হাতিরঝিল: রক্ষার প্রকল্পেই নতুন সংকট
ঢাকার জলাধার রক্ষা, পরিবেশের ভারসাম্য এবং নগরবাসীর জন্য উন্মুক্ত পরিসর তৈরির লক্ষ্য ছিল হাতিরঝিল উন্নয়ন প্রকল্পের। সেই লক্ষ্যে দুই হাজার ২৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে তোলা হাতিরঝিল এখন উল্টো উন্নয়ন ও দূষণের চাপে সংকুচিত ও বিপর্যস্ত। ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সংযোগ র্যাম্প নির্মাণে লেকের একাধিক অংশ বালু দিয়ে ভরাট করে পিলার বসানো হচ্ছে। এর সঙ্গে আশপাশের এলাকার নালা দিয়ে নিয়মিত ঢুকছে পয়ঃবর্জ্য ও নোংরা পানি।
- একদিকে এক্সপ্রেসওয়ের পিলার, অন্যদিকে পয়ঃবর্জ্য
- জলাধার রক্ষায় ব্যয়ের পরও ফিরছে পুরোনো সংকট
- নতুন করে লেক ভরাট করে চলছে এক্সপ্রেসওয়ের কাজ
- দূষণের উৎস বন্ধ হয়নি, সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন
ফলে কোথাও থমকে যাচ্ছে পানিপ্রবাহ, কোথাও জমে থাকছে দূষিত পানি। ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ, কালচে হচ্ছে পানি, ঘটছে মাছ মরে ভেসে ওঠার ঘটনাও। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি তৈরি হয়েছে সোনারগাঁও হোটেলের পেছনের অংশে। পাঁচতারকা হোটেলটির পাশের ঝিলে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা নোংরা পানি ও বর্জ্যের দুর্গন্ধ এখন হাতিরঝিলের পরিবেশগত সংকটের স্পষ্ট চিত্র হয়ে উঠেছে।
এক লেক, দুই সরকারি প্রকল্প
হাতিরঝিলের সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছিল ২০০৭ সালে। শুরুতে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৪৭৩ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। পরে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ২৩৬ কোটি টাকা। জলাধার সংরক্ষণ, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং নগরবাসীর জন্য একটি নান্দনিক ও উন্মুক্ত পরিসর তৈরি ছিল প্রকল্পটির অন্যতম উদ্দেশ্য। অথচ সেই জলাধারেরই অংশ এখন আরেক সরকারি মেগাপ্রকল্পের অবকাঠামো নির্মাণে ব্যবহার হচ্ছে।
ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সোনারগাঁও লিংক র্যাম্পের জন্য হাতিরঝিলের ইস্কাটন অংশে বালু ফেলে ভরাট করা হয়েছে। কারওয়ানবাজারের রেললাইন থেকে ইস্কাটনের বিয়াম ফাউন্ডেশনের গেট পর্যন্ত অংশে পাইলিং চলছে। সোনারগাঁও হোটেলের পেছনের অংশেও বসানো হয়েছে পিলার।
মগবাজার অংশে কুতুবখালীমুখী লাইনের জন্যও ভরাট করা হয়েছে লেকের জায়গা। সরেজমিনে দেখা গেছে, কয়েকটি পিলার ইতোমধ্যে দৃশ্যমান। দুই পিলারের মধ্যে গার্ডার বসিয়ে সংযোগ তৈরির কাজও এগিয়েছে।
নকশায় ছিল না হাতিরঝিল
বিমানবন্দর থেকে কুতুবখালী পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের চুক্তি হয় ২০১১ সালের ১৯ জানুয়ারি। ওই বছরের ৩০ এপ্রিল নির্মাণকাজের উদ্বোধন হয়। তবে মূল পরিকল্পনায় হাতিরঝিলের ওপর দিয়ে সংযোগ র্যাম্পের ব্যবস্থা ছিল না। পরে এই অংশ প্রকল্পে যুক্ত করা হয়। ইতোমধ্যে বিমানবন্দর থেকে বনানী, মহাখালী, ফার্মগেট ও হাতিরঝিলের বিএফডিসি পর্যন্ত এক্সপ্রেসওয়ে চালু হয়েছে।
প্রকল্পের কুতুবখালী পর্যন্ত অংশের কাজও চলছে। কর্মকর্তাদের হিসাবে, প্রকল্পের অগ্রগতি এখন প্রায় ৭৭ শতাংশ। ২০২৩ সালে রাজউকের সঙ্গে আলোচনার পর হাতিরঝিলে ৪০৭ থেকে ৪১৮ নম্বর পিয়ারের পাইল ড্রাইভিং শুরু হয়। এর মধ্যে প্রায় ২০টি পিলার বসানো হয়েছে। আরও ২১টি পিলার বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
আপত্তি ছিল রাজউকের
হাতিরঝিলে পিলার বসানোর বিষয়ে শুরু থেকেই আপত্তি ছিল রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক)। ২০২৩ সালে তৎকালীন স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন সমন্বয় কমিটির সভায় রাজউক জানিয়েছিল, ৪১টি পিলার হাতিরঝিলের সৌন্দর্য ও জলাধারের স্বাভাবিক কার্যকারিতা নষ্ট করতে পারে। সংস্থাটি বিকল্প রুট বিবেচনার পরামর্শও দিয়েছিল। রাজউকের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, পিলার নির্মাণের জন্য মৌখিকভাবে ছয় মাসের অনুমতি দেওয়া হলেও লেক ভরাটের অনুমতি দেওয়া হয়নি।
রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই কিংবা নকশা করার পর্যায়েও রাজউককে জানানো হয়নি। সবকিছু চূড়ান্ত করার পর অনুমোদন চাওয়া হয়েছে। প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষায় পিলার না বসানোর চেষ্টা করা হলেও বৃহৎ সরকারি পরিকল্পনার বিবেচনায় শেষ পর্যন্ত অনুমতি দিতে হয়েছে বলে জানান তিনি।
‘কাজ শেষে আগের অবস্থায়’
এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের পরিচালক মো. গোলাম মর্তুজা বলেন, উন্নয়নকাজের জন্য হাতিরঝিলের কিছু অংশ ভরাট করা হয়েছে। কাজ শেষে লেকটি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া হবে। কিন্তু পরিবেশবাদীদের উদ্বেগ শুধু ভরাট করা জায়গা পরে পুনরুদ্ধার করা হবে কি না, তা নিয়ে নয়। তাদের আশঙ্কা, নির্মাণকাজের সময় ও পরবর্তী সময়ে পিলারের অবস্থান এবং স্থাপনার কারণে লেকের পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে জলাধারের পরিবেশগত ভারসাম্যে।
এরই মধ্যে সোনারগাঁও হোটেলের পেছনের অংশে সেই আশঙ্কার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সেখানে দূষিত পানি আটকে থাকছে। কয়েক বছর আগে ওই অংশে শত শত মাছ মরে ভেসে ওঠে। পরে রাজউকের কর্মীরা মৃত মাছ সরিয়ে মাটিচাপা দেন। পরিবেশবাদীদের মতে, পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়া এবং বর্জ্য জমে থাকাই ওই পরিস্থিতির অন্যতম কারণ।
নালায় নালায় বর্জ্য, ঝিলে কালো পানি
তবে হাতিরঝিলের দুরবস্থার দায় কেবল এক্সপ্রেসওয়ের ওপর চাপানোর সুযোগ নেই। লেকের দূষণের আরেক বড় উৎস আশপাশের এলাকার পয়ঃবর্জ্য। পান্থপথ, তেজগাঁও, মগবাজারসহ বিভিন্ন এলাকার নালা ও পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার মাধ্যমে নোংরা পানি ও পয়ঃবর্জ্য হাতিরঝিলে ঢুকছে। এর সঙ্গে মিশছে পচা আবর্জনা ও অন্যান্য দূষিত পদার্থ। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই প্রবাহের কারণে লেকের পানির গুণগত মান নষ্ট হচ্ছে।
ফলে পানি কালচে হয়ে যাচ্ছে, ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। সোনারগাঁও হোটেলের পেছনের অংশে পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। নগরের গুরুত্বপূর্ণ একটি পাঁচতারকা হোটেলের পেছনে জলাধারের এমন অবস্থা হাতিরঝিলের ব্যবস্থাপনা ও বর্জ্য নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার দুর্বলতাকে সামনে এনেছে।
৪৮ কোটি টাকার শোধনেও সমাধান নেই
হাতিরঝিলের দূষিত পানি শোধনে সরকার অর্থও ব্যয় করেছে। ২০১৮ সালে ‘হাতিরঝিল লেকের দূষিত পানি পরিশোধন’ প্রকল্পে ৪৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায় রাজউক।
বিভিন্ন সময়ে লেক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজও হয়েছে। কিন্তু দূষণের উৎস বন্ধ না হওয়ায় পরিস্থিতি বারবার আগের অবস্থায় ফিরে এসেছে। একদিকে পানি শোধন করা হয়েছে, অন্যদিকে ছোট ছোট নালা দিয়ে আবার ঢুকেছে স্যুয়ারেজের পানি ও বর্জ্য।এতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বা পানি শোধনের উদ্যোগ স্থায়ী সুফল দিতে পারেনি।
মূল সংকট ব্যবস্থাপনায়
হাতিরঝিলের বর্তমান পরিস্থিতি আসলে দুটি সমস্যার যোগফল—উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য জলাধারের অংশ ব্যবহার এবং নগর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের দুর্বলতা। একদিকে লেকের ভেতরে পিলার বসছে, অন্যদিকে বাইরে থেকে বর্জ্য ঢুকছে। মাঝখানে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে পানির স্বাভাবিক চলাচল। রাজউক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার রিয়াজুল ইসলাম জানিয়েছেন, লেকের সৌন্দর্য ও পরিচ্ছন্নতা রক্ষায় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিবেশ ঠিক রাখতেও কাজ চলছে। ঢাকার খাল ও লেক নিয়ে একাধিক কমিটি করা হয়েছে এবং উন্নয়নে কয়েকটি কাজের দরপত্র প্রক্রিয়াধীন।
তবে হাতিরঝিলের অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, শুধু পরিষ্কার করা বা সৌন্দর্যায়ন দিয়ে জলাধার রক্ষা সম্ভব নয়। দূষণের উৎস বন্ধ করা, পানিপ্রবাহ অক্ষুণ্ন রাখা এবং অবকাঠামো নির্মাণের আগে জলাধারের পরিবেশগত সক্ষমতা বিবেচনায় নেওয়াই মূল চ্যালেঞ্জ। দুই হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে যে হাতিরঝিলকে ঢাকার পরিবেশ ও সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছিল, সেই জলাধার এখন উন্নয়ন ও দূষণের দ্বৈত চাপে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—একটি সরকারি প্রকল্পের সুফল নিশ্চিত করতে গিয়ে আরেক সরকারি প্রকল্পের পরিবেশগত উদ্দেশ্য কতটা বিসর্জন দেওয়া হচ্ছে? আর জলাধার রক্ষার নামে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পর সেই জলাধারকেই যদি বারবার নতুন চাপের মুখে পড়তে হয়, তাহলে ঢাকার টেকসই নগর পরিকল্পনার হিসাবটি কোথায়?
কালের আলো/এএইচ/এমকে

আপনার মতামত লিখুন
Array