খুঁজুন
                               
, ,
           

ইউএনজিএর ফাঁকে অর্থনৈতিক কূটনীতিতে তারেক রহমান

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮:৪৭ অপরাহ্ণ
ইউএনজিএর ফাঁকে অর্থনৈতিক কূটনীতিতে তারেক রহমান

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য শুধু বৈশ্বিক ইস্যুতে অবস্থান তুলে ধরার মঞ্চ হয়ে থাকছে না; এর ফাঁকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অর্থনৈতিক ভিত্তি আরও শক্ত করারও সুযোগ তৈরি হয়েছে। নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ধারাবাহিক বৈঠকগুলোতে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তি, শিক্ষা, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতার মতো খাত সামনে এসেছে। ফলে এবারের সফরে বাংলাদেশের কূটনীতিতে রাজনৈতিক যোগাযোগের সঙ্গে অর্থনৈতিক স্বার্থকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করার প্রবণতা স্পষ্ট হচ্ছে।

  • নিউইয়র্কে বৈঠকের টেবিলে বাংলাদেশের নতুন অংশীদারত্ব
  • ধারাবাহিক আলোচনায় সামনে এলো বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জনশক্তি ও স্বাস্থ্য

প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেসসচিব এ কে এম নাজমুল হক জানান, বিভিন্ন দেশের সরকার ও মন্ত্রী পর্যায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে এসব বৈঠকে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সহযোগিতা বাড়ানোর উপায় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

ইউরোপের দরজায় ক্রোয়েশিয়া
২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেই প্লেনকোভিচের সঙ্গে বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত করার বিষয়ে আলোচনা হয়। বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তি, শিক্ষা ও প্রযুক্তি সহযোগিতার সম্ভাবনাও গুরুত্ব পায়।

বাংলাদেশের জন্য এই আলোচনার তাৎপর্য কেবল দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দক্ষ মানবসম্পদ, প্রযুক্তি ও শিক্ষায় সহযোগিতা বাড়াতে পারলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তি আরও বহুমুখী হতে পারে। একই সঙ্গে জাতিসংঘসহ বহুপক্ষীয় ফোরামে দুই দেশের সমন্বয় বাড়ানোর আলোচনা সম্পর্কটিকে অর্থনৈতিক যোগাযোগের পাশাপাশি কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও বিস্তৃত করার সুযোগ তৈরি করছে।

থাইল্যান্ডে আঞ্চলিক সহযোগিতার সম্ভাবনা
থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চার্নভিরাকুলের সঙ্গে বৈঠকেও উঠে আসে দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থের বিষয়গুলো। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নেওয়ার বিভিন্ন দিক নিয়ে দুই প্রধানমন্ত্রী মতবিনিময় করেন।

এর আগে ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ বিতর্কে আনুতিন চার্নভিরাকুলের পর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য দেন। একই মঞ্চে ধারাবাহিক উপস্থিতির বাইরে দুই দেশের সরকারপ্রধানের বৈঠক আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো নিয়ে সরাসরি আলোচনার সুযোগও তৈরি করেছে।

বিশেষ করে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক যোগাযোগের সম্ভাবনাকে সামনে রেখে এ সম্পর্কের পরবর্তী ধাপ নির্ধারণের অবকাশ তৈরি হয়েছে।

সুইডেনের সঙ্গে স্বাস্থ্য কূটনীতিতে জোর
সুইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারিয়া মালমের স্টেনারগার্ডের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে স্বাস্থ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতা বিশেষ গুরুত্ব পায়। ইউএনএফপিএ আয়োজিত উচ্চ পর্যায়ের অনুষ্ঠানে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় মিডওয়াইফারির ভূমিকা শক্তিশালী করা এবং মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে সহযোগিতার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়।

স্বাস্থ্য খাতের এই সহযোগিতা বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকারের সঙ্গে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সম্পৃক্ত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।

অর্থনৈতিক কূটনীতির পাশাপাশি মানব উন্নয়নভিত্তিক সহযোগিতাকেও গুরুত্ব দেওয়ার ফলে বাংলাদেশের বহুমাত্রিক অংশীদারত্বের পরিসর বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের কেন্দ্রে অর্থনীতি
নিউইয়র্কের বৈঠকগুলোর দিকে একসঙ্গে তাকালে একটি অভিন্ন প্রবণতা চোখে পড়ে—বাংলাদেশের বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কগুলোকে আরও বাস্তবমুখী অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহযোগিতায় রূপ দেওয়ার চেষ্টা। বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সঙ্গে দক্ষ জনশক্তি, প্রযুক্তি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে যুক্ত করা হচ্ছে একই কাঠামোয়।

এর ফলে ইউএনজিএর মতো বহুপক্ষীয় আয়োজন বাংলাদেশের জন্য শুধু বৈশ্বিক বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ নয়, সম্ভাব্য অর্থনৈতিক অংশীদারদের সঙ্গে যোগাযোগ গভীর করার ক্ষেত্রও হয়ে উঠছে। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সহযোগিতার আলাদা আলাদা ক্ষেত্র নির্ধারণ এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে সমন্বয় বাড়ানোর উদ্যোগ ভবিষ্যৎ সম্পর্কের জন্য একটি বিস্তৃত ভিত্তি তৈরি করতে পারে।

সব মিলিয়ে নিউইয়র্ক সফরের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকগুলোতে তাৎক্ষণিক কোনো চুক্তির চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে সহযোগিতার সম্ভাব্য ক্ষেত্র চিহ্নিত করা। এখন এসব আলোচনাকে কার্যকর প্রকল্প, বিনিয়োগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও মানবসম্পদ উন্নয়নের উদ্যোগে রূপ দেওয়া গেলে ইউএনজিএর কূটনৈতিক যোগাযোগ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থে আরও দৃশ্যমান ফল বয়ে আনতে পারে।

কালের আলো/টিই/এমকে

শান্তি চাই, তবে নিরাপত্তায় আপস নয়: রাজনাথ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:০০ অপরাহ্ণ
শান্তি চাই, তবে নিরাপত্তায় আপস নয়: রাজনাথ

ভারত যুদ্ধ চায় না, শান্তিতে বিশ্বাস করে। তবে শান্তির আকাঙ্ক্ষাকে দুর্বলতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং।

রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) এনডিটিভি ডিফেন্স সামিট ২০২৬-এ দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সম্মেলনে ভারতের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে দেশটির সামরিক কর্মকর্তা ও শিল্প খাতের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

রাজনাথ সিং বলেন, ভারত শান্তি চায়, তবে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো আপস করবে না। কোনো প্রতিবেশী দেশ সন্ত্রাসবাদে মদদ দিয়ে গেলে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যেকোনো অভিযান চালাতে ভারত প্রস্তুত থাকবে।

ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, ভারত সংলাপে বিশ্বাসী। তবে কোনো দেশ সন্ত্রাসবাদে মদদ দিলে সেই সংলাপ সেখানেই শেষ হবে। ভারত সহযোগিতা চায়, কিন্তু জাতীয় স্বার্থের বিনিময়ে নয়।

এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনাথ সিং ‘প্রতিবেশী দেশ’ বলতে পাকিস্তানকে ইঙ্গিত করেছেন।

যুদ্ধের ধরন বদলাচ্ছে

সম্মেলনে ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল ধীরাজ শেঠ আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে প্রযুক্তি ও তথ্যযুদ্ধের প্রভাব নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, প্রযুক্তি সরাসরি লড়াইয়ের সময় কমিয়ে আনলেও পুরো যুদ্ধের মেয়াদ কমছে না।

তার মতে, যুদ্ধ জয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হলো ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ। ভূখণ্ড দখলে রাখা, সুরক্ষিত করা ও প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর ভূমিকা অপরিহার্য।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুদ্ধ নিয়ে নানা তথ্য ও বিশ্লেষণ ছড়িয়ে পড়ায় প্রকৃত পরিস্থিতি অনেক সময় আড়ালে পড়ে যাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন জেনারেল ধীরাজ। তার ভাষায়, বর্তমান সময়ের যুদ্ধকে অনেক ক্ষেত্রে ‘বিরতি দিয়ে চলা যুদ্ধ’ হিসেবে দেখা যায়। সংঘাতের বিরতিও সামরিক কৌশলের অংশ হয়ে উঠছে।

তিনি আরও বলেন, বর্তমান বিশ্বের দীর্ঘস্থায়ী সংকটে আত্মনির্ভরতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কোনো সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে সামরিক সক্ষমতার পাশাপাশি নিজস্ব সক্ষমতা ও সম্পদের ওপর নির্ভরতা পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি 

নদী রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি: পানিসম্পদমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০:৪১ অপরাহ্ণ
নদী রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি: পানিসম্পদমন্ত্রী

নদী রক্ষা ও সংরক্ষণে সরকার, জনগণ, গবেষক ও পরিবেশবিদদের সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন পানিসম্পদমন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি।

রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর পান্থপথে পানি ভবন মিলনায়তনে বিশ্ব নদী দিবস ও মার্ক এ্যাঞ্জেলো রিভার অ্যাওয়ার্ড-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান। প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন এবং বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশন যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

পানিসম্পদমন্ত্রী বলেন, নদী দখল ও দূষণ রোধের পাশাপাশি নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে হবে। নদীকে শুধু পানি প্রবাহের মাধ্যম হিসেবে দেখলে হবে না; দেশের পরিবেশ, অর্থনীতি এবং মানুষের জীবন-জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেও নদীকে বিবেচনা করতে হবে।

তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় নদী ও জলাভূমি সংরক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। নদীকে কেন্দ্র করে টেকসই ও জলবায়ু-সহনশীল উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নদীকে নিরাপদ ও জীবন্ত রাখতে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে বলেও জানান তিনি।

নদী সংরক্ষণে ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের গুরুত্ব

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ বলেন, মার্ক এ্যাঞ্জেলো রিভার অ্যাওয়ার্ড নদী ও জলসম্পদ সংরক্ষণে দীর্ঘদিন ধরে অবদান রাখা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে স্বীকৃতি দিচ্ছে। এ ধরনের সম্মাননা অন্যদেরও নদী রক্ষায় উৎসাহিত করবে।

নদীর প্রতি দায়বদ্ধতা এবং পরিবেশ সংরক্ষণে ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগকে আরও উৎসাহিত করা প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

পাঁচ ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান পেল রিভার অ্যাওয়ার্ড

নদী রক্ষা ও সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে অনুষ্ঠানে পাঁচ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে মার্ক এ্যাঞ্জেলো রিভার অ্যাওয়ার্ড-২০২৬ দেওয়া হয়।

লেখক ক্যাটাগরিতে পুরস্কার পেয়েছেন সেভ দ্য রিভার মুভমেন্টের ভাইস প্রেসিডেন্ট মাহবুবুল কবির সিদ্দিকী। গবেষণা ক্যাটাগরিতে পুরস্কার পেয়েছেন নদী গবেষক ও রিভারাইন পিপলের মহাসচিব শেখ রোকন।

সাংবাদিকতা ক্যাটাগরিতে পুরস্কার পেয়েছেন যমুনা টেলিভিশনের বিশেষ প্রতিনিধি সাজ্জাদ পারভেজ এবং দৈনিক বণিক বার্তার নিজস্ব প্রতিবেদক মো. আল ফাতাহ। সংগঠন ক্যাটাগরিতে পুরস্কার পেয়েছে নোঙর ট্রাস্ট। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান সুমন শামস পুরস্কার গ্রহণ করেন।

প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মুকিত মজুমদার বাবুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. মঞ্জুরুল কিবরিয়া, পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক সোলায়মান হায়দার এবং বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মনির হোসেন।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি 

কঠোরতার ঘোষণা, জবাবদিহির বার্তা—স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের ভেতরে কী?

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো:
প্রকাশিত: রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:৩৬ অপরাহ্ণ
কঠোরতার ঘোষণা, জবাবদিহির বার্তা—স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের ভেতরে কী?

দেশের সাম্প্রতিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের অবস্থান কী—স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের রোববারের (২৭ সেপ্টেম্বর) বক্তব্যে তাঁর একটি সমন্বিত চিত্র মিলেছে। মন্ত্রীর বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল একটি বার্তা—আইন ভাঙার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় কোনো সুরক্ষা দেবে না; একইভাবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কোনো সদস্য দায়িত্বে ব্যর্থ হলেও তাঁকে জবাবদিহির বাইরে রাখা হবে না।

  • অপরাধী যে পরিচয়েরই হোক, ব্যবস্থা হবে; পুলিশের গাফিলতিতেও একই নীতি
  • প্রমাণ ও আইনি প্রক্রিয়ার ওপর জোর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

এদিন সচিবালয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সমসাময়িক বিষয় নিয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে সাম্প্রতিক কয়েকটি আলোচিত ঘটনা তুলে ধরে মন্ত্রী একদিকে নাশকতার আশঙ্কায় পুলিশের অভিযান ও গ্রেপ্তারের ব্যাখ্যা দিয়েছেন, অন্যদিকে পুলিশের দায়িত্বে অবহেলার ঘটনায় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন। ফলে তাঁর বক্তব্যকে শুধু ‘কঠোর হওয়ার’ ঘোষণা হিসেবে দেখলে এর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আড়ালে থেকে যায়। বরং বক্তব্যজুড়ে অপরাধ দমন, প্রমাণ যাচাই এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি—এই তিনটি বিষয় পাশাপাশি এসেছে।

রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে অপরাধ
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক উত্তেজনা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে মন্ত্রীর সবচেয়ে স্পষ্ট বার্তা এসেছে অপরাধীর পরিচয় প্রসঙ্গে। তিনি বলেন, ‘অপরাধীদের বিরুদ্ধে দলমত নির্বিশেষে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। অপরাধীর কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই। অপরাধী সে অপরাধীই।’ এই বক্তব্যের অন্তর্নিহিত অর্থ হলো, অপরাধের বিচার রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়—অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার ভিত্তিতে করার নীতির কথা বলা হয়েছে।

একই ধারাবাহিকতায় মন্ত্রী সতর্ক করে বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর যেকোনো অপচেষ্টা কঠোর হস্তে দমন করা হবে।’ অর্থাৎ সরকারের ঘোষিত অবস্থান হচ্ছে, রাজনৈতিক কর্মসূচি বা মতাদর্শের পরিচয় নয়, আইন ভঙ্গের সুনির্দিষ্ট কর্মকাণ্ডই হবে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রধান ভিত্তি।

জাসদ কার্যালয়ের অভিযান: আটক থেকে প্রমাণের প্রশ্ন
এই অবস্থানের বাস্তব প্রয়োগের উদাহরণ হিসেবে মন্ত্রী তুলে ধরেন রাজধানীর জাসদ কার্যালয়ে পুলিশের অভিযানকে। তাঁর দাবি, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সেখানে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের কিছু সদস্য নাশকতার পরিকল্পনা করছিলেন। সে তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে প্রায় ২৮০ জনকে প্রাথমিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়। তবে পরবর্তী পদক্ষেপের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করেছেন মন্ত্রী—অধিকাংশকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে এবং বর্তমানে ২৭ জনকে অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে রাখা হয়েছে।

উদ্ধার করা মোবাইল ফোনের ফরেনসিক পরীক্ষা ও অনুসন্ধানে নাশকতার সঙ্গে সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। তাঁর ভাষায়, ‘কাউকে অযথা হয়রানি করার উদ্দেশ্যে এই অভিযান চালানো হয়নি।’ এখানে মন্ত্রীর বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সন্দেহের ভিত্তিতে প্রাথমিক পদক্ষেপের পর চূড়ান্ত আইনি ব্যবস্থার জন্য প্রমাণের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগের রাজনীতির বদলে সুনির্দিষ্ট মামলা
সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ভাঙচুর ও চাঁদা দাবির বিতর্ক প্রসঙ্গেও একই ধরনের অবস্থান দেখা যায়। মন্ত্রীর বর্ণনায় ঘটনাটির পেছনে মূলত জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধের বিষয়টি উঠে এসেছে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে তিনজনকে গ্রেপ্তার এবং গুলির খোসাসহ দেশীয় অস্ত্র উদ্ধারের কথাও জানান তিনি। তবে বিএনপিকে চাঁদাবাজ দল হিসেবে অভিযোগের প্রসঙ্গে মন্ত্রী একটি মৌলিক আইনি প্রশ্ন সামনে আনেন। তিনি জানান, ভুক্তভোগী নিজেই বলেছেন, তাঁর কাছে কেউ চাঁদা দাবি করেনি। এ প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য, ‘সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা মামলা ছাড়া ঢালাও অভিযোগের কোনো আইনি ভিত্তি নেই।’

বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে মন্ত্রী মূলত অভিযোগ এবং প্রমাণের মধ্যে পার্থক্যটি স্পষ্ট করেছেন। কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক সংগঠনের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলে তা তদন্তের আওতায় আসতে পারে; কিন্তু অভিযোগকে আইনি সত্যে পরিণত করতে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, তদন্ত ও প্রমাণ প্রয়োজন—মন্ত্রীর বক্তব্যে সেই কাঠামোটিই প্রতিফলিত হয়েছে।

পুলিশের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা—বার্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক
আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে সরকারের কঠোর অবস্থানের আরেকটি পরীক্ষা আসে পুলিশের নিজেদের ভূমিকা নিয়ে। মিরপুরের রাড্ডা ক্লিনিকে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ার কথা জানান মন্ত্রী। ঘটনার পর শাহআলী থানার ওসিকে প্রত্যাহার এবং তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করার কথা বলা হয়েছে। একই ঘটনায় নয়জনকে গ্রেপ্তার এবং বিভিন্ন আলামত উদ্ধারের তথ্যও দেন তিনি। এখানে মন্ত্রীর বক্তব্যের তাৎপর্য আরও বিস্তৃত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকা বাহিনীর সদস্যরা যদি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হন, তাঁদের ক্ষেত্রেও জবাবদিহি নিশ্চিত করার বার্তা দেওয়া হয়েছে।

‘শুধু বদলি’ নয়, অপরাধ হলে মামলা
পুলিশ কর্মকর্তাদের বদলি প্রসঙ্গে মন্ত্রী আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেন, দায়িত্বে অবহেলা বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ প্রমাণিত হলে শুধু প্রশাসনিক বদলিই যথেষ্ট নয়। রাষ্ট্রদ্রোহিতা কিংবা অন্য কোনো ফৌজদারি অপরাধে জড়িত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি নিয়মিত মামলাও করা হচ্ছে বলে জানান তিনি। এ প্রসঙ্গে তাঁর সরাসরি ঘোষণা, ‘পুলিশ বাহিনীতে অপরাধ বরদাশত করা হবে না।’ এই বক্তব্যের মাধ্যমে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জবাবদিহিকে আইনশৃঙ্খলা নীতির অংশ হিসেবেই তুলে ধরেছেন মন্ত্রী। অর্থাৎ অপরাধ দমনের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ উঠলেও একই আইনি কাঠামো কার্যকর থাকবে—এটাই তাঁর বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।

কঠোরতার সঙ্গে প্রমাণের ভারসাম্যই বড় পরীক্ষা
পুরো ব্রিফিং পর্যালোচনা করলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের মূল বিষয়বস্তু দাঁড়ায়—নাশকতা বা অপরাধের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র কঠোর থাকবে, কিন্তু সেই কঠোরতার পরবর্তী ধাপ নির্ধারিত হবে তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতে। একই সঙ্গে পুলিশকে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা বা অপরাধের অভিযোগ থেকে দায়মুক্তি দেওয়া হবে না। মন্ত্রী তাঁর অবস্থানকে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির সঙ্গে যুক্ত করেছেন। এদিনের ব্রিফিংয়ে তাই শুধু কঠোরতার ঘোষণা নয়, একটি প্রশাসনিক বার্তাও স্পষ্ট হয়েছে: আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় রাষ্ট্র যেমন অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর হবে, তেমনি আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও জবাবদিহি ও প্রমাণের গুরুত্বকে উপেক্ষা করা হবে না।

কালের আলো/এমএএএমকে