জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসে বড় পরিবর্তনের উদ্যোগ
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ইংরেজি, সমাজবিজ্ঞান, ফিন্যান্স, বোটানিসহ ১৫টি বিষয়ের সংশোধিত সিলেবাস ভ্যালিডেশন নিয়ে দুই দিনব্যাপী কর্মশালা শুরু হয়েছে। শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) সকালে গাজীপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ক্যাম্পাসের সিনেট হলে এ কর্মশালা শুরু হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলাম উন্নয়ন ও মূল্যায়ন কেন্দ্রের উদ্যোগে আয়োজিত এ কর্মশালায় দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ের বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষকরা অংশ নিচ্ছেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স পর্যায়ে একসঙ্গে ১৫টি বিষয়ের সিলেবাস ভ্যালিডেশন নিয়ে এ ধরনের উদ্যোগ বাংলাদেশে প্রথম বলে জানানো হয়েছে।
‘ভ্যালিডেশন অব দ্য রিভাইজড ব্যাচেলর অব অনার্স সেকেন্ড ইয়ার সিলেবাস’ শীর্ষক কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ এস এম আমানুল্লাহ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অনারারি অধ্যাপক ও সমাজবিজ্ঞানী এ আই মাহবুব উদ্দিন আহমেদ, ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক মো. নুরুল ইসলাম এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক সাবিনা শরমীন।
কর্মশালার বিভিন্ন অধিবেশনে সরকারি ও বেসরকারি খাতের বিশেষজ্ঞ, গবেষক ও শিক্ষকরা সংশোধিত সিলেবাসের বিভিন্ন দিক নিয়ে মতামত দিচ্ছেন। এর মধ্যে রয়েছে সিলেবাসের বিষয়বস্তু, শিক্ষার্থীদের শেখার প্রক্রিয়া, ব্যবহারিক ও কর্মমুখী জ্ঞান, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং শ্রেণিকক্ষে কার্যকর শিক্ষার পরিবেশ তৈরির বিষয়।
‘শুধু পরীক্ষার জন্য নয়, বাস্তব জীবনের জন্য শিক্ষা’
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপাচার্য অধ্যাপক এ এস এম আমানুল্লাহ বলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলাম ও সিলেবাস আধুনিকায়ন এখন আর শুধু সময়ের দাবি নয়, বরং এটি অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, দেশের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোতে পড়াশোনা করেন। ফলে এই শিক্ষাব্যবস্থায় গুণগত পরিবর্তন ছাড়া দেশের উচ্চশিক্ষায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা কঠিন।
উপাচার্যের ভাষ্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন না হলে দেশের ৭০ শতাংশ শিক্ষার বেহাল দশা কাটবে না। এ কারণেই কারিকুলাম ও সিলেবাস উন্নয়নে ‘ম্যাসিভ’ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, শুধু সিলেবাসের বিষয় পরিবর্তন করলেই হবে না। শিক্ষার্থীরা কী শিখছে, কীভাবে শিখছে এবং সেই শিক্ষা বাস্তব জীবনে কীভাবে কাজে লাগাতে পারছে—এসব বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হবে। সংশোধিত সিলেবাস তৈরির পর বিভিন্ন ক্ষেত্রের অভিজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের মাধ্যমে তা যাচাই করা হচ্ছে।
উপাচার্য বলেন, শিক্ষার্থীরা যেন শুধু পরীক্ষায় ভালো করার জন্য পড়াশোনা না করে; বরং বাস্তব জীবনের প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করতে পারে, সেই লক্ষ্যেই সিলেবাসকে নতুন করে দেখা হচ্ছে।
কর্মমুখী ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষায় গুরুত্ব
সহ-উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, সংশোধিত সিলেবাসে শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবন ও কর্মক্ষেতরের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয় যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি কারিগরি ও ব্যবহারিক বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাচ্ছে।
তিনি বলেন, উচ্চশিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের অংশ হিসেবে কারিকুলাম ও সিলেবাস আধুনিকায়নের উদ্যোগ ধারাবাহিকভাবে চলবে। শিক্ষার্থীদের শুধু একাডেমিক জ্ঞানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ব্যবহারিক দক্ষতা, কর্মমুখী শিক্ষা ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান অর্জনের সুযোগ তৈরি করতে হবে।
এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের জন্য তৃতীয় ভাষা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সার্বিক বিকাশে সাংস্কৃতিক ও খেলাধুলার কার্যক্রম দেশব্যাপী জোরদার করা হয়েছে।
ঔপনিবেশিক প্রভাব থেকে বের হওয়ার আহ্বান
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অনারারি অধ্যাপক ও সমাজবিজ্ঞানী এ আই মাহবুব উদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে ঔপনিবেশিকতার প্রভাব থেকে বের করে আনতে হবে। তা না হলে শিক্ষাব্যবস্থার কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব হবে না।
তিনি বলেন, শিক্ষাব্যবস্থাকে এমনভাবে সাজাতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্বাধীন চিন্তা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা ও বাস্তবজ্ঞান তৈরি হয়। শুধু পাঠ্যবইনির্ভর শিক্ষা নয়, শিক্ষার্থীদের চিন্তা ও সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা তৈরির দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
কর্মশালায় যারা উপস্থিত ছিলেন
কর্মশালায় স্বাগত বক্তব্য দেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মোল্লা মাহফুজ আল-হোসেন। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন কারিকুলাম উন্নয়ন ও মূল্যায়ন কেন্দ্রের ডিন (ভারপ্রাপ্ত) এ এইচ এম রুহুল কুদ্দুস, স্নাতকোত্তর শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্রের ডিন (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ফকির রফিকুল আলম এবং স্নাতকপূর্ব শিক্ষাবিষয়ক স্কুলের ডিন (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক মো. আশেক কবির চৌধুরী।
দুই দিনব্যাপী কর্মশালায় বিশেষজ্ঞদের মতামত ও পরামর্শের ভিত্তিতে সংশোধিত সিলেবাসের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করা হবে। এর মাধ্যমে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স পর্যায়ের শিক্ষাক্রমকে আরও আধুনিক, ব্যবহারিক ও কর্মমুখী করার উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
কালের আলো/এসএ

আপনার মতামত লিখুন
Array