খুঁজুন
                               
, ,
           

কাগজের দিন শেষ, চট্টগ্রাম বন্দরের ডিজিটাল রূপান্তর

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো:
প্রকাশিত: শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:০২ অপরাহ্ণ
কাগজের দিন শেষ, চট্টগ্রাম  বন্দরের ডিজিটাল রূপান্তর

একটি বন্দরের সক্ষমতা শুধু জাহাজ ভেড়ানো কিংবা পণ্য ওঠানামায় মাপা হয় না; কত দ্রুত, স্বচ্ছ ও নির্বিঘ্নে সেই সেবা মানুষের কাছে পৌঁছায়, তার ওপরও নির্ভর করে বন্দরটির কার্যকারিতা। সেই জায়গাতেই বড় পরিবর্তনের পথে এগোচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর। কাগজের ফাইল, কাউন্টারের অপেক্ষা ও ম্যানুয়াল অনুমোদনের দীর্ঘ প্রক্রিয়াকে পেছনে ফেলে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরকে চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে পুরোপুরি পেপারলেস ও ‘স্মার্ট পোর্টে’ রূপান্তরের লক্ষ্য নিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক)।

  • চেয়ারম্যান এস এম মনিরুজ্জামানের উদ্যোগে সমন্বিত অটোমেশন
  • ডিসেম্বরের মধ্যে স্মার্ট পোর্টে রূপান্তরের লক্ষ্য
  • এক প্ল্যাটফর্মে বিল, পেমেন্ট, ডেলিভারি ও গেট ব্যবস্থাপনা
  • কমবে সময়, কাগজ ও শারীরিক উপস্থিতি

এই রূপান্তরের কেন্দ্রে রয়েছে একটি সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা—যেখানে বিল পরিশোধ থেকে পণ্য ডেলিভারি, গেট পাস থেকে জাহাজের অনুমোদন এবং ট্রাকের প্রবেশ থেকে পার্কিং পর্যন্ত সেবার বড় অংশই পরিচালিত হবে অনলাইনে। চবক চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামানের দক্ষ নেতৃত্ব ও কার্যকর ধারাবাহিক উদ্যোগে ইতোমধ্যে বেশ কিছু সেবা ডিজিটাল কাঠামোয় এসেছে। এখন লক্ষ্য সেগুলোকে একটি পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন ব্যবস্থায় যুক্ত করা।

কাউন্টার ছাড়াই বন্দরের সেবা
চট্টগ্রাম বন্দরের শতভাগ বিল ইতোমধ্যে অনলাইনে সম্পাদিত হচ্ছে। কনটেইনার ও কনসাইনি বিলও টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেমের (টিওএস) মাধ্যমে তৈরি ও আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ওয়ান-স্টপ সার্ভিস সেন্টারে সোনালী ব্যাংক পিএলসির বুথ স্থাপনের পাশাপাশি এপিআই ইন্টিগ্রেশনের মাধ্যমে চালু হয়েছে অনলাইন পেমেন্ট। ফলে ছুটির দিন কিংবা প্রচলিত ব্যাংকিং সময়ের বাইরেও বিল পরিশোধ করা যাচ্ছে।

বন্দর ব্যবহারকারীদের জন্য এর অর্থ সরাসরি—বিল পরিশোধে কাউন্টারে যেতে হবে না, নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অপেক্ষাও করতে হবে না। একই সঙ্গে কমছে কাগজপত্রের ব্যবহার ও শারীরিক উপস্থিতির প্রয়োজন।

৭২ ঘণ্টা পর স্বয়ংক্রিয় আদায়
ডিজিটাল ব্যবস্থাপনায় শুধু গতি নয়, আর্থিক শৃঙ্খলাকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বন্দরের কোনো মাশুল বা ফি ৭২ ঘণ্টার মধ্যে পরিশোধ না হলে ‘অটো পুল পেমেন্ট’ ব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। অন্যদিকে, টিওএসের মাধ্যমে স্পেশাল ডেলিভারি অ্যাসাইনমেন্টের অনলাইন অনুমোদন এবং এনবিআর ও কাস্টমসের এপিআই ব্যবহার করে অকশন ডেলিভারির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ফলে অনুমোদন, মাশুল আদায় ও পণ্য ডেলিভারির বিভিন্ন ধাপে কাগজনির্ভরতা কমিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। চবকের পরিকল্পনার বড় বৈশিষ্ট্য এখানেই—আলাদা আলাদা সেবা অনলাইনে নেওয়ার পরিবর্তে পুরো কার্যপ্রবাহকে একটি সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থায় আনা।

গেটেই বদলাবে বন্দরের চিত্র
চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যানজটের বিষয়টি জড়িয়ে আছে। সেই বাস্তবতা বিবেচনায় গেট ব্যবস্থাপনাতেও আনা হচ্ছে প্রযুক্তিনির্ভর পরিবর্তন। ই-গেট পাস ইস্যু এবং গেটের ইন-আউট কার্যক্রম শতভাগ অনলাইনের আওতায় আনা হয়েছে। টিওএসের মাধ্যমে ‘টাইম স্লট ম্যানেজমেন্ট’, অনলাইন কার্ড টিকিট, ই-গেট চালান এবং শতভাগ ভেসেল ই-এনওসি চালুর কার্যক্রমও এগিয়ে চলছে।

নতুন টিওএস সংস্করণে ড্রপ টিকিট, পিকআপ টিকিট ও ইআইআর ই-গেট পাসের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে। ফলে বন্দরে যানবাহনের প্রবেশ, পণ্য সংগ্রহ ও বের হওয়ার প্রক্রিয়াকে আরও পরিকল্পিত করার সুযোগ তৈরি হবে।

ট্রাকের অপেক্ষা কমাতে প্রযুক্তি
বন্দরের ভেতরের যানজট কমানোর পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে আরও নির্দিষ্টভাবে। টার্মিনালে রুট-বাই-রুট ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে চালু করা হচ্ছে পেমেন্টভিত্তিক ট্রাক পার্কিং টিকিটিং ব্যবস্থা। এর ফলে নির্দিষ্ট রুট ও ব্যবস্থাপনার আওতায় ট্রাক চলাচল করতে পারবে। অপ্রয়োজনীয় অপেক্ষা ও ঘোরাফেরা কমলে বন্দরের অভ্যন্তরীণ চাপ কমার পাশাপাশি পণ্য পরিবহনের সময়ও সাশ্রয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

নেতৃত্বে গতি, পরিকল্পনায় সমন্বয়
চবক চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামানের নেতৃত্বে ডিজিটাল রূপান্তরের উদ্যোগে মূল গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে সেবার গতি ও প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাকে। বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি সফটওয়্যার চালুর বদলে বিলিং, পেমেন্ট, ডেলিভারি, গেট, জাহাজ ও ট্রাক ব্যবস্থাপনাকে একই ডিজিটাল কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ সেই পরিকল্পনারই প্রতিফলন। ওয়ান-স্টপ সার্ভিস সেন্টারে রিয়েল-টাইম ডকুমেন্ট ভেরিফিকেশন, বিল জেনারেশন ও কনফার্মেশনের পাশাপাশি অফডকের সঙ্গে ইন্টিগ্রেশনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে বন্দর ব্যবহারকারীর একটি কাজ সম্পন্ন করতে একাধিক দপ্তরে ঘোরার প্রয়োজন কমবে।

চবক কর্মকর্তাদের মতে, এর প্রভাব শুধু সেবা গ্রহণের সময় কমানোতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। দ্রুত মাশুল আদায়, স্বচ্ছ আর্থিক হিসাব, পণ্য খালাসে গতি এবং যানবাহনের অপেক্ষার সময় কমানোর মাধ্যমে বন্দরের সামগ্রিক দক্ষতাও বাড়বে।

ডিসেম্বরের লক্ষ্য, বদলে যাবে সেবার সংস্কৃতি
চট্টগ্রাম বন্দরকে স্মার্ট পোর্টে রূপান্তরের উদ্যোগের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য প্রযুক্তি সংযোজনের চেয়েও বেশি—এটি বন্দরের সেবা প্রদানের সংস্কৃতিতে পরিবর্তনের প্রচেষ্টা। যেখানে একটি বিলের জন্য কাউন্টারে দাঁড়ানো, একটি অনুমোদনের জন্য ফাইল খোঁজা কিংবা গেট পার হওয়ার জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা ধীরে ধীরে অতীতের দৃশ্যে পরিণত হবে।

ডিসেম্বরের মধ্যে পূর্ণ পেপারলেস বন্দর গড়ার লক্ষ্য বাস্তবায়নে তাই প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রয়োজন হবে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত অংশগ্রহণ। চবক চেয়ারম্যানও এ লক্ষ্য অর্জনে বন্দর ব্যবহারকারী ও সব স্টেকহোল্ডারের সহযোগিতা চেয়েছেন। সফল হলে চট্টগ্রাম বন্দরের এই পরিবর্তন শুধু একটি আধুনিক সফটওয়্যার ব্যবস্থার সংযোজন হবে না; বরং দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের সেবা ব্যবস্থাপনাকে কাগজের ফাইল থেকে রিয়েল-টাইম ডিজিটাল অপারেশনে নেওয়ার একটি দৃশ্যমান রূপান্তর হয়ে উঠবে বলে মনে করা হচ্ছে।

কালের আলো/এএইচ/এমকে

বিয়ের পর হঠাৎ থেমে গিয়েছিল সোনি রাজদানের অভিনয়জীবন

বিনোদন প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:০১ অপরাহ্ণ
বিয়ের পর হঠাৎ থেমে গিয়েছিল সোনি রাজদানের অভিনয়জীবন

একসময় নিয়মিত অভিনয় করছিলেন সোনি রাজদান। সিনেমায় প্রশংসা পাচ্ছিলেন, টেলিভিশনেও তৈরি হয়েছিল পরিচিতি। কিন্তু ১৯৮৬ সালে পরিচালক মহেশ ভাটকে বিয়ের পর হঠাৎই যেন বদলে যায় তাঁর ক্যারিয়ারের গতি। নতুন সিনেমা বা ধারাবাহিকে কাজের সুযোগ কমে যায়। একপর্যায়ে তাঁর মনে হয়েছিল, অভিনয়জীবনে এতদিনে যা কিছু অর্জন করেছিলেন, সব যেন একসঙ্গে হারিয়ে গেছে।

সম্প্রতি দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সেই সময়ের অভিজ্ঞতার কথা আবারও জানিয়েছেন এই অভিনেত্রী। তাঁর কথায়, বিয়ের সময় তিনি একটি কাজ করছিলেন এবং সেটি শেষও করেছিলেন। কিন্তু এরপর আর নতুন কোনো কাজ পাননি। যেন আচমকাই তাঁর অভিনয়জীবনের দরজা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

১৯৮১ সালে ‘৩৬ চৌরঙ্গী লেন’ সিনেমার মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক সোনি রাজদানের। এরপর ‘মান্ডি’ ও ‘সারাংশ’-এর মতো সিনেমায় অভিনয় করে নিজের জায়গা তৈরি করেন তিনি। বিশেষ করে ‘সারাংশ’-এ তাঁর অভিনয় প্রশংসিত হয়। সিনেমার পাশাপাশি টেলিভিশনেও পরিচিতি পান সোনি। রমেশ সিপ্পির ‘বুনিয়াদ’ তাঁকে আরও বড় পরিসরে দর্শকের কাছে পৌঁছে দেয়।

তখন তাঁর ক্যারিয়ার এগোচ্ছিল নিজের গতিতেই। কিন্তু ১৯৮৬ সালের ২০ এপ্রিল মহেশ ভাটকে বিয়ের পর পরিস্থিতি বদলে যায়।

সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে সোনি জানান, বিয়ের সময় তিনি কাজ করছিলেন। সেই কাজ শেষ হওয়ার পরও তিনি অভিনয় চালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নতুন কাজের প্রস্তাব আসা বন্ধ হয়ে যায়। তাঁর কাছে বিষয়টি ছিল আকস্মিক এবং হতাশাজনক।

এর আগে দেওয়া আরেক সাক্ষাৎকারেও একই অভিজ্ঞতার কথা বলেছিলেন সোনি। তাঁর দাবি, কোথাও কোথাও তাঁকে এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছিল—তিনি যেহেতু একজন প্রতিষ্ঠিত পরিচালকের স্ত্রী, তাই তাঁর আর কাজ করার প্রয়োজন কী।

এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁকে সবচেয়ে বেশি হতাশ করেছিল। কারণ, বিয়ের পরও নিজের পেশা চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা তাঁর ছিল। কিন্তু আশপাশের মানুষের ধারণা যেন তাঁর হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল।

‘মহেশ ভাটের স্ত্রী’ পরিচয়ের আড়ালে অভিনেত্রী সোনি

বিয়ের পর সোনি রাজদানের সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত হয়ে যায় আরেকটি পরিচয়—তিনি পরিচালক মহেশ ভাটের স্ত্রী। পরবর্তী সময়ে অভিনেত্রী আলিয়া ভাটের মা হিসেবেও তাঁকে ব্যাপকভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়।

কিন্তু এখানেই সোনির আপত্তি ছিল। কারণ, অভিনয়ে তাঁর পথচলা শুরু হয়েছিল আলিয়ার জন্মেরও আগে। দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করে নিজের একটি স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেছিলেন তিনি।

২০১৯ সালের এক সাক্ষাৎকারে নিজের পরিচয় নিয়ে কথা বলেছিলেন সোনি। জানিয়েছিলেন, দীর্ঘ সময় ধরে তাঁকে মূলত মহেশ ভাটের স্ত্রী হিসেবেই দেখা হয়েছে। ২০২৫ সালের আরেক সাক্ষাৎকারে তিনি আরও স্পষ্ট করে বলেন, সারা জীবনই যেন তাঁকে ‘অন্য কারও কেউ’ হিসেবে দেখা হয়েছে। নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠা করাই ছিল তাঁর দীর্ঘদিনের লড়াই।

অথচ তাঁর অভিনয়জীবনের ইতিহাস চার দশকেরও বেশি সময়ের। সিনেমা, টেলিভিশন ও পরবর্তী সময়ে ওয়েবভিত্তিক কাজ—বিভিন্ন মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি।

‘বুনিয়াদ’ ফিরিয়ে দিয়েছিল কাজ

বিয়ের পর কাজের খরা অবশ্য দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। সোনির ক্যারিয়ারে বড় পরিবর্তন আসে ‘বুনিয়াদ’ দিয়ে।

রমেশ সিপ্পি ও জ্যোতি স্বরূপ পরিচালিত ধারাবাহিকটি ১৯৮৬ সালে দূরদর্শনে প্রচার শুরু হয়। দেশভাগ এবং তার পরবর্তী সময়ের সামাজিক বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে তৈরি এই ধারাবাহিক দ্রুত জনপ্রিয়তা পায়।

‘বুনিয়াদ’-এ সোনির অভিনয়ও দর্শকের নজর কাড়ে। তাঁর নিজের ভাষ্য অনুযায়ী, এই ধারাবাহিকটি তাঁর ক্যারিয়ারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। এরপর আবার বেশ কিছু সিনেমায় কাজের সুযোগ পান তিনি।

অর্থাৎ যে সময়টিকে একসময় তিনি ‘সবকিছু হারিয়ে যাওয়ার’ সময় বলে মনে করেছিলেন, সেখান থেকেই ধীরে ধীরে অভিনয়ে ফিরে আসেন সোনি।

স্বামীর সিনেমাতেও সহজ চরিত্র মেলেনি

মহেশ ভাটকে বিয়ে করার পর সোনির ক্যারিয়ার পুরোপুরি স্বামীর ওপর নির্ভরশীল ছিল—বিষয়টি এমন নয়। বরং বিভিন্ন সময়ে মহেশ ভাট নিজেই তাঁর অভিনয়ক্ষমতার প্রশংসা করেছেন।

২০২৫ সালের এক সাক্ষাৎকারে মহেশ ভাট সোনিকে অত্যন্ত শক্তিশালী অভিনেত্রী হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁর মতে, সোনির অভিনয়ের ধরন, শরীরী ভাষা ও সূক্ষ্ম অভিব্যক্তি মূলধারার ভারতীয় সিনেমার প্রচলিত অভিনয়শৈলীর সঙ্গে সব সময় মেলে না। ফলে তাঁর প্রতিভার যথাযথ ব্যবহার করার মতো চরিত্রও সব সময় পাওয়া যায়নি।

তবে মহেশ ভাটের সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ পেলেও সোনির চরিত্রগুলোর পরিণতি অনেক সময় সুখকর হয়নি। ২০২৬ সালের এক সাক্ষাৎকারে সোনি রসিকতা করে জানান, তাঁর স্বামী তাঁকে এমন অনেক চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ দিয়েছেন, যেগুলো গল্পের মধ্যেই মারা যেত। পরিবারের সদস্যদের কাছেও বিষয়টি একসময় মজার হয়ে উঠেছিল।

‘রাজি’-তে মেয়ের মায়ের চরিত্রে

দীর্ঘ ক্যারিয়ারের পর ২০১৮ সালের ‘রাজি’ সিনেমায় আবারও বড় পর্দায় আলোচনায় আসেন সোনি রাজদান। সিনেমায় তিনি অভিনয় করেন আলিয়া ভাটের মায়ের চরিত্রে। বাস্তব জীবনেও আলিয়া তাঁর মেয়ে হওয়ায় সিনেমাটি ঘিরে দর্শকের আগ্রহ ছিল আরও বেশি।

তবে এখানেও তৈরি হয় পরিচয়ের আরেকটি দ্বন্দ্ব। সোনির অভিনয় নিয়ে আলোচনার বদলে তাঁকে অনেক সময় শুধু ‘আলিয়া ভাটের মা’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে।

যদিও বাস্তবতা হলো, সোনি যখন অভিনয়জগতে পা রাখেন, তখন আলিয়ার জন্মই হয়নি।

পরবর্তী সময়ে ‘ইয়োরস ট্রুলি’, ‘সংস অব প্যারাডাইস’-এর মতো কাজেও অভিনয় করেছেন তিনি। সিনেমার পাশাপাশি ওয়েব সিরিজ ও চরিত্রনির্ভর বিভিন্ন কাজেও তাঁকে দেখা গেছে।

বদলে গেছে সময়

নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে বর্তমান সময়ের তুলনাও করেছেন সোনি রাজদান। তাঁর মতে, এখন পরিস্থিতি অনেকটাই বদলেছে। বিশেষ করে তাঁর মেয়ে আলিয়া ভাটের প্রজন্মের অভিনেত্রীদের জন্য বিয়ে কিংবা মাতৃত্ব আগের মতো ক্যারিয়ার থামিয়ে দেওয়ার কারণ নয়।

চলতি বছর দেওয়া আরেক সাক্ষাৎকারে সোনি বলেন, সময় বদলেছে দেখে তিনি খুশি। তাঁর মেয়ে এমন এক সময়ে কাজ করছেন, যখন একজন নারী একই সঙ্গে মা এবং সফল অভিনেত্রী হিসেবে নিজের পেশাজীবন চালিয়ে যেতে পারেন।

সোনি রাজদানের নিজের ক্যারিয়ারের গল্প তাই শুধু একজন অভিনেত্রীর দীর্ঘ বিরতির গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিয়ের পর একজন নারী শিল্পীর পেশাগত পরিচয় কীভাবে বদলে দেওয়া হয়, পারিবারিক পরিচয় কীভাবে ব্যক্তিগত অর্জনকে আড়াল করে দিতে পারে এবং সময়ের সঙ্গে সেই ধারণাগুলো কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে—তারও একটি দীর্ঘ অধ্যায়।

সূত্রঃ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে

কালের আলো/এসএ

স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভাঙচুরে পুলিশি গাফিলতি হলে ব্যবস্থা: ডিএমপি কমিশনার

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:৫৫ অপরাহ্ণ
স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভাঙচুরে পুলিশি গাফিলতি হলে ব্যবস্থা: ডিএমপি কমিশনার

রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় পুলিশের কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। গাফিলতি প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ।

শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৩টার দিকে ভাঙচুরের শিকার স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি।

ডিএমপি কমিশনার জানান, ঘটনায় ২০০ থেকে ২৫০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে মামলা হয়েছে। এরই মধ্যে চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ঘটনাটি সাধারণ কোনো হামলা নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, বেশ সময় নিয়ে পরিকল্পিতভাবে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে তাণ্ডব চালানো হয়েছে। এ সময় ল্যাবের চিকিৎসা সরঞ্জামসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি লুট করা হয়।

পুলিশের গাফিলতির অভিযোগের বিষয়ে মোসলেহ উদ্দিন আহমদ বলেন, গভীর রাতে সংঘটিত এমন ঘটনা প্রতিরোধ করা পুলিশের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। পুলিশ খবর পাওয়ার পর কত দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছেছিল এবং কোনো ধরনের অবহেলা ছিল কি না, তা তদন্তে বেরিয়ে আসবে।

এ ঘটনায় এডিসি দারুস সালামকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। শনিবারের মধ্যেই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে কমিটিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গাফিলতি প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

রাড্ডা কর্তৃপক্ষ জানায়, গত বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাত ১২টা থেকে ২টার মধ্যে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়। হামলাকারীরা ওষুধ, ভ্যাকসিন, সরকারি টিকাদান কর্মসূচির রেজিস্টার, গুরুত্বপূর্ণ নথি, পরিবার পরিকল্পনার সামগ্রী, আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন, জেনারেটর, ফ্রিজ, এসি ও নগদ টাকাসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম নিয়ে যায়। এতে দেড় কোটি টাকার বেশি আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছে কর্তৃপক্ষ।

এ ঘটনায় রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার বাদী হয়ে শাহ আলী থানায় মামলা করেন। মামলায় মিরপুরের বিএনপি নেতা মো. হানিফ মিয়ার নাম উল্লেখ করে ২০০ থেকে ২৫০ জনকে অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করা হয়েছে।

১৯৭৬ সাল থেকে সরকারি অংশীদারত্বের ভিত্তিতে পরিচালিত রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারটি দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রসূতি সেবা, পরিবার পরিকল্পনা ও সরকারি ইপিআই টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করে আসছে।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি 

আধুনিক কবিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবি টি এস এলিয়ট এর প্রেম, বিচ্ছেদ ও শেষ বয়স

সাহিত্য ডেস্ক
প্রকাশিত: শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:৫২ অপরাহ্ণ
আধুনিক কবিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবি টি এস এলিয়ট এর  প্রেম, বিচ্ছেদ ও শেষ বয়স

আধুনিক কবিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবি টি এস এলিয়ট। ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’, ‘দ্য হলো মেন’, ‘অ্যাশ-ওয়েডনেসডে’ কিংবা ‘ফোর কোয়ার্টেটস’—তাঁর কবিতায় বারবার ফিরে এসেছে আধুনিক মানুষের নিঃসঙ্গতা, সভ্যতার ভাঙন, সময়, মৃত্যু, বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিকতার প্রশ্ন। কিন্তু এই গম্ভীর কবির আরেকটি দিকও ছিল। বিড়াল নিয়ে লিখেছিলেন মজার সব ছড়া, যা বহু বছর পর অ্যান্ড্রু লয়েড ওয়েবারের বিখ্যাত সংগীতনাট্য ‘ক্যাটস’-এর ভিত্তি হয়ে ওঠে।

১৮৮৮ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মিজৌরি অঙ্গরাজ্যের সেন্ট লুইসে জন্ম নেওয়া টমাস স্টার্নস এলিয়ট সাহিত্যজগতে পরিচিত হন টি এস এলিয়ট নামে। কবি হিসেবে খ্যাতির পাশাপাশি তিনি ছিলেন সাহিত্য সমালোচক, সম্পাদক ও প্রকাশক। হার্ভার্ডে পড়াশোনার পর প্যারিস ও অক্সফোর্ডে দর্শন নিয়ে পড়েন। ১৯১৪ সালে ইংল্যান্ডে স্থায়ী হন এবং ১৯২৭ সালে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। আধুনিক কবিতায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৪৮ সালে পান সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার।

দর্শনের ছাত্র থেকে আধুনিক কবি

কবি হওয়ার আগে দর্শনের প্রতি এলিয়টের গভীর আগ্রহ ছিল। হার্ভার্ডে পড়ার সময় ফরাসি প্রতীকবাদী কবিদের লেখায় প্রভাবিত হন তিনি। ১৯১০ ও ১৯১১ সালের দিকে লেখা তাঁর কয়েকটি কবিতা পরবর্তী সময়ে আধুনিক কবিতার গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হয়ে ওঠে।

এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ‘দ্য লাভ সং অব জে. আলফ্রেড প্রুফ্রক’। কবিতার কেন্দ্রীয় চরিত্র একজন আত্মসংশয়ে ভোগা ও দ্বিধাগ্রস্ত নগরবাসী। মানুষের কাছে যেতে চাইলেও প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয় তাকে আটকে রাখে। সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে—এই অনুভূতিও তাকে তাড়া করে।

১৯১৫ সালে কবিতাটি প্রকাশিত হলে সাহিত্যজগতে এলিয়টের পরিচিতি দ্রুত বাড়তে থাকে। এ সময় এজরা পাউন্ডের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পাউন্ড এলিয়টের প্রতিভায় আস্থা রাখতেন এবং সমকালীন সাহিত্যিক মহলে তাঁর পরিচিতি তৈরিতে ভূমিকা রাখেন।

১৯২২ সালে প্রকাশিত ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’-এর পাণ্ডুলিপি সম্পাদনাতেও পাউন্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এলিয়ট কবিতাটি তাঁকে উৎসর্গ করেছিলেন ‘ইল মিগলিয়র ফাব্রো’ নামে, যা দান্তের একটি পঙ্‌ক্তি থেকে নেওয়া এবং অর্থ ‘শ্রেষ্ঠ কারিগর’।

প্রথম স্ত্রী ভিভিয়েন, অস্থির দাম্পত্য

১৯১৫ সালে এলিয়ট বিয়ে করেন ভিভিয়েন হেইগ-উডকে। বিয়ের শুরু থেকেই তাঁদের সম্পর্ক ছিল জটিল। ভিভিয়েনের শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতা সময়ের সঙ্গে গুরুতর হয়ে ওঠে।

১৯৩৩ সালের পর তাঁরা আলাদা বসবাস করতে শুরু করেন। ১৯৩৮ সালে ভিভিয়েনকে একটি মানসিক চিকিৎসাকেন্দ্রে রাখা হয়। ১৯৪৭ সালে সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়।

এলিয়টের ব্যক্তিজীবন ও ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’-এর মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা হয়েছে। তাঁর দাম্পত্যের অস্থিরতা কবিতাটির কিছু অংশের পটভূমি বুঝতে সহায়ক হতে পারে। তবে ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’-কে শুধু একটি অসুখী দাম্পত্যের প্রতিফলন হিসেবে দেখলে কবিতাটির ব্যাপ্তি অনেকটাই কমিয়ে দেখা হয়।

১৯২২ সালে প্রকাশিত এই কবিতায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ইউরোপের ক্লান্তি, বিচ্ছিন্নতা, বিশ্বাসের সংকট ও সাংস্কৃতিক ভাঙনের ছবি উঠে আসে। পুরাণ, ধর্ম, সাহিত্য, আধুনিক নগরজীবন, যৌনতা, মৃত্যু, স্মৃতি ও একাকিত্ব—সব মিলিয়ে এলিয়ট নির্মাণ করেন এক ভাঙাচোরা অথচ গভীর কাব্যজগৎ।

কবির পাশাপাশি সম্পাদক ও প্রকাশক

এলিয়ট শুধু কবি ছিলেন না। ১৯২২ সালে তিনি ‘দ্য ক্রাইটেরিয়ন’ নামে একটি সাহিত্যপত্র শুরু করেন এবং ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত এর সম্পাদক ছিলেন। ইউরোপীয় সাহিত্য ও চিন্তার জগতে পত্রিকাটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

১৯২৫ সালে তিনি ফ্যাবার অ্যান্ড ফ্যাবারে যোগ দেন। পরে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালকও হন। সম্পাদক ও প্রকাশক হিসেবে বহু নতুন লেখককে সাহিত্যজগতে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল।

সাহিত্য সমালোচক হিসেবেও এলিয়টের প্রভাব ছিল গভীর। ঐতিহ্য ও ব্যক্তিগত প্রতিভার সম্পর্ক, কবির ব্যক্তিগত অনুভূতি ও কবিতার সম্পর্ক এবং সাহিত্যের মূল্যবোধ নিয়ে তাঁর প্রবন্ধগুলো বিশ শতকের ইংরেজি সাহিত্যচিন্তায় দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।

‘ওল্ড পসাম’ ও বিড়ালের জগৎ

এত গম্ভীর সাহিত্যিক পরিচয়ের আড়ালে ছিলেন অন্য এক এলিয়ট। বিড়াল নিয়ে লেখা তাঁর ছড়াগুলো ছিল রসিকতা ও আনন্দে ভরা।

‘ওল্ড পসাম’ ছিল তাঁর ডাকনাম। এজরা পাউন্ড তাঁকে এই নামে ডাকতেন। ১৯৩৯ সালে এই নামেই প্রকাশিত হয় তাঁর বিখ্যাত বই ‘ওল্ড পসামের প্র্যাকটিক্যাল ক্যাটস’।

বইটিতে একের পর এক বিড়াল চরিত্র—জেলিকল, ম্যাকাভিটি, মুংজেরি, রামপেলটিজার ও স্কিম্বলশ্যাঙ্কস—নিজস্ব স্বভাব ও কাণ্ডকারখানা নিয়ে হাজির হয়। এখানে ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’-এর গম্ভীর কবিকে পাওয়া যায় না। বরং দেখা যায় শব্দ, ছন্দ ও প্রাণীর বিচিত্র স্বভাব নিয়ে খেলতে থাকা এক রসিক লেখককে।

আর এই ছড়াগুলোই বহু বছর পর নতুন জীবন পায় মঞ্চে। ১৯৭৮ সালে অ্যান্ড্রু লয়েড ওয়েবার এলিয়টের বিড়ালবিষয়ক কবিতায় সুর বসিয়ে কাজ শুরু করেন। সেখান থেকেই তৈরি হয় বিখ্যাত সংগীতনাট্য ‘ক্যাটস’। ১৯৮১ সালে লন্ডনে প্রথম মঞ্চায়নের পর ১৯৮২ সালে এটি ব্রডওয়েতে যায় এবং ১৯৮৩ সালে সাতটি টনি পুরস্কার জেতে।

ভাঙন থেকে আধ্যাত্মিকতার পথে

এলিয়টের ব্যক্তিজীবন ও কবিতাতেও ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসে। ১৯২৭ সালে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব গ্রহণের পাশাপাশি তিনি অ্যাংলিকান ধর্মমতের সঙ্গে যুক্ত হন। এরপর তাঁর কবিতায় ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতার উপস্থিতি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

‘অ্যাশ-ওয়েডনেসডে’ এবং ‘ফোর কোয়ার্টেটস’-এ সময়, স্মৃতি, মৃত্যু, ইতিহাস, বিশ্বাস ও আত্মিক অনুসন্ধানের বিষয়গুলো বিশেষভাবে উঠে আসে।

‘ফোর কোয়ার্টেটস’-এর চারটি কবিতা—‘বার্ন্ট নর্টন’, ‘ইস্ট কোকার’, ‘দ্য ড্রাই স্যালভেজেস’ ও ‘লিটল গিডিং’—এলিয়টের পরিণত কাব্যচিন্তার অন্যতম প্রকাশ।

‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’-এ যেখানে ভাঙন ও অনুর্বরতার অনুভূতি প্রবল, ‘ফোর কোয়ার্টেটস’-এ সেখানে সেই ভাঙনের মধ্যেই অর্থের সন্ধান রয়েছে। যেন শূন্যতা থেকে অর্থের দিকে, ভাঙন থেকে বিশ্বাসের দিকে এক দীর্ঘ যাত্রা।

এমিলি হেলের সঙ্গে দীর্ঘ চিঠির সম্পর্ক

এলিয়টের জীবনের আরেক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এমিলি হেলকে ঘিরে। ১৯১০-এর দশকের গোড়ায় তাঁদের পরিচয় হয়। পরে তাঁদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

১৯৩০ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত এলিয়ট হেলকে এক হাজারের বেশি চিঠি লিখেছিলেন। ২০২০ সালে সেই চিঠিগুলো গবেষকদের জন্য উন্মুক্ত হলে সাহিত্যজগতে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়।

চিঠিগুলো এলিয়টের ব্যক্তিজীবনের আবেগ, আকাঙ্ক্ষা, অনুশোচনা ও আত্মসংঘাত সম্পর্কে নতুন তথ্যের সুযোগ তৈরি করে। তাঁদের সম্পর্কের প্রকৃতি নিয়ে দীর্ঘদিন নানা ব্যাখ্যা থাকলেও একে সরল প্রেমের গল্পের বদলে দীর্ঘস্থায়ী এক মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পর্ক হিসেবে দেখাই বেশি সংগত।

৬৮ বছর বয়সে নতুন সংসার

ভিভিয়েনের মৃত্যুর এক দশক পর, ১৯৫৭ সালে ৬৮ বছর বয়সে এলিয়ট বিয়ে করেন এস্মে ভ্যালেরি ফ্লেচারকে। ভ্যালেরি তখন ফ্যাবার অ্যান্ড ফ্যাবারে তাঁর সচিব হিসেবে কাজ করছিলেন। তাঁদের বয়সের ব্যবধান ছিল প্রায় ৩৮ বছর।

বিয়েটি ছিল অত্যন্ত ব্যক্তিগত। ঘনিষ্ঠজনেরা পরে তাঁদের দাম্পত্যকে সুখী বলে বর্ণনা করেছেন। জীবনের শেষ পর্বে ভ্যালেরি শুধু এলিয়টের ব্যক্তিগত সঙ্গীই ছিলেন না, তাঁর সাহিত্যিক উত্তরাধিকার সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

১৯৬৫ সালে এলিয়টের মৃত্যুর পর বহু বছর ধরে তাঁর লেখা, চিঠি ও অন্যান্য সাহিত্যিক সম্পদ সংরক্ষণের কাজ করেন ভ্যালেরি।

নোবেল পুরস্কার ও বিতর্ক

১৯৪৮ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান টি এস এলিয়ট। আধুনিক কবিতায় তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়।

তবে এলিয়টের সাহিত্যিক পরিচয়ের পাশাপাশি তাঁর কিছু লেখা নিয়ে বিতর্কও রয়েছে। তাঁর কয়েকটি কবিতা ও গদ্যে ইহুদিদের সম্পর্কে এমন ভাষা ও ধারণা পাওয়া যায়, যেগুলো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ইহুদিবিদ্বেষের অভিযোগ উঠেছে। এসব লেখার ব্যাখ্যা নিয়েও সাহিত্য সমালোচকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।

তাই এলিয়টকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তাঁর অসাধারণ সাহিত্যিক অবদানের পাশাপাশি তাঁর লেখার বিতর্কিত দিকগুলোও আলোচনায় এসেছে। একজন বড় সাহিত্যিকের জীবন ও কাজ সব সময় একরৈখিক হয় না—প্রতিভা, সীমাবদ্ধতা, সময়ের প্রভাব ও ব্যক্তিগত বিশ্বাস সেখানে পাশাপাশি থাকে।

শেষ জীবনে কিছুটা স্থিরতা

১৯৬৫ সালের ৪ জানুয়ারি লন্ডনে ৭৬ বছর বয়সে মারা যান টি এস এলিয়ট।

পেছন ফিরে তাঁর জীবন দেখলে একাধিক বৈপরীত্য চোখে পড়ে। একদিকে ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’, ‘দ্য হলো মেন’, ‘অ্যাশ-ওয়েডনেসডে’ ও ‘ফোর কোয়ার্টেটস’; অন্যদিকে বিড়ালদের নিয়ে মজার ছড়া। একদিকে দর্শনের ছাত্র ও কঠিন সাহিত্য সমালোচক, অন্যদিকে ব্যাংকার, সম্পাদক ও প্রকাশক। একদিকে অস্থির দাম্পত্য, অন্যদিকে জীবনের শেষ দিকে পাওয়া ব্যক্তিগত শান্তি।

তাঁর কবিতার দীর্ঘ যাত্রাটিও কম বিস্ময়কর নয়। শুরুতে আছে নিঃসঙ্গতা, আত্মসংশয় ও যুদ্ধোত্তর সভ্যতার ক্লান্তি। এরপর ধীরে ধীরে আসে ধর্ম, সময়, স্মৃতি ও আধ্যাত্মিকতার অনুসন্ধান।

সম্ভবত এখানেই টি এস এলিয়টের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। তিনি শুধু একটি ভেঙে পড়া পৃথিবীর কবি নন; সেই ভাঙনের মধ্যেও অর্থ খুঁজতে থাকা মানুষের কবি।

‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’-এর অনুর্বর ভূমি থেকে ‘ফোর কোয়ার্টেটস’-এর আধ্যাত্মিক অনুসন্ধান পর্যন্ত তাঁর পথচলা তাই শুধু একজন কবির সাহিত্যিক বিবর্তনের ইতিহাস নয়, নিজের ভেতরে অর্থ খুঁজে ফেরারও এক দীর্ঘ যাত্রা।

যে কবি অনুর্বরতার কথা লিখেছিলেন, তাঁর জীবনের শেষ পর্বে এসে যেন কিছুটা স্থিরতাও ফিরে এসেছিল। আর তাঁর সাহিত্যিক উত্তরাধিকার মনে করিয়ে দেয়—একজন কবিকে বুঝতে হলে শুধু তাঁর বিখ্যাত কবিতাগুলো নয়, তাঁর জীবনের বৈপরীত্যগুলোর দিকেও তাকাতে হয়। সেখানে ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’-এর কবির পাশে হঠাৎ দেখা যায় কয়েকটি বিড়ালকে—আর সেই দৃশ্যটিই হয়তো টি এস এলিয়টকে আরও মানবিক করে তোলে।

কালের আলো/এসএ