খুঁজুন
                               
, ,
           

প্রকৃতির রঙে সাজা সাতলা বিল টানছে পর্যটকদের

বরিশাল সংবাদদাতা
প্রকাশিত: শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০:৫৫ পূর্বাহ্ণ
প্রকৃতির রঙে সাজা সাতলা বিল টানছে পর্যটকদের

ভোরের আলো ফুটতেই টলটলে পানির ওপর ভেসে থাকা অসংখ্য লাল শাপলা মাথা তুলে তাকায় সূর্যের দিকে। শাপলার ফাঁক দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলে ছোট ছোট নৌকা। চারপাশে পাখির কিচিরমিচির, পানকৌড়ির ডুব আর মাছরাঙার ছুটে চলা—সব মিলিয়ে যেন প্রকৃতির অপূর্ব এক ক্যানভাস। বরিশালের উজিরপুর উপজেলার সাতলার বিলের এমন নৈসর্গিক সৌন্দর্য মুগ্ধ করছে দেশ-বিদেশের প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসুদের।

প্রায় ২০০ একর আয়তনের সাতলা বিলে সারা বছরই পানি থাকে। বর্ষায় পানিতে ভরে ওঠা বিল শরতে রূপ নেয় লাল শাপলার রাজ্যে। সাধারণত জুলাই থেকে শাপলা ফুটতে শুরু করে এবং নভেম্বর পর্যন্ত বিস্তীর্ণ জলাভূমি লাল শাপলায় রঙিন হয়ে থাকে।

বরিশাল শহর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরের উত্তর সাতলা গ্রামজুড়ে এই শাপলার বিস্তার। স্থানীয়দের কাছে এটি সাতলা বিল নামে পরিচিত হলেও লাল শাপলার আধিক্যের কারণে দেশজুড়ে ‘সাতলার লাল শাপলার বিল’ হিসেবেই বেশি পরিচিত। প্রতিবছর শাপলা ফোটার মৌসুমে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এখানে ছুটে আসেন পর্যটকেরা।

নৌকায় ভেসে শাপলার সৌন্দর্য

বিলের মাঝখানে থাকা বাড়িঘরের মানুষের চলাচলের অন্যতম মাধ্যম নৌকা। পর্যটকেরাও ছোট নৌকায় চড়ে বিলের ভেতরে ঘুরে শাপলার সৌন্দর্য উপভোগ করেন। লাল শাপলার ফাঁক দিয়ে নৌকা চলার দৃশ্য পুরো পরিবেশকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। লাল শাপলার পাশাপাশি এখানে সাদা ও বেগুনি শাপলারও দেখা মেলে।

ঢাকা থেকে ঘুরতে আসা শিউলি আক্তার বলেন, সাতলার শাপলা বিলের সৌন্দর্য সত্যিই মুগ্ধ করার মতো। প্রকৃতির সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রেখে পরিকল্পিত পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে এটি দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় গ্রামীণ পর্যটনকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।

বরিশালের আগৈলঝাড়া থেকে আসা মিশু বলেন, তিনি প্রতিবছর এই বিলে ঘুরতে আসেন। খুব সকালে এলে শাপলার সৌন্দর্য সবচেয়ে ভালোভাবে উপভোগ করা যায়। চারপাশের লাল শাপলা আর নৌকায় ভেসে থাকার অনুভূতি অন্যরকম।

শাপলার পাশাপাশি জীববৈচিত্র্যের আকর্ষণ

সাতলা বিল শুধু শাপলার জন্যই নয়, জীববৈচিত্র্যের কারণেও পর্যটকদের আকর্ষণ করে। বিল ও আশপাশে সাদা বক, পানকৌড়ি, মাছরাঙা, ফিঙে, শালিক, দোয়েল, চড়ুই ও কাঠঠোকরাসহ বিভিন্ন দেশীয় পাখির দেখা মেলে। ফলে প্রকৃতি ও পাখিপ্রেমীদের কাছেও এটি হয়ে উঠেছে আকর্ষণীয় গন্তব্য।

বাড়ছে পর্যটন সুবিধা

দীর্ঘদিন ধরে পর্যটকদের আকৃষ্ট করলেও পর্যাপ্ত অবকাঠামো না থাকায় সাতলা বিলে নানা অসুবিধায় পড়তে হতো দর্শনার্থীদের। এবার সেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে বিলটিকে আরও আধুনিক ও পর্যটকবান্ধব করে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, শাপলা বিলের প্রবেশমুখে নির্মাণ করা হচ্ছে দৃষ্টিনন্দন প্রবেশগেট। পাশাপাশি পর্যটকদের জন্য ভিউ পয়েন্ট, ঘাটসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়নকাজ চলছে। এসব স্থাপনা নির্মাণের ফলে পর্যটকেরা নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যে বিলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন বলে আশা করছে প্রশাসন।

উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আলী সুজা বলেন, সাতলার শাপলা বিল উজিরপুরের অন্যতম বড় প্রাকৃতিক সম্পদ ও পর্যটন সম্ভাবনার জায়গা। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রেখে পর্যটকদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রবেশদ্বার, ভিউ পয়েন্ট ও ঘাটসহ বিভিন্ন উন্নয়নকাজের মাধ্যমে স্থানটিকে আরও আকর্ষণীয় ও পর্যটকবান্ধব করে তোলা হচ্ছে।

তিনি বলেন, সাতলার শাপলা বিলের সৌন্দর্য দেশ-বিদেশের মানুষের কাছে তুলে ধরতে প্রচার-প্রচারণার পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। পরিকল্পিতভাবে পর্যটন সুবিধা বাড়ানো গেলে এটি বরিশাল তথা দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। এতে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও বাড়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে।

তবে পর্যটন উন্নয়নের পাশাপাশি বিলের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন সচেতন মহল। অতিরিক্ত স্থাপনা কিংবা পর্যটকদের অনিয়ন্ত্রিত কর্মকাণ্ডে যাতে শাপলা ও জলজ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও নজর দেওয়ার দাবি তাদের।

যেভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে সড়ক বা নৌপথে বরিশাল এসে সাতলার শাপলা বিলে যাওয়া যায়। বরিশাল থেকে উজিরপুর উপজেলার ইচলাদী বাসস্ট্যান্ডে এসে ইজিবাইক বা মাহিন্দ্রায় উত্তর সাতলার শাপলা বিলে পৌঁছানো যায়। এছাড়া ঢাকা থেকে নৌপথে বরিশাল এসে সেখান থেকেও সড়কপথে সাতলায় যাওয়া সম্ভব।

শাপলা গ্রামের আশপাশে স্থানীয় খাবারের হোটেল রয়েছে। তবে রাতযাপনের জন্য পর্যটকদের উজিরপুর সদর কিংবা বরিশাল শহরের আবাসিক হোটেল ব্যবহার করতে হয়।

কালের আলো/এমএসআইপি 

অন্যের জায়গায় ১২ বছর, এবার আশ্রয় হারানোর শঙ্কায় দিনমজুর আশরাফ

গুরুদাসপুর (নাটোর) সংবাদদাতা
প্রকাশিত: শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:৪২ পূর্বাহ্ণ
অন্যের জায়গায় ১২ বছর, এবার আশ্রয় হারানোর শঙ্কায় দিনমজুর আশরাফ

নিজের নামে একটুকরো জমিও নেই। বাঁশের খুঁটি, বনের বেড়া ও টিনের চালের জরাজীর্ণ একটি ঘরই স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে ১২ বছর ধরে দিনমজুর আশরাফ আলীর আশ্রয়। অন্যের জায়গায় কোনোভাবে সংসার চললেও এবার সেই আশ্রয়টুকুও ছাড়তে হবে তাকে। আগামী তিন মাসের মধ্যে ঘর সরিয়ে নিতে বলা হয়েছে জায়গার মালিকের পক্ষ থেকে।

নাটোরের গুরুদাসপুর পৌর এলাকার খামারনাচকৈড় খোয়ারপাড়া মহল্লায় স্ত্রী, তিন কলেজপড়ুয়া মেয়ে ও এক স্কুলপড়ুয়া ছেলেকে নিয়ে বসবাস করেন ৫৭ বছর বয়সী আশরাফ আলী। জায়গার মালিক সেখানে বাড়ি নির্মাণ করবেন। ফলে ঘর সরিয়ে নেওয়ার পর পরিবার নিয়ে কোথায় থাকবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তিনি।

আশরাফ আলী মৃত শুকুর মাহমুদের ছেলে। তার বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছে। বাকি তিন মেয়ে কলেজে পড়ছেন। একমাত্র ছেলে স্কুলে পড়াশোনার পাশাপাশি চাঁচকৈড় বাজারের একটি দোকানে কাজ করে। ছয় সদস্যের পরিবারের ভরণপোষণের প্রধান দায়িত্ব আশরাফের ওপর।

দিনমজুরি করেই চলে তার সংসার। কখনো ইট ভাঙেন, কখনো রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ করেন, আবার কখনো কৃষিশ্রমিকের কাজ করেন। প্রতিদিন কাজও মেলে না। যেদিন কাজ থাকে, সেদিন কোনোভাবে সংসারের খরচ চলে; কাজ না থাকলে নিত্যপ্রয়োজন মেটানোই কঠিন হয়ে পড়ে।

স্থানীয়রা জানান, নওশের মোল্লার জায়গায় ছোট একটি ছাপরা ঘর তুলে প্রায় ১২ বছর ধরে বসবাস করছে আশরাফের পরিবার। জরাজীর্ণ ঘরটির অবস্থা খুবই নাজুক। বৃষ্টি হলে টিনের চাল দিয়ে পানি পড়ে, মেঝেতে পানি জমে কাদায় পরিণত হয়। ঝড়-বৃষ্টির সময় চাল উড়ে যাওয়ার আশঙ্কাতেও আতঙ্কে থাকতে হয় পরিবারটিকে।

একটি ঘরেই পরিবারের সদস্যদের থাকা, খাওয়া ও পড়াশোনা। তিন কলেজপড়ুয়া মেয়ের আলাদা করে পড়ার জায়গা নেই। রাতে ঘুমানোর সময় বই-খাতা গুটিয়ে রাখতে হয়। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তারা পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন।

আশরাফ আলী বলেন, ‘জায়গার মালিক তাঁর বাড়ি করবেন, এটা তাঁর অধিকার। কিন্তু আমাদের তো যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। তিন মেয়ে কলেজে পড়ে, ছেলেটাও ছোট। সরকার যদি মাথা গোঁজার মতো একটু জায়গা আর একটা ঘর করে দেয়, সন্তানদের নিয়ে অন্তত নিশ্চিন্তে থাকতে পারতাম।’

স্থানীয় বাসিন্দা মো. সুমন হাসান ও স্বাধীন তালুকদার বলেন, পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরে কষ্টে বসবাস করছে। তাদের নিজেদের কোনো জমি নেই এবং আয়ও অনিয়মিত। সরকারি পুনর্বাসন বা আবাসন সহায়তা পেলে পরিবারটির স্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থা হতে পারে। এতে সন্তানদের পড়াশোনাও নিরাপদ পরিবেশে চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।

গুরুদাসপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহমিদা আফরোজ বলেন, পরিবারটির বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হবে। সরকারি কোনো সহায়তার সুযোগ থাকলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিন মাস পর জরাজীর্ণ ঘরটিও হারাবেন আশরাফ আলী। দীর্ঘদিনের এই আশ্রয় হারানোর আগে সরকারি সহায়তায় একটি নিরাপদ মাথা গোঁজার ঠাঁই পাওয়াই এখন পরিবারটির একমাত্র প্রত্যাশা।

কালের আলো/এমএসআইপি 

কিশোর গ্যাংয়ের সুতো কার হাতে?

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:৩০ পূর্বাহ্ণ
কিশোর গ্যাংয়ের সুতো কার হাতে?

কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান হচ্ছে নিয়মিত। ধরা পড়ছে কিশোররা। হচ্ছে মামলা। কাউকে পাঠানো হচ্ছে আদালতে। কাউকে মুচলেকায় তুলে দেওয়া হচ্ছে অভিভাবকের হাতে। কিন্তু অপরাধের নেপথ্যে থাকা প্রাপ্তবয়স্ক ‘বড় ভাই’দের বড় অংশই থেকে যাচ্ছে অদৃশ্য। ধরা পড়ছে অপরাধের দৃশ্যমান মুখ। যদিও অক্ষত থাকছে তার নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা।

  • সামনে কিশোর, পেছনে প্রাপ্তবয়স্কদের নেটওয়ার্ক
  • চার হাজারের বেশি সক্রিয় সদস্য, গ্যাং ৩৮৬
  • অভিযান ও গ্রেপ্তারের বাইরে নেপথ্যের অর্থ
  • পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা জরুরি

সম্প্রতি কুমিল্লায় ১৩ বছর বয়সি ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যার পর বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে। হত্যাকাণ্ডের পর জেলার ১৮টি থানায় একযোগে অভিযান চালিয়ে ৬২৪ জনকে আটক করে পুলিশ। এর মধ্যে ৪৫১ কিশোরকে মুচলেকায় অভিভাবকের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ১৭৩ জনকে সোপর্দ করা হয় আদালতে।

কিন্তু এত বড় অভিযানের পরও প্রশ্ন থেকে যায়—এই কিশোরদের অপরাধে নামাল কারা? অস্ত্র, অর্থ কিংবা আশ্রয় এল কোথা থেকে? আটক ব্যক্তিদের মধ্যে কোনো ‘বড় ভাই’ বা শেল্টারদাতা ছিল কি না, সে বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে স্পষ্ট তথ্য দেওয়া হয়নি।

গ্যাং বাড়ছে, থামছে না অভিযানেও
পুলিশের তথ্যেই সংকটের বিস্তার স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ২০২২ সালের শেষ দিকে পুলিশের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে কিশোর গ্যাং ছিল ১৭৩টি। বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হিসাবে সেই সংখ্যা ৩৮৬। চার বছরেরও কম সময়ে সংখ্যা বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। সক্রিয় সদস্য চার হাজারের ওপরে।

রাজধানীতে দেড় শতাধিক গ্যাংয়ের সদস্য প্রায় দুই হাজার। ঢাকার বাইরে সক্রিয় ২২৭টি গ্যাংয়ের সদস্য প্রায় ২ হাজার ৫৫০ জন। চট্টগ্রাম মহানগরেই রয়েছে ৯৮টি গ্যাং। সিলেটে ১৫টি, রাজশাহী ও গাজীপুরে ১৩টি করে এবং খুলনায় সাতটি।

সংখ্যার এই বৃদ্ধি দেখাচ্ছে, কিশোর গ্যাং আর বিচ্ছিন্ন কিছু কিশোরের অপরাধ নয়। এটি এখন স্থানীয় পর্যায়ে বিস্তৃত একটি অপরাধী কাঠামো—যার সঙ্গে প্রাপ্তবয়স্ক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে।

সামনে ‘ছোট ভাই’, পেছনে বড়রা
ডিএমপির একটি থানার সাবেক ওসি এস এম জাকারিয়ার অভিজ্ঞতায় অনেক কিশোর গ্যাংয়ে তিন স্তরের কাঠামো রয়েছে—‘বড় ভাই’, ‘মেজো ভাই’ ও ‘ছোট ভাই’। ২৫ বছরের বেশি বয়সিরা বড় ভাই, ১৮ থেকে ২৩ বছর বয়সিরা মেজো ভাই এবং ১৪ থেকে ১৭ বছর বয়সিরা ছোট ভাই গ্রুপে থাকে।

বড়দের ছত্রচ্ছায়ায় মেজো ভাইয়েরা চাঁদাবাজি, খুন, অস্ত্র দিয়ে হামলা ও মারামারির মতো গুরুতর অপরাধে জড়ায়। ছোটদের ব্যবহার করা হয় চুরি ও ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে। এই কাঠামোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—অপরাধের সময় সামনে থাকে কিশোর, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ থাকে পেছনে। ফলে পুলিশের হাতে সহজে আসে ‘হাত’, অথচ ‘মাথা’ থেকে যায় আড়ালে।

পৃষ্ঠপোষক বদলালেও কাঠামো বহাল
কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে স্থানীয় রাজনীতি ও প্রভাবশালীদের সম্পর্কের অভিযোগও পুরোনো। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগে পুলিশের এক প্রতিবেদনে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ২১ কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে কিশোর গ্যাংকে প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এর আগেও পুলিশ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির পক্ষ থেকে শেল্টারদাতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

কিন্তু অভিযোগের পর কতজন পৃষ্ঠপোষকের বিরুদ্ধে তদন্ত, মামলা কিংবা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হয়েছে—তার পরিষ্কার হিসাব নেই। সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পৃষ্ঠপোষক বদলালেও মাঠপর্যায়ের গ্যাং কাঠামো টিকে আছে। কোথাও কোথাও যুক্ত হয়েছে নতুন সদস্যও।

বয়সের সুরক্ষায় প্রভাবশালীদের সুযোগ
মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ওমর ফারুকের মতে, শিশু-কিশোরদের বয়স বিবেচনায় আইনে থাকা সুযোগকে ব্যবহার করে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা তাদের সহজ টার্গেটে পরিণত করছেন।

তার মতে, দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও আইনের দুর্বলতাও কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি বিস্তারের পেছনে ভূমিকা রাখছে। অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, এক দশকের বেশি সময় ধরে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার ঘটলেও রাষ্ট্র এখনো এর মূল চালিকাশক্তিকে কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে পারেনি। স্থানীয় পর্যায়ে কারা কিশোরদের আশ্রয় দিচ্ছে, কারা অর্থ বা অস্ত্রের জোগান দিচ্ছে—অনেক ক্ষেত্রেই তা জানা থাকলেও ভয় ও প্রভাবের কারণে তা প্রকাশ্যে আসে না।

আইনের আওতায় আনতে হবে পৃষ্ঠপোষকদেরও
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, শুধু কিশোরদের গ্রেপ্তার করে সমস্যার সমাধান হবে না; তাদের পৃষ্ঠপোষকদেরও শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। এখানেই কিশোর গ্যাং দমনের প্রচলিত পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়। ৬২৪ জনকে আটক করা হলো—কিন্তু তাদের মধ্যে কতজন সক্রিয় গ্যাং সদস্য, কারা নির্দেশদাতা এবং কারা নেপথ্যে অর্থ-আশ্রয় দিচ্ছে, সেই স্তরগুলো আলাদা করে বের করতে হবে।

কালের আলো/এমএসআইপি/এমকে

সমুদ্র, সূর্যাস্ত আর পর্যটকের পদচারণায় জমজমাট কুয়াকাটা

কলাপাড়া (পটুয়াখালী) সংবাদদাতা
প্রকাশিত: শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:২০ পূর্বাহ্ণ
সমুদ্র, সূর্যাস্ত আর পর্যটকের পদচারণায় জমজমাট কুয়াকাটা

দেশের দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র পটুয়াখালীর কুয়াকাটা। প্রায় ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সমুদ্রসৈকতে পর্যটকদের বড় অংশের ভ্রমণ শুরু হয় জিরো পয়েন্ট থেকে। সমুদ্রের বিশালতা, ঢেউয়ের ছন্দ, বালুচর, সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের দৃশ্য দেখতে প্রতিদিনই এখানে ভিড় করেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পর্যটক-দর্শনার্থীরা।

কুয়াকাটা শুধু জিরো পয়েন্টকেন্দ্রিক নয়। এই সৈকতকে ঘিরে রয়েছে লেম্বুরবন, ঝাউবন, গঙ্গামতি, কাউয়ারচর ও মিশ্রীপাড়া বৌদ্ধবিহারসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক পর্যটন স্পট। ফলে জিরো পয়েন্ট অনেকটা কুয়াকাটার পর্যটনের প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করছে।

সমুদ্রের প্রথম দর্শন

কুয়াকাটায় পৌঁছানোর পর সমুদ্রের গর্জন আর নীল জলরাশি পর্যটকদের টেনে নেয় সৈকতের দিকে। কেউ ঢেউয়ের পানিতে নেমে আনন্দ করেন, কেউ বালুচরে বসে সমুদ্র উপভোগ করেন। আবার অনেকে পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলে স্মৃতি ধরে রাখেন।

বিশেষ করে শুক্র ও শনিবারসহ ছুটির দিনে জিরো পয়েন্টে পর্যটকের ভিড় বেড়ে যায়। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখতে ভোর ও বিকেলে সৈকতে জমে ওঠে আলাদা আয়োজন।

পর্যটনের সঙ্গে জীবিকা

জিরো পয়েন্টের পর্যটনকে ঘিরে গড়ে উঠেছে স্থানীয় অর্থনীতির নানা কর্মকাণ্ড। হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, খাবারের দোকান, শামুক-ঝিনুক ও বিভিন্ন স্থানীয় পণ্যের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বহু মানুষ।

রেস্তোরাঁ মালিক আলমগীর হোসেন বলেন, ছুটির দিন ও শীত মৌসুমে পর্যটক বাড়লে বেচাকেনাও বেড়ে যায়। একই কথা জানান শামুক-ঝিনুক ব্যবসায়ী মো. রাকিব হাসান। পর্যটকের সংখ্যা বাড়লে নতুন ও আকর্ষণীয় পণ্য রাখার সুযোগও তৈরি হয় বলে জানান তিনি।

সৈকত-লাগোয়া হোটেল সিকুইনের মালিক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন হাওলাদার বলেন, পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর কুয়াকাটায় পর্যটক বেড়েছে। আগের মতো লোকসানও এখন হয় না।

কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবদুল মোতালেব শরীফ জানান, কুয়াকাটায় দুই শতাধিক আবাসিক হোটেল রয়েছে। সাপ্তাহিক ছুটিতে অনেক হোটেলের কক্ষ পূর্ণ হয়ে যায়। শীত মৌসুমে পর্যটকের চাপ আরও বেড়ে যাওয়ায় থাকার জায়গার সংকট তৈরি হয়।

নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতার চ্যালেঞ্জ

পর্যটক বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জিরো পয়েন্টে বাড়ছে মানুষের চাপ। ছুটির দিনে যানবাহনের চাপ, অতিরিক্ত ভিড় ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতি সৈকতের পরিবেশের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। প্লাস্টিক ও খাবারের প্যাকেটসহ বিভিন্ন বর্জ্য সৈকতের সৌন্দর্য নষ্ট করছে।

কুয়াকাটা পৌর প্রশাসক ও কলাপাড়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ইয়াছিন ছাদেক বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তায় ট্যুরিস্ট পুলিশের পাশাপাশি মহিপুর থানা পুলিশ ও নৌপুলিশ কাজ করছে। খাবারে অনিয়ম, অতিরিক্ত দাম এবং পর্যটক হয়রানি বন্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে।

সমুদ্রে গোসলের সময়ও পর্যটকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। জোয়ার-ভাটা, পানির গভীরতা ও আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই সৈকতে সতর্কবার্তা, লাইফগার্ড, নজরদারি ও জরুরি সহায়তার ব্যবস্থা কার্যকর রাখা জরুরি।

পরিকল্পিত উন্নয়নের প্রয়োজন

জিরো পয়েন্ট থেকে পর্যটকেরা কুয়াকাটার অন্যান্য দর্শনীয় স্থানে ছড়িয়ে পড়েন। তাই এ এলাকার উন্নয়নকে শুধু একটি সৈকতের উন্নয়ন হিসেবে না দেখে পুরো পর্যটন ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।

পর্যটকদের জন্য পরিচ্ছন্ন হাঁটার জায়গা, বসার ব্যবস্থা, নির্দিষ্ট খাবারের স্থান, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ গোসলের এলাকা, তথ্যকেন্দ্র ও জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা গেলে কুয়াকাটার পর্যটন আরও বিকশিত হতে পারে। তবে উন্নয়নের নামে সৈকতের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পরিবেশ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও নজর দিতে হবে।

কুয়াকাটার জিরো পয়েন্ট তাই শুধু সমুদ্র দেখার জায়গা নয়; এটি পর্যটকদের আনন্দ, স্মৃতি ও স্থানীয় মানুষের জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করা গেলে জিরো পয়েন্টকে ঘিরে পুরো কুয়াকাটার পর্যটনশিল্প আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।

কালের আলো/এমএসআইপি