে ১২ টাকা দরে বিক্রি করে তাঁকে লোকসান গুনতে হচ্ছে। ইতিমধ্যে ক্ষতির মুখে পড়ে দুই বিঘা জমির পেঁপেগাছ কেটে ফেলেছেন তিনি। বাকি দেড় বিঘা জমিতে লোকসান পুষিয়ে নেওয়ার আশায় সাথি ফসল চাষ করছেন।

কৃষকদের অভিযোগ, সরকার নির্ধারিত দামে সার না পাওয়ায় বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। পাশাপাশি বেড়েছে শ্রমিকের মজুরি, কীটনাশক, বীজ ও সেচের খরচ। উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও পেঁপের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় লোকসান গুনতে হচ্ছে তাঁদের।

চাষিরা জানান, এলাকায় পেঁপে সংরক্ষণের জন্য হিমাগার বা উপযুক্ত কোনো ব্যবস্থা নেই। পচনশীল ফল হওয়ায় দীর্ঘ সময় ধরে পেঁপে সংরক্ষণ করাও কঠিন। সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকলে বাজারে দাম কম থাকার সময় পেঁপে রেখে পরে বিক্রি করা যেত। এতে ফসল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি ও লোকসান কমানো সম্ভব হতো বলে মনে করেন তাঁরা।

এ বিষয়ে ঝালকাঠি জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুল্লাহ আলম মামুন বলেন, এ বছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে পেঁপে আবাদ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলনও ভালো হয়েছে। তবে অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে বাজারে সাময়িকভাবে দাম কিছুটা কমেছে।

কৃষকদের আশঙ্কা, উৎপাদন বাড়লেও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা না গেলে পেঁপে চাষে আগ্রহ হারাবেন অনেকে। তাঁদের দাবি, কৃষকের উৎপাদন খরচ বিবেচনায় ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি ফল সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। তা না হলে বাম্পার ফলনও কৃষকের জন্য লোকসানের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি 

পত্রিকার বিক্রি কমেছে, মোস্তফার সংসারে বেড়েছে অভাব

মুন্সীগঞ্জ সংবাদদাতা,কালের আলো
প্রকাশিত: বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬, ৯:৫৮ পূর্বাহ্ণ
পত্রিকার বিক্রি কমেছে, মোস্তফার সংসারে বেড়েছে অভাব

সকাল হলেই বাইসাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়েন মোস্তফা মাদবর। কাঁধে কিংবা হাতে থাকে পত্রিকার বোঝা। মানুষের হাতে তুলে দেন দেশ-বিদেশের নানা খবর। এভাবেই কেটে গেছে তাঁর জীবনের ৩৫ বছর। অথচ প্রতিদিন মানুষের সুখ-দুঃখ আর সংকটের খবর পৌঁছে দেওয়া এই মানুষটির নিজের জীবনেই জমেছে অভাবের পাহাড়। পত্রিকা বিক্রি কমেছে, বেড়েছে সংসারের খরচ। স্ত্রী, দুই ছেলে ও বৃদ্ধ মাকে নিয়ে সংসার চালাতে গিয়ে এখন দিশেহারা ৪৮ বছর বয়সী মোস্তফা। দীর্ঘ সংগ্রামের পর তাঁর মুখে এখন একটাই আক্ষেপ—‘আর পারা যাচ্ছে না।’

মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার লতব্দী ইউনিয়নের কমলাপুর গ্রামে ভাড়া থাকেন মোস্তফা। প্রায় ২০ বছর ধরে সেখানে বসবাস করছেন তিনি। আগে সিরাজদিখান এলাকায় থাকলেও তুলনামূলক কম ভাড়ার আশায় শহরসংলগ্ন এলাকা ছেড়ে চরাঞ্চলের কমলাপুরে আশ্রয় নেন। সেখানে একটি ঝুপড়ি ঘরের ভাড়া বাবদ প্রতি মাসে দিতে হয় ৩ হাজার ৫০০ টাকা। ভাড়া পরিশোধের পর সংসারের অন্যান্য খরচ মেটানো তাঁর জন্য আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

একসময় দিনে প্রায় ১ হাজার ২০০ কপি বিভিন্ন পত্রিকা বিক্রি করতেন মোস্তফা। ছাপা পত্রিকার চাহিদা বেশি থাকায় তখন আয়ও তুলনামূলক ভালো ছিল। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে পাঠকের সংখ্যা ও পত্রিকা বিক্রি কমে এসেছে। বর্তমানে দিনে প্রায় ২৩০ কপি পত্রিকা বিক্রি করেন তিনি। আয় কমে যাওয়ায় সংসারের প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁকে।

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি দাম তাঁর সংকট আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রতিদিনের আয় থেকে চাল-ডালসহ খাবারের খরচ, ঘরভাড়া, সন্তানদের লেখাপড়া এবং পরিবারের চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে হয়। কোনো মাসে বাড়তি খরচ দেখা দিলে বিপাকে পড়তে হয় তাঁকে। সীমিত আয়ে সব দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক সময় প্রয়োজনীয় খরচের হিসাবও মেলাতে পারেন না।

দুই ছেলে আলামিন মাদবর (২২) ও ইয়াছিন মাদবরের (১৪) ভবিষ্যৎ নিয়েও দুশ্চিন্তায় থাকেন মোস্তফা। সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগানোর পাশাপাশি নিজের ও বৃদ্ধ মায়ের ওষুধ কিনতে হয় তাঁকে। পরিবারের সবার চাহিদা পূরণ করতে না পারার কষ্টও তাঁকে তাড়া করে বেড়ায়।

ঈদসহ বিভিন্ন উৎসবেও স্বস্তি ফেরে না মোস্তফার সংসারে। চারদিকে যখন উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে, মানুষ পরিবারের জন্য নতুন পোশাক কেনে, তখন তাঁকে ভাবতে হয় কীভাবে নিত্যদিনের খরচ মেটাবেন। পরিবারের সবার জন্য ভালো পোশাক কেনা তো দূরের কথা, দৈনন্দিন খাবার ও প্রয়োজনীয় ব্যয় সামলানোই তাঁর কাছে বড় চ্যালেঞ্জ।

দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে পত্রিকা বিক্রি করলেও ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো নিশ্চয়তা নেই মোস্তফার। বয়স বাড়ছে, বাড়ছে পরিবারের দায়িত্বও। অথচ আয় বাড়ার বদলে কমেছে পত্রিকা বিক্রি। এই পেশার ওপর নির্ভর করে আর কত দিন সংসার চালাতে পারবেন, কীভাবে সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়বেন—এসব প্রশ্নই তাঁকে ভাবিয়ে তোলে।

সম্প্রতি নিজের জীবনসংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে সাংবাদিকের কাছে আক্ষেপ করে মোস্তফা বলেন, ‘আর পারা যাচ্ছে না।’ তাঁর এই সংক্ষিপ্ত কথাতেই ফুটে ওঠে দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, আর্থিক অনিশ্চয়তা ও পরিবারের দায়িত্ব সামলানোর ক্লান্তি।

মোস্তফার জীবন কেবল একজন পত্রিকা বিক্রেতার ব্যক্তিগত সংকট নয়; এটি জীবিকার জন্য প্রতিদিন সংগ্রাম করে যাওয়া নিম্ন আয়ের মানুষের বাস্তবতারও প্রতিচ্ছবি। মানুষের হাতে প্রতিদিন খবর পৌঁছে দেওয়া এই পরিশ্রমী মানুষটির নিজের জীবনেই এখন সবচেয়ে বড় চিন্তা সংসার চালানো।

৩৫ বছরের শ্রমের পরও মোস্তফার জীবনে স্বস্তি ফেরেনি। আগামীকালও তাঁকে পত্রিকার বোঝা নিয়ে বের হতে হবে। কারণ থেমে যাওয়ার সুযোগ নেই তাঁর। স্ত্রী, সন্তান ও বৃদ্ধ মায়ের জীবনযাপনের ভার যে তাঁর আয়ের ওপরই নির্ভরশীল।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি 

দোতারায় সুর তোলেন, তবু দুমুঠো খাবারের নিশ্চয়তা নেই রইচের

পাবনা সংবাদদাতা, কালের আলো
প্রকাশিত: বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬, ৯:২০ পূর্বাহ্ণ
দোতারায় সুর তোলেন, তবু দুমুঠো খাবারের নিশ্চয়তা নেই রইচের

একসময় তাঁর গান শুনতে ভিড় জমাতেন মানুষ। সেই গানই ছিল জীবিকার অবলম্বন। কিন্তু সময় বদলেছে, বদলেছে মানুষের বিনোদনের ধরন। ডিজিটাল যুগে লোকসংগীতের কদর কমে যাওয়ায় জীবনের শেষ প্রান্তে এসে চরম অভাব-অনটনে দিন কাটছে পাবনার ঈশ্বরদীর লোকশিল্পী রইচ উদ্দিনের। শারীরিক অসুস্থতা ও দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করেও বেঁচে থাকার তাগিদে দোতারা হাতে পথে পথে গান গেয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, একসময় বিভিন্ন স্থানে রইচ উদ্দিনের গান শুনতে মানুষের ভিড় জমত। গান গেয়েই ভালো আয়-রোজগার করতেন তিনি। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কমেছে শারীরিক সক্ষমতা, কমেছে আয়ের সুযোগও। স্থায়ী কোনো কাজ করার সামর্থ্য না থাকায় এখন পথেঘাটে, ট্রেনে-বাসে কিংবা দর্শনীয় স্থানে গান গেয়ে যা পান, তা দিয়েই কোনো রকমে চলে তাঁর সংসার।

রইচ উদ্দিন জানান, রেডিওর যুগ থেকেই রাস্তাঘাটে গান গেয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন তিনি। আগে বিভিন্ন জায়গায় গান গেয়ে ভালো আয় হতো। এখন আগের মতো শরীরে শক্তি পান না। কিন্তু পেটের ক্ষুধা তো আর বয়স বোঝে না। গান গাইতে ইচ্ছা না করলেও বেঁচে থাকার তাগিদে দোতারা হাতে তুলে নিতে হয় তাঁকে।

স্ত্রী ও এক সন্তানকে নিয়ে তাঁর সংসার। তাঁদের মুখে দুমুঠো খাবার তুলে দিতেও হিমশিম খেতে হয়। রইচ উদ্দিনের ভাষ্য, শেষ কোরবানির ঈদে গরুর মাংস দিয়ে ভাত খেয়েছিলেন। এরপর আর সেই সুযোগ হয়নি। তাঁর কথায়, সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

শুক্র ও শনিবার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এলাকা, হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ও পাকশী রেলস্টেশনে ঘুরতে আসা দর্শনার্থীদের গান শোনান রইচ উদ্দিন। সারাদিন গান গেয়ে তাঁর আয় হয় প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। এই সামান্য অর্থ দিয়েই চলে তাঁর ও পরিবারের জীবনযাপন।

ডিজিটাল যুগে লোকশিল্পীদের প্রতি মানুষের আগ্রহ কমে যাওয়ায় আক্ষেপ প্রকাশ করে রইচ উদ্দিন বলেন, এখন তাঁর মতো শিল্পীদের গান আর আগের মতো কেউ শুনতে চান না। অনেকে গান গাইতে বলেন, কিন্তু টাকা না দিয়েই চলে যান। কেউ কেউ মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করেন, অথচ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন না। বর্তমানে তিনি কোনো সরকারি সুযোগ-সুবিধা বা ভাতাও পাচ্ছেন না বলে জানান।

পাকশী রেলস্টেশনের বাদাম বিক্রেতা সালাম বলেন, সাধারণত শুক্র ও শনিবার রইচ উদ্দিন স্টেশনে আসেন। সারাদিন দোতারা হাতে গান গেয়ে যে সামান্য অর্থ উপার্জন করেন, তা দিয়েই কোনো রকমে দিন কাটান তিনি।

স্থানীয় চা-দোকানি বাবু শেখ বলেন, রইচ উদ্দিন প্রতিদিন প্রায় ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার পথ হেঁটে ঈশ্বরদীতে আসেন। ছোটবেলা থেকেই তাঁর দুই চোখে সমস্যা রয়েছে। তারপরও ভিক্ষা না করে মুর্শিদি, বাউল, লালন, পল্লীগীতি ও ভাওয়াইয়া গান গেয়ে জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করছেন তিনি।

রইচ উদ্দিনের মতো লোকশিল্পীদের দুরবস্থা স্থানীয় সচেতন মহলেরও নজর কেড়েছে। তাঁদের মতে, লোকসংগীত দেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অথচ এসব গানের শিল্পীরা বার্ধক্যে এসে আর্থিক নিরাপত্তা ও সামাজিক সহায়তার অভাবে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, জীবনের শেষ সময়ে এসে রইচ উদ্দিন যেন কিছুটা স্বস্তিতে বাঁচতে পারেন, সে জন্য বিত্তবান ব্যক্তি ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টদের এগিয়ে আসা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তাঁর মতো অসচ্ছল লোকশিল্পীদের সরকারি সহায়তার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।

এ বিষয়ে ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হাসান মোহাম্মদ শোয়াইব বলেন, রইচ উদ্দিন কোনো সরকারি ভাতা পান কি না, তা তাঁর জানা নেই। তবে তিনি ভাতা না পেয়ে থাকলে আবেদন করলে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার ব্যবস্থা করা হবে।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি