এফবিআই কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের শঙ্কা
হ্যাকিংয়ের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো (এফবিআই) কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত ও গোপন তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় সংস্থাটির বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তাদের মধ্যে আতঙ্ক ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। হ্যাকারদের হাতে থাকা তথ্য অনলাইনে প্রকাশ হলে কর্মকর্তাদের পাশাপাশি তাঁদের পরিবারের সদস্যরাও ঝুঁকিতে পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
এফবিআইয়ের বর্তমান ও সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তা বিবিসি নিউজকে জানিয়েছেন, হ্যাকারদের হাতে যদি কর্মকর্তাদের নাম, বাড়ির ঠিকানা, ফোন নম্বর, পরিচয়পত্রের তথ্য এবং চিকিৎসাসংক্রান্ত নথি চলে যায়, তাহলে এসব তথ্য ব্যবহার করে প্রতারণা, হয়রানি, ভয় দেখানো কিংবা শারীরিক হামলার চেষ্টা হতে পারে।
এফবিআইয়ের এক সাবেক সাইবার তদন্তকারী কর্মকর্তা বলেন, ঘটনাটি বিশেষ করে ছদ্মবেশী কর্মকর্তাদের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত তথ্য অপরাধী ও বিদেশি শত্রুভাবাপন্ন হ্যাকারদের হাতে চলে গেলে তা ব্যবহার করে খুব বিশ্বাসযোগ্য ফিশিং বার্তা ও প্রতারণার কৌশল তৈরি করা সম্ভব।
এমনকি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে ঘুষ বা অর্থ আদায়ের চেষ্টাও হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি। একই সঙ্গে অতীতে যেসব অপরাধীর বিরুদ্ধে কর্মকর্তারা তদন্ত করেছেন, তাঁদের কেউ ফাঁস হওয়া তথ্য ব্যবহার করে কর্মকর্তা বা তাঁদের পরিবারের সদস্যদের লক্ষ্যবস্তু করতে পারেন।
হাজারো কর্মকর্তার তথ্য চুরির দাবি
‘শাইনিহান্টার্স’ নামের একটি হ্যাকিং গোষ্ঠী দাবি করেছে, তারা এফবিআইয়ের সিস্টেমে ঢুকে বিপুল পরিমাণ তথ্য চুরি করেছে। গোষ্ঠীটি চুরি করা তথ্য ও নথি চার দিনের মধ্যে প্রকাশ করার হুমকি দিয়েছে।
তবে এর আগে এফবিআইকে তাদের একটি দাবি মেনে নিতে হবে বলেও জানিয়েছে হ্যাকাররা। শাইনিহান্টার্স সাংবাদিকদের চুরি করা তথ্যের কিছু নমুনাও দিয়েছে। এসব নমুনা আসল বলে মনে হচ্ছে বলে জানিয়েছে বিবিসি।
নমুনা তথ্যের মধ্যে কর্মকর্তাদের নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর, পরিচয়পত্রের নম্বর, পদবি এবং স্বামী বা স্ত্রীর বিষয়ে তথ্য রয়েছে। চুরি হওয়া তথ্যের মধ্যে হাজারো এফবিআই কর্মকর্তার তথ্য রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সংস্থাটির উপপরিচালকের মতো জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের তথ্যও এতে রয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়গুলোর একটি হলো, হাজারো বিশেষ এজেন্টের চিকিৎসাসংক্রান্ত সংবেদনশীল তথ্যও হ্যাকারদের হাতে চলে গেছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিবিসি চুরি হওয়া তথ্যের মধ্যে এফবিআই কর্মকর্তাদের কাজের উপযোগিতা যাচাইয়ের জন্য করা কিছু চিকিৎসা পরীক্ষার নথি দেখেছে। এসব নথিতে রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষার ফলাফল এবং চিকিৎসকদের বিভিন্ন নোট রয়েছে। কিছু নথিতে খাবারে অ্যালার্জি, প্রস্রাবে রক্ত এবং উচ্চ কোলেস্টেরলের মতো শারীরিক সমস্যার তথ্যও রয়েছে বলে জানিয়েছে বিবিসি।
ফলে কিছু কর্মকর্তার পুরো নাম, বাড়ির ঠিকানা ও যোগাযোগের তথ্যের পাশাপাশি তাঁদের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত ব্যক্তিগত তথ্যও হ্যাকারদের হাতে রয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ঝুঁকিতে কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যরাও
এফবিআইয়ের সাবেক কর্মকর্তা মাইকেল ম্যাকফারসন বর্তমানে সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান রিলিয়াকোয়েস্টের নিরাপত্তা কার্যক্রমের জ্যেষ্ঠ ভাইস প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেন, এই ঘটনা কর্মকর্তাদের নিরাপত্তার পাশাপাশি তাঁদের পরিবারের জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে।
ম্যাকফারসনের মতে, এফবিআই কর্মকর্তারা তাঁদের পেশার কারণে কিছুটা ঝুঁকি থাকার বিষয়টি জানেন। কিন্তু বাড়ির ঠিকানা ও যোগাযোগের তথ্যের সঙ্গে ব্যক্তিগত চিকিৎসা তথ্যও যদি প্রকাশ পায়, তাহলে পরিস্থিতি আলাদা হয়ে যায়। এ ধরনের তথ্য কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যদেরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।
এফবিআইয়ের সাইবার বিভাগের সাবেক উপপরিচালক সিনথিয়া কাইজার বলেন, শাইনিহান্টার্স এরই মধ্যে চুরি করা তথ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে বলে মনে হচ্ছে। এসব তথ্য সাইবার নিরাপত্তা গবেষকদের বিভিন্ন অনলাইন গ্রুপেও ছড়িয়ে পড়ছে বলে তিনি জানান।
কাইজারের মতে, তথ্য একবার অনলাইনে ছড়িয়ে পড়লে তা পুরোপুরি সরিয়ে ফেলা কঠিন। অতীতেও এফবিআইয়ের তথ্য ফাঁসের ঘটনায় দেখা গেছে, চুরি হওয়া তথ্য বহু বছর ধরে ডার্ক ওয়েবে ঘুরে বেড়িয়েছে।
জাতীয় নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ
এই হ্যাকিংয়ের প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বলে মনে করছেন কর্মকর্তারা। জাতীয় নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ফাঁস হওয়া তথ্য বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার হাতে গেলে এফবিআই কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে যোগাযোগ বা নিয়োগের চেষ্টা হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কোনো কর্মকর্তার ব্যক্তিগত দুর্বলতা, পারিবারিক তথ্য কিংবা যোগাযোগের মাধ্যম সম্পর্কে জানা থাকলে তাঁকে লক্ষ্য করে চাপ তৈরির সুযোগও বাড়তে পারে।
হামলার কারণে আতঙ্কের পাশাপাশি এফবিআইয়ের বিরুদ্ধেও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। বিবিসির সঙ্গে কথা বলা কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা প্রশ্ন তুলেছেন, এত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য কীভাবে হ্যাকারদের হাতে গেল।
প্রযুক্তিগত দিক থেকেও ঘটনাটি এফবিআইয়ের জন্য উদ্বেগের বলে মনে করছেন সাবেক কর্মকর্তারা। তাঁদের কেউ কেউ বলছেন, শাইনিহান্টার্সকে সবচেয়ে দক্ষ বা অত্যাধুনিক হ্যাকিং গোষ্ঠীগুলোর একটি হিসেবে সাধারণত বিবেচনা করা হয় না। তাই এই ঘটনায় এফবিআইয়ের নিরাপত্তাব্যবস্থায় দুর্বলতা ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ ওঠায় কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
তদন্ত শুরু করেছে এফবিআই
শাইনিহান্টার্স সোমবার এফবিআইয়ের সিস্টেমে ঢোকার দাবি করার পর নিজেদের ডার্কনেট সাইটে হামলার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করে। তবে গোষ্ঠীটির সব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এফবিআই প্রথমে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। পরে বুধবার সংস্থাটি হ্যাকিংয়ের ঘটনা স্বীকার করে। এক বিবৃতিতে তারা জানায়, কীভাবে এই ঘটনা ঘটেছে, তা নিয়ে ‘জোরালোভাবে তদন্ত’ করা হচ্ছে।
তথ্য ফাঁসের আশঙ্কায় কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত তথ্য ইন্টারনেট থেকে সরাতে সাহায্য করে এমন ‘ডিলিটমি’ নামের একটি সেবায় নিবন্ধনের পরামর্শও দেওয়া হয়েছে বলে জানান এক সাবেক কর্মকর্তা। তবে তাঁর মতে, এত বড় ঘটনার ক্ষেত্রে শুধু এই ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়।
শাইনিহান্টার্স জানিয়েছে, তারা নিজেদের ডার্কনেট সাইটে চুরি করা তথ্য প্রকাশ করবে। এবার গোষ্ঠীটি সরাসরি অর্থ বা মুক্তিপণ দাবি করেনি। তারা মে মাসে এফবিআই প্রকাশ করা একটি সতর্কবার্তা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। হ্যাকারদের দাবি, ওই সতর্কবার্তায় তাদের ‘অপমান’ করা হয়েছিল।
গোষ্ঠীটিকে তরুণ ইংরেজিভাষী সাইবার অপরাধীদের একটি সক্রিয় নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর সাইবার হামলা চালানোর অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
এখন চুরি করা তথ্য প্রকাশের হুমকির পর পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেওয়া হবে, সেটিই এফবিআইয়ের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তথ্য সত্যিই ব্যাপকভাবে প্রকাশিত হলে কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, তাঁদের পরিবারের সুরক্ষা এবং সংস্থাটির গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম—তিন ক্ষেত্রেই নতুন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সাবেক কর্মকর্তারা।
কালের আলো/এসএ

আপনার মতামত লিখুন
Array