পঞ্চম শ্রেণি থেকে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ওঠার পরীক্ষায় তিন বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছিলেন। শাস্তি হিসেবে বাবা তাঁকে পাঠিয়ে দেন কাঠমিস্ত্রির কাজে। আড়াই মাস কাজ করার পর পায়ে পেরেক ঢুকে যাওয়ার যন্ত্রণা সইতে না পেরে বাবাকে কথা দিয়েছিলেন, মন দিয়ে পড়াশোনা করবেন। সেই প্রতিশ্রুতি থেকেই শুরু হয় জীবনের নতুন অধ্যায়। একসময় মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগও পান। কিন্তু চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন পূরণের আগেই নেমে আসে ভয়াবহ বিপর্যয়। খুনের মামলায় দণ্ডিত হয়ে কাটাতে হয় সাত বছর কারাগারে।
কারাগারে নাম হারিয়ে পরিচয় হয়ে যায় একটি সংখ্যা—৪৫৩৩। জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় পেরিয়ে সেই মানুষই আবার ফিরে আসেন পড়াশোনায়। ১৯৯১ সালে পূরণ করেন চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন। আর জীবনের ৭২ বছর বয়সে নতুন পরিচয় যোগ হয় তাঁর নামের পাশে—বাংলাদেশ বেতারের তালিকাভুক্ত আধুনিক গানের শিল্পী।
রাজশাহীর শরীফ আহমেদ খানের জীবন যেন বারবার ভেঙে পড়েও উঠে দাঁড়ানোর এক ব্যতিক্রমী গল্প। কাঠমিস্ত্রির কাজ থেকে চিকিৎসক, কারাবন্দি থেকে লেখক, আর চিকিৎসক পরিচয়ের পাশাপাশি সংগীতশিল্পী—তাঁর জীবনের প্রতিটি বাঁকেই রয়েছে সংগ্রাম, বেদনা আর নতুন করে শুরু করার সাহস।
কাঠমিস্ত্রির কাজে পাঠিয়েছিলেন বাবা
রাজশাহীর হাই মাদ্রাসা, বর্তমানে হাজী মুহম্মদ মুহসীন উচ্চবিদ্যালয়ে পড়তেন শরীফ আহমেদ খান। পঞ্চম থেকে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ওঠার পরীক্ষায় তিন বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ার পর কঠোর স্বভাবের বাবা এমদাদ আলী খান তাঁকে কাঠমিস্ত্রির কাজে লাগিয়ে দেন।
আড়াই মাস কাজ করার পর একদিন পায়ে ঢুকে যায় পেরেক। যন্ত্রণায় কাতর শরীফ বাবার কাছে গিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, কাঠমিস্ত্রির কাজ আর করতে পারবেন না। এবার থেকে মন দিয়ে লেখাপড়া করবেন।
ছেলের কথায় আবার তাঁকে বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দেন বাবা। পড়াশোনার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে নিয়োগ করেন গৃহশিক্ষকও। এরপর বদলে যেতে থাকে শরীফের ফলাফল। মানবিক বিভাগ থেকে এসএসসি পাস করে রাজশাহী কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৭২ সালে এইচএসসি পরীক্ষাতেও ভালো ফল করেন।
এরপর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত রসায়ন বিভাগে দুই বছর পড়াশোনা করেন। কিন্তু তাঁর মনে তখন অন্য স্বপ্ন—চিকিৎসক হওয়া। সেই লক্ষ্য নিয়ে মেডিকেল কলেজে ভর্তির পরীক্ষা দেন এবং সুযোগও পেয়ে যান।
মায়ের সোনার দুলে শুরু চিকিৎসক হওয়ার যাত্রা
চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন পূরণের পথে এবার বাধা হয়ে দাঁড়ায় পারিবারিক সংকট। শরীফদের পরিবারে ছিলেন ১০ ভাইবোন। ছোট ভাইয়ের জন্মকে কেন্দ্র করে বাবা-মায়ের মধ্যে বিরোধ বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করে আলাদা হয়ে যান। সংসারের ভার এসে পড়ে মা রোকেয়া বেগমের ওপর।
এর মধ্যে জন্মের ৪০ দিনের মাথায় ধনুষ্টংকারে মারা যায় ছোট ভাই। সংসারের আর্থিক সংকটে শরীফের বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনাও শেষ হয়নি, আবার মেডিকেলে সুযোগ পেয়েও ভর্তি হওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
এমন পরিস্থিতিতে তাঁর মা সিদ্ধান্ত নেন, ছেলেকে চিকিৎসক হতেই হবে। নিজের একমাত্র সম্বল কানের সোনার দুলজোড়া বিক্রি করে দেন তিনি। সেই টাকা দিয়েই মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন শরীফ আহমেদ খান। মায়ের এই ত্যাগ তাঁর জীবনের অন্যতম বড় প্রেরণা হয়ে থাকে। কিন্তু চিকিৎসক হওয়ার পথে যে আরও বড় বিপর্যয় অপেক্ষা করছিল, তা তখনো জানতেন না তিনি।
সিনেমা দেখে ফেরার পথে বদলে গেল জীবন
১৯৭৮ সালে পাঁচ বন্ধুর সঙ্গে সিনেমা দেখতে গিয়েছিলেন শরীফ। ফেরার পথে এক তরুণের সঙ্গে তাঁদের তর্কবিতর্ক ও ঝামেলা হয়। এলাকার লোকজন এসে বিষয়টি মীমাংসাও করে দেন। কিন্তু ওই রাতেই খুন হন সেই তরুণ। আগের বিরোধের সূত্র ধরে খুনের মামলায় প্রধান আসামি করা হয় শরীফকে।
এরই মধ্যে এমবিবিএসের চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন তিনি। একটি বিষয়ে পাস করলেও বাকি তিন বিষয়ে অকৃতকার্য হন। এরপর ১৯৮৪ সালে সামরিক আদালতের সাজায় কারাগারে যেতে হয় তাঁকে। থমকে যায় চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন, অনিশ্চিত হয়ে পড়ে সংসার ও ভবিষ্যৎ। কারাগারে গিয়ে নিজের নাম-পরিচয়ের বদলে হয়ে যান একটি সংখ্যা—৪৫৩৩। বন্দিদের গণনার সময় এই নম্বরেই ডাকা হতো তাঁকে।
কারাগারের জীবন ছিল কঠিন। ঘুমানোর জন্য অল্প জায়গা, দুটি কম্বল, খাওয়ার জন্য থালা-বাটি—প্রয়োজনীয় অনেক কিছুরই অভাব ছিল। গাদাগাদি করে থাকার মধ্যে শারীরিক সমস্যারও মুখোমুখি হন তিনি। একসময় মনে হয়েছিল, জীবনে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।
শরীফের ভাষ্য অনুযায়ী, যে ব্যক্তিকে হত্যার মামলায় তাঁকে আসামি করা হয়েছিল, তিনি ছিলেন এলাকার পরিচিত সন্ত্রাসী। প্রতিপক্ষের লোকজন তাঁকে হত্যা করেছিল বলে দাবি করেন শরীফ। সিনেমা দেখে ফেরার পথে তাঁদের মধ্যে বিরোধ হলেও তা মিটে গিয়েছিল। পরে একই রাতে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তাঁকে মামলায় জড়ানো হয়। সামরিক আদালতে একতরফাভাবে সাজা দেওয়া হয়েছিল বলেও তাঁর দাবি।
কারাগারে বই হয়ে উঠল বেঁচে থাকার অবলম্বন
দীর্ঘ কারাজীবনের হতাশা যখন তাঁকে গ্রাস করছিল, তখন এক কর্নেলের একটি পরামর্শ নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। কারাগার পরিদর্শনে এসে ওই কর্মকর্তা তাঁকে বলেছিলেন, জীবনের এই সময়টিকে জীবনেরই একটি অংশ হিসেবে মেনে নিতে। কথাটি গভীরভাবে নাড়া দেয় শরীফকে। তিনি বই পড়া শুরু করেন। বাংলার পাশাপাশি উর্দু ভাষার বই পড়ার আগ্রহ থেকে উর্দুও শিখে নেন। বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন জীবনে বই হয়ে ওঠে তাঁর নতুন আশ্রয়।
কারাগারের দেয়াল তাঁকে আটকে রাখলেও জ্ঞানের জগতে প্রবেশের পথ বন্ধ করতে পারেনি। বই পড়তে পড়তে সময় কাটানোর পাশাপাশি মানসিকভাবে টিকে থাকার শক্তিও খুঁজে পান তিনি। ১৯৯০ সালে গণ-অভ্যুত্থানের পর এরশাদ সরকারের পতন ঘটে। পরবর্তী সময়ে মার্শাল ল কোর্টের দণ্ড বাতিল হলে সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মুক্তির সুযোগ তৈরি হয়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন শরীফ আহমেদ খানও। সাত বছরের কারাজীবন শেষে ১৯৯১ সালে মুক্তি পান তিনি।
সাত বছর পর ফিরে এল চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন
কারাগার থেকে বেরিয়ে শরীফ যোগাযোগ করেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজে। এমবিবিএসের চূড়ান্ত পরীক্ষার বাকি বিষয়গুলো দেওয়ার সুযোগ পাবেন কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। বিষয়টি কলেজের সিন্ডিকেটের সভায় ওঠে। সেখানে দেখা যায়, পরীক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর একাডেমিক কোনো বাধা নেই। এরপর বাকি পরীক্ষাগুলো দিয়ে পাস করেন শরীফ। দীর্ঘ বিরতি, কারাবাস ও জীবনের নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে ১৯৯১ সালে অবশেষে পূরণ হয় চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন।
তবে তত দিনে জীবনের অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে। সরকারি চাকরিতে আবেদনের বয়সও আর অবশিষ্ট ছিল না। ফলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি ও ব্যক্তিগতভাবে চিকিৎসাসেবা দিয়ে পেশাজীবন এগিয়ে নেন তিনি। একসময় একটি বেসরকারি সংস্থা থেকে চিকিৎসক হিসেবে অবসরও নেন।
শরীফ আহমেদ খানের বয়স এখন ৭৪ বছর। রাজশাহী নগরের শেখপাড়া মহল্লায় বসবাস করেন তিনি। জীবনের এই দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল যাত্রা নিয়ে লিখেছেন আত্মজীবনী। নাম দিয়েছেন ‘পঁয়তাল্লিশ তেঁত্রিশ’—কারাগারে তাঁর পরিচয় হয়ে ওঠা সেই সংখ্যারই স্মারক।
৭২ বছর বয়সে বেতারের তালিকাভুক্ত শিল্পী
চিকিৎসক পরিচয়ের বাইরেও শরীফের রয়েছে আরেকটি জগৎ—সংগীত। তিনি গান লেখেন, সুর করেন। জীবনের অভিজ্ঞতা, দীর্ঘ কারাবাসের বেদনা ও ভেতরে জমে থাকা ক্ষত তাঁর সৃষ্টিতে জায়গা পেয়েছে।
৭২ বছর বয়সে বাংলাদেশ বেতারের অডিশনে অংশ নিয়ে তালিকাভুক্ত আধুনিক গানের শিল্পী হন তিনি। জীবনের এতটা পথ পেরিয়ে নতুন একটি পরিচয় অর্জন করা তাঁর গল্পকে আরও ব্যতিক্রমী করে তুলেছে।
কারাজীবনের যন্ত্রণা তাঁর লেখা গানের কয়েকটি পঙ্ক্তিতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে—
‘আমি নর্দমায় পড়া এক অসহায় নিরেট
যেন সুকান্তের ছুড়ে ফেলা এক পরিত্যক্ত সিগারেট।
আমি রাতজাগা কুকুর চিৎকার করে উঠি—সব আছে ঠিক
আমি পঁয়তাল্লিশ তেঁত্রিশ এক পরাজিত সৈনিক।’
গানের এই পঙ্ক্তিগুলোয় যেন ফিরে আসে কারাগারের সেই দিনগুলো, যখন নামের বদলে একটি সংখ্যা ছিল তাঁর পরিচয়। সেই পরিচয়কে মুছে ফেলতে পারেনি সময়; বরং সেটিকেই আত্মজীবনীর নামে ধারণ করেছেন তিনি।
হারানো সময় পেরিয়ে নতুন পরিচয়ের গল্প
শরীফ আহমেদ খানের জীবনকে কেবল একজন চিকিৎসক হওয়ার গল্পে সীমাবদ্ধ করা যায় না। শৈশবে কাঠমিস্ত্রির কাজে যাওয়া, মায়ের সোনার দুল বিক্রি করে মেডিকেলে ভর্তি হওয়া, খুনের মামলায় সাত বছর কারাবাস, মুক্তির পর আবার পরীক্ষায় বসা—প্রতিটি অধ্যায়ই তাঁর জীবনের আলাদা সংগ্রামের সাক্ষী।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গান লেখা, সুর করা এবং জীবনের ৭২ বছর বয়সে বেতারের শিল্পী হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার অভিজ্ঞতা। যে মানুষ একসময় কারাগারে একটি সংখ্যায় পরিণত হয়েছিলেন, তিনিই পরে নিজের নামের পাশে যুক্ত করেছেন একাধিক পরিচয়।
জীবনের সব বাধা যে মুছে গেছে, তা নয়। হারানো সময় আর কারাবাসের স্মৃতি তাঁর জীবনের অংশ হয়েই রয়েছে। তবু সেই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই নিজের জন্য নতুন পথ তৈরি করেছেন শরীফ আহমেদ খান। তাঁর গল্প মনে করিয়ে দেয়, জীবনের কোনো অধ্যায়ই সব সম্ভাবনার শেষ কথা নয়; কখনো কখনো দীর্ঘ বিরতির পরও নতুন করে শুরু করা সম্ভব।
কালের আলো/এমএসআইপি/জেএন
আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]