খুঁজুন
                               
, ,
           

ক্যারিবীয় সফরে দাস বাণিজ্যের জন্য ক্ষমা চাইবেন চার্লস?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৬, ৭:২৬ অপরাহ্ণ
ক্যারিবীয় সফরে দাস বাণিজ্যের জন্য ক্ষমা চাইবেন চার্লস?

যুক্তরাজ্যের রাজা তৃতীয় চার্লস শিগগিরই ক্যারিবীয় অঞ্চলে সফরে যাচ্ছেন। এ সফরকে ঘিরে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের আটলান্টিক দাস বাণিজ্যে ভূমিকার বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে। সফরের সময় রাজা চার্লসের কাছে আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চাওয়ার পাশাপাশি দাস বাণিজ্যে জড়িত দেশগুলোর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ বা পুনরুদ্ধারমূলক অর্থ দেওয়ার দাবিও উঠতে পারে।

২৭ অক্টোবর রাজা তৃতীয় চার্লস ও রানি ক্যামিলা আট দিনের সফরে ক্যারিবীয় অঞ্চলে যাবেন। সফরে তারা অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডা, বাহামাস এবং গায়ানা সফর করবেন। অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডায় অনুষ্ঠিতব্য কমনওয়েলথ সরকারপ্রধানদের বৈঠক বা CHOGM-এও তাদের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।

বাকিংহাম প্যালেসের বরাত দিয়ে ‘দ্য টাইমস’ জানিয়েছে, সফরের সময় যুক্তরাজ্যের ইতিহাসের ‘সবচেয়ে অন্ধকার দিনগুলো’ এড়িয়ে যাওয়া হবে না। তবে যুক্তরাজ্য সরকার রাজা চার্লসকে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাইতে বা ক্ষতিপূরণের প্রস্তাব দিতে কোনো পরামর্শ দেয়নি বলে জানা গেছে।

আটলান্টিকের দাস বাণিজ্যে ব্রিটিশ ভূমিকা

প্রায় দুই শতাব্দী ধরে চলা আটলান্টিকের দাস বাণিজ্যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। ১৬৬০-এর দশকে রয়্যাল আফ্রিকান কোম্পানি প্রতিষ্ঠার পর ইংল্যান্ড এ বাণিজ্যে বড় পরিসরে যুক্ত হয়। ব্রিটিশ জাহাজে পশ্চিম আফ্রিকা থেকে জোরপূর্বক মানুষকে ক্যারিবীয় অঞ্চল ও আমেরিকায় নিয়ে যাওয়া হতো। সেখানে তাদের দিয়ে চিনি, তামাক, কফি ও তুলাসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন করানো হতো।

আফ্রিকা থেকে আমেরিকায় দাস পরিবহনের ভয়াবহ সমুদ্রযাত্রা ইতিহাসে ‘মিডল প্যাসেজ’ নামে পরিচিত। দীর্ঘ এই যাত্রায় রোগ, অপুষ্টি, নির্যাতন ও অমানবিক পরিবেশের কারণে বহু মানুষ প্রাণ হারান।

১৮০৭ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ‘স্লেভ ট্রেড অ্যাক্ট’ পাস করে দাস বাণিজ্য নিষিদ্ধ করে। তবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে দাসপ্রথা পুরোপুরি বিলুপ্ত হয় ১৮৩৩ সালের ‘স্লেভারি অ্যাবোলিশন অ্যাক্ট’-এর মাধ্যমে।

চার্লসের আগের বক্তব্য

রাজা তৃতীয় চার্লস এর আগেও দাসপ্রথায় যুক্তরাজ্যের ভূমিকার বিষয়ে নিজের ‘ব্যক্তিগত দুঃখবোধের’ কথা জানিয়েছেন। বাকিংহাম প্যালেসের এক মুখপাত্র বলেন, ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার এবং আটলান্টিকের দাস বাণিজ্যের প্রজন্মান্তরের প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন ফোরামে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চলছে।

তবে প্রাসাদটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এ বিষয়টি মূলত সরকারের দেখার বিষয়। রাজা চার্লস তার আগের বক্তব্যগুলোতে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। তিনি দাস বাণিজ্যকে ‘একটি নৃশংসতা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যা ইতিহাসে স্থায়ীভাবে কলঙ্কের দাগ রেখে গেছে।

বাকিংহাম প্যালেস আরও জানিয়েছে, আসন্ন সফরের মূল লক্ষ্য হবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ‘প্রাণবন্ত বর্তমান ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ’কে সামনে তুলে ধরা।

ক্ষতিপূরণের দাবি

আটলান্টিকের দাস বাণিজ্য থেকে লাভবান দেশগুলোর কাছে আনুষ্ঠানিক ক্ষমা এবং ক্ষতিপূরণের দাবি এরই মধ্যে আফ্রিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশ জানিয়েছে।

সেপ্টেম্বরে জ্যামাইকার সরকার জানায়, দাসপ্রথার জন্য ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবিতে তারা রাজা চার্লসের কাছে একটি আবেদনপত্র দেবে। দেশটির সংস্কৃতিমন্ত্রী অলিভিয়া গ্রেঞ্জ জানান, ওই আবেদনে তিনটি প্রশ্ন প্রিভি কাউন্সিলের জুডিশিয়াল কমিটির কাছে পাঠানোর জন্য রাজাকে অনুরোধ করা হবে। এসব প্রশ্নের মধ্যে জ্যামাইকায় আফ্রিকানদের দাসত্বে পরিণত করার বৈধতার বিষয়টিও থাকবে।

তবে যুক্তরাজ্য সরকারের অবস্থান এখনো ক্ষতিপূরণ দেওয়ার পক্ষে নয়। সেপ্টেম্বর মাসে ডাউনিং স্ট্রিটের এক মুখপাত্র আটলান্টিকের দাস বাণিজ্যকে ‘ঘৃণ্য’ হিসেবে উল্লেখ করলেও বলেন, যুক্তরাজ্য দাস বাণিজ্যের জন্য ক্ষতিপূরণ প্রদান করে না।

ফলে ক্যারিবীয় সফরে রাজা চার্লস দাস বাণিজ্যের ইতিহাস নিয়ে কী ধরনের বক্তব্য দেন এবং ক্ষমা বা ক্ষতিপূরণের দাবির বিষয়ে কোনো নতুন অবস্থান সামনে আসে কি না, সেদিকেই নজর থাকবে।

কালের আলো/এসএ

আকাশে উঠল টেসলার রোডস্টার? উড়ন্ত গাড়ির দাবি নিয়ে যত প্রশ্ন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৫৫ পূর্বাহ্ণ
আকাশে উঠল টেসলার রোডস্টার? উড়ন্ত গাড়ির দাবি নিয়ে যত প্রশ্ন

বিজ্ঞানের কল্পকাহিনিতে দেখা উড়ন্ত গাড়ি কি এবার বাস্তবে আসতে চলেছে? টেসলার প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্কের নতুন রোডস্টার স্পোর্টস কারের প্রদর্শনী ঘিরে এমন প্রশ্নই উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে স্পেসএক্সের একটি স্থাপনায় গাড়িটির বিশেষ প্রযুক্তি প্রদর্শন করা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এতে থ্রাস্টার ব্যবহার করে গাড়িটিকে সাময়িকভাবে শূন্যে তোলা, মাঝআকাশে ঘোরানো এবং মাটিতে অবতরণের কৌশল দেখানোর কথা বলা হয়েছে। তবে এই প্রদর্শনীকে পূর্ণাঙ্গ উড়ন্ত গাড়ির আত্মপ্রকাশ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, কোনো গাড়ি অল্প সময়ের জন্য মাটি ছেড়ে উঠতে পারা আর সেটিকে ব্যবহার করে নিয়মিত আকাশপথে যাতায়াত করা এক বিষয় নয়। গাড়িটির বাস্তব কার্যক্ষমতা, নিরাপত্তা এবং বাণিজ্যিক ব্যবহারের উপযোগিতা নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন।

প্রদর্শনীতে কী দেখালেন ইলন মাস্ক?

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) আয়োজিত প্রদর্শনীতে মাস্ক বলেন, ‘আজ রাতে আপনারা কিছু অবিশ্বাস্য বিষয় দেখতে যাচ্ছেন।’ গাড়িটির প্রদর্শনী এআই দিয়ে তৈরি কোনো দৃশ্য নয়, তা প্রমাণ করার জন্যই দর্শকদের সামনে এটি দেখানোর প্রয়োজন ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি। টেসলার দাবি, নতুন রোডস্টারে স্পেসএক্সের মহাকাশ প্রযুক্তি থেকে অনুপ্রাণিত বিশেষ থ্রাস্টার ব্যবহার করা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রচলিত গাড়ির বাইরে নতুন ধরনের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা দেখানোর পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। প্রদর্শনীতে দেখানো প্রযুক্তি বাস্তবে কতটা কার্যকর এবং গাড়িটির কোন সংস্করণে এসব সুবিধা থাকবে, তা স্পষ্টভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। শুধু আকর্ষণীয় প্রদর্শনী দিয়ে কোনো প্রযুক্তির দৈনন্দিন ব্যবহারযোগ্যতা নিশ্চিত করা যায় না।

কীভাবে শূন্যে উঠবে গাড়ি?

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গাড়িটিতে উচ্চচাপে সংরক্ষিত বাতাস দ্রুত নির্গত করে থ্রাস্ট বা ধাক্কা তৈরির ব্যবস্থা ব্যবহার করার কথা বলা হয়েছে। বাতাস দ্রুত বেরিয়ে গেলে বিপরীত দিকে বল সৃষ্টি হয়। এই বল কাজে লাগিয়ে গাড়িটিকে সাময়িকভাবে শূন্যে তোলা বা ঘোরানোর মতো কৌশল দেখানো সম্ভব হতে পারে। তবে এ ধরনের প্রযুক্তির কার্যকারিতা নির্ভর করে থ্রাস্টের পরিমাণ, গাড়ির ওজন, ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ এবং বাতাসের চাপ ব্যবস্থাপনার ওপর। দীর্ঘ সময় বাতাসে থাকা কিংবা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে আকাশপথে চলাচলের জন্য আরও জটিল প্রযুক্তি ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা প্রয়োজন। তাই থ্রাস্টার ব্যবহার করে সাময়িকভাবে শূন্যে ওঠার প্রদর্শনীকে পূর্ণাঙ্গ উড্ডয়নক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।

উড়ন্ত গাড়ি হতে হলে যেসব চ্যালেঞ্জ পেরোতে হবে

একটি পূর্ণাঙ্গ উড়ন্ত গাড়িকে একই সঙ্গে সড়ক ও আকাশপথে নিরাপদে চলাচলের উপযোগী হতে হবে। এর জন্য শুধু শক্তিশালী থ্রাস্টার থাকলেই চলবে না; প্রয়োজন হবে নির্ভরযোগ্য দিকনির্দেশনা, ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ উড্ডয়ন ও অবতরণব্যবস্থা এবং জরুরি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার প্রযুক্তি। এর পাশাপাশি যাত্রীদের নিরাপত্তা, শক্তির ব্যবহার, শব্দদূষণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনের বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তব পরিবেশে এসব শর্ত পূরণ না হলে প্রযুক্তিটি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতে ব্যবহার করা কঠিন হবে।

২০২৮ সালে উৎপাদনের পরিকল্পনা

মাস্ক জানিয়েছেন, নতুন রোডস্টারের উৎপাদন ২০২৮ সালে শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে উৎপাদন শুরুর নির্দিষ্ট সময়, গাড়ি সরবরাহের সূচি, চূড়ান্ত মূল্য এবং বিশেষ প্রযুক্তির বাস্তব কার্যক্ষমতা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে। পরিকল্পিত সময়ের মধ্যে উৎপাদন শুরু হলেও গাড়িটির কোন সংস্করণে থ্রাস্টার প্রযুক্তি থাকবে এবং সেটি ক্রেতাদের জন্য কতটা ব্যবহারযোগ্য হবে, তা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে থাকবে। উৎপাদনের ঘোষণা আর বাজারে পরীক্ষিত, অনুমোদিত ও ব্যবহারযোগ্য গাড়ি সরবরাহ—দুটি আলাদা বিষয়।

টেসলার প্রদর্শনী উড়ন্ত গাড়ির ধারণাকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। কিন্তু গাড়িটি দীর্ঘ সময় উড়তে পারে, আকাশপথে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে পারে কিংবা সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় সব নিরাপত্তাশর্ত পূরণ করেছে—এমন প্রমাণ এই বর্ণনায় নেই। অতএব, এখনই টেসলার নতুন রোডস্টারকে পূর্ণাঙ্গ উড়ন্ত গাড়ি বলা ঠিক হবে না। বরং এটিকে থ্রাস্টার প্রযুক্তির সম্ভাবনা তুলে ধরার একটি প্রদর্শনী হিসেবে দেখা যায়।

সূত্র: বিবিসি

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

 

পাঠ্যবইয়ে বাবুই, বাস্তবে নেই—তালগাছ কমে হারাচ্ছে বাংলার চিরচেনা দৃশ্য

মৌলভীবাজার সংবাদদাতা
প্রকাশিত: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৩৭ পূর্বাহ্ণ
পাঠ্যবইয়ে বাবুই, বাস্তবে নেই—তালগাছ কমে হারাচ্ছে বাংলার চিরচেনা দৃশ্য

‘বাবুই পাখিকে ডাকি বলিছে চড়াই, কুঁড়ে ঘরে থাকি কর শিল্পের বড়াই।’ কবি রজনীকান্ত সেনের ‘স্বাধীনতার সুখ’ কবিতার এই পঙ্‌ক্তি বাংলা পাঠ্যবইয়ের মাধ্যমে বহু প্রজন্মের শিক্ষার্থীর কাছে পরিচিত। নিজের হাতে তৈরি বাসার সৌন্দর্য আর আত্মনির্ভরতার প্রতীক হিসেবে বাবুই পাখির পরিচয়ও পেয়েছে বিশেষ মাত্রা। কিন্তু কবিতায় পরিচিত সেই পাখি ও তার নিপুণ বুননের বাসা এখন বাস্তবে অনেকের কাছেই অচেনা হয়ে উঠছে।

একসময় গ্রামবাংলার তালগাছের পাতায় পাতায় ঝুলত বাবুই পাখির অসংখ্য বাসা। পাখির কিচিরমিচিরে মুখর থাকত গ্রামের পথঘাট। মৌলভীবাজারের বিভিন্ন গ্রাম ও হাওরাঞ্চলেও ছিল এমন দৃশ্য। কিন্তু সময়ের সঙ্গে কমেছে তালগাছ, সংকুচিত হয়েছে বাবুই পাখির আবাসস্থল। নির্বিচারে বৃক্ষনিধন, কীটনাশকের ব্যবহার, পাখি শিকার এবং অপরিকল্পিত বসতি নির্মাণের মতো নানা কারণে প্রকৃতির এই পরিচিত দৃশ্য এখন ক্রমেই বিরল হয়ে উঠছে। স্থানীয় বাসিন্দা, প্রবীণ শিক্ষক ও পাখিপ্রেমীদের বর্ণনায় উঠে এসেছে, মৌলভীবাজারের অনেক এলাকায় একসময় প্রচুর তালগাছ থাকলেও এখন সেগুলোর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। কোথাও কোথাও তালগাছের অস্তিত্ব থাকলেও সেখানে আর আগের মতো বাবুই পাখির বাসা দেখা যায় না।

তালগাছের পাতায় পাতায় ঝুলত শত বাসা

মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার ২ নম্বর উত্তরভাগ ইউনিয়নের উত্তরভাগ গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি ও অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র শিক্ষক মো. মুজিবুর রহমানের স্মৃতিতে এখনো উজ্জ্বল সেই সময়ের গ্রামবাংলা। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় গ্রামের মেঠোপথের পাশে সারি সারি তালগাছ ছিল। গাছগুলোর পাতায় পাতায় বাবুই পাখির শৈল্পিক বাসা ঝুলত। পাখির কিচিরমিচির শব্দে মুখর থাকত পুরো গ্রাম। মুজিবুর রহমান বলেন, শুধু তাঁর গ্রামেই নয়, আবহমান বাংলার বহু গ্রামেই এমন দৃশ্য দেখা যেত। কিন্তু এখন মৌলভীবাজারের গ্রাম-গঞ্জে তালগাছ খুব একটা চোখে পড়ে না। সেই সঙ্গে কমে গেছে বাবুই পাখির উপস্থিতিও।

তাঁর স্মৃতিচারণে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, কীভাবে একটি পরিচিত প্রাকৃতিক দৃশ্য কয়েক দশকের ব্যবধানে মানুষের দৈনন্দিন জীবন থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। যে পাখি ও বাসা একসময় গ্রামীণ পরিবেশের স্বাভাবিক অংশ ছিল, এখন তা দেখার জন্যও অনেক জায়গায় খোঁজ করতে হয়।

এক দশকেই বদলে গেছে গ্রামের চিত্র

শ্রীমঙ্গল উপজেলার ২ নম্বর ভুনবীর ইউনিয়নের সরকার বাজার এলাকার বাসিন্দা জনি দাসও দেখেছেন তালগাছ কমে যাওয়ার এমন পরিবর্তন। তাঁর মতে, প্রায় এক দশক আগেও তাঁদের এলাকায় যত তালগাছ ছিল, এখন তার চার ভাগের এক ভাগও নেই। জনি দাস জানান, ২০০১-২০০২ সালের দিকে শুধু তাঁদের গ্রামেই রাস্তার পাশে ও বিভিন্ন বাড়িতে অন্তত দুই শতাধিক তালগাছ ছিল। এসব গাছে বাবুই পাখির বাসাও দেখা যেত। কিন্তু বর্তমানে পুরো গ্রাম ঘুরেও একটি তালগাছ পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে তাঁর।

বাবুই পাখির বাসার অবস্থা আরও করুণ বলে মনে করেন তিনি। একসময় যা ছিল গ্রামের পরিচিত দৃশ্য, এখন তা দেখা যেন জাদুঘরে বিরল কোনো নিদর্শন দেখার মতো বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয়দের এমন অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, তালগাছ কমে যাওয়ার প্রভাব শুধু গাছের সংখ্যা হ্রাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে বদলে যাচ্ছে গ্রামের প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং পাখিদের বসবাসের সুযোগও।

এখনো রয়েছে বাবুইয়ের বাসা দেখার বিরল সুযোগ

তবে মৌলভীবাজারের সব জায়গা থেকেই বাবুই পাখির বাসা হারিয়ে যায়নি। শ্রীমঙ্গল উপজেলার ৩ নম্বর শ্রীমঙ্গল ইউনিয়নের রূপসপুর বা ফুলবাড়ি এলাকায় পাশাপাশি থাকা দুটি তালগাছে এখনো অসংখ্য বাবুই পাখির শৈল্পিক বাসা দেখা যায়। এলাকার এই দৃশ্য দেখতে প্রতিদিন বিকেলে সেখানে ভিড় করেন অনেকে। তালগাছের পাতায় ঝুলে থাকা বাসাগুলো এখনো প্রকৃতিপ্রেমীদের আকর্ষণ করে। চারপাশে তালগাছ ও বাবুইয়ের বাসা কমে যাওয়ায় এমন জায়গাগুলো স্থানীয়ভাবে বিশেষ গুরুত্বও পেয়েছে।

ওই এলাকার বাসিন্দা হাজী মো. ফজলুর রহমান মনে করেন, নির্বিচারে গাছ কাটা, কীটনাশকের অবাধ ব্যবহার, পাখি শিকারিদের দৌরাত্ম্য এবং অপরিকল্পিতভাবে বাড়িঘর নির্মাণের কারণে তালগাছ কমে যাচ্ছে। এতে বাবুই পাখির আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে এবং পাখিটির টিকে থাকাও কঠিন হয়ে পড়ছে। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে, প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষার বিষয়টি শুধু পাখি সংরক্ষণের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; এর সঙ্গে গ্রামীণ পরিবেশের ভারসাম্যও জড়িত।

কুলাউড়ায় তালগাছ আছে, নেই বাবুইয়ের বাসা

কুলাউড়া উপজেলার কাদিপুর এলাকার সোলেমান হোসেনের স্মৃতিতেও রয়েছে ছোটবেলায় দেখা অসংখ্য তালগাছ ও বাবুই পাখির বাসার কথা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তাঁর এলাকার চিত্র বদলে গেছে। সোলেমান হোসেন জানান, বর্তমানে পুরো এলাকায় রাস্তার পাশে সরকারি জমিতে মাত্র একটি তালগাছ রয়েছে। আগে সেই গাছেও বাবুই পাখির বাসা দেখা যেত। কিন্তু কয়েক বছর ধরে সেখানে আর কোনো বাসা চোখে পড়ছে না।

এই অভিজ্ঞতা দেখায়, শুধু তালগাছের অস্তিত্ব থাকলেই বাবুই পাখির উপস্থিতি নিশ্চিত হয় না। গাছের পাশাপাশি পাখির উপযোগী পরিবেশ, নিরাপত্তা ও খাদ্যের প্রাপ্যতাও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে নির্দিষ্ট এলাকায় বাবুই পাখি না থাকার সুনির্দিষ্ট কারণ জানতে আরও পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা প্রয়োজন। শ্রীমঙ্গল উপজেলার ৪ নম্বর সিন্দুরখান ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইয়াছিন আরাফাত রবিনও তাঁর শৈশবের সঙ্গে বর্তমানের পার্থক্য তুলে ধরেছেন। ছোটবেলায় তাঁদের এলাকায় অসংখ্য তালগাছ দেখেছেন তিনি। এসব গাছে বাসা বাঁধত বাবুই পাখি। এখন তালগাছ যেমন কম দেখা যায়, তেমনি চোখে পড়ে না পাখিটির শৈল্পিক বাসাও।

তিন প্রজাতির বাবুই নিয়ে উদ্বেগ

পাখিপ্রেমী খোকন সিং বিভিন্ন প্রজাতির পাখি নিয়ে খোঁজখবর করেন এবং ফটোগ্রাফির মাধ্যমে পাখিদের উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় পাহাড়, টিলা ও হাওরসমৃদ্ধ মৌলভীবাজার জেলার বিভিন্ন উপজেলায় দাগি, বাংলা ও দেশি—এই তিন প্রজাতির বাবুই পাখির আবাস ছিল। তিনি জানান, বর্তমানে বাংলা ও দাগি বাবুইয়ের দেখা প্রায় মেলেই না। তাঁর পর্যবেক্ষণে, কোনোরকমে টিকে আছে কিছু দেশি বাবুই পাখি।

খোকন সিংয়ের মতে, বাবুই পাখির বাসা তৈরির জন্য তালগাছ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তালগাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় পাখিটির আবাসস্থলও সংকটের মুখে পড়েছে। বাবুই পাখিকে টিকিয়ে রাখতে হলে প্রচুর পরিমাণে তালগাছ রোপণ করতে হবে বলে মনে করেন তিনি। তবে কোনো প্রজাতির বর্তমান সংখ্যা, বিস্তৃতি কিংবা বিলুপ্তির ঝুঁকি নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করতে নিয়মিত মাঠপর্যায়ের জরিপ ও বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রয়োজন। পাখিপ্রেমীদের পর্যবেক্ষণ স্থানীয় পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিলেও তা দিয়ে পুরো জেলার প্রজাতিগত অবস্থা চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা যায় না।

আবাসস্থল ধ্বংসে ঝুঁকিতে পাখি ও বন্যপ্রাণী

বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. কাজী নাজমুল হক বলেন, নানা কারণে গ্রামাঞ্চলে তালগাছ কাটা এবং অপরিকল্পিতভাবে বাড়িঘর নির্মাণের ফলে বাবুই পাখিসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আশ্রয়স্থল নষ্ট হচ্ছে। তিনি পরিবেশ ও প্রতিবেশ রক্ষায় সবাইকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তালগাছ সংরক্ষণ এবং বাবুই পাখিকে বিলুপ্তির ঝুঁকি থেকে রক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। নাজমুল হকের সতর্কবার্তা হলো, প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ না নিলে একসময় বাবুই পাখি বাস্তব জীবনের পরিচিত দৃশ্য থেকে হারিয়ে গিয়ে কেবল পাঠ্যপুস্তকের কবিতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়তে পারে।

তালগাছ রক্ষা ও নতুন করে রোপণ জরুরি

বাবুই পাখির বাসা শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য নয়, এটি গ্রামবাংলার পরিবেশ ও স্মৃতিরও অংশ। তালগাছের সংখ্যা কমে যাওয়া এবং পাখির বাসা বিরল হয়ে পড়ার যে চিত্র স্থানীয়দের বক্তব্যে উঠে এসেছে, তা আবাসস্থল সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয়ভাবে তালগাছ সংরক্ষণ, উপযুক্ত জায়গায় নতুন চারা রোপণ, নির্বিচারে গাছ কাটা বন্ধ, পাখি শিকার প্রতিরোধ এবং কীটনাশকের দায়িত্বশীল ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। পাশাপাশি বিদ্যমান বাবুইয়ের বাসা থাকা গাছগুলো রক্ষা করা এবং পাখির উপস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করাও প্রয়োজন।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

 

অফিসার্স ক্লাবের নির্মাণাধীন ভবনে সাবেক অতিরিক্ত সচিবের মরদেহ উদ্ধার

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১:২৭ পূর্বাহ্ণ
অফিসার্স ক্লাবের নির্মাণাধীন ভবনে সাবেক অতিরিক্ত সচিবের মরদেহ উদ্ধার

রাজধানীর রমনায় অবস্থিত অফিসার্স ক্লাবের ভেতরে নির্মাণাধীন একটি ভবন থেকে সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. মোশাররফ হোসেনের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বেলা পৌনে ১২টার দিকে ভবনটির নিচতলায় সিঁড়ির পাশের ফাঁকা জায়গা থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ভবনটির তৃতীয় তলা থেকে নিচতলার ফাঁকা অংশে পড়ে তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ঘটনার বিস্তারিত পরিস্থিতি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দেওয়া তথ্যের বাইরে নিশ্চিতভাবে কিছু জানা যায়নি।

মেয়েকে নিয়ে সকালে অফিসার্স ক্লাবে যান

অফিসার্স ক্লাব সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে মো. মোশাররফ হোসেন তাঁর ছোট মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে ক্লাবে প্রবেশ করেন। পরে ক্লাবের সুইমিংপুলের সামনে মেয়েকে রেখে তিনি পাশের নির্মাণাধীন ভবনের ভেতরে যান। এরপর প্রায় এক ঘণ্টা পেরিয়ে গেলে ভবনটির নিচতলায় সিঁড়ির পাশের ফাঁকা অংশে তাঁকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হলে সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করেন। মোশাররফ হোসেন অফিসার্স ক্লাবের সদস্য ছিলেন। তিনি পরিবারের সঙ্গে রাজধানীর বনানীর একটি বাড়িতে বসবাস করতেন।

তৃতীয় তলা থেকে পড়ে যাওয়ার কথা জানাল পুলিশ

ঘটনা সম্পর্কে রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) শেখ জাহিদুল ইসলাম জানান, সকালে ছোট মেয়েকে নিয়ে অফিসার্স ক্লাবের সুইমিংপুলে গিয়েছিলেন সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. মোশাররফ হোসেন। তাঁর চোখে কম দেখার সমস্যা ছিল। পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, নির্মাণাধীন ভবনটির তৃতীয় তলা থেকে তিনি নিচতলার ফাঁকা অংশে পড়ে যান। ঘটনাস্থলে মরদেহের সুরতহাল সম্পন্ন করেছে পুলিশ। তবে কীভাবে তিনি নিচে পড়ে যান, সে বিষয়ে পুলিশের বক্তব্যের বাইরে বিস্তারিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পরিবারের সদস্যরা ময়নাতদন্ত করাতে চাননি। এ কারণে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের কথা জানিয়েছেন রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার শেখ জাহিদুল ইসলাম। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, মোশাররফ হোসেনের বড় মেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন। তিনি দেশে ফেরার পর বাবার দাফন সম্পন্ন করা হবে।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি