নদী দূষণের ৪২৪ দরজা
নদী বাঁচাতে খরচ হয়েছে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা। হয়েছে দখল উচ্ছেদ, ড্রেজিং, তীর রক্ষা, ট্যানারি স্থানান্তর, সৌন্দর্যবর্ধন—বাদ যায়নি বড় কোনো উদ্যোগই। তবু ঢাকার চারপাশের নদীগুলোতে দূষণের স্রোত থামেনি। বরং দুই যুগের নানা কর্মযজ্ঞের পরও প্রতিদিন নতুন করে নদীতে ঢুকছে প্রায় ৩৩০ টন তরল ও কঠিন বর্জ্য।
- আড়াই হাজার কোটি টাকার নদী রক্ষা কর্মযজ্ঞ
- তবু বন্ধ হয়নি বর্জ্য প্রবেশ
- প্রতিদিন চার নদীতে যাচ্ছে ৩৩০ টন
- নদী রক্ষায় বদলাতে হবে কৌশল
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডাব্লিউটিএ) জরিপে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যায় শনাক্ত হয়েছে ৪২৪টি বর্জ্য নির্গমনমুখ। সর্বশেষ জরিপে শুধু বুড়িগঙ্গাতেই মিলেছে ৩০৭টি দূষণমুখ। অর্থাৎ নদীর ওপর যতই পরিচ্ছন্নতার অভিযান চলুক, বর্জ্য ঢোকার দরজা খোলা থাকলে সেই নদী কতটা বাঁচানো সম্ভব—এখন সামনে এসেছে সেই মৌলিক প্রশ্ন।
নদী পরিষ্কার হচ্ছে, দূষণও ঢুকছে
নদী রক্ষার এতদিনের উদ্যোগের বড় অংশ ছিল নদীর ভেতর ও তীরে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনা। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, বর্জ্য অপসারণ কিংবা ড্রেজিংয়ে নদীর চেহারা বদলেছে। কিন্তু দূষণের উৎস বন্ধ না হওয়ায় সেই পরিবর্তন স্থায়ী হয়নি।
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান হাওলাদারের বক্তব্যেও উঠে এসেছে সমস্যার মূল জায়গাটি। তাঁর মতে, অভিযান বা জরিমানায় সাময়িকভাবে দূষণ কমানো সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদি সুফলের জন্য বর্জ্যের উৎস চিহ্নিত করে তা বন্ধ করা জরুরি।
বিআইডাব্লিউটিএর জরিপে উঠে এসেছে আরও অস্বস্তিকর তথ্য। দূষণের জন্য শুধু শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা যাচ্ছে না; সরকারি সংস্থার ড্রেনও সরাসরি নদীতে বর্জ্য ফেলছে। ঢাকা ওয়াসার ৬৬টি ড্রেনের ৫৭টি বুড়িগঙ্গা ও ৯টি তুরাগে গিয়ে পড়ছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২১টি ড্রেনের ১৯টি বুড়িগঙ্গা ও দুটি শীতলক্ষ্যায় যুক্ত। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১৬টির মধ্যে ১৫টি তুরাগ এবং একটি বুড়িগঙ্গায় গিয়ে মিশেছে।
৬০ শতাংশই শিল্পবর্জ্য
বিআইডাব্লিউটিএর তথ্য অনুযায়ী, নদীতে পড়া বর্জ্যের প্রায় ৬০ শতাংশ শিল্পবর্জ্য। ঢাকার চারপাশে নদীর তীরে রয়েছে ছোট-বড় প্রায় সাত হাজার শিল্প-কারখানা। এসব প্রতিষ্ঠানের বড় একটি অংশে কার্যকর তরল বর্জ্য পরিশোধনাগার বা ইটিপি নেই। ফলে শিল্পের রাসায়নিক, রং, তেল ও ভারী ধাতুসহ নানা বিষাক্ত উপাদান খাল ও ড্রেন পেরিয়ে সরাসরি নদীতে যাচ্ছে।
নৌবাহিনীর এক প্রতিবেদনে বুড়িগঙ্গাকে ‘অত্যন্ত সংকটাপন্ন’ এবং তুরাগকে ‘সংকটাপন্ন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ধলেশ্বরীকে বলা হয়েছে ‘অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ’। প্রতিবেদনে বুড়িগঙ্গা-তুরাগের দূষণের ৮০ শতাংশের জন্য শিল্প ও জৈব বর্জ্যকে দায়ী করা হয়েছে।
দূষণের ভয়াবহতা সবচেয়ে স্পষ্ট দ্রবীভূত অক্সিজেনের (ডিও) পরিমাপে। জলজ প্রাণীর টিকে থাকার জন্য সাধারণভাবে ডিও পাঁচ মিলিগ্রামের ওপরে থাকা প্রয়োজন। কিন্তু বুড়িগঙ্গায় এর গড় মাত্রা পাওয়া গেছে ১ দশমিক ৭ থেকে ২ দশমিক ৬৮ মিলিগ্রাম। অর্থাৎ নদীর অনেক অংশে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর স্বাভাবিক জীবনধারণের পরিবেশ নেই।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মীর মোহাম্মদ আলীর মতে, বুড়িগঙ্গার পানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের পাশাপাশি ক্যাডমিয়াম ও পারদের মতো ভারী ধাতুও পাওয়া গেছে। অনেক এলাকায় মাছ বেঁচে থাকার মতো পরিবেশ নেই। সংকটে পড়েছে বহু জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদের অস্তিত্ব।
লক্ষ্য ‘দূষণের দরজা’ বন্ধ করা
নতুন উদ্যোগে এবার নদী পরিষ্কারের চেয়ে বর্জ্য ঢোকার পথ বন্ধ করাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। গত ৬ আগস্ট ঢাকার চারপাশের নদীর পানি ও পরিবেশ উন্নয়ন নিয়ে বৈঠকের পর সমন্বিত কর্মপরিকল্পনার নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রথম ধাপে বুড়িগঙ্গা ও তুরাগের ৩৮ কিলোমিটার নৌপথকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
নদীর তীর ও আশপাশের সব দূষণমুখ চিহ্নিত করে পর্যায়ক্রমে সেগুলো বন্ধ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। নৌবাহিনী, পরিবেশ অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো এতে যুক্ত রয়েছে।
শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বিটিএমইএর সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠানে ইটিপি নেই, তাদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ইটিপি স্থাপনের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। তবে নদী দূষণের দীর্ঘ ইতিহাস বলছে, শুধু সময়সীমা বেঁধে দিলেই হবে না; কার্যকর নজরদারি ও নিয়মিত তদারকিও নিশ্চিত করতে হবে।
৩৭ সদস্যের কেন্দ্রীয় সেল
দখল ও দূষণ রোধে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে ৩৭ সদস্যের কেন্দ্রীয় সেল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে পরিবেশ, নৌপরিবহন, স্থানীয় সরকার, পানি উন্নয়ন বোর্ড, রাজউক, বিআইডাব্লিউটিএ, ঢাকা ওয়াসা, পুলিশ, কোস্ট গার্ড ও নদী রক্ষা কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রতিনিধিরা রয়েছেন।
সেলের অধীনে তিনটি উপকমিটি কাজ করবে। এর একটি শিল্পবর্জ্যসহ বিভিন্ন উৎস থেকে নদীতে বর্জ্য প্রবেশ বন্ধ, খাল-ড্রেনের বর্জ্য অপসারণ, নদীর তলদেশের কঠিন বর্জ্য সরানো এবং পানিপ্রবাহ বাড়ানোর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করবে।
বর্জ্যের বিনিময়ে নিত্যপণ্য
শুধু প্রশাসনিক অভিযান নয়, নদী রক্ষায় এবার সাধারণ মানুষকেও যুক্ত করার চেষ্টা চলছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ও বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে বুড়িগঙ্গায় চালু হয়েছে ‘বর্জ্যের বিনিময়ে ভাসমান বাজার’। নদী থেকে ক্ষতিকর বর্জ্য সংগ্রহ করে জমা দিলে বিনিময়ে মিলছে চাল, ডাল, তেল, লবণসহ নিত্যপণ্য।
উদ্যোগটি নদী থেকে কতটা বর্জ্য সরাতে পারবে, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন—মানুষের আচরণে এটি কতটা পরিবর্তন আনতে পারে। কারণ নদীর বর্জ্য কমাতে শুধু দূষণকারী প্রতিষ্ঠান নয়, নদীতীরবর্তী জনপদ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অভ্যাসও বদলাতে হবে।
হিসাব হবে নদীর পানিতে
দুই যুগে আড়াই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পরও যদি প্রতিদিন ৩৩০ টন বর্জ্য নদীতে ঢোকে, তাহলে নদী রক্ষার সাফল্য শুধু কতটি অভিযান হলো বা কত টন বর্জ্য তোলা হলো—এ দিয়ে মাপার সুযোগ নেই।
এবার সাফল্যের মাপকাঠি হতে হবে আরও কঠিন: ৪২৪টি দূষণমুখের কতটি স্থায়ীভাবে বন্ধ হলো, শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো কতটা নিয়ম মানল, নদীতে বর্জ্য প্রবেশ কতটা কমল এবং পানির ডিওসহ সামগ্রিক গুণমান কতটা ফিরল। কারণ নদীর পাড় পরিষ্কার করে নদী বাঁচে না। নদীতে বর্জ্য ঢোকার পথ বন্ধ হলেই শুরু হবে সত্যিকারের নদী রক্ষা।
কালের আলো/এমএসআইপি/এমকে




আপনার মতামত লিখুন
Array