মোবাইল সেবায় বড় ফাঁক
মোবাইল ফোনে কল করতে গিয়ে ‘নো সার্ভিস’, কথা বলার মাঝখানে হঠাৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন, ফোরজি নেটওয়ার্ক দেখালেও একটি ভিডিও চালাতে দীর্ঘ অপেক্ষা—দেশের কোটি মোবাইল গ্রাহকের কাছে এসব এখন বিচ্ছিন্ন ভোগান্তি নয়। শহরের বাইরে গেলেই অনেক এলাকায় দুর্বল নেটওয়ার্ক যেন স্বাভাবিক বাস্তবতা। অথচ বিজ্ঞাপনে চার অপারেটরেরই দাবি—দেশজুড়ে শক্তিশালী কাভারেজ, উন্নত নেটওয়ার্ক ও দ্রুতগতির ইন্টারনেট।
- চার অপারেটরের সেবায় বিটিআরসির পরীক্ষায় ঘাটতি
- কোথাও কাভারেজ নেই, কোথাও কলড্রপ; ফোরজিতেও ধীরগতি
- ৬৬ হাজার অভিযোগের পরও প্রশ্নের শেষ নেই
অপারেটরদের সেই দাবির বিপরীতে উঠে এসেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থার মাঠপর্যায়ের পরীক্ষা। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) নিজস্ব পর্যালোচনায় দেখা গেছে, চার অপারেটরের কারও সেবাই সব সূচকে নির্ভরযোগ্য নয়। একজনের নেটওয়ার্ক আছে, কিন্তু কলড্রপ বেশি; আরেকজনের ইন্টারনেট তুলনামূলক দ্রুত, কিন্তু বহু এলাকায় কাভারেজ নেই; কেউ আবার দ্রুতগতির দাবি করলেও সেই তথ্যই স্বাধীনভাবে যাচাই করার মতো পূর্ণাঙ্গ ডেটা দিতে পারেনি। ফলে প্রশ্নটি এখন শুধু কোন অপারেটর কত ভালো করছে, তা নয়। বড় প্রশ্ন—গ্রাহক যে সেবার জন্য প্রতিমাসে টাকা দিচ্ছেন, সেই সেবার ঘোষিত মান কি বাস্তবে কোথাও নিশ্চিত হচ্ছে?
গ্রামীণফোন: বড় নেটওয়ার্ক, তবুও নেটওয়ার্কহীন উপজেলা
দেশের বৃহত্তম নেটওয়ার্কের দাবি করা গ্রামীণফোনের ক্ষেত্রেই উঠে এসেছে বড় বৈপরীত্য। প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব হিসাবে ভিওএলটিই কলড্রপের হার ০.০৪২২ শতাংশ। কিন্তু বিটিআরসির পরীক্ষায় তা পাওয়া গেছে ০.৩৮১৪ শতাংশ—প্রায় নয় গুণ বেশি। হারটি নিয়ন্ত্রকের নির্ধারিত সর্বোচ্চ ০.৫০ শতাংশ সীমার মধ্যে থাকলেও প্রতিযোগীদের তুলনায় বেশি। আরও গুরুত্বপূর্ণ, পাঁচটি উপজেলায় গ্রামীণফোনের কোনো নেটওয়ার্ক কাভারেজ নেই। একটি উপজেলায় আবার ফোরজি সেবাই পৌঁছেনি।
গ্রাহকের কাছে জাতীয় পর্যায়ের বিশাল কাভারেজের হিসাব তখন কতটা অর্থবহ, যদি তার নিজের এলাকায় ফোন করাই না যায়? এখানেই অপারেটরের বিপণন-দাবি ও গ্রাহকের বাস্তব অভিজ্ঞতার দূরত্বটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
রবি: গতি কম, সঙ্গে তথ্যের ঘাটতি
রবির সেবায় সমস্যার পরিধি আরও বিস্তৃত। বিটিআরসির পরীক্ষায় ২৪টি উপজেলা ও তিনটি জেলায় টুজি কল সেটআপের ন্যূনতম মান পূরণ হয়নি। ফোরজি ডাউনলোডের গড় গতিও তিন বেসরকারি অপারেটরের মধ্যে কম—৬.৮৪৮ এমবিপিএস।
গ্রাহকের জন্য ধীর ইন্টারনেট মানে শুধু একটি ওয়েবসাইট খুলতে বেশি সময় লাগা নয়। মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন ক্লাস, অফিসের কাজ, ভিডিও কল কিংবা জরুরি তথ্য আদান-প্রদান—সবকিছুতেই এর সরাসরি প্রভাব পড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তথ্যের প্রশ্ন।
বিটিআরসি ৪১ হাজার ৮১৯টি সেলের কাঁচা বা ‘র ডেটা’ চেয়েও পায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে কমিশনকে রবির দেওয়া প্রক্রিয়াজাত তথ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। নিয়ন্ত্রকের কাছে পূর্ণাঙ্গ তথ্য না পৌঁছালে স্বাধীনভাবে সেবার মান যাচাই কঠিন হয়ে পড়ে। আর সেই দায় শেষ পর্যন্ত গ্রাহকের ওপরই বর্তায়—কারণ তিনি জানতেই পারেন না, তার এলাকায় সমস্যাটি সাময়িক নাকি কাঠামোগত।
বাংলালিংক: দ্রুত ইন্টারনেট, কিন্তু কলেই বিপত্তি
ফোরজি ইন্টারনেটের গতিতে এগিয়ে থাকলেও বাংলালিংকের ভয়েস সেবা নিয়ে প্রশ্ন কম নয়। বিটিআরসির হিসাবে প্রতিষ্ঠানটির কলড্রপ ০.৩৫৬৬ শতাংশ—গ্রামীণফোনের ০.৩২৯৮ এবং রবির ০.২৪০৫ শতাংশের চেয়ে বেশি। আবার পরিদর্শনের আওতার বাইরে অন্তত ছয়টি উপজেলায় কোনো মোবাইল নেটওয়ার্ক কাভারেজ পাওয়া যায়নি।
অর্থাৎ একজন গ্রাহক কোথাও দ্রুত ইন্টারনেট পেতে পারেন, আবার অন্য এলাকায় গিয়ে নেটওয়ার্কই নাও পেতে পারেন। এতে স্পষ্ট হয়, ‘দ্রুততম ইন্টারনেট’ কিংবা ‘বড় কাভারেজ’—একটি সূচক দিয়ে সামগ্রিক সেবার মান বিচার করা যায় না। গ্রাহকের প্রয়োজন একটি পূর্ণাঙ্গ সেবা—যেখানে ফোনে সংযোগ থাকবে, কল টিকবে এবং প্রয়োজনের সময় ইন্টারনেটও ব্যবহার করা যাবে।
টেলিটক: কাগজে দ্রুত, ৫২ জেলায় মানদণ্ডের বাইরে
রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিটকের ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও গভীর। ৬৪ জেলার মধ্যে মাত্র ১২টিতে বিটিআরসির নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করতে পেরেছে প্রতিষ্ঠানটি। অর্থাৎ ৫২ জেলায় সেবার মান সন্তোষজনক নয়। অথচ টেলিটকের নিজস্ব দাবি, তাদের গড় ফোরজি ডাউনলোড গতি ১১.২০ এমবিপিএস। কাগজে এটি তিন বেসরকারি অপারেটরের চেয়েও বেশি।
কিন্তু প্রয়োজনীয় বাইনারি ডেটা অসম্পূর্ণ থাকায় বিটিআরসি সেই দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।নিজস্ব তথ্যেই আবার ডেটা সংযোগ বিচ্ছিন্নতার হার ০.৬৪ শতাংশ, যেখানে সর্বোচ্চ অনুমোদিত সীমা ০.৫০ শতাংশ। ফোরজি সংযোগ নিরবচ্ছিন্ন রাখার সাফল্যও ৯৮.৪৯ শতাংশ—প্রয়োজনীয় ৯৯ শতাংশের নিচে। অর্থাৎ গ্রাহক যে সেবাটি ব্যবহার করছেন, তার মান নিয়ে প্রশ্নের পাশাপাশি সেই সেবার পক্ষে দেওয়া তথ্য নিয়েও সংশয় তৈরি হচ্ছে।
অভিযোগের পাহাড়, বদলায়নি ভোগান্তি
চার অপারেটরের বিরুদ্ধে ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত বিটিআরসিতে জমা পড়েছে ৬৬ হাজার ৭০৫টি অভিযোগ। নেটওয়ার্কের দুর্বলতা, কলড্রপ ও ইন্টারনেটের ধীরগতিই অভিযোগের বড় অংশজুড়ে রয়েছে।
পাশাপাশি প্যাকেজ, রিচার্জ, বিলিং, অতিরিক্ত চার্জ ও সিম-সংক্রান্ত সমস্যাও রয়েছে। অভিযোগের এই সংখ্যা দেখাচ্ছে, গ্রাহকের সমস্যা কোনো বিচ্ছিন্ন এলাকার বা সাময়িক পরিস্থিতির বিষয় নয়। বরং দীর্ঘ সময় ধরে একই ধরনের অভিযোগ ফিরে আসছে।
কমিশনের হেল্পলাইন ও ওয়েবসাইটে পাওয়া প্রায় ১৩ হাজার অভিযোগের মধ্যে ১১ হাজার ২৯৭টি নিষ্পত্তি হয়েছে—হার ৮৬ দশমিক ৭ শতাংশ। অভিযোগ নিষ্পত্তি প্রশাসনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রশ্ন থেকে যায়: অভিযোগের সংখ্যা কমছে, নাকি শুধু অভিযোগের ফাইল বন্ধ হচ্ছে? কারণ একটি এলাকায় বারবার কলড্রপ হলে অভিযোগ নিষ্পত্তির চেয়ে সেই এলাকার নেটওয়ার্ক ঠিক করাই গ্রাহকের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
১৪ হাজার টাওয়ারের ঘাটতি, দায়ও ভাগ করতে হবে
দেশে মোবাইল নেটওয়ার্কের জন্য প্রায় ৫৬ হাজার টাওয়ার রয়েছে। তারপরও কাভারেজ ও সক্ষমতা বাড়াতে আরও প্রায় ১৪ হাজার টাওয়ার প্রয়োজন বলে জানিয়েছে বিটিআরসি। বিশেষ করে দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকায় অবকাঠামোগত ঘাটতি বড় সমস্যা। তবে সমস্যার সমাধান শুধু টাওয়ার বাড়ানোতে সীমাবদ্ধ নয়। বিদ্যমান টাওয়ারের সক্ষমতা, ব্যাকহল, স্পেকট্রাম ব্যবহার, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও নেটওয়ার্ক অপ্টিমাইজেশনও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অপারেটরদের বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পাশাপাশি এসব বিষয়ে নিয়ন্ত্রকের তদারকিও কার্যকর হতে হবে।
এবার ‘দাবি’ নয়, চাই পরিমাপযোগ্য জবাব
বিটিআরসির নতুন পদ্ধতির সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো—অপারেটরদের দেওয়া তথ্যের বাইরে গিয়ে কমিশন নিজস্বভাবে নেটওয়ার্ক পরীক্ষা করছে। এনএমএস, টিএমএস ও ড্রাইভ টেস্টের মাধ্যমে বাস্তব পরিস্থিতি পরিমাপের উদ্যোগ দীর্ঘদিনের তথ্যনির্ভর তদারকির সীমাবদ্ধতা কমাতে পারে। কিন্তু শুধু প্রতিবেদন প্রকাশ করলেই গ্রাহকের ভোগান্তি কমবে না।
কোন অপারেটর কোন এলাকায় ব্যর্থ হয়েছে, কত দিনের মধ্যে তা ঠিক করতে হবে, পুনঃপরীক্ষায় কী ফল এসেছে এবং ব্যর্থতার জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—এসবও নিয়মিত প্রকাশ করা প্রয়োজন।
চার অপারেটরের সেবায় দুর্বলতার ধরন আলাদা হলেও গ্রাহকের ভোগান্তি একই—প্রয়োজনের মুহূর্তে নির্ভরযোগ্য যোগাযোগ না পাওয়া। কেউ কল করতে পারছেন না, কেউ কথা ধরে রাখতে পারছেন না, কেউ ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারছেন না; আবার কেউ অপারেটরের দেওয়া তথ্যের সত্যতাই যাচাই করতে পারছেন না। মোবাইল সেবা এখন আর বিলাসিতা নয়।
কর্মসংস্থান, ব্যবসা, শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যাংকিং—সবকিছুর সঙ্গে এটি জড়িয়ে গেছে। তাই সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সেটিকে শুধু ‘নেটওয়ার্ক সমস্যা’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি গ্রাহকের অর্থ, সময় ও দৈনন্দিন জীবনের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
কালের আলো/এএএন/এমকে

আপনার মতামত লিখুন
Array