তথ্যের অবারিত সময় এখন। তথ্যের অভাব না থাকলেও সংকট সত্য তথ্যের। আবার সাংবাদিকতার পরিসর বিস্তৃত হলেও প্রশ্ন রয়ে গেছে—সাংবাদিকের পরিচয় কী, পেশাগত স্বীকৃতি কোথায়, আর অধিকার ও কল্যাণের সুযোগই বা কার জন্য? একই দিনে দুটি পৃথক অনুষ্ঠানে দাঁড়িয়ে এই দুই প্রশ্নের দিকেই দৃষ্টি দিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী এমপি।
এক মঞ্চে তিনি বললেন, সাংবাদিকের অধিকার, ওয়েজবোর্ড ও পেশাগত স্বীকৃতির কথা। অন্য মঞ্চে তাঁর কণ্ঠে উঠে এলো অপতথ্য, অসত্য তথ্য এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধের আহ্বান। দুটি বক্তব্যের ভেতর দিয়ে যেন একটি অভিন্ন বার্তাই সামনে এলো সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর)—অধিকার যেমন কাঠামো ছাড়া টেকসই হয় না, তেমনি তথ্যের স্বাধীনতাও সত্যতা ও দায়িত্বশীলতা ছাড়া অর্থবহ হয় না।
- কল্যাণের সুবিধা প্রকৃত সাংবাদিকের কাছে পৌঁছাতে সংজ্ঞা স্পষ্ট করার আহ্বান
- এআই অপব্যবহার রোধে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার তাগিদ
এদিন সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন ২০২৬-এর কনসালটেশন সভায় সাংবাদিকদের অধিকার ও কল্যাণের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘সংজ্ঞা নির্ধারণ, কল্যাণ নিশ্চিত করা, ওয়েজবোর্ডসহ সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষা করতে সরকার কাজ করছে।’ নিজ বক্তব্যের পরের ধাপেই তিনি স্পষ্ট করেন, অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি অধিকারভোগীর পরিচয়ও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। প্রকৃত সাংবাদিকরা যাতে তাঁদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত না হন এবং সাংবাদিক ছাড়া অন্যরা যাতে সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করতে না পারেন, সে জন্য সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের ‘সংজ্ঞা’ সুস্পষ্ট করার ওপর জোর দেন তিনি।

অর্থাৎ সাংবাদিকতার কল্যাণের প্রশ্নটি তাঁর বক্তব্যে কেবল সুযোগ-সুবিধার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলো না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পেশাগত পরিচয় ও স্বীকৃতির প্রশ্নও। কে সাংবাদিক, কে নন—এই সীমারেখা স্পষ্ট না হলে অধিকার রক্ষার কাঠামোও যে পূর্ণতা পাবে না, প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে সেই প্রয়োজনীয়তাই প্রতিফলিত হয়েছে। সাংবাদিকদের ওয়েজবোর্ড, পেশাগত অধিকার ও কল্যাণের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে একটি গ্রহণযোগ্য কাঠামো প্রণয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। সাংবাদিকদের পেশাগত স্বীকৃতির জন্য একটি সুস্পষ্ট কাঠামো প্রণয়নের প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে বার কাউন্সিলের মতো কোনো ব্যবস্থা করা যায় কি না, সে বিষয়ে সাংবাদিক সংগঠনগুলোর কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট পরামর্শ প্রয়োজন।
সভার আলোচনায় অংশ নেন আরটিভির হেড অফ নিউজ ইলিয়াস হোসেন, একুশে টেলিভিশনের সিইও আবদুস সালাম, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের সিইও মোস্তফা আকমল, ডা. শাখাওয়াত হোসেন সায়ন্ত, ইআরএফের সাবেক সভাপতি শারমিন রিনভী, দৈনিক মানবজমিনের সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ, দৈনিক প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ, ইউএনবির ডেপুটি এডিটর মাসউদুল-হক, দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার ব্যবস্থাপনা সম্পাদক জাহিদ চৌধুরী এবং ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম প্রমুখ।
সভায় ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বক্তব্য রাখেন। এসময় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবা ফারজানা, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব মোঃ মামুনুর রশীদ ভূঞাসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এআই অপব্যবহার রোধে ঐক্যের ডাক
একই দিন, অন্য আরেকটি এক মঞ্চে তথ্য প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে তথ্যের সত্যতা। আন্তর্জাতিক তথ্য অধিকার দিবস-২০২৬ উপলক্ষে তথ্য কমিশনের হলরুমে আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি বলেন, ‘তথ্যের অবাধ প্রবাহের পাশাপাশি সঠিক ও নির্ভরযোগ্য তথ্য নিশ্চিত করা এবং অপতথ্য ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) অপব্যবহার রোধে বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব দেশকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।’ এই বছরে দিবসটির প্রতিপাদ্য ছিল—‘ডিজিটাল যুগে সঠিক তথ্য নিশ্চিতকরণ; অপতথ্যরোধে তথ্য অধিকারের ভূমিকা’।
প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী এমপি বলেন, ‘ডিজিটাল যুগে তথ্যের কোনো অভাব নেই, বরং সঠিক তথ্যের পাশাপাশি অপতথ্য, অসত্য তথ্যের বিস্তার এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ কারণে তথ্য অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি তথ্যের সত্যতা যাচাই এবং দায়িত্বশীলভাবে তথ্য পরিবেশনের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।’ তাঁর বক্তব্যে তথ্য অধিকার আর তথ্যের দায়বদ্ধতা যেন একই সুতোয় বাঁধা। মানুষের জানার অধিকার আছে, কিন্তু সেই জানার উপকরণটি যদি ভুল বা অসত্য হয়, তাহলে অধিকারটি তার কাঙ্ক্ষিত অর্থ হারাতে পারে—এই বাস্তবতার কথাই সামনে আনেন।
প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্যে—’তথ্য জানার অধিকার সকলেরই আছে। তবে সেই তথ্য হতে হবে সঠিক, অপতথ্য নয় কিংবা অসত্য তথ্য নয়।’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রসঙ্গেও সতর্ক করেন তিনি। কোনো তথ্য শেয়ার, লাইক বা কমেন্ট করার আগে সত্যতা যাচাইয়ের আহ্বান জানিয়ে বলেন, অনেক সময় মানুষ নিজের অজান্তেই যাচাই না করে কোনো তথ্য শেয়ার বা প্রচার করেন।
গণমাধ্যমের দায়িত্বের জায়গাটিও স্পষ্ট করে দেন ইয়াসের খান। বলেন, ‘যারা গণমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত, তাদের সঠিক তথ্য যাচাই করে তা জনগণের সামনে তুলে ধরার দায়িত্ব রয়েছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক নেতা, সামাজিক সংগঠন ও সাধারণ নাগরিকদেরও তথ্য ব্যবহারে দায়িত্বশীল হতে হবে।’ অপতথ্যের অভিঘাত যে কেবল একটি স্ক্রিনের ভেতর আটকে থাকে না, সেটিও তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভুল ও অসত্য তথ্য ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। নারী ও শিশুসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধনেও এর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।
আর প্রযুক্তির সর্বশেষ বিস্ময়—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—যখন মানুষের ছবি ও পরিচয়কে বিকৃত করে উপস্থাপনের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন উদ্বেগ আরও গভীর হয়। প্রতিমন্ত্রী বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিভিন্ন প্রযুক্তির অপব্যবহারের মাধ্যমে মানুষের ছবি ও পরিচয় ব্যবহার করে তাদের হেয়প্রতিপন্ন ও মানহানি করা হচ্ছে। ‘এ ধরনের অপসংস্কৃতি থেকে সমাজকে বেরিয়ে আসতে হবে।’
ভবিষ্যৎ নিয়ে সতর্ক করে তিনি বলেন, ‘যদি আমরা এখন থেকেই সতর্কতা অবলম্বন না করি, এখন থেকেই পদক্ষেপ না নিই, তাহলে এই অপতথ্য, অসত্য তথ্য এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের অপব্যবহারের জন্য পৃথিবী একদিন হুমকির মুখে পড়বে।’ এ সংকট মোকাবিলায় জাতীয় সীমানার বাইরেও সহযোগিতার প্রয়োজন দেখছেন তিনি। তাঁর আহ্বান, ‘বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব রাষ্ট্রকে সম্মিলিতভাবে অপতথ্য ও এআইয়ের অপব্যবহার মোকাবিলায় কাজ করতে হবে।’
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। সভায় সভাপতিত্ব করেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবা ফারজানা। সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের গণমাধ্যম অধ্যয়ন ও সাংবাদিকতা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. সুমন রহমান। আলোচনায় অনলাইনে যুক্ত হন সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ প্রমুখ।
সভায় বক্তারা তথ্য অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ডিজিটাল মাধ্যমে সঠিক ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের প্রবাহ নিশ্চিত করা, অপতথ্য প্রতিরোধ, গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার মোকাবিলায় জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। সভায় তথ্য কমিশনের সচিব মোঃ শাহ আলম, তথ্য সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন দপ্তর প্রধানগণসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
কালের আলো/এমএএএমকে
আপনার মতামত লিখুন
Array