খুঁজুন
                               
, ,
           

নদী দূষণের ৪২৪ দরজা

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:২১ অপরাহ্ণ
নদী দূষণের ৪২৪ দরজা

নদী বাঁচাতে খরচ হয়েছে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা। হয়েছে দখল উচ্ছেদ, ড্রেজিং, তীর রক্ষা, ট্যানারি স্থানান্তর, সৌন্দর্যবর্ধন—বাদ যায়নি বড় কোনো উদ্যোগই। তবু ঢাকার চারপাশের নদীগুলোতে দূষণের স্রোত থামেনি। বরং দুই যুগের নানা কর্মযজ্ঞের পরও প্রতিদিন নতুন করে নদীতে ঢুকছে প্রায় ৩৩০ টন তরল ও কঠিন বর্জ্য।

  • আড়াই হাজার কোটি টাকার নদী রক্ষা কর্মযজ্ঞ
  • তবু বন্ধ হয়নি বর্জ্য প্রবেশ
  • প্রতিদিন চার নদীতে যাচ্ছে ৩৩০ টন
  • নদী রক্ষায় বদলাতে হবে কৌশল

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডাব্লিউটিএ) জরিপে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যায় শনাক্ত হয়েছে ৪২৪টি বর্জ্য নির্গমনমুখ। সর্বশেষ জরিপে শুধু বুড়িগঙ্গাতেই মিলেছে ৩০৭টি দূষণমুখ। অর্থাৎ নদীর ওপর যতই পরিচ্ছন্নতার অভিযান চলুক, বর্জ্য ঢোকার দরজা খোলা থাকলে সেই নদী কতটা বাঁচানো সম্ভব—এখন সামনে এসেছে সেই মৌলিক প্রশ্ন।

নদী পরিষ্কার হচ্ছে, দূষণও ঢুকছে
নদী রক্ষার এতদিনের উদ্যোগের বড় অংশ ছিল নদীর ভেতর ও তীরে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনা। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, বর্জ্য অপসারণ কিংবা ড্রেজিংয়ে নদীর চেহারা বদলেছে। কিন্তু দূষণের উৎস বন্ধ না হওয়ায় সেই পরিবর্তন স্থায়ী হয়নি।

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান হাওলাদারের বক্তব্যেও উঠে এসেছে সমস্যার মূল জায়গাটি। তাঁর মতে, অভিযান বা জরিমানায় সাময়িকভাবে দূষণ কমানো সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদি সুফলের জন্য বর্জ্যের উৎস চিহ্নিত করে তা বন্ধ করা জরুরি।

বিআইডাব্লিউটিএর জরিপে উঠে এসেছে আরও অস্বস্তিকর তথ্য। দূষণের জন্য শুধু শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা যাচ্ছে না; সরকারি সংস্থার ড্রেনও সরাসরি নদীতে বর্জ্য ফেলছে। ঢাকা ওয়াসার ৬৬টি ড্রেনের ৫৭টি বুড়িগঙ্গা ও ৯টি তুরাগে গিয়ে পড়ছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২১টি ড্রেনের ১৯টি বুড়িগঙ্গা ও দুটি শীতলক্ষ্যায় যুক্ত। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১৬টির মধ্যে ১৫টি তুরাগ এবং একটি বুড়িগঙ্গায় গিয়ে মিশেছে।

৬০ শতাংশই শিল্পবর্জ্য
বিআইডাব্লিউটিএর তথ্য অনুযায়ী, নদীতে পড়া বর্জ্যের প্রায় ৬০ শতাংশ শিল্পবর্জ্য। ঢাকার চারপাশে নদীর তীরে রয়েছে ছোট-বড় প্রায় সাত হাজার শিল্প-কারখানা। এসব প্রতিষ্ঠানের বড় একটি অংশে কার্যকর তরল বর্জ্য পরিশোধনাগার বা ইটিপি নেই। ফলে শিল্পের রাসায়নিক, রং, তেল ও ভারী ধাতুসহ নানা বিষাক্ত উপাদান খাল ও ড্রেন পেরিয়ে সরাসরি নদীতে যাচ্ছে।

নৌবাহিনীর এক প্রতিবেদনে বুড়িগঙ্গাকে ‘অত্যন্ত সংকটাপন্ন’ এবং তুরাগকে ‘সংকটাপন্ন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ধলেশ্বরীকে বলা হয়েছে ‘অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ’। প্রতিবেদনে বুড়িগঙ্গা-তুরাগের দূষণের ৮০ শতাংশের জন্য শিল্প ও জৈব বর্জ্যকে দায়ী করা হয়েছে।

দূষণের ভয়াবহতা সবচেয়ে স্পষ্ট দ্রবীভূত অক্সিজেনের (ডিও) পরিমাপে। জলজ প্রাণীর টিকে থাকার জন্য সাধারণভাবে ডিও পাঁচ মিলিগ্রামের ওপরে থাকা প্রয়োজন। কিন্তু বুড়িগঙ্গায় এর গড় মাত্রা পাওয়া গেছে ১ দশমিক ৭ থেকে ২ দশমিক ৬৮ মিলিগ্রাম। অর্থাৎ নদীর অনেক অংশে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর স্বাভাবিক জীবনধারণের পরিবেশ নেই।

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মীর মোহাম্মদ আলীর মতে, বুড়িগঙ্গার পানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের পাশাপাশি ক্যাডমিয়াম ও পারদের মতো ভারী ধাতুও পাওয়া গেছে। অনেক এলাকায় মাছ বেঁচে থাকার মতো পরিবেশ নেই। সংকটে পড়েছে বহু জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদের অস্তিত্ব।

লক্ষ্য ‘দূষণের দরজা’ বন্ধ করা
নতুন উদ্যোগে এবার নদী পরিষ্কারের চেয়ে বর্জ্য ঢোকার পথ বন্ধ করাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। গত ৬ আগস্ট ঢাকার চারপাশের নদীর পানি ও পরিবেশ উন্নয়ন নিয়ে বৈঠকের পর সমন্বিত কর্মপরিকল্পনার নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রথম ধাপে বুড়িগঙ্গা ও তুরাগের ৩৮ কিলোমিটার নৌপথকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

নদীর তীর ও আশপাশের সব দূষণমুখ চিহ্নিত করে পর্যায়ক্রমে সেগুলো বন্ধ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। নৌবাহিনী, পরিবেশ অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো এতে যুক্ত রয়েছে।

শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বিটিএমইএর সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠানে ইটিপি নেই, তাদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ইটিপি স্থাপনের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। তবে নদী দূষণের দীর্ঘ ইতিহাস বলছে, শুধু সময়সীমা বেঁধে দিলেই হবে না; কার্যকর নজরদারি ও নিয়মিত তদারকিও নিশ্চিত করতে হবে।

৩৭ সদস্যের কেন্দ্রীয় সেল
দখল ও দূষণ রোধে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে ৩৭ সদস্যের কেন্দ্রীয় সেল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে পরিবেশ, নৌপরিবহন, স্থানীয় সরকার, পানি উন্নয়ন বোর্ড, রাজউক, বিআইডাব্লিউটিএ, ঢাকা ওয়াসা, পুলিশ, কোস্ট গার্ড ও নদী রক্ষা কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রতিনিধিরা রয়েছেন।

সেলের অধীনে তিনটি উপকমিটি কাজ করবে। এর একটি শিল্পবর্জ্যসহ বিভিন্ন উৎস থেকে নদীতে বর্জ্য প্রবেশ বন্ধ, খাল-ড্রেনের বর্জ্য অপসারণ, নদীর তলদেশের কঠিন বর্জ্য সরানো এবং পানিপ্রবাহ বাড়ানোর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করবে।

বর্জ্যের বিনিময়ে নিত্যপণ্য
শুধু প্রশাসনিক অভিযান নয়, নদী রক্ষায় এবার সাধারণ মানুষকেও যুক্ত করার চেষ্টা চলছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ও বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে বুড়িগঙ্গায় চালু হয়েছে ‘বর্জ্যের বিনিময়ে ভাসমান বাজার’। নদী থেকে ক্ষতিকর বর্জ্য সংগ্রহ করে জমা দিলে বিনিময়ে মিলছে চাল, ডাল, তেল, লবণসহ নিত্যপণ্য।

উদ্যোগটি নদী থেকে কতটা বর্জ্য সরাতে পারবে, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন—মানুষের আচরণে এটি কতটা পরিবর্তন আনতে পারে। কারণ নদীর বর্জ্য কমাতে শুধু দূষণকারী প্রতিষ্ঠান নয়, নদীতীরবর্তী জনপদ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অভ্যাসও বদলাতে হবে।

হিসাব হবে নদীর পানিতে
দুই যুগে আড়াই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পরও যদি প্রতিদিন ৩৩০ টন বর্জ্য নদীতে ঢোকে, তাহলে নদী রক্ষার সাফল্য শুধু কতটি অভিযান হলো বা কত টন বর্জ্য তোলা হলো—এ দিয়ে মাপার সুযোগ নেই।

এবার সাফল্যের মাপকাঠি হতে হবে আরও কঠিন: ৪২৪টি দূষণমুখের কতটি স্থায়ীভাবে বন্ধ হলো, শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো কতটা নিয়ম মানল, নদীতে বর্জ্য প্রবেশ কতটা কমল এবং পানির ডিওসহ সামগ্রিক গুণমান কতটা ফিরল। কারণ নদীর পাড় পরিষ্কার করে নদী বাঁচে না। নদীতে বর্জ্য ঢোকার পথ বন্ধ হলেই শুরু হবে সত্যিকারের নদী রক্ষা।

কালের আলো/এমএসআইপি/এমকে

পর্যটনে সম্ভাবনা, সংকটে বাংলাদেশ

ভ্রমণ ডেস্ক
প্রকাশিত: রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:৪০ অপরাহ্ণ
পর্যটনে সম্ভাবনা, সংকটে বাংলাদেশ

বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার, পৃথিবীর একক বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, শ্রীমঙ্গলের বিস্তীর্ণ চা-বাগান কিংবা বান্দরবানের মেঘ-পাহাড়—প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের দিক থেকে বাংলাদেশের রয়েছে অনন্য সম্পদ। সমুদ্র, পাহাড়, বন, নদী ও গ্রামীণ জনপদের বৈচিত্র্য মিলিয়ে পর্যটনের জন্য বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে দেশটির।

তবে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এমন সমৃদ্ধ ভাণ্ডার থাকার পরও আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রে বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে। বিদেশি পর্যটক আকর্ষণে যেমন বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে, তেমনি নানা হয়রানি, অতিরিক্ত খরচ ও সেবার মান নিয়ে অসন্তোষের কারণে দেশের পর্যটকেরাও অনেক সময় বিদেশমুখী হচ্ছেন।

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ‘ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্স ২০২৬’-এর তথ্য অনুযায়ী, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশের অবস্থান একেবারে নিচের দিকে। প্রতিবেশী অনেক দেশ যেখানে বিপুলসংখ্যক বিদেশি পর্যটক আকর্ষণ করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে, সেখানে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক পর্যটকের সংখ্যা এখনো তুলনামূলকভাবে নগণ্য।

পর্যটনকেন্দ্রে বাড়তি খরচের চাপ

দেশের পর্যটন খাতের অন্যতম বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিচ্ছে অতিরিক্ত খরচ। কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন কিংবা বান্দরবানের মতো জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রে ছুটির মৌসুমে ভ্রমণ করতে পরিবহন, আবাসন ও খাবারের পেছনে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হয়, তা অনেক সময় বিদেশে ভ্রমণের খরচের কাছাকাছি চলে যায়।

পরিবহন ভাড়া, হোটেলের কক্ষের মূল্য এবং খাবারের দাম বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে স্থানীয় পর্যায়ের অতিরিক্ত চার্জ ও নানা ধরনের হয়রানির অভিযোগও রয়েছে।

ফলে অনেক পর্যটকের কাছে দেশের ভেতরে ভ্রমণের তুলনায় ভারত, নেপাল, থাইল্যান্ড কিংবা মালদ্বীপের মতো দেশে ভ্রমণকে তুলনামূলকভাবে আকর্ষণীয় মনে হচ্ছে। এতে দেশের পর্যটন খাতে ব্যয় হওয়ার সম্ভাব্য অর্থের একটি অংশ বিদেশে চলে যাচ্ছে।

নিয়মের বেড়াজালেও পর্যটকের ভোগান্তি

কিছু পর্যটন এলাকায় বিভিন্ন নিয়ম ও বাধ্যবাধকতা নিয়েও পর্যটকদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। বান্দরবানের বগালেক কিংবা কেওক্রাডংয়ের মতো পর্যটনকেন্দ্রে যাওয়ার ক্ষেত্রে পাকা সড়ক তৈরি হলেও বাধ্যতামূলকভাবে গাইড নেওয়ার নিয়ম রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

শুধু গাইডের পারিশ্রমিক নয়, অনেক ক্ষেত্রে গাইড ও গাড়িচালকের থাকা-খাওয়ার খরচও পর্যটকদের বহন করতে হয়। ফলে ভ্রমণের মোট ব্যয় আরও বেড়ে যায়।

পর্যটন ব্যবস্থাপনায় নিরাপত্তা ও পরিবেশ রক্ষার জন্য কিছু নিয়ম প্রয়োজন হলেও পর্যটকদের অভিযোগ, এসব নিয়ম বাস্তবায়নের পদ্ধতি অনেক সময় ভ্রমণকারীদের ওপর বাড়তি আর্থিক ও প্রশাসনিক চাপ তৈরি করে।

নদীভিত্তিক পর্যটনের সম্ভাবনা কাজে লাগেনি

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অসংখ্য নদ-নদী, চর ও জলাভূমি রয়েছে। নদীকে কেন্দ্র করে নৌভ্রমণ, পর্যটনকেন্দ্র ও স্থানীয় সংস্কৃতিকে ঘিরে নতুন পর্যটন পণ্য তৈরির বড় সুযোগ রয়েছে।

তবে সঠিক পরিকল্পনার অভাব, নদীদূষণ, দখল ও ভরাটের কারণে নদীভিত্তিক পর্যটনের সেই সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পিত নদীকেন্দ্রিক পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে দেশের প্রচলিত পর্যটনকেন্দ্রের বাইরে নতুন গন্তব্য তৈরি করা সম্ভব।

নারীবান্ধব পর্যটন পরিবেশের ঘাটতি

দেশের পর্যটন খাতে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ নিরাপত্তা। বিশেষ করে নারী ও পরিবার নিয়ে ভ্রমণের ক্ষেত্রে নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ পরিবেশ এখনো অনেক পর্যটনকেন্দ্রে নিশ্চিত করা যায়নি।

নিরাপত্তার অভাব, পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি এবং স্থানীয় পর্যায়ে পর্যটকদের প্রতি অসচেতন আচরণের কারণে কক্সবাজার, সিলেটের মতো পরিচিত কয়েকটি গন্তব্যের বাইরে অনেক স্থান পরিবার ও নারী পর্যটকদের কাছে তুলনামূলকভাবে কম আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।

পর্যটন খাতের উন্নয়নে তাই শুধু নতুন অবকাঠামো নির্মাণ নয়, পর্যটকদের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বিদেশিদের কাছে বাংলাদেশকে তুলে ধরার ঘাটতি

বিদেশি পর্যটক আকর্ষণের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের বড় দুর্বলতা প্রচার ও ডিজিটাল ব্র্যান্ডিংয়ে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও বৈশ্বিক পর্যটন প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের পর্যটন আকর্ষণগুলোকে পরিকল্পিতভাবে তুলে ধরার জন্য সমন্বিত প্রচারণার ঘাটতি রয়েছে।

বিদেশি ট্রাভেল এজেন্সি ও পর্যটকদের কাছে বাংলাদেশের দর্শনীয় স্থান, যোগাযোগব্যবস্থা, আবাসন, স্থানীয় সংস্কৃতি এবং ভ্রমণসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য সহজে পৌঁছানোর মতো সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মও পর্যাপ্ত নয়।

ফলে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য থাকলেও আন্তর্জাতিক পর্যটকদের বড় অংশের কাছে দেশটির পর্যটন সম্ভাবনা যথেষ্ট পরিচিত নয়।

নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির প্রভাব

বিদেশি পর্যটকদের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রাজনৈতিক অস্থিরতা, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত নেতিবাচক খবর অনেক সময় বিদেশি পর্যটকদের বাংলাদেশ ভ্রমণে নিরুৎসাহিত করতে পারে।

বিভিন্ন দেশের ট্রাভেল অ্যাডভাইজরিতেও কোনো কোনো সময় বাংলাদেশ সম্পর্কে নিরাপত্তাসংক্রান্ত সতর্কতা দেওয়া হয়। এসব বিষয় আন্তর্জাতিক পর্যটকের ভ্রমণ সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পর্যটনকেন্দ্রগুলোর আবাসন ও খাবারের খরচ। পার্শ্ববর্তী অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে মানসম্মত হোটেল ও খাবারের মূল্য বিদেশি পর্যটকদের কাছে তুলনামূলক বেশি মনে হতে পারে।

নেই নির্দিষ্ট এক্সক্লুসিভ ট্যুরিস্ট জোন

বিদেশি পর্যটকদের নিরাপত্তা, বিনোদন ও বিশেষায়িত সেবার কথা বিবেচনা করে কক্সবাজারসহ দেশের বড় পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে এখনো পর্যাপ্ত ‘এক্সক্লুসিভ ট্যুরিস্ট জোন’ গড়ে ওঠেনি।

একটি নির্দিষ্ট এলাকায় আবাসন, বিনোদন, খাবার, সাংস্কৃতিক আয়োজন, নিরাপত্তা ও পর্যটনসেবা সমন্বিতভাবে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা গেলে বিদেশি পর্যটকদের জন্য ভ্রমণ আরও সহজ ও আকর্ষণীয় হতে পারে।

একই সঙ্গে বাংলাদেশের নিজস্ব সংস্কৃতি, খাবার, সংগীত, লোকজ ঐতিহ্য ও জীবনধারাকে বিদেশি পর্যটকদের সামনে পরিকল্পিতভাবে তুলে ধরার ব্যবস্থাও বাড়ানো প্রয়োজন।

সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বড় পদক্ষেপের প্রয়োজন

বহু সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বাংলাদেশের পর্যটন খাতে সম্ভাবনা রয়েছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক স্থাপনা, লোকজ সংস্কৃতি, নদী, পাহাড়, সমুদ্র ও বন—সব মিলিয়ে পর্যটনের জন্য দেশের সম্পদের অভাব নেই।

তবে এই সম্ভাবনাকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে হলে শুধু পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণ করলেই হবে না; প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা, নিরাপদ পরিবেশ, মানসম্মত সেবা এবং কার্যকর প্রচারণা।

পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য ও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া, পরিবহন ও আবাসন খাতে যৌক্তিক মূল্য নিশ্চিত করা এবং পর্যটকদের হয়রানি বন্ধে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।

একই সঙ্গে পর্যটন পুলিশের সক্ষমতা বাড়িয়ে পর্যটকদের যেকোনো সমস্যায় দ্রুত সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। নারী ও পরিবারবান্ধব পর্যটন পরিবেশ তৈরি, নদীকেন্দ্রিক পর্যটন উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের পর্যটন ব্র্যান্ডিং জোরদার করাও জরুরি।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বাংলাদেশের বড় সম্পদ। এখন সেই সম্পদকে পরিকল্পিত, নিরাপদ ও পর্যটকবান্ধব ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় রূপ দেওয়াই দেশের পর্যটন খাতের বড় চ্যালেঞ্জ।

কালের আলো/এসএ

৫৫ খাল, পাঁচ নদী—বদলের পথে ঢাকা

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো:
প্রকাশিত: রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:৩৪ অপরাহ্ণ
৫৫ খাল, পাঁচ নদী—বদলের পথে ঢাকা

ঢাকার খালপাড়ের বাঁশের সেতুগুলো এবার স্থায়ীভাবে বিদায় নেওয়ার পথে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় থাকা বাঁশের সেতু পর্যায়ক্রমে আরসিসিতে রূপান্তর করা হবে। একই সঙ্গে খাল দখল করে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা ও অনুমোদনহীন সেতুর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ৫৫টি খাল পরিষ্কার করে পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনা, পাঁচ নদীকে পুরোনো নাব্যতায় ফেরানো এবং স্যুয়ারেজের বর্জ্য শোধন করে নদীতে পরিষ্কার পানি ছাড়ার সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।

  • বাঁশের সেতু হবে আরসিসি
  • খালপাড়ে হবে ওয়াকওয়ে
  • দখল-দূষণ ঠেকাতে সমন্বিত উদ্যোগের ঘোষণা মীর শাহে আলমের

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের ঘোষণায় উঠে এসেছে রাজধানীর জলপথ ব্যবস্থাপনাকে ঘিরে সরকারের এই নতুন কর্মপরিকল্পনা। রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) ত্রিমোহনী খাল ব্রিজ এলাকায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের জিরানি খাল পরিদর্শন শেষে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ঢাকায় কোনো বাঁশের সেতু থাকবে না। ত্রিমোহনী এলাকার বাঁশের সেতুটিও অল্পদিনের মধ্যে আরসিসি সেতুতে রূপান্তর করা হবে।

‘ঢাকায় কোনো বাঁশের সেতু থাকবে না’
বাঁশের সাঁকো রাজধানীর কিছু এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের চলাচলের ভরসা হলেও নগর অবকাঠামোর স্থায়ী সমাধান নয়। সেই বাস্তবতায় বাঁশের সেতুর পরিবর্তে আরসিসি সেতু নির্মাণকে নিরাপদ ও টেকসই যোগাযোগব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখছে সরকার।

মীর শাহে আলম বলেন, শুষ্ক মৌসুমের মধ্যেই খালগুলোর চলমান কাজ দৃশ্যমান পর্যায়ে নিয়ে যেতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হবে। এতে মানুষের চলাচলের সুবিধা বাড়ার পাশাপাশি খালের পানিপ্রবাহ সচল করে জলাবদ্ধতা নিরসনের পথও সহজ হবে। তবে অবকাঠামো নির্মাণের সঙ্গে খাল দখলমুক্ত রাখাকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছেন প্রতিমন্ত্রী। তাঁর ঘোষণা, খাল দখল করে গড়ে ওঠা স্থাপনা এবং অবৈধভাবে নির্মিত সেতুর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। চলতি বছর সব ধরনের অবৈধ দখল উচ্ছেদের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

৫৫ খালে ফিরবে পানির গতি
ঢাকার জলাবদ্ধতা ও জলপথের সংকট সমাধানে দুই সিটি করপোরেশনের ৫৫টি খালকে ঘিরে নেওয়া হয়েছে বড় পরিকল্পনা। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২৬টি এবং উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৯টি খাল রয়েছে।

মীর শাহে আলম বলেন, এসব খাল পরিষ্কার করে পানিপ্রবাহ সচল করা হবে। খালের দুই পাশে প্রয়োজন অনুযায়ী গাইডওয়াল, রিটেইনিং ওয়াল ও ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হবে। নেটিংয়ের মাধ্যমে সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি দখল ও দূষণ থেকে খালগুলোকে সুরক্ষিত রাখার ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।

জিরানীসহ চার খালে ৮৯৮ কোটি টাকার কর্মযজ্ঞ
৫৫ খাল ঘিরে বৃহত্তর পরিকল্পনার পাশাপাশি ডিএসসিসির মান্ডা, জিরানী, কালুনগর ও শ্যামপুর খাল পুনরুদ্ধার, সংস্কার ও নান্দনিক পরিবেশ সৃষ্টির জন্য পৃথক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর আওতায় পরিদর্শন করা জিরানী খালের দৈর্ঘ্য ৩ দশমিক ৯০ কিলোমিটার এবং প্রস্থ ৪ থেকে ২৫ মিটার।

৮৯৮ কোটি ৬১ লাখ ৩০ হাজার টাকা ব্যয়ের প্রকল্পটি ২০২২ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়নের কথা রয়েছে। প্রকল্প ব্যয়ের ৭০ শতাংশ সরকার এবং ৩০ শতাংশ ডিএসসিসি বহন করছে। তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত প্রকল্পটির সার্বিক অগ্রগতি হয়েছে ২১ দশমিক ৮৪ শতাংশ।

খালভিত্তিক অগ্রগতির হিসাবে মান্ডা খালের কাজ এগিয়েছে ৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ, জিরানীর ৫ দশমিক ৬০ শতাংশ, কালুনগরের ৬ দশমিক ৩৬ শতাংশ এবং শ্যামপুরের ২ দশমিক ০৫ শতাংশ।

খালপাড়ে ওয়াকওয়ে, সুরক্ষা বেষ্টনী ও সবুজায়ন
প্রকল্পের আওতায় চারটি খালের প্রায় ২০ দশমিক ৫৯ কিলোমিটার পুনঃখনন ও স্লাজ অপসারণ করা হবে। একই সঙ্গে খালের সীমানা নির্ধারণ ও স্লোপ প্রটেকশনের কাজ থাকবে। পরিকল্পনায় রয়েছে ৩২ দশমিক ৫৬ কিলোমিটার রিটেইনিং ওয়াল, ৩৮ দশমিক ০৬ কিলোমিটার সুরক্ষা বেষ্টনী এবং ৩২ দশমিক ৪৪ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে নির্মাণ। খালপাড়ে ল্যান্ডস্কেপিং ও সবুজায়নের পাশাপাশি পরিবেশদূষণ নিয়ন্ত্রণে আটটি ইটিপি নির্মাণ করা হবে।

ফলে প্রকল্পটি শুধু খনন বা দখলমুক্ত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; খালের পানিপ্রবাহ, পাড়ের স্থায়িত্ব, নাগরিক চলাচল এবং পরিবেশ—সবগুলো বিষয়কে একই অবকাঠামোগত পরিকল্পনার আওতায় আনা হয়েছে।

পাঁচ নদীকে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য
খালের পাশাপাশি ঢাকার চারপাশের পাঁচ নদী নিয়েও বড় পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন মীর শাহে আলম। তাঁর বক্তব্য, নদীগুলোকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার পাশাপাশি পাড় সংরক্ষণে গাইডওয়াল ও রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ এবং বৃক্ষরোপণ করা হবে।

নদীগুলোকে ৪০ থেকে ৫০ বছর আগের মতো সচল করে নৌযান চলাচলের উপযোগী করার লক্ষ্য রয়েছে। নদী পুনরুদ্ধারে স্টিমার ও ফেরিতে সরেজমিন পরিদর্শনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় কাজ চিহ্নিত করা হয়েছে। বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ ও অনুমোদনের কাজও এগিয়ে চলছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।

স্যুয়ারেজের বর্জ্য যাবে শোধনাগারে
ঢাকার নদী-খাল দূষণের বড় উৎস পয়ঃবর্জ্য। এই সংকট মোকাবিলায় স্যুয়ারেজ ব্যবস্থাপনায়ও পরিবর্তনের পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন মীর শাহে আলম। তিনি বলেন, ঢাকার স্যুয়ারেজ লাইন শহরের বাইরে নিয়ে দাসেরকান্দি, পাগলা, মিরপুর, উত্তরা ও রায়েরবাজার-মাদানীসহ নির্ধারিত স্থানে শোধনাগারের মাধ্যমে পয়ঃবর্জ্য পরিশোধন করা হবে। এরপর শোধিত পানি নদীতে ফেলার পরিকল্পনা রয়েছে।

‘উন্নয়নের গ্যারান্টি দেব’
নগর উন্নয়ন নিয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরে মীর শাহে আলম বলেন, সরকার বেহেশতের গ্যারান্টি দেবে না, তবে উন্নয়নের গ্যারান্টি দেবে। রাস্তাঘাট ঠিক করা, খাল সচল করা এবং স্যুয়ারেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটিয়ে দুর্গন্ধমুক্ত ও বাসযোগ্য নগরী গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সাত মাস হয়েছে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সমস্যাগুলো সমাধানের দিকে যাচ্ছে। যেখানে সরকারের ব্যর্থতা রয়েছে, সেখানে জনগণের কাছে দুঃখ প্রকাশ ও ক্ষমা চাওয়া হচ্ছে। জনগণের দেওয়া দায়িত্বকে সম্মান করে আগামী পাঁচ বছর প্রয়োজনীয় কাজ করে যাওয়ার কথাও জানান তিনি।

অন্যরা কে কী বলেছেন?
প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার বলেন, ঢাকায় প্রায় তিন কোটি মানুষের বসবাস। ফলে নগরে স্বাস্থ্যঝুঁকিও বেড়েছে। প্রধানমন্ত্রী ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

তিনি বলেন, নদী, খাল ও জলাশয়ের দুই পাড় গাইডওয়াল দিয়ে সংরক্ষণের পাশাপাশি বৃক্ষরোপণ করা হবে। নদীতে ময়লা-আবর্জনা ফেলা বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি এসব বর্জ্য সংগ্রহ করে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় শোধন করা হবে।

ঢাকা-৯ আসনের সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব বলেন, গত ১৫ বছরে খালগুলো অবৈধভাবে দখল করা হয়েছে। যারা দখল করেছে, তাদের পরিচয় শুধু অবৈধ দখলদার। রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে তাদের বিবেচনা করার সুযোগ নেই। খাল দখলমুক্ত করে এলাকার উন্নয়ন বাস্তবায়ন করা হবে বলেও জানান তিনি। বাঁশের সাঁকোগুলো আরসিসি সেতুতে রূপান্তরের কাজও এগিয়ে চলছে বলে উল্লেখ করেন।

অনুষ্ঠানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম, স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. শহীদুল হাসানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

রাজধানীর জলপথ ব্যবস্থাপনায় নতুন অধ্যায়
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের ঘোষিত কর্মপরিকল্পনায় ঢাকার দখল, দূষণ ও জলাবদ্ধতার মতো পুরোনো সংকটগুলোকে একটি সমন্বিত কাঠামোয় মোকাবিলার চেষ্টা স্পষ্ট। বাঁশের সেতুর পরিবর্তে স্থায়ী অবকাঠামো, ৫৫ খালে পানিপ্রবাহ, পাঁচ নদীর পুনরুদ্ধার, খালপাড়ে ওয়াকওয়ে ও সবুজায়ন এবং স্যুয়ারেজ শোধন—সব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর জলপথ ব্যবস্থাপনায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে। তবে সেই পরিবর্তনের চূড়ান্ত সাফল্য নির্ভর করবে প্রকল্পের গতি, দখল উচ্ছেদের ধারাবাহিকতা এবং পুনরায় দখল-দূষণ ঠেকানোর কার্যকর ব্যবস্থার ওপর।

কালের আলো/এমএএএমকে

উত্তর প্রদেশে বৃষ্টিতে ৫৬ মৃত্যু

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:২৯ অপরাহ্ণ
উত্তর প্রদেশে বৃষ্টিতে ৫৬ মৃত্যু

ভারতের উত্তর প্রদেশে টানা প্রায় ৬০ ঘণ্টার ভারি বৃষ্টিতে অন্তত ৫৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ৪৬ জন। প্রবল বর্ষণে রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় ব্যাপক জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ঘরবাড়ি, ব্যাহত হয়েছে যান চলাচল এবং বিভিন্ন এলাকায় তৈরি হয়েছে আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা।

রাজ্য সরকারের বরাতে ইন্ডিয়া টুডে জানিয়েছে, বৃষ্টিজনিত বিভিন্ন ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১ হাজার ২১টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সময়ে মারা গেছে ১০৭টি গবাদিপশু।

সীতাপুরে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি

জেলাভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে সীতাপুরে। সেখানে মারা গেছেন সাতজন। এরপর লখিমপুর খেরি, বাহরাইচ ও বালরামপুরে পাঁচজন করে এবং অযোধ্যা ও গোরখপুরে চারজন করে প্রাণ হারিয়েছেন।

প্রবল বৃষ্টির কারণে রাজ্যের আরও বিভিন্ন এলাকায় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়েছে। অনেক জায়গায় সড়কে পানি জমে যাওয়ায় যানবাহন চলাচলে সমস্যা তৈরি হয়েছে।

পশু মৃত্যুতেও বড় ক্ষয়ক্ষতি

বৃষ্টির কারণে শুধু মানুষের প্রাণহানিই নয়, পশুসম্পদেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি পশু মারা গেছে হারদই জেলায়—২৮টি।

এ ছাড়া সীতাপুরে ১৬টি, কন্নৌজে ১৪টি, বাহরাইচ ও কানপুর দেহাতে সাতটি করে এবং উন্নাওয়ে ছয়টি পশু মারা গেছে।

হারদইয়ে সবচেয়ে বেশি বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত

বাড়িঘরের ক্ষয়ক্ষতির দিক থেকেও এগিয়ে রয়েছে হারদই। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জেলাটিতে ২৭২টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় টানা বৃষ্টির ফলে নিচু এলাকাগুলোতে পানি জমে গেছে। লখনউসহ বেশ কয়েকটি জেলায় জলাবদ্ধতার কারণে সাধারণ মানুষের চলাচল কঠিন হয়ে পড়েছে।

কয়েক জেলায় ২০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি

আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সকাল পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় উত্তর প্রদেশের কয়েকটি এলাকায় ২০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

এর মধ্যে বান্দায় ২২৭ দশমিক ৬ মিলিমিটার, ফতেহগড়ে ২২৪ মিলিমিটার, বাহরাইচের নানপাড়ায় ২১৭ মিলিমিটার, হারদইয়ে ২১৪ মিলিমিটার এবং কন্নৌজে ২০৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে।

এ ধরনের ভারি বৃষ্টিতে নদী ও জলাধারের পানি বাড়ার পাশাপাশি নিচু এলাকাগুলোতে পানি জমে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

আরও ভারি বৃষ্টির পূর্বাভাস

আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, উত্তর প্রদেশের বিভিন্ন এলাকায় ভারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। রাজ্যের মধ্যাঞ্চল ও তেরাই এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে অতি ভারি বৃষ্টি হতে পারে।

এর পাশাপাশি এসব এলাকায় আকস্মিক বন্যার আশঙ্কার কথাও জানিয়েছে আবহাওয়া দপ্তর। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা রয়েছে।

জলাবদ্ধতা নিয়ে অখিলেশের সমালোচনা

এদিকে ভারি বৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা নিয়ে রাজ্য সরকারের সমালোচনা করেছেন সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি ভিডিও প্রকাশ করে গঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের জলাবদ্ধতা নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করেন তিনি।

অন্যদিকে বহুজন সমাজ পার্টির (বিএসপি) প্রধান ও সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মায়াবতী ভারি বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্তদের সব ধরনের প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে রাজ্য সরকারগুলোর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

টানা ভারি বৃষ্টিতে প্রাণহানি, বাড়িঘর ও পশুসম্পদের ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি নতুন করে অতিভারি বৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যার পূর্বাভাস থাকায় উত্তর প্রদেশের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

কালের আলো/এসএ