বিসিএস ৬১১-এর পর ৪৬, প্রজ্ঞাপন সোমবার
৪৯তম বিসিএসের বিশেষ শিক্ষা ক্যাডারে নিয়োগ নিয়ে কয়েক দিনের ধোঁয়াশার মধ্যে এবার সময়সীমা দিল সরকার। বাকি ৪৬ জনের নিয়োগের প্রজ্ঞাপন আগামী সোমবার (৫ অক্টোবর) জারি করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। একই সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কোনো প্রার্থীর নিয়োগে বৈষম্য করা হবে না বলেও স্পষ্ট করেছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে সমসাময়িক বিষয়ে আয়োজিত জরুরি প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এ সময় জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী ও মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনি উপস্থিত ছিলেন।
- সুপারিশপ্রাপ্তদের নিয়োগ নিয়ে সরকারের বড় সিদ্ধান্ত
- রাজনৈতিক পরিচয়ে বৈষম্য নয়
- ভেরিফিকেশন হবে বিধি অনুযায়ী
এক ঘোষণায় বদলে গেল অপেক্ষার চিত্র
নিয়োগপ্রত্যাশীদের অপেক্ষার কেন্দ্রে এখন একটি তারিখ—৫ অক্টোবর। প্রথম দফায় ৬১১ জনের প্রজ্ঞাপনের পর বাকি প্রার্থীদের নিয়ে নানা আলোচনা চলছিল। কেউ বাদ পড়েছেন কেন, নিয়োগপ্রক্রিয়া কোথায় আটকে আছে এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের কোনো প্রভাব পড়েছে কি না—এসব প্রশ্ন ঘুরছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। সেই পরিস্থিতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘোষণা সব সমস্যার কার্যকর সমাধান দিয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বাকি ৪৬ জনের প্রজ্ঞাপন সোমবার (৫ অক্টোবর) জারি হবে।
তবে এই প্রক্রিয়াকে শুধু একটি তারিখ ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি মন্ত্রী। প্রজ্ঞাপনের আগে প্রশাসনিক কিছু ধাপ সম্পন্ন করার কথা জানিয়ে তিনি বলেছেন, ফাইল রাষ্ট্রপতি পর্যন্ত যাওয়ার প্রক্রিয়া রয়েছে। তাই এ বিষয়ে ধৈর্য ধরতে হবে। অর্থাৎ সিদ্ধান্তের পাশাপাশি প্রজ্ঞাপন প্রকাশের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়াটিও সরকারের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে।
সংখ্যার বিষয়ে মন্ত্রীর বক্তব্য
৪৯তম বিসিএসের নিয়োগ নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে সংখ্যা ঘিরে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই এ বিষয়ে ছড়ানো তথ্যের প্রসঙ্গ তুলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘পিএসসি থেকে ৬৬৮ জনকে সুপারিশ করার কথা থাকলেও প্রকৃত সংখ্যা ছিল ৬৫ জন—এমন বিভ্রান্তিকর তথ্যও ছড়িয়েছে। পরে যাচাইয়ে ৬৫৭ জনের বিষয়টি আসে। তাদের মধ্যে ৬১১ জনের প্রজ্ঞাপন ইতোমধ্যে জারি হয়েছে। বাকি ৪৬ জনের প্রজ্ঞাপনও নির্ধারিত প্রক্রিয়া শেষে জারি করা হবে।’ নিয়োগসংক্রান্ত সংখ্যাগুলো নিয়ে বিভিন্ন ধরনের তথ্য সামনে আসার প্রেক্ষাপটে মন্ত্রীর এই বক্তব্যই বৃহস্পতিবারের ব্রিফিংয়ে সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া সর্বশেষ ব্যাখ্যা। এখন সেই বক্তব্যের সবচেয়ে দৃশ্যমান বিষয় হলো—৬১১ জনের পর ৪৬ জনের প্রজ্ঞাপন।
রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে ‘না’
নিয়োগপ্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাব নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, সেটি সরাসরি নাকচ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক পরিচয় যেটিই হোক, নিয়োগ বা পরীক্ষার ক্ষেত্রে সে কারণে কারও প্রতি বৈষম্য করা হবে না।’ সরকারের এই অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে মূলত নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে তৈরি হওয়া প্রশ্নের কারণে। কোনো প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচয় তাঁর নিয়োগের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলবে না—মন্ত্রী প্রকাশ্যেই এমন নিশ্চয়তা দিয়েছেন। ফলে এখন নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে প্রযোজ্য বিধি, যোগ্যতা এবং বাধ্যতামূলক যাচাইপ্রক্রিয়াই প্রাসঙ্গিক—মন্ত্রীর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সেটিই স্পষ্ট হয়েছে।
ভেরিফিকেশন থাকবে, রাজনৈতিক ছাঁকনি নয়
তবে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে বৈষম্য না করার ঘোষণা মানে নিয়োগের আগে যাচাই বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়। বরং পুলিশ ভেরিফিকেশনকে নিয়মিত ও বাধ্যতামূলক প্রক্রিয়া হিসেবে উল্লেখ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কারও বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ বা আদালতে দণ্ডের বিষয় থাকলে বিধি অনুযায়ী তা যাচাই করা হবে। কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই।
এই জায়গাটিই এদিনের বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ দিক। রাজনৈতিক পরিচয় এবং অপরাধসংক্রান্ত যাচাইকে এক কাতারে না রেখে আলাদা করে দেখিয়েছে সরকার। একজন প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচয় কী—সেটি নিয়োগে বৈষম্যের কারণ হতে পারবে না। অন্যদিকে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ বা আদালতের দণ্ড থাকলে সেটি বিধি অনুযায়ী যাচাইয়ের আওতায় আসবে।
‘সব সরকারের সময়ই ভেরিফিকেশন’
পুলিশ ভেরিফিকেশন নিয়ে চলমান আলোচনার মধ্যেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘ভেরিফিকেশন সব সরকারের সময়ই বিধি অনুযায়ী হয়ে থাকে।’ বর্তমানে ভেরিফিকেশনের কারণে কারও নিয়োগ হচ্ছে না—এমন ধারণা করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি বলেও জানান তিনি। তবে কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগের কারণে নিয়োগ না হলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ বা আবেদন করার সুযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী। অর্থাৎ কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি থাকলে প্রশাসনিকভাবে সেটি জানানোর সুযোগও থাকছে।
এখন আর গুজব নয়, সোমবারই বড় পরীক্ষা
নিয়োগপ্রক্রিয়াকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা তথ্য ছড়ানোয় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। এ অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উত্তেজনা সৃষ্টি না করার আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। একই সঙ্গে অপতথ্য বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে শিক্ষার্থীদের উত্তেজিত না করার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি। সরকারের ঘোষণার পর এখন আলোচনার কেন্দ্রও বদলে গেছে। সময় নির্ধারিত হয়েছে ৫ অক্টোবর। আর অবস্থানও স্পষ্ট করা হয়েছে—রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে বৈষম্য করা হবে না; পুলিশ ভেরিফিকেশন হবে বিধি অনুযায়ী।
এখন সেই অবস্থানের বাস্তব প্রয়োগ দেখা যাবে প্রজ্ঞাপনে। ৪৬ জনের নিয়োগের ঘোষণা বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘ অপেক্ষার একটি বড় অংশের অবসান ঘটবে। একই সঙ্গে নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে যে প্রশ্নগুলো উঠেছে, সেগুলোরও অনেকটা পরিষ্কার হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। তাই ৫ অক্টোবর শুধু আরেকটি প্রশাসনিক তারিখ নয়; ৪৯তম বিসিএসের নিয়োগ নিয়ে সরকারের ঘোষিত অবস্থান বাস্তবে প্রতিফলিত হওয়ার দিনও।
কালের আলো/এমএএএমকে

আপনার মতামত লিখুন
Array