সাত দশকের সম্পর্ক শেষ, জার্মানির গায়ে আর দেখা যাবে না অ্যাডিডাস
জার্মান জাতীয় ফুটবল দলে চলছে পরিবর্তনের সময়। কোচিংয়ে নতুন অধ্যায়ের পাশাপাশি দলটির দীর্ঘদিনের পরিচিত একটি সম্পর্কও এবার শেষের পথে। সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে জার্মান ফুটবলের সঙ্গে থাকা ক্রীড়া সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাডিডাসকে বিদায় জানিয়ে ২০২৭ সাল থেকে নতুন চুক্তিতে নাইকির সঙ্গে পথচলা শুরু করতে যাচ্ছে জার্মান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (ডিএফবি)।
সম্পর্কচ্ছেদের সেই অধ্যায়ের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়েছে নেশনস লিগের ম্যাচে। আমস্টারডামে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে জার্মানির ১–১ গোলে ড্র হওয়া ম্যাচে জার্মান খেলোয়াড়দের গায়ে দেখা গেছে অ্যাডিডাসের তৈরি শেষ জাতীয় দলের জার্সি।
কালো রঙের এই জার্সিটি জার্মানির প্রচলিত সাদা জার্সির চেয়ে একেবারেই আলাদা। ভি-নেক কলারের ওপর সাদা ও সোনালি রঙের বর্ডার এবং একই রঙের কালো শর্টস—সব মিলিয়ে বিশেষ নকশায় তৈরি করা হয়েছে জার্সিটি। জার্মানির সাবেক তারকা ফিলিপ লাম ও ইয়ুর্গেন ক্লিন্সম্যানকে সামনে রেখে কিছুদিন আগে এই জার্সি উন্মোচন করেছিল অ্যাডিডাস।
তবে জার্সিটির বিশেষত্ব শুধু নকশায় নয়। এটি জার্মান জাতীয় দলের জন্য অ্যাডিডাসের তৈরি শেষ জার্সি। এরপর আর জার্মানির জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের গায়ে এই জার্মান ব্র্যান্ডের তিন দাগের লোগো দেখা যাবে না।
জার্মান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন ও অ্যাডিডাসের সম্পর্ক শুরু হয়েছিল ১৯৫৪ সালের বিশ্বকাপ থেকে। সেই আসরেই জার্মানি প্রথমবার অ্যাডিডাসের সঙ্গে জাতীয় দলের সরঞ্জাম নিয়ে পথচলা শুরু করে। এরপর বিশ্বকাপ, ইউরোসহ অসংখ্য বড় আসরে জার্মানির সাফল্যের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল অ্যাডিডাসের নাম।
জাতীয় দলের সঙ্গে কোনো ক্রীড়া সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের এত দীর্ঘ সম্পর্ক ফুটবল ইতিহাসে বিরল। জার্মান ফুটবলের পরিচিত সাদা জার্সি আর অ্যাডিডাসের তিন দাগ যেন দীর্ঘদিন ধরে একে অপরের সমার্থক হয়ে উঠেছিল।
কিন্তু সেই সম্পর্ক শেষ করার সিদ্ধান্ত নেয় ডিএফবি। ২০২৪ সালে তারা ঘোষণা দেয়, ২০২৬ সালের পর অ্যাডিডাসের সঙ্গে চুক্তি আর নবায়ন করা হবে না। ২০২৭ সাল থেকে জার্মান জাতীয় দলের নতুন সরঞ্জাম সরবরাহকারী হবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান নাইকি।
এই পরিবর্তনের পেছনে বড় কারণ অর্থনৈতিক। জার্মান সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, নাইকি বছরে প্রায় ১০ কোটি ইউরো দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। অ্যাডিডাসের আগের প্রস্তাবের তুলনায় এই অঙ্ক প্রায় দ্বিগুণ। তবে দরপত্রের আর্থিক তথ্য গোপন রাখার নিয়মের কারণে ডিএফবি আনুষ্ঠানিকভাবে নির্দিষ্ট অঙ্ক নিশ্চিত করেনি। তারা শুধু জানিয়েছে, নাইকি ‘সেরা আর্থিক প্রস্তাব’ দিয়েছিল।
ডিএফবির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ দরপত্র প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নাইকিকে নির্বাচিত করা হয়েছে। আগামী এক দশকে জার্মান ফুটবলের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম এগিয়ে নিতে নতুন চুক্তিটি ভূমিকা রাখবে বলেও জানিয়েছিল সংস্থাটি।
তবে অ্যাডিডাসের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের সিদ্ধান্ত জার্মানিতে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করে। দেশের অন্যতম পরিচিত ব্র্যান্ডের সঙ্গে জাতীয় দলের দীর্ঘ সম্পর্ক শেষ হয়ে যাওয়ায় অনেক ফুটবলপ্রেমী ও সাধারণ মানুষ হতাশা প্রকাশ করেন।
তৎকালীন জার্মান অর্থমন্ত্রী রবার্ট হাবেকও এ সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রকাশ্যে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন। তিনি অ্যাডিডাসের তিন দাগের লোগোর সঙ্গে জার্মান জাতীয় দলের দীর্ঘ সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে বলেছিলেন, ‘থ্রি-স্ট্রাইপস’ ছাড়া জার্মানি জাতীয় দলকে কল্পনা করা তার জন্য কঠিন।
অন্যদিকে ডিএফবির যুক্তি ছিল, জাতীয় দলের সরঞ্জাম সরবরাহের চুক্তি শুধু আবেগের বিষয় নয়; অর্থনৈতিক দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ। নাইকির প্রস্তাব থেকে পাওয়া অতিরিক্ত অর্থ জার্মান ফুটবলের ভবিষ্যৎ কার্যক্রম ও উন্নয়নে কাজে লাগানো সম্ভব হবে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
অ্যাডিডাসের সঙ্গে এই সম্পর্কচ্ছেদের সময়েই জার্মানি জাতীয় দলেও এসেছে বড় পরিবর্তন। দলটির দীর্ঘদিনের গোলরক্ষক ম্যানুয়েল নয়্যার এবং ডিফেন্ডার আন্তোনিও রুডিগারকে ঘিরে একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে। কোচিংয়েও নতুন ভাবনা সামনে এসেছে।
ফলে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ম্যাচটি শুধু একটি নেশনস লিগের ম্যাচ হিসেবেই নয়, জার্মান ফুটবলের একটি দীর্ঘ ঐতিহ্যের শেষ অধ্যায়ের সূচনা হিসেবেও আলাদা গুরুত্ব পেয়েছে। ১৯৫৪ বিশ্বকাপ থেকে শুরু হওয়া অ্যাডিডাস-জার্মানি সম্পর্ক ২০২৬ সালে এসে আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হচ্ছে। ২০২৭ সাল থেকে জার্মান ফুটবলের নতুন দৃশ্যপটে দেখা যাবে নাইকির লোগো।
কালের আলো/এসএ

আপনার মতামত লিখুন
Array