খুঁজুন
                               
, ,
           

জুলাই-আগস্টের ভ্যাট রিটার্নে এনবিআরের সময় বাড়ল

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:১৬ অপরাহ্ণ
জুলাই-আগস্টের ভ্যাট রিটার্নে এনবিআরের সময় বাড়ল

চলতি অর্থবছরের জুলাই ও আগস্ট কর মেয়াদের অনলাইন ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা বাড়িয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত কোনো ধরনের জরিমানা ছাড়াই এসব কর মেয়াদের ভ্যাট রিটার্ন দাখিল করতে পারবেন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো।

বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) এনবিআরের ভ্যাট মনিটরিং, পরিসংখ্যান ও সমন্বয় শাখার জারি করা এক আদেশে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

আদেশে বলা হয়েছে, জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭-এর ভ্যাট রিটার্নসংক্রান্ত সংশোধিত বিধান অনুযায়ী, প্রতি তিন কর মেয়াদ শেষে রিটার্ন দাখিলের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এ কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান জুলাই ও আগস্ট কর মেয়াদের ভ্যাট রিটার্ন দাখিল করেনি।

এ পরিস্থিতিতে মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২-এর ৬৪ ধারার উপধারা (৩)-এ দেওয়া ক্ষমতাবলে রিটার্ন জমা না দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে। নির্ধারিত বর্ধিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ওপর কোনো জরিমানা আরোপ করা হবে না।

এনবিআরের আদেশে আরও বলা হয়েছে, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগামী ১৫ অক্টোবরের মধ্যে জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর—এই তিন কর মেয়াদের ভ্যাট রিটার্ন সিস্টেমে দাখিল করতে হবে।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি 

সাত বছর কারাগারে, পরিচয় ছিল ৪৫৩৩—তারপর হলেন চিকিৎসক

ফিচার ডেস্ক, কালের আলো
প্রকাশিত: শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৩৮ অপরাহ্ণ
সাত বছর কারাগারে, পরিচয় ছিল ৪৫৩৩—তারপর হলেন চিকিৎসক

পঞ্চম শ্রেণি থেকে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ওঠার পরীক্ষায় তিন বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছিলেন। শাস্তি হিসেবে বাবা তাঁকে পাঠিয়ে দেন কাঠমিস্ত্রির কাজে। আড়াই মাস কাজ করার পর পায়ে পেরেক ঢুকে যাওয়ার যন্ত্রণা সইতে না পেরে বাবাকে কথা দিয়েছিলেন, মন দিয়ে পড়াশোনা করবেন। সেই প্রতিশ্রুতি থেকেই শুরু হয় জীবনের নতুন অধ্যায়। একসময় মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগও পান। কিন্তু চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন পূরণের আগেই নেমে আসে ভয়াবহ বিপর্যয়। খুনের মামলায় দণ্ডিত হয়ে কাটাতে হয় সাত বছর কারাগারে।

কারাগারে নাম হারিয়ে পরিচয় হয়ে যায় একটি সংখ্যা—৪৫৩৩। জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় পেরিয়ে সেই মানুষই আবার ফিরে আসেন পড়াশোনায়। ১৯৯১ সালে পূরণ করেন চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন। আর জীবনের ৭২ বছর বয়সে নতুন পরিচয় যোগ হয় তাঁর নামের পাশে—বাংলাদেশ বেতারের তালিকাভুক্ত আধুনিক গানের শিল্পী।

রাজশাহীর শরীফ আহমেদ খানের জীবন যেন বারবার ভেঙে পড়েও উঠে দাঁড়ানোর এক ব্যতিক্রমী গল্প। কাঠমিস্ত্রির কাজ থেকে চিকিৎসক, কারাবন্দি থেকে লেখক, আর চিকিৎসক পরিচয়ের পাশাপাশি সংগীতশিল্পী—তাঁর জীবনের প্রতিটি বাঁকেই রয়েছে সংগ্রাম, বেদনা আর নতুন করে শুরু করার সাহস।

কাঠমিস্ত্রির কাজে পাঠিয়েছিলেন বাবা
রাজশাহীর হাই মাদ্রাসা, বর্তমানে হাজী মুহম্মদ মুহসীন উচ্চবিদ্যালয়ে পড়তেন শরীফ আহমেদ খান। পঞ্চম থেকে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ওঠার পরীক্ষায় তিন বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ার পর কঠোর স্বভাবের বাবা এমদাদ আলী খান তাঁকে কাঠমিস্ত্রির কাজে লাগিয়ে দেন।

আড়াই মাস কাজ করার পর একদিন পায়ে ঢুকে যায় পেরেক। যন্ত্রণায় কাতর শরীফ বাবার কাছে গিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, কাঠমিস্ত্রির কাজ আর করতে পারবেন না। এবার থেকে মন দিয়ে লেখাপড়া করবেন।

ছেলের কথায় আবার তাঁকে বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দেন বাবা। পড়াশোনার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে নিয়োগ করেন গৃহশিক্ষকও। এরপর বদলে যেতে থাকে শরীফের ফলাফল। মানবিক বিভাগ থেকে এসএসসি পাস করে রাজশাহী কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৭২ সালে এইচএসসি পরীক্ষাতেও ভালো ফল করেন।

এরপর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত রসায়ন বিভাগে দুই বছর পড়াশোনা করেন। কিন্তু তাঁর মনে তখন অন্য স্বপ্ন—চিকিৎসক হওয়া। সেই লক্ষ্য নিয়ে মেডিকেল কলেজে ভর্তির পরীক্ষা দেন এবং সুযোগও পেয়ে যান।

মায়ের সোনার দুলে শুরু চিকিৎসক হওয়ার যাত্রা
চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন পূরণের পথে এবার বাধা হয়ে দাঁড়ায় পারিবারিক সংকট। শরীফদের পরিবারে ছিলেন ১০ ভাইবোন। ছোট ভাইয়ের জন্মকে কেন্দ্র করে বাবা-মায়ের মধ্যে বিরোধ বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করে আলাদা হয়ে যান। সংসারের ভার এসে পড়ে মা রোকেয়া বেগমের ওপর।

এর মধ্যে জন্মের ৪০ দিনের মাথায় ধনুষ্টংকারে মারা যায় ছোট ভাই। সংসারের আর্থিক সংকটে শরীফের বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনাও শেষ হয়নি, আবার মেডিকেলে সুযোগ পেয়েও ভর্তি হওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

এমন পরিস্থিতিতে তাঁর মা সিদ্ধান্ত নেন, ছেলেকে চিকিৎসক হতেই হবে। নিজের একমাত্র সম্বল কানের সোনার দুলজোড়া বিক্রি করে দেন তিনি। সেই টাকা দিয়েই মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন শরীফ আহমেদ খান। মায়ের এই ত্যাগ তাঁর জীবনের অন্যতম বড় প্রেরণা হয়ে থাকে। কিন্তু চিকিৎসক হওয়ার পথে যে আরও বড় বিপর্যয় অপেক্ষা করছিল, তা তখনো জানতেন না তিনি।

সিনেমা দেখে ফেরার পথে বদলে গেল জীবন
১৯৭৮ সালে পাঁচ বন্ধুর সঙ্গে সিনেমা দেখতে গিয়েছিলেন শরীফ। ফেরার পথে এক তরুণের সঙ্গে তাঁদের তর্কবিতর্ক ও ঝামেলা হয়। এলাকার লোকজন এসে বিষয়টি মীমাংসাও করে দেন। কিন্তু ওই রাতেই খুন হন সেই তরুণ। আগের বিরোধের সূত্র ধরে খুনের মামলায় প্রধান আসামি করা হয় শরীফকে।

এরই মধ্যে এমবিবিএসের চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন তিনি। একটি বিষয়ে পাস করলেও বাকি তিন বিষয়ে অকৃতকার্য হন। এরপর ১৯৮৪ সালে সামরিক আদালতের সাজায় কারাগারে যেতে হয় তাঁকে। থমকে যায় চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন, অনিশ্চিত হয়ে পড়ে সংসার ও ভবিষ্যৎ। কারাগারে গিয়ে নিজের নাম-পরিচয়ের বদলে হয়ে যান একটি সংখ্যা—৪৫৩৩। বন্দিদের গণনার সময় এই নম্বরেই ডাকা হতো তাঁকে।

কারাগারের জীবন ছিল কঠিন। ঘুমানোর জন্য অল্প জায়গা, দুটি কম্বল, খাওয়ার জন্য থালা-বাটি—প্রয়োজনীয় অনেক কিছুরই অভাব ছিল। গাদাগাদি করে থাকার মধ্যে শারীরিক সমস্যারও মুখোমুখি হন তিনি। একসময় মনে হয়েছিল, জীবনে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।

শরীফের ভাষ্য অনুযায়ী, যে ব্যক্তিকে হত্যার মামলায় তাঁকে আসামি করা হয়েছিল, তিনি ছিলেন এলাকার পরিচিত সন্ত্রাসী। প্রতিপক্ষের লোকজন তাঁকে হত্যা করেছিল বলে দাবি করেন শরীফ। সিনেমা দেখে ফেরার পথে তাঁদের মধ্যে বিরোধ হলেও তা মিটে গিয়েছিল। পরে একই রাতে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তাঁকে মামলায় জড়ানো হয়। সামরিক আদালতে একতরফাভাবে সাজা দেওয়া হয়েছিল বলেও তাঁর দাবি।

কারাগারে বই হয়ে উঠল বেঁচে থাকার অবলম্বন
দীর্ঘ কারাজীবনের হতাশা যখন তাঁকে গ্রাস করছিল, তখন এক কর্নেলের একটি পরামর্শ নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। কারাগার পরিদর্শনে এসে ওই কর্মকর্তা তাঁকে বলেছিলেন, জীবনের এই সময়টিকে জীবনেরই একটি অংশ হিসেবে মেনে নিতে। কথাটি গভীরভাবে নাড়া দেয় শরীফকে। তিনি বই পড়া শুরু করেন। বাংলার পাশাপাশি উর্দু ভাষার বই পড়ার আগ্রহ থেকে উর্দুও শিখে নেন। বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন জীবনে বই হয়ে ওঠে তাঁর নতুন আশ্রয়।

কারাগারের দেয়াল তাঁকে আটকে রাখলেও জ্ঞানের জগতে প্রবেশের পথ বন্ধ করতে পারেনি। বই পড়তে পড়তে সময় কাটানোর পাশাপাশি মানসিকভাবে টিকে থাকার শক্তিও খুঁজে পান তিনি। ১৯৯০ সালে গণ-অভ্যুত্থানের পর এরশাদ সরকারের পতন ঘটে। পরবর্তী সময়ে মার্শাল ল কোর্টের দণ্ড বাতিল হলে সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মুক্তির সুযোগ তৈরি হয়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন শরীফ আহমেদ খানও। সাত বছরের কারাজীবন শেষে ১৯৯১ সালে মুক্তি পান তিনি।

সাত বছর পর ফিরে এল চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন
কারাগার থেকে বেরিয়ে শরীফ যোগাযোগ করেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজে। এমবিবিএসের চূড়ান্ত পরীক্ষার বাকি বিষয়গুলো দেওয়ার সুযোগ পাবেন কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। বিষয়টি কলেজের সিন্ডিকেটের সভায় ওঠে। সেখানে দেখা যায়, পরীক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর একাডেমিক কোনো বাধা নেই। এরপর বাকি পরীক্ষাগুলো দিয়ে পাস করেন শরীফ। দীর্ঘ বিরতি, কারাবাস ও জীবনের নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে ১৯৯১ সালে অবশেষে পূরণ হয় চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন।

তবে তত দিনে জীবনের অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে। সরকারি চাকরিতে আবেদনের বয়সও আর অবশিষ্ট ছিল না। ফলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি ও ব্যক্তিগতভাবে চিকিৎসাসেবা দিয়ে পেশাজীবন এগিয়ে নেন তিনি। একসময় একটি বেসরকারি সংস্থা থেকে চিকিৎসক হিসেবে অবসরও নেন।

শরীফ আহমেদ খানের বয়স এখন ৭৪ বছর। রাজশাহী নগরের শেখপাড়া মহল্লায় বসবাস করেন তিনি। জীবনের এই দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল যাত্রা নিয়ে লিখেছেন আত্মজীবনী। নাম দিয়েছেন ‘পঁয়তাল্লিশ তেঁত্রিশ’—কারাগারে তাঁর পরিচয় হয়ে ওঠা সেই সংখ্যারই স্মারক।

৭২ বছর বয়সে বেতারের তালিকাভুক্ত শিল্পী
চিকিৎসক পরিচয়ের বাইরেও শরীফের রয়েছে আরেকটি জগৎ—সংগীত। তিনি গান লেখেন, সুর করেন। জীবনের অভিজ্ঞতা, দীর্ঘ কারাবাসের বেদনা ও ভেতরে জমে থাকা ক্ষত তাঁর সৃষ্টিতে জায়গা পেয়েছে।

৭২ বছর বয়সে বাংলাদেশ বেতারের অডিশনে অংশ নিয়ে তালিকাভুক্ত আধুনিক গানের শিল্পী হন তিনি। জীবনের এতটা পথ পেরিয়ে নতুন একটি পরিচয় অর্জন করা তাঁর গল্পকে আরও ব্যতিক্রমী করে তুলেছে।

কারাজীবনের যন্ত্রণা তাঁর লেখা গানের কয়েকটি পঙ্‌ক্তিতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে—
‘আমি নর্দমায় পড়া এক অসহায় নিরেট
যেন সুকান্তের ছুড়ে ফেলা এক পরিত্যক্ত সিগারেট।
আমি রাতজাগা কুকুর চিৎকার করে উঠি—সব আছে ঠিক
আমি পঁয়তাল্লিশ তেঁত্রিশ এক পরাজিত সৈনিক।’

গানের এই পঙ্‌ক্তিগুলোয় যেন ফিরে আসে কারাগারের সেই দিনগুলো, যখন নামের বদলে একটি সংখ্যা ছিল তাঁর পরিচয়। সেই পরিচয়কে মুছে ফেলতে পারেনি সময়; বরং সেটিকেই আত্মজীবনীর নামে ধারণ করেছেন তিনি।

হারানো সময় পেরিয়ে নতুন পরিচয়ের গল্প
শরীফ আহমেদ খানের জীবনকে কেবল একজন চিকিৎসক হওয়ার গল্পে সীমাবদ্ধ করা যায় না। শৈশবে কাঠমিস্ত্রির কাজে যাওয়া, মায়ের সোনার দুল বিক্রি করে মেডিকেলে ভর্তি হওয়া, খুনের মামলায় সাত বছর কারাবাস, মুক্তির পর আবার পরীক্ষায় বসা—প্রতিটি অধ্যায়ই তাঁর জীবনের আলাদা সংগ্রামের সাক্ষী।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গান লেখা, সুর করা এবং জীবনের ৭২ বছর বয়সে বেতারের শিল্পী হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার অভিজ্ঞতা। যে মানুষ একসময় কারাগারে একটি সংখ্যায় পরিণত হয়েছিলেন, তিনিই পরে নিজের নামের পাশে যুক্ত করেছেন একাধিক পরিচয়।

জীবনের সব বাধা যে মুছে গেছে, তা নয়। হারানো সময় আর কারাবাসের স্মৃতি তাঁর জীবনের অংশ হয়েই রয়েছে। তবু সেই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই নিজের জন্য নতুন পথ তৈরি করেছেন শরীফ আহমেদ খান। তাঁর গল্প মনে করিয়ে দেয়, জীবনের কোনো অধ্যায়ই সব সম্ভাবনার শেষ কথা নয়; কখনো কখনো দীর্ঘ বিরতির পরও নতুন করে শুরু করা সম্ভব।

কালের আলো/এমএসআইপি/জেএন

ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে বড় ধাক্কা

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশিত: শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, ১:২৬ অপরাহ্ণ
ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে বড় ধাক্কা

পোশাকের দাম কমিয়েও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে রপ্তানি আয় ধরে রাখতে পারছে না বাংলাদেশ। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় কমেছে ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ। একই সময়ে প্রতি কেজি পোশাকের দাম কমানোর পাশাপাশি রপ্তানির পরিমাণও কমেছে। এতে দেশের তৈরি পোশাক খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইইউর পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছিল ১ হাজার ৩৫০ কোটি ৪৫ লাখ ইউরো। চলতি বছরের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৯২ কোটি ৮০ লাখ ইউরোতে। অর্থাৎ আট মাসে রপ্তানি আয় কমেছে প্রায় ১৫৭ কোটি ৬৫ লাখ ইউরো।

দাম কমিয়েও বাড়েনি রপ্তানি
রপ্তানি আয় ধরে রাখতে বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা পোশাকের গড় দাম কমিয়েছেন। গত বছরের প্রথম আট মাসে প্রতি কেজি পোশাকের গড় দাম ছিল ১৪ দশমিক ৮৭ ইউরো। চলতি বছরের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৭৬ ইউরোতে। অর্থাৎ প্রতি কেজিতে দাম কমেছে ৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ। তবে দাম কমানোর পরও রপ্তানির পরিমাণ বাড়েনি। বরং গত বছরের জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে ইউরোপে বাংলাদেশ ৯০ কোটি ৮৩ লাখ ৭০ হাজার কেজি পোশাক রপ্তানি করেছিল। চলতি বছরের একই সময়ে রপ্তানির পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে ৮৬ কোটি ৬৭ লাখ ৬০ হাজার কেজিতে। এতে রপ্তানির পরিমাণ কমেছে ৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ।

বিশ্ববাজারে মন্দা, বাংলাদেশের পতন বেশি
চলতি বছরের প্রথম আট মাসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের তৈরি পোশাক আমদানির মোট মূল্য কমেছে ৩ দশমিক ৮৩ শতাংশ। আমদানির পরিমাণ কমেছে ২ দশমিক ৫৭ শতাংশ। অর্থাৎ ইউরোপের বাজারে সামগ্রিকভাবে পোশাকের চাহিদা ও আমদানি কমেছে। তবে বৈশ্বিক আমদানি মূল্য কমার তুলনায় বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের পতন অনেক বেশি।

ইউরোপের বাজারে সবচেয়ে বড় পোশাক সরবরাহকারী চীনের রপ্তানি আয় বেড়েছে ২ দশমিক ৩৮ শতাংশ। পঞ্চম বৃহত্তম সরবরাহকারী ভিয়েতনামের আয় বেড়েছে ৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ। দেশটি পোশাকের গড় দামও বাড়িয়েছে ১০ দশমিক ১১ শতাংশ। অন্যদিকে তৃতীয় বৃহত্তম সরবরাহকারী তুরস্কের রপ্তানি আয় কমেছে ১১ দশমিক ০২ শতাংশ। চতুর্থ অবস্থানে থাকা ভারতের আয় কমেছে ১০ দশমিক ৮৪ শতাংশ। এ ছাড়া কম্বোডিয়ার রপ্তানি আয় কমেছে ৪ দশমিক ৫১ শতাংশ, পাকিস্তানের ৯ দশমিক ৬৩ শতাংশ, মরক্কোর ৬ দশমিক ১০ শতাংশ, শ্রীলঙ্কার ১১ দশমিক ১২ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ার ১১ দশমিক ০৩ শতাংশ।

বাংলাদেশ এখনো ইউরোপীয় ইউনিয়নের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক সরবরাহকারী দেশ। তবে চীন ও ভিয়েতনামের রপ্তানি আয় বাড়লেও বাংলাদেশের আয় কমেছে। ফলে ইউরোপের বাজারে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের ব্যবধান আরও বেড়েছে।

কম দামের কৌশল কেন কাজে আসছে না
ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের গড় দাম এখনো ভিয়েতনাম, তুরস্ক ও ভারতের তুলনায় কম। এমনকি ইউরোপীয় ইউনিয়নে সব দেশ থেকে আমদানি করা পোশাকের গড় দামও বাংলাদেশের পোশাকের চেয়ে বেশি। এরপরও কম দাম দিয়ে বাজার ধরে রাখার কৌশল প্রত্যাশিত ফল দিচ্ছে না।

এ বিষয়ে এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ও নিট তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের আমদানি ও চাহিদা কমে যাওয়ায় ক্রেতারা দাম কমানোর সুযোগ নিচ্ছেন। অন্য দেশগুলোও কম দামে পোশাক সরবরাহ করে বাজার ধরে রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের পক্ষে অনির্দিষ্টকাল দাম কমিয়ে ব্যবসা চালানো সম্ভব নয়। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অনিশ্চয়তার কারণে চীন ইউরোপের বাজারে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে এবং আক্রমণাত্মক দামে পোশাক সরবরাহ করছে। চীনের সঙ্গে এই অসম প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের মতো রপ্তানিনির্ভর দেশের উদ্যোক্তাদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।

গ্যাস-বিদ্যুৎ ও ব্যাংকিং সংকটে উৎপাদন ব্যাহত
দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলোও তৈরি পোশাক খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে প্রভাবিত করছে বলে মনে করেন ফজলুল হক। তাঁর মতে, ব্যাংকিং খাতের জটিলতা এবং কারখানায় গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে স্বাভাবিক উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এতে অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমে যাচ্ছে।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, পোশাকের নকশা ও ধরনে বৈচিত্র্য আনা, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং ব্যাংকঋণের সুদের হার কমানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। পাশাপাশি রপ্তানিমুখী শিল্পে আর্থিক ও নীতিগত সহায়তা জোরদারের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন। ফজলুল হক সতর্ক করে বলেন, আগামী দিনে শ্রমিকদের মজুরি পুনর্বিন্যাসসহ আরও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ আসতে পারে। তাই তৈরি পোশাক খাতের সক্ষমতা বাড়াতে এখন থেকেই সমন্বিত প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।

বাজারে পুনরুদ্ধারের আভাস, তবে রয়েছে শঙ্কা
তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক এবং বাংলাদেশ অ্যাপারেল এক্সচেঞ্জ (বিএএই) ও বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের (বিএভি) প্রধান নির্বাহী মো. মহিউদ্দিন রুবেল মনে করেন, বছরের শুরুতে ইউরোপের বাজারে রপ্তানি আয় কমার যে প্রবণতা ছিল, জুলাই-আগস্টে তা কিছুটা কমেছে।

বিএভির পর্যালোচনা তুলে ধরে তিনি জানান, জানুয়ারি-এপ্রিল সময়ে আমদানি প্রায় ১০ শতাংশ কমেছিল। তবে সংস্থাটির হিসাবে, মে-আগস্ট সময়ে ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় আমদানি প্রায় ২ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে। তাঁর মতে, বছরের মাঝামাঝি সময়ে বাজারে ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত মিলেছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ আরও তীব্র ও বিস্তৃত হলে এই পুনরুদ্ধার বাধাগ্রস্ত হতে পারে। মহিউদ্দিন রুবেলের আশঙ্কা, যুদ্ধের প্রভাব দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির পাশাপাশি বৈশ্বিক পোশাকবাজারেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।  ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি খাত একদিকে বৈশ্বিক চাহিদা হ্রাস, অন্যদিকে উৎপাদন ব্যয় ও প্রতিযোগিতার চাপে রয়েছে। বাজার ধরে রাখতে শুধু দাম কমানো নয়, উৎপাদনশীলতা, পণ্যের বৈচিত্র্য এবং নীতিগত সহায়তা বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি

শিম চাষে বাম্পার ফলনের আশা, লাভের অপেক্ষায় কৃষক

হবিগঞ্জ সংবাদদাতা,কালের আলো
প্রকাশিত: শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, ১:১০ অপরাহ্ণ
শিম চাষে বাম্পার ফলনের আশা, লাভের অপেক্ষায় কৃষক

হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলায় শিম চাষে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। অনুকূল আবহাওয়া, রোগবালাইয়ের তুলনামূলক কম উপদ্রব এবং সন্তোষজনক বাজারদরে চলতি মৌসুমে ভালো লাভের স্বপ্ন দেখছেন স্থানীয় কৃষকেরা। উপজেলার বিভিন্ন এলাকার শিমক্ষেত এখন সবুজ গাছে ও সাদা ফুলে ভরে উঠেছে। গাছে গাছে শিমের উপস্থিতিতে ফলন নিয়েও আশাবাদী চাষিরা। উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে মাধবপুরে প্রায় ২৮০ হেক্টর জমিতে শিমের আবাদ হয়েছে। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে এ পরিমাণ ১০ হেক্টর বেশি। মাঠের বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রাও ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

সবুজ শিমক্ষেতে ব্যস্ত কৃষকেরা
উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, শিমগাছের পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকেরা। লতানো গাছে ঝুলছে শিম, ফুটেছে সাদা ফুল। ফসল ঘরে তোলার আগে গাছের যত্ন নিতে বাড়তি মনোযোগ দিচ্ছেন তাঁরা। অনুকূল আবহাওয়া এবং রোগবালাইয়ের উপদ্রব কম থাকায় এবার ফলন ভালো হওয়ার আশা করছেন চাষিরা। কৃষকদের প্রত্যাশা, মাঠের বর্তমান অবস্থা শেষ পর্যন্ত বজায় থাকলে উৎপাদন ভালো হবে। একই সঙ্গে বাজারে বর্তমান দাম ধরে রাখা গেলে শিম বিক্রি করে কাঙ্ক্ষিত আয় করা সম্ভব হবে।

কেজি ১০০ থেকে ১২০ টাকা
জগদীশপুর এলাকার শিমচাষি সাইফুল ইসলাম জানান, বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি শিম ১০০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এই দাম অব্যাহত থাকলে শিম চাষ করে ভালো লাভের আশা করছেন তিনি।তবে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগও রয়েছে কৃষকদের মধ্যে। সাইফুল ইসলাম বলেন, সার, বীজ ও শ্রমিকের খরচ আগের তুলনায় বেড়েছে। ফলে ভালো ফলন হওয়ার পাশাপাশি শেষ পর্যন্ত ন্যায্যমূল্য পাওয়াও জরুরি।

আবাদ বেড়েছে, এখন উৎপাদনের প্রত্যাশা
কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১০ হেক্টর বেশি জমিতে শিম চাষ হওয়ায় চলতি মৌসুমে উৎপাদন বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে ফলন ও আয় শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে আবহাওয়া, ফসলের পরিচর্যা এবং বাজারদরের ওপর।
মাধবপুরের শিমচাষিদের মধ্যে এখন আশার সঞ্চার হয়েছে। ফলন ভালো হওয়া এবং বাজারে ন্যায্য দাম পাওয়া গেলে চলতি মৌসুম তাঁদের জন্য লাভজনক হয়ে উঠতে পারে।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি