খুঁজুন
                               
, ,
           

পচা সুপারিতে কর্মসংস্থান, ঘুরছে গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা

কুড়িগ্রাম সংবাদদাতা
প্রকাশিত: শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:৪৬ পূর্বাহ্ণ
পচা সুপারিতে কর্মসংস্থান, ঘুরছে গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা

একসময় গাছ থেকে ঝরে পড়ে পচে যাওয়া সুপারি ছিল কৃষকের কাছে মূল্যহীন। এখন সেই ফেলনা সুপারি ঘিরেই কুড়িগ্রামের রাজারহাটে গড়ে উঠেছে নতুন আয়ের উৎস। বিভিন্ন গ্রাম থেকে ঝরে পড়া পচা সুপারি সংগ্রহ করে শুকানো, বাছাই ও প্রক্রিয়াজাতের পর তা পাঠানো হচ্ছে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে। এতে একদিকে কমছে অপচয়, অন্যদিকে তৈরি হচ্ছে কর্মসংস্থান।

রাজারহাট উপজেলার দিনোবাজারে নিয়মিত বসছে শুকনো পচা সুপারির পাইকারি বাজার। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, এ বাজারে অন্তত ১১ জন ব্যবসায়ী নিয়মিত পচা সুপারি কেনাবেচা করেন। মাসে প্রায় ৫০ টন সুপারি সংগ্রহ করে তারা মানভেদে কেজিপ্রতি ৬০ থেকে ১০০ টাকা দরে কিনে থাকেন। পরে পরিষ্কার ও বাছাই শেষে ট্রাকযোগে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে পাঠানো হয়।

ব্যবসায়ীদের দাবি, প্রক্রিয়াজাত পচা সুপারি মূলত বাণিজ্যিক রং তৈরির কারখানা ও অন্যান্য রাসায়নিক শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে কৃষকের কাছে ফেলনা হিসেবে বিবেচিত পণ্যটি এখন বাণিজ্যিকভাবে মূল্যবান হয়ে উঠেছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কুড়িগ্রামে প্রায় ১ হাজার ২৬৫ হেক্টর জমিতে সুপারির বাগান রয়েছে। ফলন আহরণের পাশাপাশি ঝরে পড়া সুপারি সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতের কারণে স্থানীয়ভাবে বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

দিনোবাজারে সুপারি শুকানো ও বাছাইয়ের কাজে শতাধিক শ্রমিক যুক্ত রয়েছেন। তাদের বড় একটি অংশ নারী। উপজেলার বিভিন্ন এলাকাতেও আরও অর্ধশতাধিক মানুষ এ পেশার সঙ্গে জড়িত।

ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম জানান, তিনি প্রতি মাসে গড়ে ৫০ টন পচা সুপারি বিভিন্ন স্থানে পাঠান। এ ব্যবসা থেকে মাসে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা নিট লাভ হয়। আরেক ব্যবসায়ী লাভলু মিয়া জানান, তাঁর ব্যবসার সঙ্গে প্রায় ১০০ শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে।

নারী শ্রমিক সাগরিকা বলেন, আগে কাজের সন্ধানে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে হতো। এখন বছরের প্রায় ছয় মাস নিয়মিত কাজ পান। প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০ টাকা আয় করে সংসারে সহযোগিতা করছেন। ছাটবান্ধা এলাকার শ্রমিক রেণুবালা জানান, সুপারি বাছাই ও শুকানোর কাজে প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি পান।

তবে সম্ভাবনাময় এ খাতকে আরও এগিয়ে নিতে প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র, সহজ ঋণ এবং আধুনিক শুকানোর প্রযুক্তির প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, আধুনিক ড্রায়ার মেশিন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধা দেওয়া গেলে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতে বিদেশেও এ পণ্য রপ্তানির সুযোগ তৈরি হতে পারে।

রাজারহাট উপজেলা অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা হৈমন্তী রানী বলেন, একসময় নর্দমায় ফেলে দেওয়া সুপারি এখন কৃষকের বাড়তি আয়ের পথ তৈরি করেছে। এ ব্যবসার সঙ্গে কৃষক, ব্যবসায়ী ও শ্রমিক—সবাই আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। তবে খাতটি আধুনিক ও সম্প্রসারণে বর্তমানে তাঁদের হাতে কোনো নতুন সরকারি পরিকল্পনা বা প্রকল্প নেই।

কালের আলো/এমএসআইপি 

চার বিভাগে ভারী বৃষ্টির আভাস, কমবে তাপমাত্রা

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:৫৭ পূর্বাহ্ণ
চার বিভাগে ভারী বৃষ্টির আভাস, কমবে তাপমাত্রা

দেশের চার বিভাগে তুলনামূলক ভারী বৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে সারাদেশে দিন ও রাতে তাপমাত্রা কমতে পারে। শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ১২০ ঘণ্টার পূর্বাভাসে এসব তথ্য জানায় আবহাওয়া অধিদফতর।

পূর্বাভাসে আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক জানান, স্থল নিম্নচাপটি বর্তমানে উত্তর ছত্রিশগড় ও তৎসংলগ্ন উত্তরপূর্ব মধ্যপ্রদেশে অবস্থান করছে। এটি আরো উত্তর-উত্তরপশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে ক্রমান্বয়ে দুর্বল হতে পারে।

মৌসুমি বায়ুর অক্ষের বর্ধিতাংশ মধ্য প্রদেশ, নিম্নচাপের কেন্দ্রস্থল, গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল হয়ে আসাম পর্যন্ত বিস্তৃত। মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের উপর মোটামুটি সক্রিয় এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে মাঝারী অবস্থায় রয়েছে।

তিনি আরও জানান, আজ সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় রংপুর, রাজশাহী, ঢাকা ও খুলনা বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় এবং বরিশাল, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের দু’এক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারী ধরনের বৃষ্টি/বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সাথে সারাদেশের কোথাও কোথাও মাঝারী ধরনের ভারী বর্ষণ হতে পারে। সারাদেশে দিন এবং রাতে তাপমাত্রা সামান্য বাড়তে পারে।

আগামীকাল রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) সকাল ৯ টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, রংপুর, রাজশাহী, ঢাকা, ময়মনসিংহ, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের দু’এক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারী ধরনের বৃষ্টি/বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সারাদেশে দিন এবং রাতের তাপমাত্রা সামান্য বাড়তে পারে।

আগামী সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) সকাল ৯ টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, রংপুর, রাজশাহী, ঢাকা, ময়মনসিংহ, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের দু’এক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারী ধরনের বৃষ্টি/বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সারাদেশে দিন এবং রাতের তাপমাত্রা সামান্য বাড়তে পারে।

আগামী মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম, বরিশাল ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় এবং খুলনা ও ঢাকা বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারী ধরনের বৃষ্টি/বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। এছাড়া দেশের অন্যত্র অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা আকাশসহ আবহাওয়া প্রধানত শুষ্ক থাকতে পারে। সারাদেশে দিনের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে এবং রাতের তাপমাত্রা সামন্য কমতে পারে।

আগামী বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম, বরিশাল ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় এবং রংপুর, রাজশাহী, ঢাকা, ময়মরসিংহ ও খুলনা বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারী ধরনের বৃষ্টি/বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সাথে চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও মাঝারী ধরনের ভারী বর্ষণ হতে পারে। সারাদেশে দিন এবং রাতের তাপমাত্রা সামান্য কমতে পারে।

বর্ধিত পাঁচদিন আবহাওয়ার উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি।

কালের আলো/আরডি/এমডিএইচ

অন্যের জায়গায় ১২ বছর, এবার আশ্রয় হারানোর শঙ্কায় দিনমজুর আশরাফ

গুরুদাসপুর (নাটোর) সংবাদদাতা
প্রকাশিত: শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:৪২ পূর্বাহ্ণ
অন্যের জায়গায় ১২ বছর, এবার আশ্রয় হারানোর শঙ্কায় দিনমজুর আশরাফ

নিজের নামে একটুকরো জমিও নেই। বাঁশের খুঁটি, বনের বেড়া ও টিনের চালের জরাজীর্ণ একটি ঘরই স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে ১২ বছর ধরে দিনমজুর আশরাফ আলীর আশ্রয়। অন্যের জায়গায় কোনোভাবে সংসার চললেও এবার সেই আশ্রয়টুকুও ছাড়তে হবে তাকে। আগামী তিন মাসের মধ্যে ঘর সরিয়ে নিতে বলা হয়েছে জায়গার মালিকের পক্ষ থেকে।

নাটোরের গুরুদাসপুর পৌর এলাকার খামারনাচকৈড় খোয়ারপাড়া মহল্লায় স্ত্রী, তিন কলেজপড়ুয়া মেয়ে ও এক স্কুলপড়ুয়া ছেলেকে নিয়ে বসবাস করেন ৫৭ বছর বয়সী আশরাফ আলী। জায়গার মালিক সেখানে বাড়ি নির্মাণ করবেন। ফলে ঘর সরিয়ে নেওয়ার পর পরিবার নিয়ে কোথায় থাকবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তিনি।

আশরাফ আলী মৃত শুকুর মাহমুদের ছেলে। তার বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছে। বাকি তিন মেয়ে কলেজে পড়ছেন। একমাত্র ছেলে স্কুলে পড়াশোনার পাশাপাশি চাঁচকৈড় বাজারের একটি দোকানে কাজ করে। ছয় সদস্যের পরিবারের ভরণপোষণের প্রধান দায়িত্ব আশরাফের ওপর।

দিনমজুরি করেই চলে তার সংসার। কখনো ইট ভাঙেন, কখনো রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ করেন, আবার কখনো কৃষিশ্রমিকের কাজ করেন। প্রতিদিন কাজও মেলে না। যেদিন কাজ থাকে, সেদিন কোনোভাবে সংসারের খরচ চলে; কাজ না থাকলে নিত্যপ্রয়োজন মেটানোই কঠিন হয়ে পড়ে।

স্থানীয়রা জানান, নওশের মোল্লার জায়গায় ছোট একটি ছাপরা ঘর তুলে প্রায় ১২ বছর ধরে বসবাস করছে আশরাফের পরিবার। জরাজীর্ণ ঘরটির অবস্থা খুবই নাজুক। বৃষ্টি হলে টিনের চাল দিয়ে পানি পড়ে, মেঝেতে পানি জমে কাদায় পরিণত হয়। ঝড়-বৃষ্টির সময় চাল উড়ে যাওয়ার আশঙ্কাতেও আতঙ্কে থাকতে হয় পরিবারটিকে।

একটি ঘরেই পরিবারের সদস্যদের থাকা, খাওয়া ও পড়াশোনা। তিন কলেজপড়ুয়া মেয়ের আলাদা করে পড়ার জায়গা নেই। রাতে ঘুমানোর সময় বই-খাতা গুটিয়ে রাখতে হয়। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তারা পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন।

আশরাফ আলী বলেন, ‘জায়গার মালিক তাঁর বাড়ি করবেন, এটা তাঁর অধিকার। কিন্তু আমাদের তো যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। তিন মেয়ে কলেজে পড়ে, ছেলেটাও ছোট। সরকার যদি মাথা গোঁজার মতো একটু জায়গা আর একটা ঘর করে দেয়, সন্তানদের নিয়ে অন্তত নিশ্চিন্তে থাকতে পারতাম।’

স্থানীয় বাসিন্দা মো. সুমন হাসান ও স্বাধীন তালুকদার বলেন, পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরে কষ্টে বসবাস করছে। তাদের নিজেদের কোনো জমি নেই এবং আয়ও অনিয়মিত। সরকারি পুনর্বাসন বা আবাসন সহায়তা পেলে পরিবারটির স্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থা হতে পারে। এতে সন্তানদের পড়াশোনাও নিরাপদ পরিবেশে চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।

গুরুদাসপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহমিদা আফরোজ বলেন, পরিবারটির বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হবে। সরকারি কোনো সহায়তার সুযোগ থাকলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিন মাস পর জরাজীর্ণ ঘরটিও হারাবেন আশরাফ আলী। দীর্ঘদিনের এই আশ্রয় হারানোর আগে সরকারি সহায়তায় একটি নিরাপদ মাথা গোঁজার ঠাঁই পাওয়াই এখন পরিবারটির একমাত্র প্রত্যাশা।

কালের আলো/এমএসআইপি 

কিশোর গ্যাংয়ের সুতো কার হাতে?

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:৩০ পূর্বাহ্ণ
কিশোর গ্যাংয়ের সুতো কার হাতে?

কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান হচ্ছে নিয়মিত। ধরা পড়ছে কিশোররা। হচ্ছে মামলা। কাউকে পাঠানো হচ্ছে আদালতে। কাউকে মুচলেকায় তুলে দেওয়া হচ্ছে অভিভাবকের হাতে। কিন্তু অপরাধের নেপথ্যে থাকা প্রাপ্তবয়স্ক ‘বড় ভাই’দের বড় অংশই থেকে যাচ্ছে অদৃশ্য। ধরা পড়ছে অপরাধের দৃশ্যমান মুখ। যদিও অক্ষত থাকছে তার নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা।

  • সামনে কিশোর, পেছনে প্রাপ্তবয়স্কদের নেটওয়ার্ক
  • চার হাজারের বেশি সক্রিয় সদস্য, গ্যাং ৩৮৬
  • অভিযান ও গ্রেপ্তারের বাইরে নেপথ্যের অর্থ
  • পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা জরুরি

সম্প্রতি কুমিল্লায় ১৩ বছর বয়সি ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যার পর বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে। হত্যাকাণ্ডের পর জেলার ১৮টি থানায় একযোগে অভিযান চালিয়ে ৬২৪ জনকে আটক করে পুলিশ। এর মধ্যে ৪৫১ কিশোরকে মুচলেকায় অভিভাবকের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ১৭৩ জনকে সোপর্দ করা হয় আদালতে।

কিন্তু এত বড় অভিযানের পরও প্রশ্ন থেকে যায়—এই কিশোরদের অপরাধে নামাল কারা? অস্ত্র, অর্থ কিংবা আশ্রয় এল কোথা থেকে? আটক ব্যক্তিদের মধ্যে কোনো ‘বড় ভাই’ বা শেল্টারদাতা ছিল কি না, সে বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে স্পষ্ট তথ্য দেওয়া হয়নি।

গ্যাং বাড়ছে, থামছে না অভিযানেও
পুলিশের তথ্যেই সংকটের বিস্তার স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ২০২২ সালের শেষ দিকে পুলিশের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে কিশোর গ্যাং ছিল ১৭৩টি। বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হিসাবে সেই সংখ্যা ৩৮৬। চার বছরেরও কম সময়ে সংখ্যা বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। সক্রিয় সদস্য চার হাজারের ওপরে।

রাজধানীতে দেড় শতাধিক গ্যাংয়ের সদস্য প্রায় দুই হাজার। ঢাকার বাইরে সক্রিয় ২২৭টি গ্যাংয়ের সদস্য প্রায় ২ হাজার ৫৫০ জন। চট্টগ্রাম মহানগরেই রয়েছে ৯৮টি গ্যাং। সিলেটে ১৫টি, রাজশাহী ও গাজীপুরে ১৩টি করে এবং খুলনায় সাতটি।

সংখ্যার এই বৃদ্ধি দেখাচ্ছে, কিশোর গ্যাং আর বিচ্ছিন্ন কিছু কিশোরের অপরাধ নয়। এটি এখন স্থানীয় পর্যায়ে বিস্তৃত একটি অপরাধী কাঠামো—যার সঙ্গে প্রাপ্তবয়স্ক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে।

সামনে ‘ছোট ভাই’, পেছনে বড়রা
ডিএমপির একটি থানার সাবেক ওসি এস এম জাকারিয়ার অভিজ্ঞতায় অনেক কিশোর গ্যাংয়ে তিন স্তরের কাঠামো রয়েছে—‘বড় ভাই’, ‘মেজো ভাই’ ও ‘ছোট ভাই’। ২৫ বছরের বেশি বয়সিরা বড় ভাই, ১৮ থেকে ২৩ বছর বয়সিরা মেজো ভাই এবং ১৪ থেকে ১৭ বছর বয়সিরা ছোট ভাই গ্রুপে থাকে।

বড়দের ছত্রচ্ছায়ায় মেজো ভাইয়েরা চাঁদাবাজি, খুন, অস্ত্র দিয়ে হামলা ও মারামারির মতো গুরুতর অপরাধে জড়ায়। ছোটদের ব্যবহার করা হয় চুরি ও ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে। এই কাঠামোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—অপরাধের সময় সামনে থাকে কিশোর, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ থাকে পেছনে। ফলে পুলিশের হাতে সহজে আসে ‘হাত’, অথচ ‘মাথা’ থেকে যায় আড়ালে।

পৃষ্ঠপোষক বদলালেও কাঠামো বহাল
কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে স্থানীয় রাজনীতি ও প্রভাবশালীদের সম্পর্কের অভিযোগও পুরোনো। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগে পুলিশের এক প্রতিবেদনে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ২১ কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে কিশোর গ্যাংকে প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এর আগেও পুলিশ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির পক্ষ থেকে শেল্টারদাতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

কিন্তু অভিযোগের পর কতজন পৃষ্ঠপোষকের বিরুদ্ধে তদন্ত, মামলা কিংবা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হয়েছে—তার পরিষ্কার হিসাব নেই। সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পৃষ্ঠপোষক বদলালেও মাঠপর্যায়ের গ্যাং কাঠামো টিকে আছে। কোথাও কোথাও যুক্ত হয়েছে নতুন সদস্যও।

বয়সের সুরক্ষায় প্রভাবশালীদের সুযোগ
মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ওমর ফারুকের মতে, শিশু-কিশোরদের বয়স বিবেচনায় আইনে থাকা সুযোগকে ব্যবহার করে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা তাদের সহজ টার্গেটে পরিণত করছেন।

তার মতে, দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও আইনের দুর্বলতাও কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি বিস্তারের পেছনে ভূমিকা রাখছে। অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, এক দশকের বেশি সময় ধরে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার ঘটলেও রাষ্ট্র এখনো এর মূল চালিকাশক্তিকে কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে পারেনি। স্থানীয় পর্যায়ে কারা কিশোরদের আশ্রয় দিচ্ছে, কারা অর্থ বা অস্ত্রের জোগান দিচ্ছে—অনেক ক্ষেত্রেই তা জানা থাকলেও ভয় ও প্রভাবের কারণে তা প্রকাশ্যে আসে না।

আইনের আওতায় আনতে হবে পৃষ্ঠপোষকদেরও
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, শুধু কিশোরদের গ্রেপ্তার করে সমস্যার সমাধান হবে না; তাদের পৃষ্ঠপোষকদেরও শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। এখানেই কিশোর গ্যাং দমনের প্রচলিত পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়। ৬২৪ জনকে আটক করা হলো—কিন্তু তাদের মধ্যে কতজন সক্রিয় গ্যাং সদস্য, কারা নির্দেশদাতা এবং কারা নেপথ্যে অর্থ-আশ্রয় দিচ্ছে, সেই স্তরগুলো আলাদা করে বের করতে হবে।

কালের আলো/এমএসআইপি/এমকে