১৫ টাকার ডিমে পুষ্টির হিসাব
ডিমের বাজারে আবারও বড় ধাক্কা। রাজধানীর খুচরা বাজারে এক ডজন বাদামি ডিমের দাম উঠেছে ১৫৫ থেকে ১৬০ টাকায়। এক সপ্তাহের ব্যবধানে ডজনপ্রতি বেড়েছে প্রায় ১০ টাকা। একসঙ্গে এক ডজন কেনার সামর্থ্য নেই—এমন নিম্ন আয়ের পরিবারকে এখন একটি ডিম কিনতেও গুনতে হচ্ছে প্রায় ১৫ টাকা। অর্থাৎ যে ডিম ছিল কম খরচে প্রাণিজ আমিষের অন্যতম সহজলভ্য উৎস, সেটিই ক্রমে অনেক পরিবারের দৈনন্দিন খাবারের হিসাবের বাইরে চলে যাচ্ছে।
বাজারের এই ঊর্ধ্বগতির পেছনে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির যুক্তি রয়েছে। ডিম উৎপাদনকারী শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান ডায়মন্ড এগের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কায়সার আহমেদ জানান, গত দুই মাসে মুরগির খাবারের দাম কেজিতে সর্বোচ্চ ১২ টাকা বেড়েছে। প্রতি আটটি ডিম উৎপাদনে প্রায় এক কেজি খাবার লাগে। ফলে শুধু ফিডের মূল্যবৃদ্ধির কারণে দুই হালি ডিম উৎপাদনে খরচ বেড়েছে প্রায় ১২ টাকা। তাঁর মতে, ফিডের কিছু কাঁচামাল যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি হওয়ায় সেখানকার বাণিজ্যিক পরিবর্তনের প্রভাবও স্থানীয় উৎপাদন ব্যয়ে পড়ছে।
- ডজন ১৬০ টাকা, এক সপ্তাহেই বেড়েছে ১০
- ডজন ১৬০ টাকা, এক সপ্তাহেই বেড়েছে ১০
- ফিডের দাম বেড়েছে, সঙ্গে পরিবহন ও জ্বালানি ব্যয়ও
খামারে বাড়ছে খরচ, বাজারে বড় চাপ
ডিমের দামের পেছনে শুধু মুরগির খাবার নয়, বেড়েছে ওষুধ, পরিবহন ও জ্বালানির ব্যয়ও। বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি থাকলে খামারে জেনারেটর চালাতে ডিজেল ব্যবহার করতে হচ্ছে। সেই বাড়তি ব্যয়ও শেষ পর্যন্ত ভোক্তার বাজারে এসে যোগ হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মৌসুমি উৎপাদন ঘাটতির সম্ভাবনা। খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, অতিরিক্ত গরম ও আর্দ্রতার কারণে বছরের এই সময়ে মুরগির ডিম দেওয়ার হার কিছুটা কমে যায়। ফলে একই সময়ে উৎপাদন ব্যয় বাড়া এবং সরবরাহে চাপ তৈরি হওয়ায় বাজারে দামের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
২ হাজার ৪৪১ কোটি উৎপাদনেও পাতে কমছে
ডিমের উৎপাদন নিয়ে দেশের সামগ্রিক চিত্র অবশ্য সংকটের নয়। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে প্রায় ২ হাজার ৪৪১ কোটি ডিম উৎপাদিত হয়েছে। বছরে জনপ্রতি প্রাপ্যতা ১৩৭টির কিছু বেশি। কিন্তু উৎপাদনের এই পরিসংখ্যান মানুষের পাতে ডিমের উপস্থিতি বাড়ার নিশ্চয়তা দিচ্ছে না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের খানা আয়-ব্যয় জরিপে দেখা যায়, জনপ্রতি দৈনিক ডিম গ্রহণের পরিমাণ ১২ দশমিক ৭ গ্রাম। ২০১৬ সালে তা ছিল ১৩ দশমিক ৬ গ্রাম।
অর্থাৎ উৎপাদন বাড়লেও মানুষের ভোগ কমেছে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে মূল্যবৃদ্ধি। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর খাদ্য ও ফিডের দাম বাড়ার যে প্রভাব ডিমের বাজারে পড়েছিল, তা এখনো পুরোপুরি কাটেনি।
৮৫ টাকা থেকে ১৬০—বদলে গেছে বাজারের হিসাব
একসময় বছরের বড় সময়জুড়ে ডজন ডিমের দাম ৮৫ থেকে ১২০ টাকার মধ্যে থাকত। এখন তা ১২৫ থেকে ১৬০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরের মাঝামাঝি একপর্যায়ে ডজনপ্রতি দাম ২০০ টাকাতেও উঠেছিল। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের হিসাবে, বর্তমানে ডিমের হালি ৫০ থেকে ৫৫ টাকা, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ১১ শতাংশ বেশি।
প্রতিবেশীদের চেয়ে দাম বেশি কেন
পাকিস্তানে ডজন ডিমের দাম বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১১৫ টাকা। শ্রীলঙ্কায় ১৩৮ টাকা এবং ভারতের কলকাতায় প্রায় ১১৫ টাকা। অর্থাৎ একই অঞ্চলের কয়েকটি দেশের তুলনায় বাংলাদেশে ডিমের খুচরা দাম এখন উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের ২০২৪ সালের এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, এক দিন বয়সী মুরগির বাচ্চা, মুরগির খাবার ও ডিমের দাম ভারত ও পাকিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশে বেশি। আমদানি নিয়ন্ত্রণ এবং দেশীয় শিল্পকে উচ্চমাত্রায় সুরক্ষা দেওয়াকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
দাম নিয়ন্ত্রণে নজর সরবরাহব্যবস্থায়
ডিমের দাম নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক বৈঠকে উৎপাদন খরচ থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থার হিসাব খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। উৎপাদক, পাইকার ও খুচরা পর্যায়ে কতটা মূল্য সংযোজন এবং মুনাফা হচ্ছে, তা পর্যালোচনা করা হবে। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেছেন, ডিমের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়লে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর সরাসরি চাপ পড়ে। সেই চাপের বাস্তব চিত্র পাওয়া যায় ভোক্তার কথাতেও। মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোডের বাসিন্দা শাহানা আক্তারের ভাষায়, তরল দুধ, সয়াবিন তেল, আটা ও চিনির পর ডিমের দামও বাড়ছে; এভাবে নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে থাকলে সাধারণ মানুষের খাবারের জোগানই কঠিন হয়ে পড়বে।
ডিমের বাজারের বর্তমান সংকট তাই কেবল একটি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির গল্প নয়। উৎপাদন খরচের চাপ, আমদানি নীতি, সরবরাহব্যবস্থার ব্যয় এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা—সব মিলিয়েই তৈরি হচ্ছে এই বাজারচিত্র। উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি ডিম সাধারণ মানুষের নাগালে রাখতে হলে কোন পর্যায়ে খরচ ও মূল্য বাড়ছে, সেই হিসাবই এখন সবচেয়ে জরুরি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
কালের আলো/টিইকে/এমকে

আপনার মতামত লিখুন
Array