দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মকে আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় দুই দফায় আট দিনের রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানো হয়েছে জামায়াতে ইসলামীর বহিষ্কৃত সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে। তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, জিজ্ঞাসাবাদে মরিয়মের প্রতি অবহেলা, দাম্পত্য জীবনে বৈষম্য এবং মানসিক নির্যাতনের নানা তথ্য উঠে এসেছে। এসব তথ্য এখন মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
- আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় নজরুল কারাগারে
- রিমান্ডে উঠে এসেছে দাম্পত্য বৈষম্য ও মানসিক নির্যাতনের তথ্য
- চিরকুট ঘিরেও বাড়ছে তদন্তের গুরুত্ব
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলামের আদালত নজরুল ইসলামের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। রিমান্ড শেষে তাকে আদালতে হাজির করা হলেও নতুন করে রিমান্ড আবেদন না থাকায় শুনানি হয়নি। পরে তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির তেজগাঁও জোনাল টিমের পরিদর্শক মোহাম্মদ সালাউদ্দিন তাকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন।
একই ফ্ল্যাটে থেকেও আলাদা বাস্তবতা
তদন্ত কর্মকর্তার আদালতে দেওয়া বক্তব্যে নজরুল ইসলামের দাম্পত্য জীবনের একটি বৈষম্যমূলক চিত্র সামনে এসেছে। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানিয়েছেন, ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাটের শয়নকক্ষে তিনি প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামকে নিয়ে থাকতেন। অন্যদিকে দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মকে কখনো কখনো ওই শয়নকক্ষের পাশের বেলকনিতে রাত কাটাতে হতো।
তদন্তে বলা হয়েছে, বিয়ের পর মরিয়মকে ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাটে থাকার সুযোগ দেওয়া হলেও স্ত্রী হিসেবে তার প্রাপ্য মর্যাদা দেওয়া হয়নি। একই ছাদের নিচে বসবাস করলেও দুই স্ত্রীর জীবনযাপনে এমন পার্থক্য মরিয়মের ওপর কী ধরনের মানসিক প্রভাব ফেলেছিল, সেটিই এখন তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
পরিচয় থেকে বিয়ে, এরপর সম্পর্কের টানাপোড়েন
তদন্ত কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ ছিলেন নজরুল ইসলামের ভাগনে। ঢাকায় এলে নজরুল তার বাসায় অবস্থান করতেন এবং সেখান থেকেই সংসদের কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। এই সূত্রেই মরিয়মের সঙ্গে তার পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়।
এর ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের ১৬ জুন নজরুল ইসলাম মরিয়মকে মৌখিকভাবে বিয়ে করেন। পরে ওই তারিখ দেখিয়ে বিয়ে নিবন্ধন ও কাবিননামা সম্পন্ন করা হয়। তবে বিয়ের পর তাদের সম্পর্ক স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবনের কাঠামো পেয়েছিল কি না, তদন্তে সেই প্রশ্নই ক্রমে সামনে এসেছে।
চিরকুটেও ছিল অভিযোগের ছাপ
গত ২০ সেপ্টেম্বর ন্যাম ভবনের ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাট থেকে ১৯ বছর বয়সী মরিয়মের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ থাকায় সিআইডির সহায়তায় তা ভেঙে প্রবেশ করা হয়। পরে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় মরদেহ পাওয়া যায়। ঘর থেকে উদ্ধার হওয়া কয়েকটি চিরকুটও তদন্তে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব চিরকুটে মরিয়মের প্রতি অবহেলা ও মানসিক নির্যাতনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগের আইনগত দায় নির্ধারণে চিরকুট, সাক্ষ্য, ফরেনসিক তথ্য এবং অন্যান্য প্রমাণের পারস্পরিক সামঞ্জস্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
আদালতের পরবর্তী পর্যায়ে প্রমাণই হবে মূল বিষয়
ঘটনার পরদিন মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ বাদী হয়ে নজরুল ইসলাম, তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলাম এবং মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা করেন। ওই রাতেই নজরুল ও মাকছুদাকে গ্রেপ্তার করা হয়। মাকছুদাও এক দিনের রিমান্ড শেষে কারাগারে রয়েছেন।
মামলায় এখন তদন্তের পরবর্তী ধাপ হবে
জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে ঘটনাস্থলের আলামত, চিরকুট, সাক্ষ্য ও অন্যান্য প্রমাণ মিলিয়ে দেখা। রিমান্ডে কোনো তথ্য পাওয়া গেছে—এটি তদন্তের একটি অংশ; আদালতে অভিযোগ প্রমাণের জন্য সেই তথ্যের আইনগত গ্রহণযোগ্যতা ও অন্যান্য প্রমাণের সঙ্গে সামঞ্জস্যই শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
কালের আলো/এম/এএইচ
আপনার মতামত লিখুন
Array