অনলাইন অপরাধের লাগাম টানতে পুলিশের নতুন বলয়
অপরাধের ধরন বদলেছে। পাল্টেছে অপরাধ সংঘটনের পরিসরও। একসময় অপরাধের আলামত খুঁজতে ছুটতে হতো ঘটনাস্থলে। এখন সেই আলামত থাকতে পারে একটি মোবাইল ফোনে, ক্লাউড সার্ভারে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টে কিংবা ভার্চুয়াল মুদ্রার লেনদেনে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তারে সেই জগত আরও জটিল হচ্ছে ক্রমশ। এমন বাস্তবতায় সাইবার অপরাধ দমন, ডিজিটাল নিরাপত্তা জোরদার এবং প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত সক্ষমতা বাড়াতে বাংলাদেশ পুলিশে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করল স্বতন্ত্র সাইবার পুলিশ ইউনিট। অনুমোদিত কাঠামো অনুযায়ী এই ইউনিটে থাকছে ৪ হাজার ৫৯২ জনের জনবল।
- ৪,৫৯২ সদস্যের স্বতন্ত্র সাইবার ইউনিট
- ডার্ক ওয়েব-ক্রিপ্টো-ম্যালওয়্যার বিশ্লেষণে বিশেষজ্ঞ
- বিচ্ছিন্ন তদন্ত এবার এক ছাতার নিচে
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর পুলিশ সদর দপ্তরের ‘হল অব ইন্টেগ্রিটি’তে ইউনিটটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। পরে ‘হল অব প্রাইড’-এ আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি জানান, পরিবর্তনশীল অপরাধের ধরন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সনাতন পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে আধুনিক প্রযুক্তি ও মেধানির্ভর বাহিনীতে রূপান্তরের লক্ষ্যেই এই ইউনিট গঠন করা হয়েছে।

এক ছাতার নিচে সাইবার তদন্ত
সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় এতদিন পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে প্রয়োজন অনুযায়ী তদন্ত ও নজরদারি চললেও তা ছিল অনেকটাই ছড়িয়ে থাকা কাঠামোর মধ্যে। নতুন ইউনিটের অন্যতম উদ্দেশ্য সেই বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে সমন্বিত তদন্তব্যবস্থা তৈরি করা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, পূর্বে বিভিন্ন ইউনিটে অসংগঠিতভাবে পরিচালিত সাইবার তদন্তের সমন্বয়হীনতা দূর করে এখন থেকে একক কাঠামোর অধীনে এসব কার্যক্রম পরিচালিত হবে। নতুন ইউনিটটি একজন অতিরিক্ত আইজিপির নেতৃত্বে পরিচালিত হবে।
প্রাথমিকভাবে অতিরিক্ত আইজিপি মো. ইকবাল হোসেনকে এর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বিভাগীয় পর্যায়ে ডিআইজি ও অতিরিক্ত ডিআইজি এবং জেলা পর্যায়ে পুলিশ সুপার বা দায়িত্বপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করবেন। থানায় ওসির নেতৃত্বে সাইবারকেন্দ্রিক সেবা ও তদন্তের জন্য পৃথক এসআই, এএসআই ও কনস্টেবল পদায়ন করা হবে। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় পর্যায়ের বিশেষায়িত সক্ষমতাকে মাঠপর্যায়ের তদন্তের সঙ্গে যুক্ত করার একটি পূর্ণাঙ্গ কাঠামো দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
পুলিশের সঙ্গে যুক্ত হবে প্রযুক্তিবিশেষজ্ঞ
সাইবার অপরাধের জটিলতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে কেবল প্রচলিত পুলিশি দক্ষতা দিয়ে এর সব স্তর মোকাবিলা করা কঠিন। সেই সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় নতুন ইউনিটে চুক্তিভিত্তিক ও আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ নিয়োগের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, সিস্টেম অ্যানালিস্ট, ফাইন্যান্সিয়াল ডেটা অ্যানালিস্ট, সাইবার সিকিউরিটি এক্সপার্ট, নেটওয়ার্ক অ্যাডমিনিস্ট্রেটর, ডার্ক ওয়েব অ্যানালিস্ট, ক্রিপ্টো অ্যানালিস্ট, ম্যালওয়্যার অ্যানালিস্ট ও সোশ্যাল মিডিয়া অ্যানালিস্ট নিয়োগ দেওয়া হবে। পাশাপাশি ইমার্জেন্সি রেসপন্স কনসালটেন্ট ও ডিজাস্টার রিকভারি এক্সপার্টও থাকবেন।
বিশেষজ্ঞদের জন্য পৃথক আকর্ষণীয় বেতন কাঠামোর ব্যবস্থা থাকবে বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে পুলিশের আইটি-প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সদস্যদের অগ্রাধিকার দিয়ে ইউনিটে পদায়ন করা হবে। এখানে মূল পরিবর্তনটি হচ্ছে—সাইবার তদন্তকে শুধু পুলিশের একটি দায়িত্ব হিসেবে না দেখে প্রযুক্তি, তথ্য বিশ্লেষণ ও আইন প্রয়োগের সমন্বিত কাজ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

ডিজিটাল ফরেনসিকে বড় বিনিয়োগ
সাইবার অপরাধের তদন্তে প্রযুক্তিগত আলামত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ এখন অপরিহার্য। একটি ডিভাইসের তথ্য, অনলাইন লেনদেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যক্রম কিংবা ম্যালওয়্যারের গতিপথ—সবই তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারে। এই সক্ষমতা বাড়াতে সাইবার পুলিশ ইউনিটের অধীনে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও সরঞ্জামসমৃদ্ধ ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাবরেটরি স্থাপনের কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, মানি লন্ডারিং, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক অপরাধ, গুজব, আর্থিক অপরাধ, মাদক ও উগ্রবাদের প্রেক্ষাপটে ডিজিটাল ও ফরেনসিক ল্যাবের প্রয়োজনীয়তা এখন সর্বাত্মক। ফলে প্রস্তাবিত ল্যাবের ব্যবহার শুধু সাইবার অপরাধে সীমাবদ্ধ থাকবে না; প্রযুক্তিনির্ভর আলামত যেখানে তদন্তের অংশ, সেখানেও এর প্রয়োজন পড়তে পারে।
৪৫৯২ জনের কাঠামো, উচ্চতর বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ
অনুমোদিত অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী ইউনিটটির মোট জনবল ৪ হাজার ৫৯২ জন। বিদ্যমান পুলিশ বাহিনী থেকে অভিজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত সদস্যদের পদায়নের পাশাপাশি নতুন নিয়োগের মাধ্যমে জনবল পূর্ণাঙ্গ করা হবে। ইউনিটের সিনিয়র কর্মকর্তাদের দেশে ও বিদেশে উচ্চতর বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী। কর্মকর্তাদের কাজের অবদানের ভিত্তিতে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
নিজেদের দক্ষতাকে নিয়মিত হালনাগাদ রাখা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অপরাধের নতুন কৌশল তৈরি করছে, আবার একই প্রযুক্তি তদন্তের নতুন সুযোগও তৈরি করছে। ফলে সাইবার পুলিশ ইউনিটের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হবে প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের দক্ষতাকে নিয়মিত হালনাগাদ রাখা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন ইউনিটের লক্ষ্য বাংলাদেশ পুলিশকে আধুনিক প্রযুক্তি ও মেধানির্ভর বাহিনীতে রূপান্তর করা। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়িত হলে সাইবার অপরাধ তদন্তে সমন্বিত সক্ষমতার পাশাপাশি প্রচলিত অপরাধ তদন্তেও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়তে পারে। অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী, আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকিরসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
কালের আলো/এমএএএমকে




আপনার মতামত লিখুন
Array