বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জন্য বড় এক সুখবর এসেছে জাপান থেকে। টোকিও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের (TIFF) ৩৯তম আসরের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে জায়গা করে নিয়েছে নির্মাতা রুবাইয়াত হোসেনের চলচ্চিত্র ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’। প্রায় চার দশকের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো বাংলাদেশি চলচ্চিত্র উৎসবটির মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে নির্বাচিত হলো।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) টোকিওর স্পাইরাল হলে উৎসবের পূর্ণাঙ্গ আয়োজন ও প্রতিযোগিতা বিভাগের চলচ্চিত্রগুলোর তালিকা প্রকাশ করা হয়। সেখানেই বাংলাদেশের ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’-এর নাম ঘোষণা করা হয়।
রুবাইয়াত হোসেনের চতুর্থ পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র
‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ রুবাইয়াত হোসেনের চতুর্থ পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। বাংলাদেশ, ফ্রান্স, পর্তুগাল, নরওয়ে ও জার্মানির যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত ছবিটির গল্প ঢাকার এক হবু কনেকে ঘিরে।
বিয়ের প্রস্তুতি, সৌন্দর্যচর্চা, পারিবারিক প্রত্যাশা ও সামাজিক নিয়মের মধ্যে এক নারীর শরীর ও মনের অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতাকে চলচ্চিত্রটিতে তুলে ধরা হয়েছে। বাস্তবতার সঙ্গে স্বপ্ন, ভয়, স্মৃতি ও অলৌকিকতার মিশেলে নারীর শরীর, ইচ্ছা, সৌন্দর্যবোধ এবং বিয়েকে ঘিরে সমাজে প্রচলিত নানা জটিল ও বৈষম্যমূলক রীতিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানো হয়েছে।
এর আগে ভেনিস ও টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও প্রদর্শিত হয়েছে সিনেমাটি। ফলে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনে আগেই আলোচনায় এসেছিল রুবাইয়াত হোসেনের এই নির্মাণ।
১ হাজার ৮৯২ সিনেমা থেকে নির্বাচিত ১৫টি
এবার টোকিও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে নির্বাচিত হয়েছে মোট ১৫টি চলচ্চিত্র। এসব চলচ্চিত্র ৩১টি দেশ ও অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব করছে।
উৎসবের প্রোগ্রামিং ডিরেক্টর ইচিয়ামা শোজো জানান, ১১২টি দেশ ও অঞ্চল থেকে জমা পড়া ১ হাজার ৮৯২টি চলচ্চিত্রের মধ্য থেকে প্রতিযোগিতা বিভাগের সিনেমাগুলো বাছাই করা হয়েছে।
এই বিভাগে রোমান্স, রাজনীতি, ভৌতিকতা, প্রকৃতি এবং সামাজিক সংঘাতসহ বিভিন্ন বিষয় ও ঘরানার চলচ্চিত্র স্থান পেয়েছে। বাংলাদেশের ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’-এর পাশাপাশি আর্জেন্টিনা, রোমানিয়া, ইতালি, সিঙ্গাপুর, পর্তুগাল, ইরান, সার্বিয়া, ইন্দোনেশিয়া, চীন ও উত্তর মেসিডোনিয়ার চলচ্চিত্রও রয়েছে।
২৬ অক্টোবর শুরু, চলবে ৪ নভেম্বর পর্যন্ত
টোকিও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ৩৯তম আসর শুরু হবে আগামী ২৬ অক্টোবর। চলবে ৪ নভেম্বর পর্যন্ত। ১০ দিনের এই আয়োজনে টোকিওর হিবিয়া, ইউরাকুচো, মারুনোউচি ও গিনজা এলাকা ঘিরে বসবে চলচ্চিত্রের বড় এই আয়োজন।
এবার উৎসবে ২০০টির বেশি চলচ্চিত্র ও সংশ্লিষ্ট অনুষ্ঠান থাকছে। মোট ২০৪টি চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হবে, যা গত বছরের ১৮৪টি চলচ্চিত্রের তুলনায় বেশি।
এবারের উৎসবের থিম ‘সংযোগ—চলচ্চিত্র আমাদের বাইরের বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত করে’। উৎসবের উদ্বোধনী রেড কার্পেট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে হিবিয়া-নাকাদোরি অ্যাভিনিউতে।
উদ্বোধনী ও সমাপনী সিনেমাতেও বৈচিত্র্য
এবারের উৎসবের উদ্বোধনী চলচ্চিত্র হিসেবে থাকছে তাকাহিসা জেজের ‘সুকিয়াকি’। সিনেমাটিতে বিলবোর্ড চার্টজয়ী একটি ঐতিহাসিক গানের পেছনের গল্প তুলে ধরা হয়েছে।
সমাপনী চলচ্চিত্র হিসেবে প্রদর্শিত হবে ইয়োন সাং-হোর কোরিয়ান জম্বি থ্রিলার ‘কলোনি’। আর সেন্টারপিস হিসেবে থাকছে ইয়ামাজাকি তাকাশির ‘গডজিলা মাইনাস জিরো’।
এবার উৎসবে নতুন পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব হিসামাৎসু তাকেও। জাপানি ও এশীয় নির্মাতাদের আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরা এবং নারী নির্মাতাদের বৈশ্বিক যাত্রাকে আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।
বাংলাদেশের জন্য ঐতিহাসিক উপস্থিতি
টোকিও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের প্রায় চার দশকের ইতিহাসে মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের কোনো চলচ্চিত্রের অংশগ্রহণ দেশের চলচ্চিত্রাঙ্গনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’-এর এই নির্বাচনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক দর্শকদের সামনে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নির্মাণের একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে নারীর শরীর, ব্যক্তিস্বাধীনতা, সামাজিক প্রত্যাশা ও বিয়েকে ঘিরে প্রচলিত রীতিনীতির মতো বিষয়কে কেন্দ্র করে নির্মিত চলচ্চিত্রটির আন্তর্জাতিক উৎসবযাত্রা বাংলাদেশের স্বাধীনধারার সিনেমার জন্যও নতুন আগ্রহ তৈরি করেছে।
এবারের টোকিও উৎসবে মূল প্রতিযোগিতার পাশাপাশি ‘এশিয়ান ফিউচার’, অ্যানিমেশন, ‘নিপ্পন সিনেমা নাউ’, ‘গালা সিলেকশন’, ‘ক্রসকাট এশিয়া প্লাস’, ‘উইমেনস এমপাওয়ারমেন্ট’, ‘ইউথ’, ‘ওয়ার্ল্ড ফোকাস’ ও ‘জাপানিজ ক্লাসিকস’সহ বিভিন্ন বিভাগ থাকছে।
চলচ্চিত্র প্রদর্শনের পাশাপাশি থাকছে মাস্টারক্লাস, আলোচনা, পুরস্কার ও চলচ্চিত্রবিষয়ক নানা আয়োজন। ২৮ থেকে ৩০ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হবে চলচ্চিত্র ও অডিওভিজ্যুয়াল কনটেন্টের বাজার টিফকম।
সব মিলিয়ে এবারের টোকিও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশের ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’-এর উপস্থিতি দেশের চলচ্চিত্রের আন্তর্জাতিক যাত্রায় একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হয়ে উঠেছে।
কালের আলো/এসএ
আপনার মতামত লিখুন
Array