রোনালদোর গাড়ির বহরে বিরল সব মডেল
ছোটবেলায় খেলনার বাক্স থাকে প্রায় সবারই। তবে সেই খেলনার বাক্সের ধারণাকে বাস্তবে বদলে যদি কেউ তৈরি করেন একটি বিশাল গাড়ির শোরুম, গল্পটা তখন আর সাধারণ থাকে না। ফুটবল মাঠে সাফল্যের পাশাপাশি ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর বিলাসবহুল জীবনযাপনও বরাবরই ভক্তদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। এবার নিজের ব্যক্তিগত গ্যারেজের কয়েকটি ছবি প্রকাশ করে সেই আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন পর্তুগিজ তারকা।
ইনস্টাগ্রামে মাত্র দুই শব্দের ক্যাপশন—‘মাই টয়েজ’। সঙ্গে ব্যক্তিগত গ্যারেজ থেকে তোলা তিনটি ছবি। পোস্টটি কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পেয়েছে ২ কোটি ৬৫ লাখের বেশি লাইক। মন্তব্যও পড়েছে প্রায় চার লাখ। এতে আবারও স্পষ্ট হয়েছে, মাঠের বাইরে রোনালদোর গাড়ির সংগ্রহও তাঁর ফুটবল ক্যারিয়ারের মতোই দর্শকদের কাছে আকর্ষণীয়।
গ্যারেজে যেন এক বিলাসবহুল শোরুম

রোনালদোর ব্যক্তিগত গ্যারেজকে সাধারণ কোনো পার্কিং স্পেস বলার সুযোগ নেই। কালো চকচকে মেঝে, ছাদজুড়ে সরলরেখার এলইডি আলো এবং বিশাল জায়গাজুড়ে সাজানো গাড়িগুলো মিলিয়ে এটি অনেকটা বিলাসবহুল গাড়ির শোরুমের মতো।
একসঙ্গে এক ডজনেরও বেশি গাড়ি অনায়াসে রাখা যায় সেখানে। আর প্রতিটি গাড়িই যেন আলাদা গল্প বলে—কোনোটির উৎপাদন সীমিত, কোনোটি বিশেষ সংস্করণের, আবার কোনোটি বিশ্বের হাতে গোনা কয়েকজন সংগ্রাহকের মালিকানায় রয়েছে।
রোনালদোর গ্যারেজে এখন গাড়ির সংখ্যা আনুমানিক ৪০ থেকে ৪১টি।
এক গ্যারেজেই বুগাত্তির রাজত্ব

রোনালদোর সংগ্রহের অন্যতম বড় আকর্ষণ বুগাত্তি। তাঁর গ্যারেজে রয়েছে বুগাত্তি ভেরন ১৬.৪ গ্র্যান্ড স্পোর্ট ভিতেস, বিশেষভাবে তৈরি একটি বুগাত্তি শিরন এবং নতুন বুগাত্তি তুরবিইয়োঁ।
তুরবিইয়োঁর দাম প্রায় ৩২ লাখ পাউন্ড। গাড়িটির উপস্থিতিই বোঝায়, রোনালদোর সংগ্রহে শুধু পরিচিত বিলাসবহুল গাড়িই নেই, বরং বিশ্বের সবচেয়ে বিশেষ ও ব্যয়বহুল গাড়িগুলোরও জায়গা রয়েছে।
তবে বুগাত্তির মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত গাড়িটি সেন্তোদিয়েচি। এটিই রোনালদোর সবচেয়ে দামি গাড়ি হিসেবে পরিচিত।
১০টি তৈরি, একটির মালিক রোনালদো

বুগাত্তির ১১০ বছর পূর্তি উপলক্ষে সেন্তোদিয়েচি তৈরি করা হয়েছিল। গাড়িটি নব্বইয়ের দশকের কিংবদন্তি সুপারকার ইবি ১১০-এর প্রতি এক ধরনের শ্রদ্ধার্ঘ্যও।
শুরু থেকেই এটি ছিল সীমিত সংস্করণের প্রকল্প। বুগাত্তি গাড়িটি তৈরি করেছে মাত্র ১০টি। ফলে বাজারে আসার আগেই এর দুর্লভতা নিশ্চিত হয়ে যায়।
শুরুতে গাড়িটির দাম ধরা হয়েছিল প্রায় ৮৫ লাখ থেকে ১ কোটি ডলার। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন হিসাবে এর মূল্য প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ ডলার পর্যন্ত ধরা হয়েছে।
সেন্তোদিয়েচির বিশেষত্ব শুধু দাম বা গতি নয়। সীমিত উৎপাদন, ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং স্বতন্ত্র নকশা—সব মিলিয়ে এটি গাড়ি সংগ্রাহকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়।
১ হাজার ৬০০ হর্সপাওয়ারের দানব

বুগাত্তি সেন্তোদিয়েচির বনেটের নিচে রয়েছে ৮ লিটারের ডব্লিউ১৬ ইঞ্জিন। চারটি টার্বোচার্জারের সমন্বয়ে ইঞ্জিনটি সর্বোচ্চ ১ হাজার ৬০০ হর্সপাওয়ার শক্তি উৎপাদন করতে পারে।
শূন্য থেকে ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার গতিতে পৌঁছাতে গাড়িটির সময় লাগে মাত্র ২.৪ সেকেন্ড। এর সর্বোচ্চ গতি প্রযুক্তিগতভাবে ঘণ্টায় ৩৮০ কিলোমিটার পর্যন্ত সীমাবদ্ধ করা হয়েছে।
এমন একটি গাড়ি বিশ্বের যেকোনো গাড়ি সংগ্রহের প্রধান আকর্ষণ হতে পারে। রোনালদোর গ্যারেজে সেটিও যেন আরও অনেক বিশেষ গাড়ির ভিড়ে একটি অংশমাত্র।
ফেরারির সংগ্রহও কম নয়

রোনালদোর গাড়ির তালিকায় ফেরারির উপস্থিতিও বেশ শক্তিশালী। তাঁর সংগ্রহে রয়েছে ফেরারি পুরোসাংগে, দাইতোনা এসপি ৩, মনৎসা এসপি ১, কালো ৫৯৯ জিটিও এবং লাফেরারি।
এর মধ্যে লাফেরারির দাম সাড়ে তিন কোটি ডলারের বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
আর মনৎসা এসপি ১ তৈরি হয়েছে পঞ্চাশের দশকের রেসিং কারের নকশা অনুসরণ করে। গাড়িটিতে নেই কোনো প্রচলিত ছাদ কিংবা সাধারণ উইন্ডশিল্ড। এর দাম প্রায় ১৮ লাখ ডলার।
মনৎসা এসপি ১ এবং দাইতোনা এসপি ৩—দুটিই ফেরারির সীমিত সংস্করণের ‘ইকোনা’ সিরিজের গাড়ি। এগুলো সাধারণ শোরুম থেকে ইচ্ছা করলেই কেনা যায় না; বরং ফেরারি নির্দিষ্ট গ্রাহকদের কাছে গাড়িগুলো বরাদ্দ করে।
ম্যাকলারেন সেনা থেকে স্পিডটেইল

রোনালদোর সংগ্রহে রয়েছে ম্যাকলারেনেরও একাধিক বিশেষ গাড়ি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ম্যাকলারেন সেনা ও স্পিডটেইল।
ম্যাকলারেন সেনা তৈরি করা হয়েছে কিংবদন্তি ব্রাজিলিয়ান রেসিং চালক আইর্তন সেনার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে। বিশ্বজুড়ে গাড়িটির মাত্র ৫০০টি তৈরি করা হয়েছে।
শূন্য থেকে ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার গতিতে পৌঁছাতে এর সময় লাগে মাত্র ২.৮ সেকেন্ড। গাড়িটির দাম প্রায় ১০ লাখ ডলার।
রোনালদোর গ্যারেজে থাকা রুপালি রঙের ম্যাকলারেন সেনায় কার্বন ফাইবারের ট্রিমও স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে।
আরও আছে লাম্বরগিনি, পোর্শে, বেন্টলি

বুগাত্তি, ফেরারি ও ম্যাকলারেনেই অবশ্য রোনালদোর সংগ্রহ শেষ নয়। তাঁর গ্যারেজে রয়েছে লাম্বরগিনি আভেন্তাদর, পোর্শে ৯১১, বেন্টলি ফ্লাইং স্পার এবং ব্রাবাসের হাতে বিশেষভাবে সাজানো একটি মার্সিডিজ জি-ওয়াগন।
আল নাসর ক্লাব থেকে রোনালদো ও তাঁর সতীর্থদের উপহার হিসেবে পাওয়া বিএমডব্লিউও রয়েছে তাঁর গাড়ির তালিকায়।
অন্য কারও জন্য এমন একটি গাড়ি হয়তো বিশেষ উপহার। কিন্তু রোনালদোর মতো গাড়ি সংগ্রাহকের বিশাল বহরের তুলনায় সেটি খুব বড় সংযোজন নয়।
শুধু অর্থ নয়, পছন্দও গুরুত্বপূর্ণ
রোনালদো নিজেই তাঁর গাড়ির সংখ্যা নিয়ে কখনো বিশেষ রাখঢাক করেননি। কতগুলো গাড়ি রয়েছে—এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি একবার বলেছিলেন, অনুমান করলে সংখ্যাটি ৪০ বা ৪১টি হতে পারে। বুগাত্তির গাড়ির প্রতি নিজের বিশেষ পছন্দের কথাও জানিয়েছেন তিনি।
তাঁর পুরো গাড়ি সংগ্রহের মূল্য আনুমানিক ৪ কোটি ডলার বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে রোনালদোর গ্যারেজকে শুধু বিপুল অর্থের প্রদর্শন হিসেবে দেখলে এর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বাদ পড়ে যায়। কারণ তাঁর সংগ্রহের বেশ কিছু গাড়ি এমন, যেগুলো অর্থ থাকলেই সাধারণভাবে কেনা সম্ভব নয়।
সব গাড়ি টাকা থাকলেই কেনা যায় না

মনৎসা এসপি ১, দাইতোনা এসপি ৩ কিংবা মার্সিডিজ এএমজি ওয়ানের মতো গাড়ি সাধারণ কোনো শোরুম থেকে চাইলেই কেনা যায় না। এগুলোর উৎপাদন সীমিত এবং নির্দিষ্ট ক্রেতাদের জন্য বরাদ্দ করা হয়।
বিশেষ করে এএমজি ওয়ান এমন একটি গাড়ি, যার উৎপাদন সংখ্যা মাত্র ২৭৫টি। ফলে শুধু অর্থের সামর্থ্য থাকলেই গাড়িটির মালিক হওয়া যায় না।
এ কারণেই রোনালদোর গ্যারেজের গল্পটা শুধু একজন ধনী ফুটবলারের দামি গাড়ি কেনার গল্প নয়। এখানে রয়েছে বিরল গাড়ি বেছে নেওয়া, সীমিত সংস্করণের মডেল সংগ্রহ করা এবং অটোমোবাইল জগতের বিশেষ ইতিহাসের প্রতি আগ্রহ।
একজন ধনী ব্যক্তি অনেক দামি জিনিস কিনতে পারেন। কিন্তু রোনালদোর গ্যারেজে থাকা গাড়িগুলোর বৈচিত্র্য, দুর্লভতা ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব সেটিকে অন্য অনেক সংগ্রহ থেকে আলাদা করে।
ফুটবল মাঠে রোনালদোর ট্রফি ও রেকর্ড যেমন তাঁর ক্যারিয়ারের পরিচয়, তেমনি মাঠের বাইরে তাঁর এই গাড়ির সংগ্রহও হয়ে উঠেছে তাঁর বিলাসী রুচি ও গাড়ির প্রতি গভীর আগ্রহের অন্যতম পরিচায়ক।
কালের আলো/এসএ

আপনার মতামত লিখুন
Array