পুকুর ভরাটে কক্সবাজারে বাড়ছে সুপেয় পানির সংকট
CREATOR: gd-jpeg v1.0 (using IJG JPEG v62), quality = 80?
কক্সবাজারে অপরিকল্পিত নগরায়ন, পুকুর ও জলাধার ভরাট এবং ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহারে পরিবেশ ও পানি-নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সরকারি হিসাবে গত কয়েক বছরে জেলার পুকুরের সংখ্যা কমেছে এক হাজারেরও বেশি। একই সময়ে প্রতিবছর ১০ থেকে ১১ ফুট হারে নিচে নামছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর।
জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে কক্সবাজারে পুকুর রয়েছে ৯ হাজার ৫৬০টি। অথচ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১১ সালের হিসাবে এ সংখ্যা ছিল ১০ হাজার ৬৩৭টি। অর্থাৎ সরকারি হিসাবেই এক হাজার ৭৭টি পুকুর কমেছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর দাবি, বাস্তবে বর্তমানে জেলার পুকুরের সংখ্যা ৭ হাজারের বেশি নয়।
জেলার পেকুয়া উপজেলায় সদর ইউনিয়ন পরিষদের পাশে প্রায় সাড়ে ৯ বিঘার একটি সরকারি পুকুরও গত কয়েক বছরে ভরাট হয়ে ছোট হয়ে গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পুকুরটির পাড় ধীরে ধীরে ভরাট করায় এর আয়তন কমেছে। অথচ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫ হাজার মানুষ এবং হাটবারে ২৫ থেকে ৩০ হাজার মানুষ পুকুরটি ব্যবহার করেন।
শুধু পেকুয়া নয়, জেলার বিভিন্ন এলাকায় পুকুর ও জলাধার ভরাট করে গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন, মার্কেট, আবাসিক স্থাপনাসহ বিভিন্ন অবকাঠামো। পরিবেশবাদীরা বলছেন, অপরিকল্পিত নগরায়ন, বাণিজ্যিকভাবে মাটি ফেলা এবং যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাব জলাধার কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা বলেন, প্রতিবছর যেভাবে পুকুর হারিয়ে যাচ্ছে, তা জেলার জন্য ভয়াবহ সংকেত। সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন উভয় ধরনের পুকুর ভরাটের কারণে সুপেয় পানি ও পরিবেশগত সংকট বাড়ছে।
পুকুর ও জলাধার কমে যাওয়ার প্রভাব পড়ছে পানি নিষ্কাশন, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ, স্থানীয় তাপমাত্রা এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর। পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, বৃষ্টির সময় পুকুর পানি ধারণ করে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার ওপর চাপ কমায়। একই সঙ্গে জলাধার স্থানীয় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে।
এদিকে কক্সবাজারে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রতিবছর ১০ থেকে ১১ ফুট হারে পানির স্তর নিচে নামছে। এক দশক আগে কক্সবাজার শহরের টেকপাড়ায় ১২০ থেকে ১৫০ ফুট গভীরতায় পানি পাওয়া গেলেও বর্তমানে অনেক জায়গায় পানির জন্য ৩০০ ফুটের বেশি গভীরে যেতে হচ্ছে।
সাগরপাড়ের কলাতলী এলাকাতেও গত কয়েক বছরে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ১০ থেকে ১৫ ফুট নিচে নেমেছে। এতে তিন শতাধিক আবাসিক হোটেলের অনেক পানির পাম্প অকেজো হয়ে পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন এবং পুকুর-জলাশয় ভরাটকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী আবুল মনজুর বলেন, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং পুকুর, লেক ও নদীর পানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। সুপেয় পানি নিশ্চিত করতে বাঁকখালী নদীর পানি শোধনের জন্য একটি বড় প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১০ লাখ লিটার পানি শোধন করা সম্ভব হবে, যা কক্সবাজার পৌরসভার মোট চাহিদার প্রায় ৫৫ শতাংশ পূরণ করতে পারবে।
এ ছাড়া বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং প্রকল্প চলছে। উখিয়া ও টেকনাফে স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য পৃষ্ঠপানি জলাধার ও পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি শহরের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় পর্যাপ্ত জলাধার থাকা জরুরি। কক্সবাজারে জলাধার ভরাটের প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে পানি-নিরাপত্তা, জলাবদ্ধতা ও অতিরিক্ত তাপের মতো সংকট আরও তীব্র হতে পারে। তাই বিদ্যমান পুকুর ও প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ এবং অবৈধ ভরাট বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।
কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি

আপনার মতামত লিখুন
Array