উত্তর গাজার ধ্বংসযজ্ঞ ও সামরিক ঘাঁটির চিত্র প্রকাশ
ইসরায়েল সরকারের সরকারি পাবলিক ম্যাপিং পরিষেবা ‘গভম্যাপ’-এ অল্প সময়ের জন্য গাজার উত্তরাঞ্চলের উচ্চ-রেজল্যুশনের স্যাটেলাইট ছবি দেখা গেছে। এসব ছবিতে যুদ্ধের কারণে উত্তর গাজার ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পাশাপাশি কয়েকটি সামরিক স্থাপনার চিত্রও দৃশ্যমান হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
তবে পরে গভম্যাপে গাজার ওই এলাকাগুলোর স্যাটেলাইট ছবি আবার ঝাপসা করে দেওয়া হয়।
সোমবার ‘@Stinky915846091’ নামের একটি এক্স অ্যাকাউন্টের নজরে আসে বিষয়টি। অ্যাকাউন্টটি ওপেন-সোর্স ইন্টেলিজেন্স বা ওএসআইএনটি নিয়ে কাজ করে এবং গাজা উপত্যকার বিভিন্ন ঘটনার ভৌগোলিক অবস্থান শনাক্ত করার জন্য পরিচিত। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চ-রেজল্যুশনের ছবিগুলো প্রকাশ্যে আসার পর গাজার বিভিন্ন এলাকার স্যাটেলাইট চিত্র আবার ঝাপসা করে দেওয়া হয়।
গভম্যাপে দীর্ঘদিন ধরেই গাজা উপত্যকা, ইসরায়েল এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরের সামরিক ঘাঁটি ও অন্যান্য সংবেদনশীল স্থাপনার স্যাটেলাইট ছবি ঝাপসা করে দেখানো হয়। এ কারণে গাজার কিছু এলাকার তুলনামূলকভাবে পরিষ্কার ও উচ্চ-রেজল্যুশনের ছবি অল্প সময়ের জন্য দৃশ্যমান হওয়ার ঘটনাটি ব্যতিক্রমী বলে মনে করা হচ্ছে।
ঝাপসা না থাকা ছবিগুলোর মধ্যে উত্তর গাজার বেইত লাহিয়া ও বেইত হানুনের মতো এলাকাও ছিল।
২০২৩ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে উত্তর গাজার এসব এলাকা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রকাশিত ছবিগুলো ২০২৫ সালের হওয়ায় এগুলো ইসরায়েলি সেনাদের সামরিক ঘাঁটির বর্তমান অবস্থা দেখায় না। তবে ছবিগুলোতে উত্তর গাজার বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসের চিত্র দেখা যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ইসরায়েলি সেনাদের নিয়ন্ত্রণাধীন বাফার জোনের ভেতরে অন্তত ১১টি সামরিক স্থাপনা বা ঘাঁটির চিত্রও এসব ছবিতে দেখা গেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এক্স ব্যবহারকারী ‘@Nrg8000’ ছবিগুলো ‘সোয়ার অ্যাটলাস’-এও প্রকাশ করেছেন। তবে মিডল ইস্ট আই জানিয়েছে, ছবিগুলোর সত্যতা তারা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। একই সঙ্গে প্রকাশিত ছবিগুলো গাজায় ইসরায়েলি সেনাদের উপস্থিতি এবং যুদ্ধের ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ নিয়ে আগের বিভিন্ন প্রতিবেদনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
বেইত হানুনে ব্যাপক ধ্বংস
উত্তর গাজার বেইত হানুন শহরের বিভিন্ন অংশে ব্যাপক ধ্বংসের চিত্র দেখা গেছে। ছবিতে অনেক ভবন ধ্বংস হয়ে যাওয়া এবং বিভিন্ন এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ার দৃশ্য রয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের কারণে শহরটির বিপুলসংখ্যক বাসিন্দা এলাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। পরবর্তী সময়ে এলাকাটির বড় অংশ সামরিক নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয় বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শুজাইয়ায় ধ্বংসস্তূপ
গাজা শহরের শুজাইয়া এলাকাতেও ব্যাপক ধ্বংসের চিত্র ফুটে উঠেছে। স্যাটেলাইট ছবিতে অনেক ভবন ও রাস্তাঘাট ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখা যায়। বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ধ্বংসস্তূপের চিত্রও স্পষ্ট বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
কারনি ক্রসিংয়ে সামরিক উপস্থিতি
গাজা শহরের জেইতুন এলাকার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত কারনি ক্রসিংয়ের আশপাশেও ইসরায়েলি সেনাদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি দেখা গেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
প্রকাশিত ছবির ভিত্তিতে দাবি করা হয়েছে, গাজার আরও ভেতরে সামরিক অভিযান পরিচালনার জন্য এলাকাটি সামরিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
পূর্ব জাবালিয়ায় সামরিক ঘাঁটি
পূর্ব জাবালিয়ায় ইসরায়েলি সেনাদের একটি সামরিক স্থাপনার চিত্রও স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে মাটির তৈরি উঁচু প্রতিরক্ষা বাঁধ এবং বেশ কিছু সামরিক যান দেখা যায়।
যুদ্ধের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি
২০২৩ সালের অক্টোবরে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর গাজায় বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনি নিহত ও আহত হয়েছেন। প্রতিবেদনে দেওয়া হিসাবে, এ পর্যন্ত অন্তত ৭৩ হাজার ৯২৮ জন নিহত এবং ১ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। গত বছরের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতির পরও ১ হাজার ৪০৮ জন নিহত এবং ৪ হাজার ৯১৬ জনের বেশি আহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে বিভিন্ন স্বাধীন হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গাজার ৮০ শতাংশের বেশি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোর মধ্যে রয়েছে আবাসিক ভবন, স্কুল, হাসপাতাল ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো।
গভম্যাপে অল্প সময়ের জন্য প্রকাশিত স্যাটেলাইট ছবিগুলো সেই ধ্বংসযজ্ঞের একটি ভৌগোলিক চিত্র তুলে ধরেছে। তবে ছবিগুলোর উৎস, সময়কাল ও নির্দিষ্ট সামরিক স্থাপনার পরিচয় নিয়ে স্বাধীনভাবে যাচাইয়ের সীমাবদ্ধতা থাকায় এসব তথ্যকে সতর্কতার সঙ্গে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।
কালের আলো/এসএ

আপনার মতামত লিখুন
Array