এক দশকেরও বেশি সময় পর যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। তাকে স্বাগত জানাতে বিমানবন্দরে নিজেই হাজির মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সামরিক ঘাঁটিতে লালগালিচা, সামরিক আনুষ্ঠানিকতা, রাষ্ট্রীয় নৈশভোজ—শির সফরকে ঘিরে ওয়াশিংটনের আয়োজন যেন বলে দিচ্ছে, অতিথি এবার সাধারণ কোনো রাষ্ট্রপ্রধান নন।
- বিমানবন্দরে ট্রাম্পের অভ্যর্থনা
- রাষ্ট্রীয় নৈশভোজ—জাঁকজমকের আড়ালে বাণিজ্য
- তাইওয়ান ও প্রযুক্তির সংঘাত
কিন্তু লালগালিচার নিচেই জমে আছে কঠিন হিসাব। বাণিজ্যযুদ্ধ থেকে বিরল খনিজ, তাইওয়ান থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে ওয়াশিংটন ও বেইজিং মুখোমুখি। ফলে এই সফরের আসল পরীক্ষা অভ্যর্থনার জাঁকজমকে নয়; দুই নেতা কতটা সংঘাত সামলে সম্পর্ককে স্থিতিশীল রাখতে পারেন, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
লালগালিচার আড়ালে ট্রাম্পের হিসাব
শির সফরে ট্রাম্পের তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকারের জায়গায় বাণিজ্য। পাল্টাপাল্টি শুল্কে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক একসময় ভয়াবহ উত্তেজনায় পৌঁছেছিল। পরে দুই দেশ যুদ্ধবিরতির পথে যায়। এখন সেই সমঝোতা আরও কিছু সময় বহাল রাখার পাশাপাশি বড় বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে। ট্রাম্পের জন্য এর গুরুত্ব শুধু অর্থনীতিতে সীমিত নয়। বাণিজ্যে নতুন উত্তেজনা মার্কিন ভোক্তা ও শিল্প খাতে চাপ বাড়াতে পারে। বিপরীতে চীনের সঙ্গে সমঝোতার দৃশ্যমান অগ্রগতি ওয়াশিংটনের জন্য অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার বার্তা তৈরি করতে পারে।তবে শুল্ক কমানোই সব নয়। চীনের বাজারে মার্কিন কৃষিপণ্যের প্রবেশ, বিরল খনিজ, প্রযুক্তি এবং রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ—সবগুলো প্রশ্নই আলোচনার টেবিলে আলাদা হিসাব তৈরি করবে।
এবার শির হাতেও চাপের অস্ত্র
শি ওয়াশিংটনে এসেছেন আগের তুলনায় শক্তিশালী দর-কষাকষির অবস্থান নিয়ে। চীন এখন শুধু সস্তা পণ্যের উৎপাদক নয়; বৈদ্যুতিক গাড়ি, ব্যাটারি, শিল্প প্রযুক্তি এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহব্যবস্থায় দেশটির প্রভাব বেড়েছে।
বিশেষ করে বিরল খনিজের ক্ষেত্রে চীনের অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। স্মার্টফোন, বৈদ্যুতিক গাড়ি থেকে সামরিক প্রযুক্তি—বিভিন্ন শিল্পেই এসব উপাদানের প্রয়োজন। ফলে ওয়াশিংটন যেমন চীনের ওপর শুল্ক ও প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের চাপ দিতে পারে, বেইজিংয়ের হাতেও রয়েছে পাল্টা চাপ সৃষ্টির বাস্তব সক্ষমতা। এই পরিবর্তিত ভারসাম্যই এবারের বৈঠককে আগের অনেক আলোচনার চেয়ে আলাদা করে তুলেছে।
তাইওয়ানে মিলবে না সহজ সমাধান
বাণিজ্যে সমঝোতার রাস্তা থাকলেও সবচেয়ে কঠিন দেয়াল তাইওয়ান। বেইজিংয়ের কাছে এটি সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। ওয়াশিংটনের কাছে তাইওয়ান আবার ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তাইওয়ানের কাছে মার্কিন অস্ত্র বিক্রি বন্ধের দাবি শির আলোচনার অন্যতম কঠিন বিষয় হতে পারে। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রও চীনের চাপের মুখে তাইওয়ান প্রশ্নে বড় কোনো ছাড় দিতে চাইবে না। অর্থাৎ, বাণিজ্যে ‘দেনা-পাওনা’র হিসাব মিললেও তাইওয়ান প্রশ্নে সমঝোতার জায়গা অনেক সংকীর্ণ।
বাণিজ্য পেরিয়ে যুদ্ধ এখন প্রযুক্তিতে
যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতার নতুন ফ্রন্ট কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। উন্নত চিপ, এআই মডেল, প্রযুক্তি রপ্তানি এবং সামরিক প্রয়োগ—সব ক্ষেত্রেই দুই দেশ এগিয়ে যেতে চাইছে। শির সফরে মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে সাক্ষাতের আয়োজন তাই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এতে একদিকে চীনের প্রযুক্তি বাজারের গুরুত্ব ফুটে উঠছে, অন্যদিকে ওয়াশিংটনের প্রযুক্তি-নিরাপত্তা উদ্বেগও স্পষ্ট হচ্ছে। বড় কোনো প্রযুক্তিগত ছাড়ের চেয়ে দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ ও ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের কাঠামো তৈরিই বাস্তবসম্মত লক্ষ্য হতে পারে।
ইরানেও মুখোমুখি ভিন্ন স্বার্থ
ইরান ইস্যু আলোচনায় এলে দুই দেশের স্বার্থের পার্থক্যও সামনে আসবে। যুক্তরাষ্ট্র যেখানে সংঘাতের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক ফলাফল নিয়ে ব্যস্ত, চীনের প্রধান উদ্বেগ মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা ও জ্বালানি সরবরাহ। ট্রাম্প চাইতে পারেন, ইরান নিয়ে বেইজিং কোনো কূটনৈতিক ভূমিকা নিক। কিন্তু চীন যে ওয়াশিংটনের অবস্থানের সঙ্গে পুরোপুরি একমত হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
সংঘাত ঠেকানোই লক্ষ্য
শিকে ঘিরে এত আয়োজন তাই দুই দেশের বন্ধুত্বের নতুন অধ্যায়ের চেয়ে নিয়ন্ত্রিত প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রয়োজনীয়তাই বেশি তুলে ধরছে। যুক্তরাষ্ট্র চীনের উত্থান ঠেকাতে চাপ অব্যাহত রাখতে চায়। চীনও সেই চাপ মেনে নেওয়ার অবস্থানে নেই। ফলে এবারের বৈঠকে বড় ঐতিহাসিক চুক্তির চেয়ে বাণিজ্যযুদ্ধ ফের তীব্র না হওয়া, যোগাযোগের পথ খোলা রাখা এবং সংঘাতের সীমা নির্ধারণ—এই তিনটি বিষয়ই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। শির জন্য লালগালিচা যতই বিছানো হোক, বৈঠকের টেবিলে বসবে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি—বন্ধু নয়, হিসাবের অংশীদার।
কালের আলো/জেএন/এমকে
আপনার মতামত লিখুন
Array